Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৮:১৯ পূর্বাহ্ণ

“ঈসা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত জঙ্গলবাড়ী ও এগার সিন্দুর ”

ঈসা খাঁ ১৫২৯ খ্রিঃ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সোলায়মান খান ছিলেন আফগানিস্তানের সোলায়মান পার্বত্য অঞ্চলের এক আফগান দলপতির বংশধর। তিনি বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দীন নুসরাত শাহের রাজত্বকালে (১৫১৯-১৫৩৩ খ্রি:) পূর্ব বাংলার ভাটি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। নিজ দক্ষতায় তিনি ভাটি অঞ্চলে বৃহত্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলার উত্তর পূর্ব অংশ নিয়ে এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে সুলতান ইসলাম শাহ্ শূরের বিরুদ্ধে সোলায়মান খান অন্তত: দু’বার বিদ্রোহ করেন এবং যুদ্ধে (১৫৪৮ খ্রি.) নিহত হন। পিতার মৃত্যুকালে ঈসা খাঁর বয়স ছিল প্রায় ১৯ বছর। পিতার মৃত্যুর পর দাদা কুতুবউদ্দিন খান নাতিকে লালন পালন করেন। ঈসা খাঁর শৈশব ও যৌবন ভাটি অঞ্চলেই কাটে। কররানী আফগান শাসক তাজ খানের সময় প্রায় ৩৫ বছর বয়সে ঈসা খাঁ বাংলার কররানী শাসকদের সামন্ত’ হিসাবে সোনারগাঁও ও মহেশ্বরদী পরগনায় ১৫৬৪ খ্রি:  জমিদারী লাভ করেন। এরপর ঈসা খাঁ কররানী শাসকদের আরো অনুগ্রহ লাভ করে ক্রমশ : শক্তি ও পদমর্যাদা বৃদ্ধি করেন ১৫৭১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তিনি এত শক্তিশালী হয়ে ওঠেন যে, মুঘল ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁকে পূর্ব বাংলার (ভাটি অঞ্চলের) শাসকরূপে আখ্যায়িত করেন। বাংলায় ‘ভাটি’ শব্দটি সাধারণত নিম্ন অঞ্চলকে বুঝায়। এই বিবেচনা বাংলার সমগ্র নিম্ন অঞ্চলকে ভাটি বলা যায়। ১৫৭৩ খ্রিঃ ঈসা খাঁ ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা উদয় মানিক্যের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম অভিযানে দাউদ খানকে সাফল্যের সাথে সাহায্য করেছিলেন। তারপর ১৫৭৫ খ্রি: সোনারগাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মুঘল নৌবহরকে বিতাড়িত করতে দাউন খানের সেনাপতিকে ঈসা খাঁ সাহায্য করেছিলেন। ঈসা খাঁ দক্ষতা ও কর্তব্য নিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হয়ে দাউদ খান তাঁকে ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। 

১৫৮৬ খ্রি: রানী এলিজাবেথের বিশেষ দূত রালফ্ ফিচ্ বাংলাদেশ ভ্রমণে আসেন। তিনি ঈসা খাঁর খুবই প্রশংসা করেছিলেন। তিনি ঈসা খাঁকে একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে এবং রাজাদের রাজা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। বিবিধ রাজকীয় গুনের অধিকারী ‘মসনদ-ই আলা ঈসা খাঁ’ বা ‘মর্জুমানে ভাটি ঈসা খাঁ’-র অমর স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে ময়মনসিংহ অঞ্চলে কিশোরগঞ্জ জেলার ‘জঙ্গলবাড়ী’ আর ‘এগার সিন্দুর’ নামক দুটি সুপ্রাচীন জনপদ। কিশোরগঞ্জ মহকুমা (বর্তমানে জেলা) শহরের চেয়েও অধিক প্রাচীন এ জঙ্গলবাড়ী জনপদ। বাংলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ বার ভূঁইয়াদের অন্যতম মর্জুমানে ভাটি ঈসা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী ছিল এই জঙ্গলবাড়ী। ১৭৬৫ খ্রি: প্রণীত মেজর রেনেল সাহেবের মানচিত্রেও জঙ্গলবাড়ীর অবস্থান উল্লেখ ছিল। জনশ্রুতি আছে যে, এ এলাকা একসময় ছিল গহীন অরণ্যে ঘেরা। তখন এখানে বাজিতপুরের নামও শোনা যেত। পঞ্চদশ শতকে এ জঙ্গলবাড়ী ছিল কোচ রাজবংশীয় সামন্তরাজ লক্ষণ হাজোর রাজধানী। বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় সাড়ে ছয় কি:মি: পূর্বে নরসুন্দা নদীর তীরে করিমগঞ্জ থানায় জঙ্গলবাড়ী অবস্থিত। এই এলাকায় এখনও আছে পুরাতন ইটের অংশ ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর দিকে গভীর ও প্রশস্ত পরিখা। আরো আছে ঈসা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত ভগ্নদুর্গ প্রাচীর, ধ্বংসপ্রাপ্ত দরবার হল/পরিষদ কক্ষ, সুপ্রাচীন মসজিদ, পুকুর, পুকুর পাড়ে বাঁধানো দেয়াল ও সবুজ ঘাসে ঢাকা একটি ভবনের ভিত্তি। শোনা যায় ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে ঈসা খাঁ মুঘলদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এই জঙ্গলবাড়ীতে চলে আসেন এবং রাজা লক্ষণ হাজোর রাজধানী দখল করেন। জঙ্গলবাড়ীতে এসে তিনি এখানকার দুর্গ সংস্কার করেন এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করেন। তিনদিক থেকে গভীর ও প্রশস্ত পরিখা খনন করেন এবং জঙ্গলবাড়ী দুর্গকে একটি গোলাকার দ্বীপের আকার দেন। তাঁর মূল ঘাঁটি জঙ্গলবাড়ী থেকেই অগ্রসর হয়ে তিনি ঢাকা অঞ্চলের সোনারগাঁও দখল করেন। তারপর সোনারগাঁও-এ তিনি রাজধানী স্থাপন করে জঙ্গলবাড়ীকে দ্বিতীয় রাজধানী করেন। শোনা যায় ঈসা খাঁর হঠাৎ আক্রমণে কোচ রাজা লক্ষণ হাজো ভীত হয়ে প্রাণভয়ে সপরিবারে পার্শ্ববর্তী সুসং রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন। আশ্রিত রাজা লক্ষণ হাজো জঙ্গলবাড়ী উদ্ধারের জন্য রাজা রঘুনাথের সাহায্য কামনা করেন। তখন রাজা রঘুনাথ জঙ্গলবাড়ী উদ্ধারের জন্য সৈন্যবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। এই অগ্রাভিযানের সংবাদ পেয়ে ঈসা খাঁ নান্দাইল-নীলগঞ্জ এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে রঘুরাজের সৈন্যবাহিনীকে প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণ চালান। এ যুদ্ধে রাজা রঘুনাথ পরাজিত হলে তাকে বন্দী করে জঙ্গলবাড়ীতে আনা হয়। এতে সুসং দুর্গাপুরের রাজার সৈন্যরা নীলগঞ্জের সন্নিকটে নরসুন্দা নদী থেকে একটি খাল খনন করে কৌশলে রাজা রঘুনাথকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। সেই খাল এখনও আছে। নরসুন্দা নদীর এই সংযোগ খালকে বলা হয় ‘রঘুখালী’। মহাকালের করাল গ্রাসকে ঠেকিয়ে আজও একটি মসজিদ জঙ্গলবাড়ী দুর্গের পাশে টিকে আছে। স্থানীয় লোকজনের ধারণা ঈসা খাঁর বংশধরেরা এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদে আছে তিনটি গম্বুজ। কয়েক বছর আগে এ মসজিদ মেরামত করা হলে। তার মৌলিকত্ব বেশীরভাগ অংশে রাখা সম্ভব হয়নি। 

এগার সিন্দুর দুর্গ প্রসঙ্গে লিখিত কোন কাহিনী পাওয়া যায়নি। তবে পর্যটক ইবনে বতুতা চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এগারসিন্দুর প্রসঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। ঐ সময় এগারসিন্দুর বন-জঙ্গল আর বন্যপ্রাণীতে পরিপূর্ণ ছিল। ওখানে তৈরী হত প্রচুর পরিমাণে সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র। ঐ মূল্যবান বস্ত্র তৈরী করানোর জন্য ঐ সময়ে ইংরেজ ও পর্তুগীজরা এগার সিন্দুরে কুঠি স্থাপন করেছিলেন। এখানে পাওয়া যেত প্রচুর ফলমূল। আর এখানে পান চাষও হত। সুলতান ফকরুদ্দিন মোবারক শাহ্ ঐ সময়ে সোনারগাঁও-এর শাসনকর্তা ছিলেন। বর্তমান পাকুন্দিয়া থানার অন্তর্গত এগার সিন্দুর দুর্গ ছিল বিশাল আকৃতির। মহাকালের করাল গ্রাসে এগার সিন্দুর বিলীন হয়ে গেলেও এখানে পাওয়া যায় নকশা করা ইট, অজানা সুড়ঙ্গ, কিছু পাথর খন্ড, মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষ ইত্যাদি। একটি উঁচু টিলা ছাড়া ঈসা খাঁর আমলের আর কোন চিহ্ন এখানে আর নেই। দুর্গের অবস্থান অনুমান করে চিহ্নিত স্থানের পশ্চিম দিকে প্রশস্ত পরিখার ধারণা পাওয়া যায়। উত্তর পূর্ব দিকে শঙ্খনদীর বাঁক দ্বারা সৃষ্টি হয়েছিল প্রাকৃতিক পরিখা। বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদ শতত বহমান ছিল দক্ষিণ পাশ দিয়ে। কোচ সামস্ত রাজা বেবুদ পঞ্চদশ শতকে এই এলাকায় রাজস্ব করতেন। ঈসা খাঁ এই এলাকায় ১৫৮৬ খ্রি: আগমন করলে কোচ রাজার রাজত্বের অবসান ঘটে। সামরিক ও অর্থনৈকি গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি এখানে রাজবাড়ী ও দুর্গ সংস্কার করে চারদিকে পরিখা খনন করেন এবং সৈন্য ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করেন। পরবর্তী সময় তাঁর এই ঘাঁটি থেকেই ব্রহ্মপুত্র নদের অপর পাড়ে অবস্থিত মুঘল সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।

মনন-ই-আলা ঈসা খাঁ ও মুঘল সেনাপতি রাজা মানসিংহের মধ্যে দ্বৈত যুদ্ধের কাহিনী আজও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। শোনা যায় যুদ্ধের এক পর্যায়ে মানসিংহের তরবারি ভেঙে গেলে ঈসা খাঁ তাঁকে হত্যা না করে  আরেকটি তরবারি তাঁর হাতে দিয়ে পুনরায় যুদ্ধের আহ্বান জানান। এই ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে সেনাপতি রাজা মানসিংহ তাঁকে বন্ধু হিসেবে আলিঙ্গন করেন। ভিন্নমতে জানা যায়, যুদ্ধ চলাকালে মানসিংহ তাঁর অশ্ব থেকে পড়ে গেলে ঈসা খাঁ নিজ অশ্ব থেকে নেমে তাড়াতাড়ি তাঁকে মাটি থেকে তোলেন। এতে ঈসা খাঁর মহত্ত্বে মুগ্ধ তাঁকে বুকে আলিঙ্গন করেন। তবে এসব ঘটনা ইতিহাস সমর্থিত কিনা তা জানা যায়নি। 

ঈসা খাঁর ইন্তেকালের পর মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সময় ১৬৩৮ খ্রি: অহমরাজ প্রায় পাঁচশ যুদ্ধযানসহ ব্রহ্মপুত্র নদ অতিক্রম করে ঈসা খাঁর এগারসিন্দুর বন্দর আক্রমণ ও লুটতরাজ করে এ বন্দর ধ্বংস করে দেয়। এ সংবাদ পাওয়া মাত্র বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁ তাঁর সৈনাদল নিয়ে এগারসিন্দুর রওয়ানা হন। তিনি এসেই অহমরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। এ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অহমরাজ আসামের দিকে পালিয়ে যায়। এ যুদ্ধে বন্দর আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপরেও বন্দরের যা কিছু ছিল তা ১৮৯২ খ্রি: ভূমিকম্পে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ১৫৯৯ খ্রি: বাংলার এই অদ্বিতীয় বীরযোদ্ধা, স্বাধীনচেতা সিংহপুরুষ এগার সিন্দুরের অদূরে বখতিয়ারপুর প্রাসাদে ইন্তেকাল করেন। 

১৯৭৮ খ্রি: তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার বাজিতপুর থানায় থানা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার (পিআইও) হিসেবে কর্মরত থাকাকালে এককালের বীরশ্রেষ্ঠ মসনদ-ই-আলা ঈসা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত জঙ্গলবাড়ী ও এগারসিন্দুর কাছ থেকে দেখার ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে আলোচনার সুযোগ আমার হয়েছিল। ১৯৭১ এ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে.... কত তিতুমীর, কত ঈসা খাঁন দিয়েছে জীবন, দেয়নিক মান এই ........’গানটি জীবনী শক্তি হিসেবে আমাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষতি কারা করছে? একটু লক্ষ্য করলে ও ১৯৭১ থেকে পত্র পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলে ওদের চিহ্নিত করা যায়। ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বরের পরে পাকবাহিনীর ফেলে যাওয়া কোটি কোটি টাকার অস্ত্র, শত শত মিল-কলকারখানার অংশ, হাজার হাজার বন্ধ দোকান ভেঙ্গে এদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার সম্পদ হাজার হাজার ট্রাকে ভরে কারা নিয়েছে? তিনমাসব্যাপী চট্টগ্রাম, চালনা-মংলা বন্দরে ভয়াবহ লুটের বিবরণ সম্ভবত ১৯৭২-এ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় পাওয়া যাবে। অন্যপন্থায় এখনও নিচ্ছে বাংলাদেশের সম্পদ। এসবের প্রতিবাদ করায় বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের উপর নেমে এসেছিল সীমাহীন সরকারি নির্যাতন। তৎকালীন বীরশ্রেষ্ঠ তিতুমীর আর ঈসা খাঁর দেশাত্মবোধের শিক্ষা আমাদের সাহায্য করবে ঐ শত্রুদের প্রতিহত করতে। ঐসব অপ্রতিরোধ্য ও ভয়াবহ লুটের বিবরণ মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর তৎকালীন পত্রিকা ‘হক কথা’ ও জাসদের পত্রিকায় (নাম সম্ভবত গণকণ্ঠ) পাওয়া যাবে।

মন্তব্য করুন