Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৮:০২ পূর্বাহ্ণ

চর্যাপদের যুগে বাংলার সামাজিক অবস্থা (শেষ পর্ব)

‘চর্যাপদের যুগে বাংলার সামাজিক অবস্থা’

আলবেরুনি একাদশ শতকের ভারতবর্ষে হিন্দুদের যে ছ’টি উৎসব পালন করতে দেখেছিলেন, সেগুলোর একটা ফিরিস্তি তিনি তাঁর লেখায় দিয়ে গিয়েছেন। সেই উৎসবগুলির মধ্যে হয়ত দু’-তিনটি ওই সময়ের বাঙলাতেও প্রচলিত ছিল; যেমন - চৈত্র পূর্ণিমাতে বসন্তোৎসব, কার্তিকে দীপাবলী, ফাল্গুনে দোল ও শিবরাত্রি। তবে তাঁর লেখায় গাজনের কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না, কিন্তু গাজন ওই সময়ে নিম্নপর্যায়ের বাঙালীর, বিশেষ করে লুইসিদ্ধার শিষ্যদের প্রধান উৎসব ছিল। তখন ব্রাহ্মণেরা অবশ্য গাজন দেখাও দোষের বলে মনে করতেন। ওই সময়ের গাজনের মিছিলে অনেক কিছু থাকত - বাজনদার, দেবদেবীর সঙ, লাঠিয়াল বাগদী, ডোম ঘোড়সওয়ার, গাজনের মূল সন্ন্যাসী-গুরু আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ স্ত্রী ও পুরুষেরা। গাজনের মিছিলে তখন গুরু ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গের দল খোল-করতাল সহযোগে নানা রাগ-রাগিণীতে কীৰ্তন গাইতেন। সেইসব রাগিণীর নাম ছিল - পটমঞ্জরী, গবড়া, গুঞ্জরী, শীবরী (শবরী), বাংগালা ইত্যাদি। এথেকে বোঝা যায় যে, বাঙলার কীর্তন শ্রীচৈতেন্যর কালের দান নয়, বরং চৈতন্যের বহুযুগ আগে থেকেই বঙ্গদেশে কীর্তনের চল ছিল। ওই সময়ের বাঙলার নারীদের স্বাধীনতাও অবাধ ছিল। ময়নার গানে পাওয়া যায় যে, ময়না “হাটে গ্যাছেন, বাজারে গ্যাছেন, কিনিয়া খাইছেন খই”। তখনকার পাঠশালে ছেলেমেয়েদের একসঙ্গেই পড়াশুনা করতে হত, ঠাকুরদা ও ঠাকুমার ঝুলির গল্পগুলিতেও এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। পাঠশালে পড়ানো হত - সংস্কৃত, প্রাকৃত-বাঙলা, মাগধী, ও শৌরসেনী। তখন উচ্চবর্ণের পাঠশালায় যেমন ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধভিক্ষু গুরু হতেন, তেমনি নিম্নবর্ণের ক্ষেত্রে ডোম গুরু হতেন। ওই সময়ে নিম্নপর্যায়ের ডোমেরা কিন্তু উচ্চপর্যায়ের ব্রাহ্মণদের তুল্য ছিলেন। ‘শূন্যপুরাণের’ রচয়িতা ও বঙ্গদেশে ধৰ্ম্মঠাকুরের প্রতিষ্ঠাতা ‘রামাই পণ্ডিত’ও জাতিতে ডোম ছিলেন; তিনি নিজেই নিজেকে ‘দ্বিজ রামাই’ বলেছিলেন। বস্তুতঃ কেউ কেউ বলেন যে, এখনও নাকি দক্ষিণ রাঢ়ে ডোম পণ্ডিতদের সন্ধান পাওয়া যায়; শিক্ষকতাই তাঁদের প্রধান বৃত্তি। একাদশ শতকের বাঙলায় ‘পাকা’ তালপাতায় লেখালেখির কাজকর্ম চলত। তখন তালপাতাকে পাকানোর পদ্ধতিটি ছিল - প্রথমে মাজ-পাতা কেটে ছ’মাস ধরে পুকুরে পুঁতে রাখতে হত, তারপরে সেই পাতাকে দুধে সেদ্ধ করা হত। এরপরে শাঁখ দিয়ে ডলে, কাঠি বাদ দিয়ে সেটাকে সমান করে কেটে নেওয়া হত। লেখার জন্য তখন কঞ্চির, বাখারির বা লোহার কলমের ব্যবহার করা হত। লেখার কালির জন্য সাধারণতঃ ভুসাকালির চল ছিল, আর ব্লটিং বা চোষকের কাজটি মিহি বালি দিয়ে করা হত।

ঐতিহাসিকদের মতে অভিনন্দ লিখিত ‘রামচরিত’ পুরোবর্তী গ্রন্থ হলেও, ‘সন্ধ্যাকর নন্দী’ রচিত ‘রামচরিত’ সেটার থেকে অধিকতর মূল্যবান একটি ঐতিহাসিক রচনা। প্রথমটি রামায়ণকে অনুসরণ করে অষ্টম শতকে লেখা হলেও, দ্বিতীয়টি কিন্তু একাদশ শতকের একটি উপাদেয় সংস্কৃত শ্লিষ্ট কাব্য। ‘শ্লিষ্ট’ শব্দের অর্থ হল - যেটার দু’রকম অর্থ করা যেতে পারে। রচনায় সেই মুনশীয়ানা ছাড়াও ঐতিহাসিক ও সামাজিক দিক থেকেও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতের আরো অনেক মূল্য রয়েছে। তালপাতায় লেখা সেই পুঁথিটি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। সমগ্র পুঁথিটি খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের বাঙলা অক্ষরে লিখিত। সন্ধ্যাকর নন্দী বাঙালী ছিলেন, বরেন্দ্রীর শ্রীপৌণ্ড্রবর্ধনপুরের সন্নিকটে কায়স্থকুলে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তিনি রাজা রামপালেরই প্রায় সমসাময়িক ছিলেন। সাম্প্রতিক অতীতে জাপানের ‘হরিউজি’ মন্দিরে অর্থাৎ বিহারে রক্ষিত কয়েকটি ধর্মশাস্ত্রের মধ্যেও ঐতিহাসিকেরা একাদশ শতকের বাঙলা অক্ষরের নমুনা পেয়েছিলেন। সন্ধ্যাকরের কাব্যের প্রায় প্রতিটি শ্লোকই দ্ব্যর্থবাচক। রামচরিত বললে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের প্রথমেই রামায়ণের রামচন্দ্রের কথা মনে পড়ে; সন্ধ্যাকরের কাব্যটি বস্তুতঃ প্রথম অর্থে তাই বটে। কিন্তু দ্বিতীয় অর্থে ওই কাব্যে তাঁর লেখা শ্লোকগুলি তৎকালীন গৌড়াধিপ রামপাল সম্পর্কেও সমানভাবেই প্রযোজ্য; এমনি মুনশীয়ানা নিয়ে তিনি সমগ্র কাব্যটি লিখেছিলেন যে, সেটির কোথাও বিন্দুমাত্র কোন অসঙ্গতি পাওয়া যায় না। ইতিহাস বলে যে, রামপাল অস্তগামী পাল-সূর্যের প্রায় শেষরশ্মি ছিলেন। কিন্তু অস্তগামী হলে কি হবে, সে রশ্মিটির তেজ কিন্তু প্রচণ্ডই ছিল। তাঁর অগ্রজ দ্বিতীয় মহীপালের কালে তাঁদেরই সামন্তরাজ ‘দিব্বোক’ বা ‘দিব্য’ বিদ্রোহী হয়ে গৌড়ের সিংহাসন দখল করে নিয়েছিলেন। এর বহু বছর পরে দিব্যের ভ্রাতুষ্পুত্র ‘ভীম’কে যুদ্ধে পরাজিত করে রামপাল পুনরায় গৌড় উদ্ধার করেছিলেন। সন্ধ্যাকরের লেখা কাব্যটিতে সেই যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায়, একই সাথে তাতে ওই সময়ের গৌড়ের সাধারণ চিত্রও ফুটে উঠেছে। দিব্য জাতে কৈবর্ত ছিলেন। তখন বাংলার কৈবর্তেরা দু’ভাগে বিভক্ত ছিলেন - ‘হালিক’ ও ‘জালিক’। হালিক বলতে সাধারণতঃ চাযজীবী, আর জালিক বলতে সাধারণতঃ মৎসজীবিকে বোঝানো হত। তবে তাঁদের কুলগত কর্ম নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে নানা তর্কবিতর্ক রয়েছে। ধর্মের দিক থেকে ওই সময়ে তাঁরা শৈব ছিলেন। দ্বাদশ শতকের পণ্ডিত ‘হলায়ুধ’ বলেছিলেন, “কৈবর্তো ধীবরো দাসো মৎস্যজীবী চ জালিকঃ”। কারো কারো মতে কৈবর্তেরা তখন কর্ণধার, নৌচালক, ও নাবিক ছিলেন। অতীতে বালী, জাভা প্রভৃতি জায়গার ঔপনিবেশিক বাঙালীও ওই কৈবর্তজাতীয়, অর্থাৎ নৌচালক ও যুদ্ধব্যবসায়ী ছিলেন। এবারে প্রথমেই একাদশ শতকের বাংলার যুদ্ধের কথা বলা যাক। তখন রাজারা চতুরঙ্গ সেনা, অর্থাৎ পদাতিক ধনুর্ধর, অশ্বারোহী, গজারোহী আর নৌবহর নিয়ে যুদ্ধ করতেন। তখনকার বাংলার যুদ্ধে অবশ্য নৌবহরের তেমন কোন কাজ ছিল না। ওই সময়ে যুদ্ধের অস্ত্রের মধ্যে মূলতঃ অসি, কুন্ত অর্থাৎ বর্শা, শঙ্কু অর্থাৎ বড় ছুরি, তীরধনুক প্রভৃতি প্রধান ছিল। এমনকি পাথর ছুঁড়েও তখন শত্রুদমন করা হত। মহিষ রণসম্ভার বহন করত। বলা বাহুল্য যে, নিম্নকোটির বাঙালীদের নিয়েই তখনকার সৈন্যদল গড়া হত; তাঁদের মধ্যে যুদ্ধে রত থাকবার সময়ে জাতি-বিভেদের কোন প্রশ্ন উঠত না বলেই মনে হয়। পালরাজ্যের শাসনভার হাতে নেওয়ার পরে রামপাল ‘রামাবতী’তে তাঁর নতুন রাজধানীটি তৈরী করেছিলেন। সেই রামাবতী বর্তমান মালদহের কাছাকাছি কোথাও ছিল বলে ঐতিহাসিকেরা অনুমান করে থাকেন। রামাবতী ছিল ‘দেবগণ’ ও ‘আঢ্যজনের’ পুরী - সবৈশ্বর্যজ্ঞাপক। সেখানকার প্রাসাদ কারুকার্যখচিত ইষ্টকালয় ছিল; বাংলার ইতিহাসে যেটার অন্যকোন তুলনা পাওয়া যায় না। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ইষ্টক বা ইষ্টকা কিন্তু ওই সময়ের বহু আগে থেকেই ভারতবর্ষে দৃঢ় গৃহনির্মাণের ক্ষেত্রে নিজের স্থায়ী জায়গাটা কায়েম করে বসেছিল। প্রখ্যাত নাটক ‘মৃচ্ছকটিক’-এও এর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়; উক্ত নাটকটির রচনাকালকে কোনোক্রমেই ষষ্ঠ শতকের পরবর্তী বলে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে তখনকার সেই ইঁটগুলো এখনকার ইঁটের তুলনায় অনেক ছোট ও সরু ছিল। রামপালের প্রাসাদটি হয়ত বরাহমিহির-বর্ণিত ‘বজ্রলেপ’ ও ইঁটের সংযোগে তৈরী করা হয়েছিল, তবে এখন অবশ্য সেসবের কোন চিহ্নও নেই। তখন বঙ্গদেশে একমাত্র রাজমহল ছাড়া অন্য কোথাও পাথর পাওয়া যেত না; আর সেই পাথর সংগ্রহ করাও তখন দুঃসাধ্য ছিল। তাই ওই সময়ে পাথর দিয়ে কোথাও মন্দির, বিহার বা প্রাসাদ তৈরী করা হয়নি। তাছাড়া বহু আগে থেকেই বাঙলায় পোড়ামাটির কাজের আদর ছিল। ওই সময়ের রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরেও ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি ছিল। হীরক, বৈদুর্য, মুক্তা, মরকতমণি, পদ্মরাগমণি, নীলমণি খচিত আভরণেরই বা কত বাহার ছিল। এক্ষেত্রে কবির অতিশয়োক্তিকে বাদ দিলেও, সেই সময়ের রাজার সঙ্গে বিত্ত-ঐশ্বর্যের যে একটা বিপুল সমাবেশ ছিল, তখনকার রাজ আভরণ ও রাজান্তঃপুরের ব্যাখ্যা থেকে সেটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারা যায়। একাদশ শতকের উচ্চকোটি সমাজের মানুষের সঙ্গে ওই বিত্ত-ঐশ্বর্যের একটা সামঞ্জস্য বর্তমান ছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়, বিশেষ করে তখনকার বেণেদের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে। ওই সময়ের ধবল প্রাসাদ-শ্রেণীর চূড়ায় কনক-কলস শোভা পেত। সেকালেও অট্টালিকায় চুনের প্রলেপ লাগানো হত, আর সেই চুন নিঃসন্দেহে কলিচুন ছিল। তখন ‘শ্লক্ষ্ণ’ বস্ত্রেরও ছড়াছড়ি ছিল; ‘শ্লক্ষ’ বলতে শুধু মনোহর নয়, মোলায়েমও বোঝায়। অবশ্য বঙ্গদেশই তখন ভারতবর্ষের প্রধান বস্ত্র-ভাণ্ডার ছিল। ওই সময়ে প্রসাধনের জন্য কস্তূরী, কালাগুরু (কৃষ্ণ অগুরু - কাষ্ঠ), চন্দন, কুঙ্কুম ও কর্পূর ব্যবহার করা হত। এছাড়া নানা বাদ্যযন্ত্রও ছিল; সন্ধ্যাকর নন্দীর লেখায় তারও ফিরিস্তি পাওয়া যায়। গুপ্তযুগের সম্রাট ‘সমুদ্রগুপ্ত’ নিজেই একজন প্রসিদ্ধ বীণাবাদক ছিলেন; হয়ত তাঁরই আদর্শে পালরাজারাও গীতবাদ্যে উৎসাহী হয়েছিলেন; আর পরবর্তী শতকে সেই ধারাটি আরো প্রশস্ততর হয়েছিল। তখনকার গৃহপালিত জীবের মধ্যে গরু ও মহিষই প্রধান ছিল। ওই সময়ে যুদ্ধের জন্য সিন্ধুদেশ থেকে ঘোড়া সংগ্রহ করা হত, আর প্রাচীন বাঙলা তো বরাবরই হাতীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। নিজের রাজ্যে পানীয় জল ও জলসেচের জন্য রামপাল বড় বড় দীঘি খনন করিয়েছিলেন; তিনি প্রজাদের করভারও লাঘব করেছিলেন। ফলে, ওই সময়ে একদিকে যেমন ফসল উৎপাদন বেড়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি চাষীদের স্বচ্ছলতাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। সন্ধ্যাকরের কাব্যটিতে ওই সময়ের একটি উপবনের চিত্রও পাওয়া যায়। সেখানে নানা ধরণের কন্দ (ফলাকার উদ্ভিদ মূল), লকুচ বা লকচ (মাদার ফল), শ্রীফল (বেল), লবনী (লতা), কন্দল (কলাগাছ), প্রিয়ালা (আঙ্গুরের লতা), আমলকী, পুগ (গুবাক), অসন (পীতশাল - এই বৃক্ষটি সম্ভবতঃ এখন লুপ্ত হয়ে গিয়েছে), বৃহৎ মালতী, শ্রেষ্ঠ নাগকেশর, বকুল, অশোক, পারিজাত, ও লবঙ্গলতার সমাবেশ ছিল। তৎকালীন বরেন্দ্রী যেহেতু সুজলা ছিল, সেহেতু শস্যশ্যামলা ছিল; সেখানকার মাঠে বহুবিধ ধান্য আর নারিকেলের বন দেখতে পাওয়া যেত। মহাযানপন্থী পালরাজারা গোঁড়া বৌদ্ধ ছিলেন না। রামপাল তিন পংক্তি শিবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া তাঁর রাজ্যে আরো অনেক মন্দির ছিল। সেই সব মন্দিরের দেবতাদের মধ্যে ছিলেন - ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, আদিত্য, স্কন্দ (কার্তিকেয়) ও বিনায়ক (গণেশ)। তবে অত সব ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের মধ্যে বসবাস করেও রামপালের সেসবের প্রতি কোন আসক্তি জন্মায়নি বলেই মনে হয়; কারণ রামচরিতের কবি বলেছিলেন যে, নিজের শেষ বয়সে তিনি ছেলের হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়ে ‘মুগিরি’তে অর্থাৎ মুঙ্গেরে স্বেচ্ছায় গঙ্গাপ্রবেশ করে প্রাণত্যাগ করেছিলেন। রামচরিতে সেকালের ওই ধরণের আত্মাবলুপ্তির কথা বহুল পরিমাণে পাওয়া যায়।

এবারে নেপালে ‘চর্যাপদ’ পুঁথির আবিষ্কর্তা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মত অনুসরণ করে কিছু কথা বলা যাক। চর্যাপদ বৌদ্ধ সহজিয়া মতের অতি পুরনো বাঙলা গান। হয়ত নানা কারণে তাতে পশ্চিমা অপভ্রংশের অল্প কিছু রূপ অনুপ্রবেশ করেছিল, কিন্তু তার ফলে সেটির বাঙালীত্ত্ব কিন্তু কখনোই মুছে যায়নি। এখন প্রশ্ন হল যে, প্রাকৃত ও অপভ্রংশের মধ্যে প্রভেদ কি? সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপন্ন হলেই সেটাকে প্রাকৃত বলা হয়; সেই হিসাবে অশোকের শিলালিপিও প্রাকৃত, পালিও প্রাকৃত, আবার বাঙলাও প্রাকৃত। প্রাকৃত ব্যাকরণের সীমানা যে শব্দ লঙ্ঘন করে সেটাকেই অপভ্রংশ বলা হয়। সহজিয়া ধর্মের সব পুঁথিই সান্ধ্যভাষায় লেখা হয়েছিল। এই সান্ধ্যভাষার অর্থ হল - আলো-আঁধারি ভাষা; অর্থাৎ, এই ভাষার কিছুটা স্পষ্ট, আর কিছুটা অস্পষ্ট। চর্যাপদেরও তাই। লুইপাদ যে বাংলার সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের আদি-পুরুষ ছিলেন, সেকথা আগেই বলা হয়েছে। লুইপাদ বাঙালী ছিলেন। তাঁর চ্যালাদের মধ্যে অনেকেই সংকীর্তনের পদ আর দোঁহা লিখেছিলেন। ওই সময়ে বৌদ্ধ ও হিন্দু - দু’দল থেকেই কেউ কেউ নাথপন্থা গ্রহণ করেছিলেন। উক্ত শতাব্দীর নাথপন্থীদের দু’জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির মধ্যে গোরক্ষনাথ যেখানে বৌদ্ধ ছিলেন, মৎস্যেন্দ্রনাথ সেখানে হিন্দু ছিলেন বলে অনেকেই মনে করে থাকেন। সমসাময়িক নাথপন্থীরাও চর্যাপদের ধরণের বাঙলা ভাষাতেই অনেক পুঁথি লিখেছিলেন। ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন যে, সেই দোহা থেকেই পরবর্তীকালে পয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল। একালে কীর্তনের পদকে পদ বলা হলেও, একাদশ শতকে সেটাকে চর্যাপদ বলা হত। সহজ-মতের তিনটি পন্থা ছিল - অবধূতী, চণ্ডালী ও ডোম্বী বা বঙালী। অবধূতীরা দ্বৈতবাদী ছিলেন; চণ্ডালীরা দ্বৈতও ছিলেন না, আবার অদ্বৈতও ছিলেন না; আর ডোম্বী বা বঙালীরা নিছকই অদ্বৈতবাদী ছিলেন। চর্যাপদের কথা বোঝার সুবিধা হবে বলেই এই প্রস্তাবনাটি এখানে উল্লেখ করা হল। চর্যাপদ সান্ধ্যভাষায় লেখা হয়েছিল, এখনও পর্যন্ত সেটির সাতচল্লিশটি শ্লোক পাওয়া গিয়েছে। সেগুলিতে ওই সময়ের নিম্নকোটি বাঙালীর সিদ্ধাচার্যদের সাধনার কাহিনী যেমন লিপিবদ্ধ রয়েছে, তেমনি সেগুলির মাঝে মাঝে ওই সময়ের কিছু সামাজিক কথাও উকিঝুঁকি দিয়েছে। একটি উদাহরণ তুলে ধরা যাক -

“উঁচা উঁচা পাবত তহিঁ বসই সবরী বালী।

মোরঙ্গি পীচ্ছ পরহিণ সবরী গিবত গুঞ্জরী মালী৷৷

উমত সবরো পাগল সবরো মা কর গুলী গুহাডা তোহৌরি।

নিত্য ঘরিণী নামে সহজ সুন্দারী॥

...

গুরুবাক পুঞ্চআ বিন্ধ ণিঅমন বাণে।

একে শর সন্ধানে বিন্ধহ বিন্ধহ পরমণি বাণে॥”

উক্ত পদ ক’টির আধুনিক বাঙলা রূপ হল - উঁচা পাহাড়ে বালিকা শবরী বাস করে। শবরীর পরনে ময়ূরপুচ্ছ, গলায় গুঞ্জামালা। এখানে গুঞ্জার অর্থ হয় পুষ্পস্তবক, আর নয় তো তালবৃক্ষের পাতা। শবরী শবরকে বলছে, তুমি আমাকে অবহেলা করে অন্য কারো কাছে যেয়ো না। আমি সহজ সুন্দরী - তোমার নিজ গৃহিণী, তোমারই গুহায় ঘুরি ফিরি। … গুরুবাক্যকে ধনু করে, নিজ মনকে বাণ করে, এক শরসন্ধানে পরম নির্বাণকে বিদ্ধ কর - বিদ্ধ কর। এর মাঝে যে তত্ত্বকথা, অর্থাৎ রহস্যাবৃত সাধনার কথাও রয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তত্ত্বকথার অর্থ খোঁজা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়; এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হল, সামাজিক ইতিহাসের জন্য ওই সময়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কাহিনীকে খুঁজে বের করা।

তবুও উপরোক্ত অংশের শেষের দুটি পংক্তি সম্পর্কে কিছু বলবার প্রয়োজন রয়েছে। ওই পংক্তি দুটি যে উপনিষদের প্রতিধ্বনি তাতে সন্দেহ কোন নেই। উদাহরণ হিসেবে ‘মুণ্ডকোপনিষদের’ দ্বিতীয় মুণ্ডক থেকে একটি শ্লোক (৩৫/৩) উদ্ধৃত করা যেতে পারে -

“ধনুগৃহীত্বৌপনিষদং মহাস্ত্রং

শরঃ হ্যুপাসা-নিশিতং সংদধীত।

আযন্য তদ্ভাবগতেন চেতসা

লক্ষ্যং তদেবাক্ষরং সোম্য বিদ্ধি॥”

অর্থাৎ, হে প্রিয়দর্শন, উপনিষদবেদ্য মহাস্ত্র ধনু গ্রহণ করে তাতে উপাসনা দ্বারা শোধিত শর যোজনা কর। তারপর ব্রহ্মে তন্ময় হয়ে সে তন্ময় চিত্ত দিয়ে সে অক্ষর পুরুষকে বিদ্ধ কর। এখানে এটুকু এই কারণেই বলা হল যে, উপনিষদে ‘গুরু’র কথার ছায়ামাত্র না থাকলেও, সহজিয়া দোহায় কিন্তু ‘গুরুবাক’ ছাড়া পরমনির্বাণ লাভ অসম্ভব। ওখান থেকেই পরবর্তীকালের বাঙলার অন্ধ গুরুবাদের সূত্রপাত ঘটেছিল। চর্যাপদে সেই নিম্নকোটি বাঙালী সমাজের বৃত্তির কথাই স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে, যেটার সঙ্গে অলবেরূনির ঐতিহাসিক সাক্ষ্যও মিলে যায়। তখন ডোমেরা তাঁত (তন্ত্রী) ও চাঙারি (চাঙেড়া) বা করগুহো (চুপড়ি) তৈরী করে বিক্রি করতেন; কেউ কেউ আবার মণ্ড (ভাতের মাড়) থেকে বারুণী (মদ) চোলাই করতেন। উক্ত সময়ে মদের সাথে চাট হিসেবে নাপাকেলা বা কাঁচা কাঁকুড় ব্যবহার করা হত। ওদিকে “হাঁড়ীতে ভাত নাহি” অথচ “নিতি আবেগী”, অর্থাৎ নিত্যই তাঁর প্রয়োজন। তখনকার অত দারিদ্র্য সত্ত্বেও যে ‘আকাশ ফুলিআ’ বা আকাশ-কুসুমের চাষ হত না, তা নয়; শবর- শবরীও প্রেমে মশগুল হতেন, কেউবা ‘নেউর’ বা নূপুর বেঁধে নাচও করতেন। তখন ‘কুঠার’ যেহেতু ছিল, সেহেতু কেউ কেউ নিশ্চই কাঠও কাটতেন। কেউ কেউ আবার ‘সংক্রম’ অর্থাৎ সাঁকোও তৈরি করতেন। চর্যাপদে খালে, ণই (নদী) ও ণাব (নৌকা)-এর কথা যেমন বহুল পরিমাণে পাওয়া যায়; একই সঙ্গে কাচ্ছী (নৌকার কাছি), খুন্টি (নোকা বাঁধিবার খুঁটা), গুণে (নৌকার গুণ), নৌবাহী (নেয়ে), পতবাল (হাল) বেরডুয়াল (বৈঠা), ও কবড়ী (কড়ি)-র কথাও পাওয়া যায়। ফলে যে চিত্রটি কল্পনায় জেগে ওঠে সেটা হল - নদীতে খেয়া বেয়ে নেয়ে পারাপার করে; পারের কড়ি না পেলে যাত্রীর লাঞ্ছনা হয়; নেয়ে তাঁর তল্পিতল্পা পারের কড়ির জন্য তল্লাশ করেন, এমন কি ‘বাণ্ডকুরণ্ড’ও অর্থাৎ ‘বটুয়া’ ও ‘করঙ্ক’ও তল্লাশির তালিকা থেকে বাদ পড়ে না। ‘গঙ্গাসাঅরুর’ বা গঙ্গাসাগরের উল্লেখের ফলে মনে হয় যে, চর্যাপদের কোনো কোনো সিদ্ধাচার্য চন্দ্রদ্বীপের মানুষ ছিলেন। চর্যাপদে ওই সময়ের পশুদের মধ্যে ‘গঅন্দা’ বা গজেন্দ্রের উল্লেখ পাওয়া যায়; তখন ‘গোহালী’ অর্থাৎ গোশালা যখন ছিল, তখন তাতে নিশ্চই গরুও ছিল; এছাড়া চর্যাপদে ‘তুরঙ্গ’ অর্থাৎ ঘোড়া, ‘মূষা’ বা মূষিক, ‘শিয়ালহ’ অর্থাৎ শিয়াল, ‘হরিআ’ বা হরিণের উল্লেখও পাওয়া যায়; এমনকি চর্যাপদে ‘বোড়ো’ বা বোড়া সাপেরও কোন অভাব নেই। আর এসবের সাথে সেখানে হরিণ-শিকারের চিত্রও দেখতে পাওয়া যায়।

“বেরিল হাক পড়অ চৌদীস।

তুরঙ্গতে হরিণার খুর দীঘঅ॥”

অর্থাৎ, হরিণ ভয় পেয়ে ছুটছে; তার গতি এত দ্রুত যে তার ক্ষুরের চিহ্ন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তবে তখন ‘মৃগয়া’ শব্দের অর্থ হয়ত নিহত জীবের মাংস বিতরণ ছিল। চর্যাপদে তৎকালীন বাংলার ফলের মধ্যে ‘কঙ্গুরি’ বা কাঁকুড়, ‘তেন্তলি’ বা তেঁতুল, ‘কলু’ বা কলা, ও ‘সিরফল’ বা বেলের উল্লেখ পাওয়া যায়। তখনকার ফসলের মধ্যে ভাতের মূল ছিল ধান; আর ‘তুসি’ অর্থাৎ তুষ যখন ছিল তখন নিশ্চই ধানভানাও চলত। ওই সময়ে তুলা আঁশ আঁশ করে ধোনাও হত; আর ‘তন্ত্রী’ যখন চলত, তাহলে নিশ্চই সুতাও কাটা হত। তখনও বিবাহের সময়ে বর ‘জউতুকে’ বা যৌতুক পেতেন; হয়ত ডোমও বিবাহ অনুষ্ঠানের বহ্মণ বা ব্রাহ্মণ হতে পারতেন; বিবাহের পরে ‘বহুড়ী’ বা বৌ ঘরে আসতেন। আর একই সাথে সেই সময়েও চোরের ভয় ছিল, কারণ ঘুমন্ত বধূর কানের গয়নাও তখন চুরি হয়ে যেত।

“কানেট চোরে নিল আধারাতী॥

সসুরা নিদ্ গেল বহুড়ী জাগই।

কানেট চোরে নিল কা গই মাগই॥”

সাধারণ বঙ্গানুবাদ -

“কানের গহনা চোরে নিল আধা রাতে

শাশুড়ী ঘুমায় বউ জেগে আছে

কানের গহনা যে চোরে নিল কোথায় খোঁজা যায়৷৷”

ওই সময়ে খেলার মধ্যে হয়ত ‘নববল’ বা দাবাখেলা শ্রেষ্ঠ ছিল। সেকালেও ‘উপকারিক’ খেলোয়ারকে চাল বলে দিত। তখন ‘ইষ্টমালা’ বা জপমালাও ছিল। পরম জ্ঞানের সন্ধানে কেউ কেউ বা লঙ্কায় যেতেন। তবে ‘সরহপাদ’ সবাইকে লঙ্কায় যেতে নিষেধ করে লিখেছিলেন - “নিঅহি বোহি মা জাহুরে লাঙ্ক”। চর্যাপদের অনেক পদই পরবর্তীকালে ক্রমে বাঙলা প্রবাদে পরিণত হয়ে গিয়েছে। ‘ভুসুকু’র “আপনা মাংসে হরিণা বৈরী”, অর্থাৎ সুস্বাদু মাংসের জন্য হরিণ নিজেই নিজের শত্রু হয়েছে - এর প্রতিধ্বনি পরবর্তীকালের প্রবাদেও পাওয়া যায়। সরহপাদের “বর ঘুণ গোহালী কি সো দুঠট বলঙ্গ”-র অধুনিক রূপটি হল - “দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভাল”। ঐ সিদ্ধাচার্যেরই “হাথেরে কাঙ্কাণ মা লোউ ছাপন” বর্তমানে “হাতের শাঁখা দর্পণে দেখা” হয়েছে। আর ‘ঢেণ্টণপাদের’ “দুহিল দুধু কি বেন্টে সামাঅ” বর্তমানে হয়েছে - “দোয়া দুধ কি আর বাঁটে সেধোয়?”

এবারে একবার একাদশ শতকের বাঙালী সমাজের সামগ্রিক চিত্রটির সন্ধান করা যাক। বলাই বাহুল্য যে, বাঙালীর মধ্যে তখনও কোনো অখণ্ড সমাজসত্তা গড়ে উঠেনি। ওই সমাজের একদিকে ছিলেন মুষ্টিমেয় উচ্চকোটি মানুষেরা, আর অন্যদিকে ছিলেন বিরাট ও নিঃস্বপ্ৰায় নিম্নকোটির জনতা; এর মধ্যে কোনো মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তর সংস্থা কিন্তু তখনও পর্যন্ত ছিল না। উচ্চকোটির কাছে নিম্নকোটি ঘৃণ্য ও অবহেলিত ছিলেন। তখনকার ক্রমবর্ধমান তান্ত্রিকবাদে এর একটি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। ওই সময়ে উচ্চকোটি মানুষেরা উত্তরাপথের দিকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিপাত করে নিজেদেরকে আর্যসভ্যতার ধারক বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিলেন, ওদিকে নিম্নকোটি মানুষেরা বাঙলার আদিম সভ্যতার বাহক হয়ে, নিজেদেরই গড়া সমাজে উচ্চকোটি থেকে পরিপূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিলেন। তখনকার ধর্মের একদিকে ছিলেন উচ্চকোটি শূন্যবাদী বৌদ্ধ ও পৌরাণিকধর্মী হিন্দু; আর অন্যদিকে ছিলেন নিম্নকোটি বৌদ্ধ সহজযানপন্থী ও নাথপন্থী। সেই সময়ে শূন্যবাদী বা মহাযানপন্থী বৌদ্ধদের চারিত্রিক দৃঢ়তা ক্রমশঃ লোপ পাচ্ছিল, বাঙলার বহির্বাণিজ্যে ভাটা আসবার ফলে দেশের স্বচ্ছলতাও ক্ষীয়মাণ হচ্ছিল। একই সময়ে শূন্যবাদী বৌদ্ধদের দৃষ্টি সহজযানের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিল বটে, কিন্তু সেই পথের পরিসমাপ্তি যে নোংরামিতে - সেটার দৃষ্টান্তও তাঁদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছিল না। তখনকার উচ্চকোটিতে হিন্দু ও বৌদ্ধে মূলতঃ কোনো সামাজিক প্রভেদ ছিল না; তাঁদের উভয়েই মনুসংহিতার নির্দেশ মেনে চলতেন, আর শুধু গৃহ্যসূত্রোক্ত দশসংস্কার হলেই বৌদ্ধরা হিন্দু হতে পারতেন। ফলে তৎকালীন বৌদ্ধ-সমাজের চূড়ামণি বেণেরা ক্রমশঃ সেদিকেই ঝুঁকে পড়ছিলেন। ওদিকে চাতুর্বর্ণ ধর্মের বাহক হিন্দুরা তখন নানা ধরণের বৃত্তিভোগী ছিলেন। সেই সময়ের ব্রাহ্মণেরা স্মার্ত, এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিষ্ণুভক্ত ছিলেন; কিন্তু শ্রুতিতে, অর্থাৎ বেদ ও উপনিষদে তাঁদের দখল কম ছিল। একাদশ শতাব্দীতে বৌদ্ধরা বাংলার রাজা হলেও, অন্য কোনো ধর্মের প্রতি তাঁদের কিন্তু কোন বিদ্বেষ ছিল না। বঙ্গদেশে তখন সামন্তরাজদের সংখ্যাও কিছু কম ছিল না; মূল রাজাকে তাঁদের কর দিতে হলেও, সেই করভার কিন্তু খুব একটা বেশি ছিল না। যার ফলে দেশে তখন মোটামুটি শান্তিই বর্তমান ছিল। ওই সময়ের বাঙলার অন্তর্বাণিজ্যেও বিনিময় প্রথা চালু ছিল। তখন নগদ অর্থ হিসাবে কড়ির প্রচলন বেশি হলেও, হয়ত কিছু স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার ব্যবহারও চালু ছিল, তবে সেটার কোন স্পষ্ট ঐতিহাসিক সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। তৎকালীন সময়ের চিকিৎসা ব্যবস্থা সুশ্রুত-পন্থী হলেও, সর্বসমাজেই টোটকা, তুকতাক, ঝাড়ফুঁকই সাধারণ মানুষের অন্ততঃ প্রাথমিক সম্বল ছিল। মূলতঃ সেই কারণেই মানুষ তখন তান্ত্রিক পন্থার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল। চর্যাপদের যুগের বাংলার শিক্ষার বাহন ছিল প্রাকৃত ও সংস্কৃত ভাষা, আর বাঙালীরপোশাক ছিল ধুতি ও শাড়ি। তবে বৌদ্ধরা তখন পাগড়ি পরতেন না, তাঁদের ছোঁয়াচে একালে সর্বশ্রেণীর বাঙালী ক্রমশঃ পাগড়ি পরা ত্যাগ করে, মাথার বোঝা লাঘব করে, ওই সময়ে উত্তরাপথে প্রচলিত ‘নাঙ্গাশির’ হয়েছে। মৎস্য সম্পর্কে ওই সময়ের বৌদ্ধরা যে, “অহিংসা পরমো ধর্মঃ” বলে মানতেন, এমনটা মনে করবার কোন কারণ নেই; তখনকার হিন্দুদের মধ্যে একমাত্র ব্রাহ্মণেরাই হয়ত খাওয়ার ক্ষেত্রে সামান্য কিছু বাছ-বিচার করতেন। সহজযানের প্রবর্তক লুইপাদের মৎস্যপ্রীতি সর্বজনবিদিত; তিনি ‘মাছের আঁতড়ি’ (পাতরি?), ‘তেলের বড়া’, ছেঁচড়া ও চচ্চড়ি খেতে ভালবাসতেন। তখনকার প্রাসাদ, বিহার ও মন্দিরগুলি ইষ্টকে তৈরী করা হত। একাদশ শতকের বাংলার শহরে ও বন্দরে ‘ইঁটকোঠা’, ‘মাটকোঠা’, বেত, বাঁশ, কাঠ ও শণের তৈরী বাড়ি দেখতে পাওয়া যেত। সেই ‘ইঁটকোঠা’ ও ‘মাটকোঠা’ বাড়িগুলির প্রত্যেকটিতেই বাতায়ন আর রাস্তার দিকে একটা করে গোল বারান্দা থাকত। ওই সময়ের গ্রামে স্বাভাবিকভাবেই মাটকোঠা ও বেত-বাঁশ-শণের বাড়ি বেশি দেখতে পাওয়া যেত। উক্ত সময়ের বহু আগেই লাঙ্গলের প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল, জোড়া বলদে মিলে সেই লাঙ্গল টানত। গবেষকদের মতে, লাঙ্গল শব্দটি মূলতঃ অস্ট্রিক ভাষার, অর্থাৎ আদি অস্ট্রেলিয়ার ভাষার, যেটা ক্রমশঃ ধানচাষের প্রসারের ফলে সারা দূরপ্রাচ্যে ও ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর্যদের প্রথমে চাষবাস ছিল না; তাই সংস্কৃতে ওই ধরণের কোন শব্দের প্রয়োজনও তখন ঘটেনি। পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যে চাষবাস প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে লাঙ্গল শব্দটিও সংস্কৃতে গৃহীত হয়ে গিয়েছিল বলে অনেকেই বিশ্বাস করে থাকেন। তখনকার বাংলায় চাষের উপযোগী নানা ধরণের যন্ত্রপাতি গ্রামে ও শহরে - উভয় জায়গাতেই তৈরী করা হত। বাঙালী তখন কলাপাতায় এবং মাটির ও কাঠের থালায় পিঁড়িতে বসে খাবার খেত। তবে সেই ব্যাপারে কলাপাতার ভূমিকা তখন যে ব্যাপক ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। বর্তমানেও খনার একটি বচনের আধুনিক রূপে সেটার রেশ পাওয়া যায় -

“এক হাত অন্তর দু’হাত খাই (খাদ, গর্ত)

কলা রুয়ো চাষা ভাই,

রুয়ো কলা না কেট পাত

তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।”

মূলতঃ এই প্রথাটিই এখনো বর্তমান রয়েছে, তবে ধাতুর তৈরী পাত্র ক্রমশঃ দ্বিতীয় দু’টির জায়গা নিয়েছে। তবে তখন অবশ্য রাজরাজড়া, বণিকশ্রেণী ও ধনীদের গৃহে, বিশেষ করে উৎসবে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের থালার ব্যবহার প্রচলিত ছিল। তখনকার উৎসবে যে যে মাঙ্গলিক দ্রব্যাদির ব্যবহার করা হত, সেই প্রসঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছিলেন, “রাস্তার দু’ধারে বাঁশের থাম। প্রত্যেক থামের গোড়ায় পূর্ণকলস, তাহার উপর আম্রশাখা, একটি টাটকা ডাব। কলসীতে সিন্দুর, চন্দন ও হলুদের দাগ। পূর্ণকলসের পিছনে একটি কলাগাছ।” একালেও বাঙালীর সেই মাঙ্গলিক চিহ্নের কোনো পরিবর্তন ঘটেছে কি? অশন ও বসনেও বর্তমান বাঙালী সমাজে মূল পরিবর্তন কিন্তু বিশেষ কিছুই হয়নি; যেমনটা সেই একাদশ শতকে ছিল, বর্তমান শতকেও প্রায় তেমনিই রয়ে গিয়েছে। কিন্তু তখন থেকে এখনও পর্যন্ত যেটা সবচেয়ে অপরিবর্তিত রয়েছে, সেটা হল বাঙালী জাতির একটা অখণ্ড সমাজবোধের অভাব। সেই ফাঁক কিন্তু কোনোদিনই ভরেনি, হয়ত কোনো শতকে একটু কমেছে মাত্র। এই অখণ্ড জাতীয়তাবোধের অভাবের ক্ষেত্রে বাঙালী অবশ্য সমগ্র ভারতবর্ষেরই অংশীদার, কিন্তু তাঁর এই সহজাত দৈন্যই তাঁকে আজও চরম দুর্বল করে রেখেছে। ফলে ভারতের সমাজ-দেহের এই বিচ্ছিন্ন বৃহৎ অঙ্গটি তাই সর্ব শতকেই একটি নোঙর-ছেঁড়া নৌকার মত ঘাট খুঁজে মরেছে। সেকালে বাঙলা ও গুজরাটের বহির্বাণিজ্যে সুনাম ছিল। সেজন্য ওই সময়ের বাঙালী বণিকেরা তাঁদের রপ্তানির মাল চারিদিক থেকে এনে কোন কোন জায়গায় গুদামজাত করতেন। সম্ভবতঃ সেটার জন্যই ওই সব জায়গায় তখন ছোট ছোট শহরাঞ্চল গড়ে উঠেছিল; আর সেগুলিকে আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক শাসনকেন্দ্রে পরিণত করাও সুবিধাজনক হয়েছিল। সেই অঞ্চলগুলির চারদিকে বেষ্টনী তুলে সেগুলিকে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। তখনকার বাংলার বড় বড় গ্রামেও যে প্রধান বেষ্টনী থাকত, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের কোন সন্দেহ নেই; চর্যাপদেও সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ওই সময়ের নিম্নকোটির বাঙালী সমাজের স্থান কখনো সেই বেষ্টনীর মধ্যে হয়েছিল কিনা - তাতে সন্দেহ রয়েছে। গুপ্তযুগ থেকেই বাঙলা তথা সৌরাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমগ্র উত্তরাখণ্ডে ‘গুপ্তাব্দের’ প্রচলন ঘটেছিল। গুপ্তাব্দ শুরু হয়েছিল ৩১৯ খ্রীষ্টাব্দ থেকে, অর্থাৎ প্রথম চন্দ্রগুপ্তের আমলে। এরপরে ষষ্ঠ শতকের প্রায় প্রথম পাদ পর্যন্ত বাঙলায় গুপ্তাব্দ চালু ছিল। তারপরে পালাব্দ শুরু হয়েছিল ৭৫০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে, কিন্তু একই সঙ্গে তখন হয়ত গুপ্তাব্দও কিছু চলত। নবম শতক থেকে সারা উত্তরাখণ্ডে বিক্রমাব্দের প্রচলন ঘটেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে বিক্রমাব্দের পিছনে কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তাই সারা উত্তরাখণ্ডে সেটি চললেও বাঙলায় কিন্তু চলেনি। তখন ওই সব অব্দ সাধারণতঃ রাজকার্যে, আর বিভিন্ন সামাজিক ব্যাপারে, দিনক্ষণ দেখতে এবং তিথি-বিচার করতে ব্যবহার করা হত। ক্রমে মানুষের জীবনে দৈবশক্তির তথা গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাববৃদ্ধির ফলে সেই বিচার সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে উঠেছিল। বৌদ্ধযুগেও বঙ্গদেশে দিনক্ষণ দেখা চলত, ‘ঠাকুরদাদার ঝুলি’তে সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই সময়ে দিনক্ষণ দেখেই সওদাগরেরা বাণিজ্যে যাত্রা করতেন। ‘মধুমালা’য় রানী ও রাজকন্যা “ক্ষণ-সময় দেখিয়া মদনকুমারকে সোনার ময়ূরে চড়াইয়া মধুমালার দেশে পাঠাইয়া দিলেন।” কিন্তু তখন সারা দেশ যে গণক-জ্যোতিষে ভর্তি ছিল না, ডাকের বচনে সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় -

“যে দেশে নাই গণক জ্যোতিষা

গোধূলি লগন, যাত্রা ঊষা।”

সেই কারণেই দ্বাদশ শতকে বাঙালীর তিথি-বিচার প্রবল হয়ে উঠেছিল।

(তথ্যসূত্র:

১- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনা সমগ্র।

২- বৌদ্ধধর্ম, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

৩- বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদিপর্ব, নীহাররঞ্জন রায়।

৪- বাঙ্গালার ইতিহাস, রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়।

৫- বাংলা দেশের ইতিহাস, রমেশচন্দ্র মজুমদার।

৬- বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, বিনয় ঘোষ।

৭- বাঙ্গালার ইতিহাস (সামাজিক বিবর্তন), ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত।

৮- বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, আশুতোষ ভট্টাচার্য।

৯- বাংলা ও বাঙালীর বিবর্তন, অতুল সুর।

১০- পূজা পার্বণের উৎস কথা, পল্লব সেনগুপ্ত।

১১- ইতিহাসের আলোকে বৈদিক সাহিত্য, সুকুমারী ভট্টাচার্য।

১২- প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যের ইতিহাস, ডঃ তমোনাশ চন্দ্র দাশগুপ্ত।)

মন্তব্য করুন