Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৭:৫২ পূর্বাহ্ণ

প্রমিত বাংলা কি মান্য বাংলা ( প্রমিত ভাষায় কথা বলতে হবে কেন)

প্রমিত ভাষায় কথা বলতে হবে কেন?

অনেক লেখায় অনেকবার নানা প্রসঙ্গে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। সংক্ষেপে আবার বলছি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। কিন্তু কোন রূপের বাংলা? অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষের কাছেও এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। এটিএন বাংলায় তিন বছর ‘প্রমিত বাংলা’ শিরোনামে একটা অনুষ্ঠান পরিচালনা করার সময় বহুবার এ প্রসঙ্গে বলতে হয়েছে। শিক্ষিত লোকদের ধারণা, প্রমিত বাংলাই তাদের মাতৃভাষা। আসলে কিন্তু তা নয়। প্রত্যেকের নিজের অঞ্চলের ভাষাই, যে ভাষায় তার মা কথা বলেন, তার মাতৃভাষা।

মায়ের কোলে শুয়ে-বসে, হেসে-খেলে যে ভাষায় একটা শিশু কথা বলা শেখে, সেটাই তার মাতৃভাষা। তো মা যে অঞ্চলের ভাষায় কথা বলেন, সেই অঞ্চলের ভাষাই হবে তার মাতৃভাষা। বাড়ির বাইরে, বিশেষ করে স্কুলে আসার পর বইপত্রে এবং শিক্ষকদের কাছে প্রথমে তার পরিচয় হয় প্রমিত বাংলার সঙ্গে। এ বাংলা ভাষার অর্জন অনেক পরের কথা।

আঞ্চলিক ভাষার সীমাবদ্ধতা হলো, এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলে সহজবোধ্য না-ও হতে পারে। প্রবাদ আছে, এক অঞ্চলের বুলি, অন্য অঞ্চলের গালি। তখন প্রয়োজন হয় সর্বজনবোধ্য একটা ভাষার। প্রমিত বাংলা ভাষা সেই প্রয়োজন মেটাতে পারে। তাই সব অঞ্চলে, সব ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলার কদর।

উনিশ শতকের একেবারে শুরুতে যে গদ্য সৃষ্টি হয়েছিল, তা কোনোদিন আমাদের মুখের ভাষা ছিল না। না অভিজাত সমাজের, না আমজনতার। তবে কলকাতার শিক্ষিত সম্প্রদায় একরকম পরিশীলিত শিষ্ট ভাষায় কথা বলত। সেই শিষ্ট মৌখিক ভাষার ওপর ভিত্তি করে চলিত বাংলায় গদ্য রচনার সূচনা হয়। রবীন্দ্রনাথ চাইতেন, নগর কলকাতার শিষ্ট ভাষার ভিত্তিতে গড়ে উঠুক মানভাষা। সেই ভাষায় সাহিত্য রচনা ছিল সেকালে প্রায় দুরাশা। সাধু গদ্যের বিপরীতে চলিত ভাষায় সাহিত্য রচনার সাহস দেখা গেল প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’, এবং কালী প্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ উপন্যাস দুটোতে। ক্রমেই এ ভাষা পরিশীলিত হয়ে সাধু ভাষার পাশাপাশি সাহিত্য রচনার মাধ্যম হয়ে ওঠে। এ শিষ্ট মৌখিক ভাষাই আজকের প্রমিত বাংলা ভাষার ভিত্তি। এ ভাষাই হয়ে উঠল সবরকম আনুষ্ঠানিকতার ভাষা; যা আঞ্চলিক ভাষা থেকে অনেক বেশি সজ্জিত এবং রূপ রীতি ও বচনে আলাদা।

কলকাতায় গড়ে ওঠা শিক্ষিত বাবু সম্প্রদায় তাদের জীবনচারিতায় তথা পোশাকে-আশাকে, খাওয়া-দাওয়ায়, বসবাসের সচ্ছলতায় একরকম আভিজাত্যের আবহ গড়ে তুলেছিল। এর সঙ্গে পরিশীলিত শিষ্ট বাংলা বচন যুক্ত হয়ে এক ধরনের ভাষিক শ্রেণি নির্মিত হয়েছিল। শিক্ষা-দীক্ষায়, বচনে, ধনসম্পদে ওরাই ছিলেন সমাজের শিরোমণি। তখন থেকে প্রমিত বাংলা শুধু আনুষ্ঠানিক পরিবেশের ভাষা নয়, এলিট শ্রেণিরও ভাষা হয়ে ওঠে। অবস্থা এখনো তাই।

সবরকম আনুষ্ঠানিক পরিবেশে আমরা প্রমিত বাংলা ব্যবহার করি। কারণ, আনুষ্ঠানিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে প্রমিত বাংলা ভাষার দাবি সর্বাগ্রে। এ ভাষা শিখতে হয়। হিজিবিজি আঁকিবুঁকি সবাই পারেন, কিন্তু ছবি আঁকাটা শিখতে হয়। সেটা দেখে দেখে হোক বা প্রশিক্ষণ নিয়ে, শিখতেই হয়। প্রমিত বাংলাও তাই। প্রমিত বাংলায় কথা বলতে না পারলে পরিশীলিত জনগোষ্ঠীর দরবার, মানে চাকরি, রেডিও-টেলিভিশনে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, মঞ্চে বক্তৃতা, আবৃত্তি, অনুষ্ঠান সঞ্চালনা-কোথাও সমাদর পাওয়া যায় না। তাই নিজেদের স্বার্থেই আমরা প্রমিত বাংলায় কথা বলতে চাই। এ রীতির ভাষাকে ‘মান্যভাষা’ মনে করি।

মন্তব্য করুন