সহকারী শিক্ষক
১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৮:০৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
এমনই এক আশ্চর্য প্রেমের গল্প শুনিয়েছিলেন বনফুল, তার ‘তাজমহল’ গল্পে। প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের প্রেমের স্মৃতিতে সম্রাট শাহজাহানের তাজমহল নির্মাণের অনুষঙ্গে এই সাধারণ মানুষ দুটিকে জুড়ে দিয়েছিল ওই গল্প। তবে এমন ঘটনা যে কেবল গল্পেই শোনা যায়, তা কিন্তু নয়। বাস্তবেও অনেক সময় দেখা গেছে, প্রেমের জন্যই আশ্চর্য সব কাজ করে বসেছেন অতি সাধারণ কোনো মানুষ। রাজা-বাদশাহদের মতো অর্থ-সামর্থ্য বা লোকবল কিছুই ছিল না তাদের। কেবল প্রেমের জোরেই হয়তো তারা এমন কোনো কাজ করেছেন, যা কল্পনাতীত।
শুরু করা যাক ভিন্ন এক তাজমহলের গল্প দিয়ে। ভারতের উত্তর প্রদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামের পোস্টমাস্টার ফৈজুল কাদরি। দাম্পত্যের ৫৮ বছর পর যখন তার স্ত্রী তাজামুল্লি মারা যান, তখন নিজের জমি, স্ত্রীর গহনা সব বিক্রি করে শেষ সম্বলটুকু দিয়ে তাজমহল বানাতে শুরু করেন ফৈজুল। জানা যায়, স্ত্রীকে নাকি এমনটাই কথা দিয়েছিলেন তিনি। খবর পেয়ে তাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন খোদ ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তখন ওই টাকায় গ্রামে মেয়েদের জন্য কলেজ নির্মাণ করে দিতে বলেন ফৈজুল। কিন্তু তাজমহল গড়বেন নিজেই। একইভাবে স্ত্রীর মূর্তি গড়ে মন্দির বানিয়েছেন তামিলনাড়ুর এক ৮৪ বছরের বৃদ্ধ। তার কথায়, ৫০ বছর একসঙ্গে ঘর করেছেন দুজন। স্ত্রীকে না দেখে আর থাকতে পারবেন না তিনি।
থাইল্যান্ডের শ্যাডিল ডেফি অবশ্য বিয়েই করেছিলেন তার ‘মৃত প্রেমিকাকে’। কলেজ থেকে প্রেম, কিন্তু বিয়ে করার ফুরসত আর মিলছিল না তাদের। অবশেষে ১০ বছর প্রেমের পর যখন বিয়ের তারিখ পাকা, তার ঠিক আগেই দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলো তার প্রেমিকা অ্যানের। এরপরও বিয়ে বাতিল করেননি ডেফি। প্রেমিকার শেষকৃত্যের দিনই বিয়ের পোশাকে সেজে তার আঙুলে বিয়ের আংটি পরিয়ে দেন ওই যুবক।
আবার মৃত্যুর হাত থেকেই প্রেমিকাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন এক যুবক। স্রেফ ভালোবেসে। নাৎসিরক্ষী ফ্রান্ৎজ ভুঙ্ক, গ্যাসচেম্বার থেকে রেহাই দিয়েছিলেন হেলেনা সিট্রোনোভা নামে এক ইহুদি মেয়েকে, এমনকি তার বোনকেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই ভয়ংকর সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো মানুষের পক্ষে যে কাজ প্রায় অসাধ্যই ছিল।
আবার ব্যক্তিগত প্রেমেই এক আলাদা মাত্রা জুড়ে দিয়েছিলেন দশরথ মাঝি। প্রথাগত শিক্ষা নেই, টাকাপয়সাও নেই বিশেষ। কিন্তু প্রেমে কমতি পড়েনি এতটুকু। প্রেমে আকুল হয়ে গ্রামের যে মেয়েটিকে বিয়ে করেছিলেন দশরথ, সে-ই একদিন পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়। তা-ও অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। হাসপাতাল শহরে, কিন্তু সেখানে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। তাই বউকে কাঁধে নিয়েই ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন দশরথ। কিন্তু ততক্ষণে তার স্ত্রী আর বেঁচে নেই। দশরথ সেদিনই ঠিক করেছিলেন, ওই পাহাড় কেটে রাস্তা বানাবেন তিনি। যাতে আর কেউ চিকিৎসার অভাবে তার ভালোবাসার মানুষকে না হারায়। আর পরের ২২ বছর ধরে একাই ঠিক সেই কাজটিই করেছেন দশরথ মাঝি।
একা থাকেন এলসি এলার-ও। আমেরিকার মধ্যভাগে নেব্রাস্কা অঞ্চলের উত্তর দিকের শহর মনোউই। চেকোস্লোভাকিয়া থেকে দেশান্তরী হয়ে আসা মানুষেরা এই শহরটি গড়ে তুলেছিলেন এককালে। ১৯ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পর স্বামী রুডির সঙ্গে এই শহরে এসে সংসার শুরু করেন এলসিও। ১৯৩০ সালে শহরটির মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫০ জন। কিন্তু এরপর কারও কারও মৃত্যু হয়, কেউ আবার কাজের জন্য চলে যান অন্য শহরে। সবমিলিয়ে শহরের জনসংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। শেষমেশ রুডি আর এলসি ছাড়া সেখানে কেউই ছিলেন না। ২০০৪ সালে রুডির মৃত্যুর পর এলসি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। তাদের দুই সন্তানও থাকেন অন্য শহরে। তবু এক অদ্ভুত মায়ায় একাই ওই শহরে থেকে যান এলসি। শহরের মেয়রের দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে লাইব্রেরির তত্ত্বাবধান, সব কাজই একাই করেন তিনি।
রাজা-বাদশাহদের প্রেমের গল্প ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায়। কিন্তু দশরথ মাঝি কিংবা ফৈজুল কাদরির মতো মানুষের কথা থাকে যায় আড়ালেই। তাতে অবশ্য প্রেমের কিছু যায় আসে না। ভালোবাসার হাত ধরেই অসাধারণ সব কাজ করে যান এমন সাধারণ মানুষেরাই।
৫৩
৯১ মন্তব্য