Loading..

ব্লগ

রিসেট

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

লম্বা বা খাটো,কেমন হবে সন্তানের উচ্চতা? জানেন তো?

জানেন কি?তুরষ্কের Sultan kosen,পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা মানুষটির কথা! যার উচ্চতা ৮ফুট ৩ ইঞ্চি কিংবা নেপালের khagendra Thapa Magar,মাত্র ২ফুট ২ইঞ্চি উচ্চতা নিয়ে গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছেন।প্রকৃতপক্ষে,এই লম্বা-খাটো হওয়ার পিছনে দায়ী জিনিসটা কি? তবে আসুন আজকে এই বিষয়টি নিয়ে কিছু তথ্য জেনে নিই।

মানুষ লম্বা বা খাটো হওয়ার পেছনে যেই ফ্যাক্টরটি কাজ করছে তার নাম “গ্রোথ হরমোন গ্রোথ হরমোন বা সোমাটোট্রপিন,যা একটি প্রোটিন অণু এবং মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে অবস্থিত অগ্রমস্তিষ্কের পিটুইটারি নামক গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত একটি  হরমোন। এটি দেহের প্রায় সকল টিস্যুর বৃদ্ধি ঘটায় এবং কোষে খাদ্য পৌঁছানোর মাধ্যমে শক্তি  উৎপন্ন করে দেহের মেটাবলিজমে সাহায্য করে।এছাড়াও কোষের বিভাজন,বৃদ্ধি,পেশির সংখ্যা বৃদ্ধি ও হাড়ের গঠন এবং বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন,যৌনাকাঙ্ক্ষা,মূত্র উৎপাদন প্রভৃতি নিয়ন্ত্রন করে থাকে গ্রোথ হরমোন।

পশ্চাৎ পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত এই গ্রোথ হরমোন,ইনসুলিন হরমোন ক্ষরণে উদ্দীপনা জাগায়।পরবর্তীতে এই হরমোনগুলো শিশুদের বৃদ্ধি বিশেষ করে উচ্চতা এবংকিশোর-কিশোরীদের মানসিক পরিপক্কতা ও শারীরিক বৃদ্ধির গতি ত্বরাণ্বিত করে।

সাধারনত,বয়সের সাথে শিশুর উচ্চতা ঠিকমতো বাড়ছে কি না তা নির্ধারনের মাধ্যমে একটি শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে উঠার বিষয়টি বুঝা যায়। যেমন:জন্মের পর প্রথম বছর একটি শিশুর উচ্চতা প্রায় ৯-১০সেন্টিমিটার বাড়ে,পরের ২-৩ বছর প্রায় ৪-৫ সেন্টিমিটার করে বৃদ্ধি পায়।পাঁচ-ছয় বছর বয়সের পর থেকে বয়ঃসন্ধিকাল এর আগ পর্যন্ত বৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হয়ে যায়।আবার বয়ঃসন্ধিকালে গ্রোথ হরমোনের ক্ষরণ বৃদ্ধি পায় এবং ১৭ বছর বয়সের পর থেকে ২১ থেকে ২৩ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি অনেকটাই কম হয়ে যায় তখন বছরে ১-২ সেন্টিমিটার করে বাড়তে পারে এবং আস্তে আস্তে গ্রোথ হরমোনের ক্ষরণ কমে আসে।

যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মার উচ্চতা,বংশগতীয় কারন কিংবা জাতিভেদ মানুষের দৈহিক বৃদ্ধিতে কিছুটা পার্থক্য দেখা দিতে পারে। কোন কোন সময় দেখা যায় শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বাড়ন্ত বয়সে গ্রোথ হরমোনের  ক্ষরণ হঠাৎ কমে যেতে পারে,এ অবস্থাকে বামনত্ব বলা হয়।যার ফলে ছেলে/মেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক খাটো হয়।

আবার,গ্রোথ হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণের ফলে শিশুদের ক্ষেত্রে জাইগ্যান্টিজম বা দৈত্যাকৃতি এবং বড়দের ক্ষেত্রে অ্যাক্রোমেগালি দেখা দেয়। এক্ষেত্রে হাতের সাইজ  বড় হওয়া,মুখের আকৃতির পরিবর্তন যেমন: নাক বড় হওয়া,অতিরিক্ত লোম হওয়া, চামড়া পাতলা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। মূলতঃ পিটুইটারি গ্রন্থিতে টিউমার হওয়ার ফলে গ্রোথ হরমোনের অস্বাভাবিক ক্ষরণে জাইগ্যান্টিজম হয়ে থাকে।

এছাড়াও প্রায়ই দেখা যায়,পরিমিত গ্রোথ হরমোনের অভাবে বাড়ন্ত কিশোর-কিশোরীদের

ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা না আসায় তারা প্রায়ই মনঃক্ষুন্নতায় ভোগে,যার

ফলে তাদের মধ্যে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

গ্রোথ হরমোনের অভাবের উপসর্গসমূহঃ

পেশি শক্তি এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া

দেহে ভালো এবং খারাপ কোলেষ্টেরল এর ভারসাম্যে অস্বাভাবিকতা

দূর্বল স্মৃতিশক্তি

দূর্বলতা এবং শক্তি কমে যাওয়া

অস্টিওপোরোসিস

আবার,গ্রোথ হরমোনের কিছু কিছু অস্বাভাবিকতা জিনগত কারনেও দেখা দিতে পারে।

এক্ষেত্রে শিশুর সঠিক বৃদ্ধির পরিমাপ রেগুলার চেকআপের মাধ্যমে জানাটা খুব প্রয়োজন।

কারন অনেক সময় জিনগত রোগ যেমন: টার্নার সিনড্রোম,প্রাডেরউইলি সিনড্রোম

ইত্যাদি কারনে শিশুর বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না

এবার যেই কথাটি না বললেই নয়,ইদানিং দেখা যাচ্ছে,কিছু মানুষ ইন্টারনেট থেকে বা টিভি বিজ্ঞাপন দেখে কিংবা কিছু তথাকথিত অ্যান্টি-এজিং এক্সপার্টদের পরামর্শে বয়স এবং সৌন্দর্য্য ধরে রাখার জন্য,লম্বা হওয়ার জন্য,চুল গজানোর জন্য কিংবা ফিটনেস ধরে রাখার জন্য কৃত্রিম হিউম্যান গ্রোথ হরমোন পিল হিসেবে অথবা স্প্রে-র মাধ্যমে অনায়াসে গ্রহন করছে।এভাবে সার্টিফাইড ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এইসকল পিল গ্রহন মোটেও উচিত না।

যদি একান্তই দেহে কোনো কারনে গ্রোথ হরমোনের প্রয়োজন হয় তবে হরমোন স্পেশালিস্ট এর পরামর্শে বিভিন্ন টেস্ট এর মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে গ্রোথ হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্রহন করা যেতে পারে। কারন ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কৃত্রিম গ্রোথ হরমোন গ্রহনের ফলে আমাদের দৈহিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।এভাবে কৃত্রিম গ্রোথ হরমোন ব্যবহারে যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে সেগুলো হল:

কৃত্রিম গ্রোথ হরমোন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াঃ

নার্ভ, পেশি অথবা জয়েন্টে ব্যথা

চামড়ার অসারতা

দেহে উচ্চমাত্রার কোলেষ্টেরল

ডায়বেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া

ক্যান্সার সম্ভাব্য টিউমারের উৎপত্তি

তাই শৈশব থেকে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত আপনার সন্তান শারীরিক এবং মানসিক দিক থেকে

সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কি না তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখুন।

নিয়ন্ত্রিত গ্রোথ হরমোন ক্ষরণের উপায়ঃ

এবার দেহের সঠিকভাবে বেড়ে উঠার জন্য নিয়ন্ত্রিতভাবে গ্রোথ হরমোন ক্ষরণের উপায়গুলো সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

অতিরিক্ত স্ট্রেস না নিয়ে পর্যাপ্ত পরিমান ঘুম,সঠিকভাবে খাওয়া-দাওয়া,রেগুলার ব্যায়াম ও খেলাধুলা এবং দেহ ও মনের সুষ্ঠু পরিচর্যার মাধ্যমে গ্রোথ হরমোন ক্ষরণের পরিমান নিয়ন্ত্রনে রাখা যায়।

যেহেতু গ্রোথ হরমোন কার্বোহাইড্রেট ও লিপিডের ভাঙ্গন এবং প্রোটিনের সংশ্লেষনের পাশাপাশি ভিটামিন এবং মিনারেলস এর শোষন বৃদ্ধি করে তাই সঠিক এবং সুষম খাদ্য গ্রহনের মাধ্যমে গ্রোথ হরমোনের লেভেল অনেকটাই ঠিক রাখা যায়।

 

বিভিন্ন খাদ্যের মধ্যে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য যেমন:ভাত,পাউরুটি,মিষ্টিআলু, বার্লি,ওটমিল; প্রোটিন জাতীয় খাদ্য যেমন:মাছ,মাংস,ডিম,ডাল,বীচি,বাদাম,দই এবং দুগ্ধজাতীয় খাদ্য; ফ্যাট এর মধ্যে বাটার,অলিভ অয়েল,সূর্যমুখী বীজের তেল,সামুদ্রিক মাছের তেল;ভিটামিন এবং মিনারেলস জাতীয় খাদ্য যেমন:সবুজ এবং রঙিন শাক-সবজি,গাজর,মটরশুটি,তরমুজ,জিংক ও আয়রনসমৃদ্ধ মিষ্টিকুমড়া,ডার্ক চকোলেট,বিভিন্ন টাটকা মৌসুমি ফলমূল ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

অতিরিক্ত চিনি গ্রহন না করে সুষম খাদ্য নির্দিষ্ট সময়ে সঠিকভাবে গ্রহন করতে হবে পাশাপাশি প্রতিদিন কিছু নির্দিষ্ট ব্যায়াম গ্রোথ হরমোন ক্ষরণের গতি ত্বরান্বিত করে। যদিও ব্যক্তির লম্বা কিংবা খাটো হওয়া অনেকটাই তার বংশগতির উপর নির্ভরশীল তথাপি বাড়ন্ত বয়সে যথাযথ খাবার,ঘুম,ব্যায়ামের মাধ্যমে গ্রোথ হরমোনের ক্ষরণ ত্বরাণ্বিত করা যায়।

তাই আসুন, অন্যকে লম্বা কিংবা খাটো নিয়ে বিড়ম্বনায় না ফেলে লম্বা-খাটোর ভেদাভেদ ভুলে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে জীবন-যাপন করি,যা সকলেরই কাম্য।

 

মন্তব্য করুন