সহকারী শিক্ষক
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৬:২৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘বঙ্গদেশে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক’
ধর্ম যখনই প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, তখনই বিপরীতবাদী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত ধর্মই তাত্ত্বিকভাবে মানবপ্রেম ও সৌভ্রাতৃত্বের কথা বললেও বারবার একে অন্যের সঙ্গে বিরোধে, যুদ্ধে, রক্তপাতে, শক্তিক্ষয়ে নিয়োজিত হয়েছে। রাজনীতির ধর্ম, এবং ধর্মের রাজনীতি ব্যক্তি-মানুষের উপরে চিরকালই প্রবলতর চাপ সৃষ্টি করেছে। মানুষের উপরে তাঁর নিজস্ব ধর্মের চাপ ছাড়াও ক্রমশঃ অন্য ধর্মের চাপও তৈরী হয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই বারবার সোচ্চারে ঘোষণা করে যে, আমিই শ্রেষ্ঠ; বারবার তারা মানুষের কাছে আহবান জানায় যে, এসো, আমি তোমাকে মুক্তির দিশা দেখাব। সুদূর অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত কখনও লোভে, তো কখনও ভয়ে, আবার কখনও প্রেরণায় মানুষ ধর্মান্তরিত হয়েছে। শেষপর্যন্ত তাতে ব্যক্তি-মানুষের আত্মার কোনও মুক্তি কিন্তু হয়নি। বরং সে নানা ব্যবহারিক অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে। তাতে লাভ যা হয়েছে, সেটা প্রতিষ্ঠানের - ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার। বাংলায় মুসলমান-আধিপত্যের আগে হিন্দু-যুগে বর্ণ-হিন্দুরা যেভাবে অন্ত্যজ ও বৌদ্ধদের সামাজিক নিগ্রহ এবং অবমাননার মধ্যে রেখেছিলেন, পরবর্তীকালে ধর্মান্তরিত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা সেসবেরই প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। এই দুই ধর্ম-সম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিকতার চাপে তখন সাধারণ মানুষের অবস্থা যে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, সাধারণ মানুষের মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান তৈরী হয়েছিল, সেকথা আগেই বলা হয়েছে। আসলে, তত্ত্বগতভাবে, পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের মধ্যেই কিন্তু বিভেদের বীজ নিহিত রয়েছে। একটু লক্ষ করলেই একটি ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের মৌলিক বিরোধটা চোখে ধরা পড়ে। এই বিরোধ যে কেবলমাত্র ব্যবহারিক, তা কিন্তু নয়। তত্ত্বগতভাবেও ধর্মগুলির মধ্যে বিরোধ রয়েছে, এছাড়া পরস্পরবিরোধী মতবাদ তো রয়েছেই। বস্তুতঃ, ধর্মের এতরকম পরস্পর-বিরোধী সংজ্ঞা রয়েছে যে, তাতে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে পড়ে। কেননা, এক ধর্মের সংজ্ঞার সঙ্গে অন্য ধর্মের সংজ্ঞার সাথে বিন্দুমাত্র মেলে না। এক ধর্মের ঈশ্বর অন্য ধর্মের কাছে সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন। হিন্দুধর্মে যেমন মূর্তিপুজোর বিধান রয়েছে, ইসলামে তেমনই মূর্তিপুজো নিষিদ্ধ। আবার হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মে জন্মান্তর একটি প্রধান বিষয় হলেও, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মে জন্মান্তরবাদ বলে কিছু নেই। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাস করে যে, মানুষ এই পৃথিবীতে কেবলমাত্র একবারই জন্মায়। মহম্মদ যেমন একবারই পৃথিবীতে জন্মেছিলেন, তেমনি যিশুও তাই। কিন্তু বুদ্ধ আগে নানা জাতক হয়ে জন্মে শেষে বুদ্ধ হয়ে জন্মাবার পরে তিনি বোধিলাভ করেছিলেন, কাঙ্খিত নির্বাণ পেয়েছিলেন। হিন্দুধর্মে জন্মান্তরবাদে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাউল-তত্ত্বে তো একলক্ষ চুরাশি হাজার যোনি-ভ্রমণের কথা রয়েছে। খ্রিস্টধর্মেও পৌত্তলিকতার কিছুটা স্থান রয়েছে। তত্ত্বগতভাবে হিন্দুত্ব আর ইসলাম এতটাই পরস্পরবিরোধী যে, অতীতে কোনওভাবেই এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কখনো মিলন বা মিশ্রণ সম্ভব বলেও কেউ চিন্তা করতেন না। হিন্দুত্ব অন্তর্নিহিত পরমার্থে বিশ্বাসী, আর ইসলাম জ্ঞানাতীত আল্লাহর আদেশে বিশ্বাস করে। হিন্দুর ঈশ্বর যেখানে মূলতঃ সাকার (উপনিষদে একেশ্বরবাদের কথা থাকলেও সেটাকে ব্রাহ্ম ছাড়া অন্যান্যরা মেনে নেন নি), ইসলামে সেখানে নিরাকার। হিন্দুরা বহু প্রতিমায় ঈশ্বরকে কল্পনা করেন, তাঁকে পূজা করেন; অন্য দিকে ইসলামে মূর্তিপূজা, বহু-ঈশ্বরবাদের কোনও স্থানই নেই। এমনকি ইসলাম এক-পয়গম্বরের (রসুল) অস্তিত্ব ছাড়া অন্য পয়গম্বরের কথা কল্পনাও করে না। মুসলিম শাসনের ভারতে হিন্দুদের ক্ষেত্রে এর ফল বিষময় হয়েছিল। সেই সময়ে শাসক মুসলমানদের কাছে হিন্দুদের মন্দির ও মূর্তিগুলি চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল। এইসব মৌল অমিলগুলিই প্রতিটি ধর্মের মধ্যে বিভেদরেখা তৈরী করেছে। বিশেষতঃ, ইসলামের একেশ্বরবাদ এবং হিন্দুত্বের বহুত্ববাদ; ইসলামের নিরাকার ধর্ম ও হিন্দুত্বের সাকার ধর্ম; ইসলামের সর্বজনীনতা ও হিন্দুত্বের সঙ্কীর্ণতা, ইসলামের ধর্মান্তর ও হিন্দুত্বের অবিকল্প হিন্দুত্ব - এইসব তত্ত্বগত বিভেদও যে দুই ধর্ম-সম্প্রদায়ের মিলনের পক্ষে বাধাস্বরূপ, সেটা মনে রাখবার প্রয়োজন রয়েছে। কেননা, উক্ত দুই ধর্মই জানায় যে, তার ধর্মই শ্রেষ্ঠ, অন্যটি অকিঞ্চিৎকর। এই শাস্ত্রীয় অহমিকাই দু’য়ের মধ্যে মিলন ও গ্রহণকে সুদূরপরাহত করে তোলে। সেক্ষেত্রে কেবলমাত্র ধর্ম পরিত্যাগ করলেই এই মিলন সম্ভব। শুধুমাত্র দুটি ধর্মহীন মানুষই তাঁদের নিজেদের ধর্ম ছেড়ে পারস্পরিক প্রেমে মিলতে পারেন; সেখানে একটি তৃতীয় ধর্ম গড়ে ওঠে, সেটা হল মিলনের ধর্ম। বাংলার ফকির ও বাউল-সম্প্রদায় অতীত থেকে সেই চেষ্টাই করেছেন। কিন্তু সমাজ বা রাষ্ট্র কখনওই সেই ধর্মহীন-ধর্মকে মেনে নেয় না। ফলে ফকির-বাউলদের তখনও যেমন সমাজের প্রত্যন্ত প্রদেশে বসবাস করতে হয়েছিল, এখনও তাই করতে হয়। তবে ভারতের ইতিহাসে যে এই রকমের মিলন-প্রয়াস কখনো দেখা যায়নি, তা কিন্তু নয়। তৃতীয় মোঘল সম্রাট আকবর ‘দীন-ই-ইলাহি’ নামের একটি নতুন ধর্ম প্রবর্তন করে হিন্দু ও মুসলমান-মনকে মেলাতে চেয়েছিলেন। ‘দারা শুকো’ কোরান আর উপনিষদের সংমিশ্রণ করবার চেষ্টা করেছিলেন। আধুনিককালে ‘বিনোবা ভাবে’ বিভিন্ন ধর্মের সারাৎসার সংকলন করে একধরনের ধর্ম-সমন্বয়ের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেইসব প্রয়াস শেষপর্যন্ত ব্যর্থতাতেই পর্যবসিত হয়েছিল। ধর্ম যেহেতু ভাবাবেগ, সেহেতু বিজ্ঞানের রসায়ন এখানে কার্যকরী হয় না। হাইড্রোজেনও অক্সিজেন মিলে জল তৈরি হলেও, দুটি ধর্ম মিশিয়ে তৃতীয়, নতুন ও অপূর্ব একটি ধর্ম তৈরী করবার চেষ্টা বস্তুতঃ ব্যর্থতারই নামান্তর। তাই বাংলার হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কও কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। দুটি সমান্তরাল ধর্ম, দুটি পরস্পরবিমুখ রাজনৈতিক শক্তি, দুটি ধর্ম ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমাজ-ব্যবস্থার বিপরীতমুখিতার মধ্যেই দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্ক, সম্পর্কের টানাপোড়েন নিহিত রয়েছে। এখানে মনে রাখা দরকার যে, মধ্যযুগের ভারত তথা বঙ্গদেশে (বিশেষতঃ মধ্যযুগের প্রথমভাগে) হিন্দুদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও মর্যাদার অবনমনেও উক্ত দুই সম্প্রদায়ের সামাজিক ও ধর্মীয় সম্পর্কে আরো বেশি ব্যবধান গড়ে উঠেছিল। লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, এর আগে যেসব আক্রমণকারী বাংলা অধিকার করেছিলেন, তাঁরা সংস্কৃতিগতভাবে সেই সময়ের হিন্দু-বাঙালির তুলনায় দুর্বলতর ছিলেন। ফলে তাঁরা রাজ্যজয় করলেও ওই সময়ের বাংলার সংস্কৃতি ও ধর্মে কিন্তু কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। তাঁরা হিন্দুত্বের মূল স্রোতেই মিশে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেই একই ঘটনা-প্রবাহ সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে গড়িয়েছিল। কেননা, ইসলাম তখন এক নবীন বিশ্বজনীন ধর্ম-হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। মধ্য-প্রাচ্যের বিকশিত সভ্যতার পটভূমিকায় ইহুদিধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, জরোথুস্ট্রীয়বাদ, নয়া প্লেটোবাদ, বৌদ্ধধর্ম ও বেদুইন-সংস্কৃতির সমন্বয়ে গঠিত ইসলাম ধর্ম ততদিনে পৃথিবীর নানা দেশে নিজের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। এক আল্লাহ, এক রসুল, এক ধর্মগ্রন্থ ও এক সাম্রাজ্যের বাণী নিয়েই ইসলাম তখন এক সহজ, সুদৃঢ় ও মৌলিক ধর্ম হিসাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে ক্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই তুলনায় উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে নিজেদের হীনবল ধর্ম ও সংস্কৃতি দিয়ে প্রতিহত করবার ক্ষমতা কিন্তু ওই সময়ের হিন্দুদের মধ্যে ছিল না। যথাসময়ে সেই নবগঠিত ধর্ম তথা ধর্মাবলম্বীরা সাম্রাজ্যবাদের হাত ধরে ভারতেও প্রবেশ করেছিলেন। মধ্যযুগের বাংলায় তুর্কী আধিপত্য বিস্তার একদিকে যেমন সেই সময়কার হিন্দু-শাসকদের রাজনৈতিক আধিপত্যকে খর্ব করেছিল, তেমনই তা হিন্দুধর্মের উপরেও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছিল। দুই ধর্মের তত্ত্বগত ও আচরণগত পার্থক্যই তখন অনিবার্য সংঘাতের সৃষ্টি করে দিয়েছিল। বাঙালি-হিন্দুরা যেমন প্রথমাবধি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে উন্নাসিকতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষের চোখে দেখেছিলেন, মুসলমানরাও তেমনি তীব্রতর প্রতিহিংসার মাধ্যমে সেটার জবাব দিয়েছিলেন। অনেক সামাজিক গবেষকই সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচার করে মুসলমান সমাজ-বিন্যাস অনেক বেশি আধুনিক ও প্রগতিশীল রায় দিয়েছেন। ইসলাম শ্রেণীগত, জাতিগত ও বর্ণগত ভেদগুলিকে সামাজিক ক্ষেত্রেও বর্জন করে। ইসলাম প্রথম থেকেই সাম্যের কথা বলেছে। অন্যদিকে হিন্দুধর্ম কেবল বর্ণাশ্রম প্রথাকে তৈরীই করেনি, সেটাকে সামাজিক জীবনে কঠোরভাবে বলবৎও করেছে। একেবারে প্রথমাবধি অস্পৃশ্যতা হিন্দুধর্মে এক পরম-গ্রহণীয় বিষয় বলে গণ্য হয়েছে। সামাজিক প্রথাগুলিতেও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দুস্তর পার্থক্য রয়েছে বলে দেখা যায়। হিন্দুর বিবাহ সম্পর্ক যেখানে চিরস্থায়ী ও অবিচ্ছেদ্য (অন্ততঃ শাস্ত্রীয় বচন অনুসারে), মুসলমানেরা সেখানে অনায়াসেই বিবাহবিচ্ছেদে (তালাক) ধর্মীয় সমর্থন পেয়ে থাকেন। শাস্ত্রীয় বিধানে নারীর বৈধব্য পালনের কঠোর হিন্দু-বিধানের পাশে ইসলামে বিধবা মুসলমান-রমণীর পুনর্বিবাহের ধর্মীয় সমর্থন পাওয়া যায়। এমনকি প্রাত্যহিক জীবনচর্যার ক্ষেত্রেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়। খাদ্যাভ্যাস ও আহার গ্রহণেও দুই ধর্ম ভিন্নমুখী। হিন্দুরা যেহেতু গো-দুগ্ধ পান করেন, সেহেতু গো-নিধনকে তাঁরা মাতৃহত্যা বলেই মনে করেন। অন্যদিকে, মুসলমানেরা গো-দুগ্ধ পান করেও গো-মাংসকেই তাঁদের সর্বাপেক্ষা প্রিয় খাদ্য বলে বিবেচনা করেন। পাশাপাশি শূকর ও কচ্ছপের মাংস মুসলমানের কাছে ত্যজ্য (হারাম) হলেও, হিন্দু-সমাজে কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ-বর্জনীয় নয়। অতীতে হিন্দুধর্ম জাতপাত নির্বিশেষে একত্রে খাদ্য-গ্রহণকে অনুমোদন করত না। তখন ব্রাহ্মণেরা যেমন কায়স্থের পাক খেতেন না, কায়স্থরাও তেমনি নমঃশূদ্রদের খাদ্য গ্রহণ করতেন না। সর্বোপরি, সমস্ত সম্প্রদায়কে একসঙ্গে বসে খাদ্য-গ্রহণের কোনও সুযোগই তখন হিন্দুধর্ম দিত না। এছাড়া পোশাক, সৎকার, অভিবাদন পদ্ধতি, উত্তরাধিকার আইন, কালগণনার পদ্ধতি ইত্যাদি নানা বিষয়েও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দুস্তর পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তবে মধ্যযুগের মুসলমান-সুলতানেরা যে সবক্ষেত্রেই হিন্দুদের উপরে বিধিনিষেধ জারি করেছিলেন, তা নয়। তৎকালীন হিন্দুসমাজের অনেক রীতিনীতিকে তাঁরা আবার মেনেও নিয়েছিলেন। তখন অনেকক্ষেত্রেই তাঁরা ইসলাম-অননুমোদিত বহু আচার-আচরণও হিন্দু জনগোষ্ঠীকে পালন করতে দিয়েছিলেন। হিন্দুদের বহু সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানও তাঁরা বন্ধ করেন নি। প্রকাশ্যে পূজা-পার্বণ, বলি, প্রতিমা-শোভাযাত্রা, কীর্তন, সৎকার, মদ বিক্রি, কচ্ছপ ও শূকরের মাংস বিক্রি এবং খাওয়ায় তখন তাঁরা কোন ধরণের বিধিনিষেধ কিন্তু আরোপ করেননি। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর ‘দিল্লি সুলতানেট’ গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে নানা তথ্য লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। কিন্তু তবুও ক্রমশঃ দুই সম্প্রদায়ের সামাজিক জীবন এক গভীর সঙ্কটের মধ্যে দিয়েই প্রবাহিত হয়েছিল। মধ্যযুগের ভারতের হিন্দু-জনগোষ্ঠী সততই অবিশ্বাস ও উৎকণ্ঠার মধ্যে নিজেদের দিন কাটিয়েছিলেন। তখন পাশাপাশি বাস করেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কখনোই অভিপ্রেত সম্মিলন গড়ে ওঠেনি। ফলে তৎকালীন শাসক-মুসলমান ও শাসিত-হিন্দুর মধ্যে এক অদ্ভুত স্বাভাবিক টানাপোড়েন ও দূরত্ব তৈরী হয়েছিল। তখন কেবলমাত্র সামাজিক ক্ষেত্রেই নয়, রাজনৈতিক অবস্থানেও দুই সম্প্রদায় বিভেদের বশবর্তী হয়ে পড়েছিল। আর সেক্ষেত্রেও ওই বিভেদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সেই ধর্ম। মধ্যযুগের মুসলমান শাসকেরা যেখানে মূর্তি-ভাঙা আর মন্দির-বিনাশকে ‘ধর্মসম্মত’ বলে মনে করে গৌরববোধ করতেন, হিন্দুরা তেমনই সেই ধর্মনাশের ঘটনায় বিচলিত, বিষণ্ণ ও রাগান্বিত হতেন। তখন মুসলমানেরা নিজেদের ধর্ম-প্রবণতায়, ইসলামের অনুপ্রেরণায় যে জেহাদকে গৌরবজনক বলে মনে করে উল্লসিত হতেন, হিন্দুরা সেই ঘটনায় হীনম্মন্যতা বোধ করতেন। এর ফলে, তখন সুযোগ পেলেই ভারতীয় হিন্দু-রাজারাও নানাসময়ে প্রতিশোধকামী হয়ে উঠে মসজিদ চূর্ণ করেছিলেন ও মুসলমান নারীদের অবমাননা করেছিলেন। রাজপুতানার ‘মহারাণা কুম্ভ’ মুসলমান নারীদের বন্দি করেছিলেন, একটি মসজিদও তিনি ধ্বংস করেছিলেন। মালবদেশের ‘মেদিনী রায়’ মুসলমান নারীদের ক্রীতদাসী করেছিলেন। বিজয়নগরের রাজারা মুসলমানদের হত্যা করেছিলেন এবং মুসলমান নারী ও সম্পদ লুণ্ঠন করেছিলেন। সবক্ষেত্রেই (বলা ভালো, উভয় ক্ষেত্রেই) সেই একই দোহাই ছিল - ধর্মের দোহাই। অবশ্য, এই রকমের লিপিবদ্ধ তথ্য ইতিহাসের পাতায় তুলনায় অনেক কম পাওয়া যায়। তাই অনুমান করা যেতে পারে যে, মুসলমান-ঐতিহাসিকেরা যেভাবে সুলতানদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিজয়গুলিকে উৎসাহদীপ্ত হয়ে বর্ণনা করেছিলেন, যেহেতু সেগুলি তাঁদেরও মুসলমান হিসাবে গর্বিত ও উদ্দীপিত করেছিল, তেমনি মুসলমান-নিগ্রহ ও পরাজয়গুলিকে তাঁরা বিপরীত কারণেই উহ্য রাখতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে, মুসলমান আমলে কোনও হিন্দু সেভাবে রাজ-ঐতিহাসিক হওয়ার সুযোগ পাননি। ফলে সেইসব তথাকথিত হিন্দু-বিজয়ের ঘটনা হিন্দু-কলমে লিপিবদ্ধ হওয়ার সুযোগও পায়নি। সর্বোপরি, হিন্দুরা ওই সব ভাঙনের খেলার বিশেষ সমর্থক ছিলেন বলেও মনে হয় না। ফলে উক্ত ঘটনাগুলিকে তাঁরা হিন্দুত্বের সহনশীলতা, এবং রক্ষণশীলতার পরিপন্থী, কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে বিবেচনা করেই সম্ভবতঃ গোপন রেখেছিলেন। কিংবা, তখন যাঁরা রাজসভার দাক্ষিণ্য পেয়েছিলেন, তাঁরা বিপরীতে আখ্যান রচনার কোন দায় নিতে চান নি।
চতুর্দশ শতকে মুসলমান পরিব্রাজক ‘ইবন বতুতা’ তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার সম্পর্কের নানা চিত্র লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সমকালীন ভারতীয় সাহিত্যেও এর নানা বিবরণ পাওয়া যায়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যেও সমকালীন মুসলমান শাসনের নানা বৃত্তান্ত রয়েছে। মুসলমান-শাসনের প্রথম যুগে সুলতানেরা শত্রুপক্ষীয় হিন্দুদের কোনও রকমের উচ্চ রাজপদে বসাননি। কেননা, তখন তাঁদের পক্ষে হিন্দু-প্রশাসকদের বিশ্বাস ও নির্ভর করা স্বাভাবিকভাবেই দুরূহ ছিল। কিন্তু, ঘটনাচক্রে পরবর্তীকালে সেই অবস্থার অনেক পরিবর্তনও ঘটেছিল। ক্রমশঃ হিন্দু-আমলারা যেমন সুলতানের আস্থা অর্জন করেছিলেন, তেমনই অনেকক্ষেত্রে মুসলমান উজির-ওমরাহরাও বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন। ফলে সুলতানি প্রশাসনে ধীরে ধীরে হিন্দু-আধিপত্য বাড়তে শুরু করেছিল। উক্ত সময়ে মুসলমান আমির ও জায়গিরদাররা প্রায়শঃই সুলতানের প্রাপ্য কর প্রদানে অসম্মত হতেন। সেই অবস্থায় মুসলমান শাসকেরা হিন্দু জমিদারদের ক্ষমতা-প্রদান করতে শুরু করেছিলেন। বাংলার ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, ‘শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ’ (১৩৪২-৫৭) বহু হিন্দুকে রাজকার্যে নিযুক্ত করেছিলেন। ‘আমির খসরু’র বিবরণ থেকে জানা যায় যে, গৌড়ের সুলতানের পক্ষে হিন্দু-সেনারা উড়িষ্যা-অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে তখন প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দুদের হাতে কিছু কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কর আদায়ের দায়িত্ব হিন্দু জমিদারদের উপরেই বর্তেছিল। ওই সময়ে বাংলার গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত হিন্দুদের নিজস্ব প্রাচীন শাসন-ব্যবস্থাও মুসলমান শাসকগোষ্ঠী বহাল রেখে দিয়েছিলেন। সেই সময়ে সমাজে ‘ভূঁইয়া’ নামের একটি শ্রেণীর জন্ম হয়েছিল, তাঁরা আসলে হিন্দু ‘ভৌমিক’ বংশীয়। ওই সময়ে তাঁরা জমিদার হিসাবে প্রশাসনিক খ্যাতির অধিকারী ছিলেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস সেই শ্রেণীর উপরে বিশেষ নির্ভর করতেন। সেই উচ্চ-শ্রেণীর আর্থিক স্বার্থ সুলতানের সঙ্গে জড়িত থাকবার ফলে, দুই পক্ষের মধ্যেই একধরনের প্রয়োজনভিত্তিক বোঝাপড়া হয়েছিল। উত্তরবঙ্গের ভূঁইয়ারা তো নিজস্ব সৈন্যবাহিনীও গঠন করেছিলেন। ক্রমশঃ সেই শ্রেণী সুলতানদের কাছে খুবই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। ভাদুড়িয়া (ভাতুরিয়া) পরগনার হিন্দু-জায়গীরদার জগদানন্দ ভাদুড়ি শামসুদ্দিনের প্রধান উজির ছিলেন। তবে একই সাথে একথাও স্বীকার করতেই হবে যে, ব্যবহারিক কারণে হলেও, ওই সময়ের সুলতানদের সঙ্গে হিন্দু-জনগোষ্ঠীর একাংশের একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তখন থেকেই ক্রমশঃ একধরনের সম্প্রীতির আবহও তৈরি হচ্ছিল। বস্তুতঃ, সুলতান হুসেন শাহই সেই ধারার পথিকৃৎ ছিলেন। এর আগে গণেশ (১৪১০-১৮) ও জালালুদ্দিনের (১৪১৮-৩৩) শাসনকালেও গৌড়-দরবারে হিন্দু-পণ্ডিত ও প্রশাসকদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি হয়েছিল। পরে সেই ধারা অন্যান্য সুলতানদের আমলেও অনুসৃত হয়েছিল। ক্রমে হিন্দুরা মুসলিম শাসকদের রাজস্ব ও সেনাপতিত্বের দায়িত্বেও বহাল হয়েছিলেন। মধ্যযুগের সামাজিক ইতিহাসে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য ও অন্যান্য হিন্দু-শ্রেণীর আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। সুলতানেরা নিজেদের প্রশাসনের অনেক গুরু দায়িত্বই তাঁদের উপরে ন্যস্ত করেছিলেন। গণেশ ও জালালুদ্দিনের সময়ে পণ্ডিত ও প্রশাসকরূপে ‘বৃহস্পতি মিশ্র’ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি কয়েকজন গৌড়াধিপতির মন্ত্রী হয়ে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। এছাড়া ওই সময়ের বিভিন্ন মুসলিম শাসককে প্রীত করে তিনি কবিচক্রবর্তী, কবিপণ্ডিতচূড়ামণি, পণ্ডিতসার্বভৌম, রাজপণ্ডিত, মহাচার্য, রায়মুকুট ইত্যাদি খেতাব এবং তাঁদের কাছ থেকে হার, কুণ্ডল, রতনচূড়, ছত্র ও তুরগ উপহার পেয়েছিলেন। সুলতান হুসেন শাহর আমলেও ব্রাহ্মণরা রাজসভায় বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছিলেন। সেই সময়ে ‘সনাতন’ এবং ‘রূপ গোস্বামী’ নামের দুই পণ্ডিত ও কবি-ভ্রাতার বিবরণ ড. সুকুমার সেনের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (প্রথমপর্ব) গ্রন্থের ‘মধ্যযুগে বাঙলা ও বাঙালী শীর্ষক’ অধ্যায়ে পাওয়া যায়। সেই দুই ভাই একাধারে প্রশাসক ও কবি ছিলেন। সনাতন ছিলেন সুলতানের ‘দাবীর-খাস’ (ব্যক্তিগত সচিব), এবং রূপ ছিলেন ‘সাকর মল্লিক’ (রাজস্ব সচিব)। তাঁদের পূর্বপুরুষরা কর্নাটের রাজা বা ভূস্বামী ছিলেন। ‘রূপেশ্বর’ সম্পত্তি-বঞ্চিত হয়ে শিখরভূমে বাস করতে শুরু করেছিলেন। তাঁর পুত্র ‘পদ্মনাভ’ রাজা দনুজমর্দনের অনুরোধে ‘নরহট্টক’ (অধুনা নৈহাটি) গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মুকুন্দের পুত্র কুমারের তিন পুত্র ছিলেন - সনাতন, রূপ ও বল্লভ। বল্লভের পুত্র ছিলেন ‘জীব’। বল্লভ সুলতানের মুদ্রাশালার অধ্যক্ষর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তাঁদের অন্যান্য আত্মীয়রাও তখন উচ্চ-রাজপদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। মধ্যযুগের বাংলার মুসলমান শাসনে কায়স্থ শ্রেণীর প্রভাবও যথেষ্ট ছিল। তৎকালীন প্রশাসন পরিচালনা ও সেনাবাহিনীর সংগঠনে এই শ্রেণীর বিশেষ অধিকার ও প্রতিপত্তি তৈরী হয়েছিল। সুলতান ‘রাকনুদ্দিন বারবক শাহ’ (১৪৫৯-৭৪) ‘মালাধর বসু’ নামের একজন হিন্দু-কায়স্থকে নিজের প্রধান রাজকর্মচারী পদে নিয়োগ করেছিলেন। তাঁর বংশধরেরাও রাজ-দরবারে বহু দায়িত্বশীল পদে আসীন ছিলেন। অন্যদিকে ‘গৌর মল্লিক’ নামের একজন হিন্দু সেনাপতি ও ‘রামচন্দ্র খান’ নামের একজন হিন্দু প্রশাসকের উল্লেখও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য থেকে পাওয়া যায়। কথিত আছে যে, সেই রামচন্দ্রের সাহায্যেই শ্রীচৈতন্যদেব, গৌড়ের সুলতান ও উড়িষ্যার রাজা প্রতাপরুদ্রের সংঘর্ষের সময়ে, বাংলা-সীমান্ত পেরিয়ে নীলাচলে (উড়িষ্যা) গিয়েছিলেন। হুসেন শাহর এক উজির ছিলেন বর্ধমানবাসী ‘গোপীনাথ বসু’, ওরফে ‘পুরন্দর খান’। বৃন্দাবন দাসের লেখা ‘শ্রীচৈতন্যভাগবত’ ও কৃষ্ণদাস কবিরাজের লেখা ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে ওই সব হিন্দু-রাজপুরুষদের বিবরণ পাওয়া যায়। সুলতানি আমলের বাংলায় ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ ছাড়া বৈদ্য-সম্প্রদায়ও বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তখন রাজ-পরিবারের অন্তঃপুরে বিশ্বস্ত বৈদ্যরা ছাড়া অন্য কেউ সঙ্গত কারণেই চিকিৎসা করবার সুযোগ পেতেন না। হুসেন শাহের প্রধান চিকিৎসক ছিলেন ‘মুকুন্দ দাশ’ (গুপ্ত)। এই বৈদ্য-শ্রেণীরা পাল ও সেন বংশোদ্ভূত। এছাড়া সুকুমার সেনের গ্রন্থে ওই সময়ের ছত্রী ও বণিকদের মধ্যে ‘কেশব ছত্রী’ ও ‘কুলধরের’ নামোল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যযুগের মুসলমান-রাজসভায় হিন্দু-রাজকর্মচারীরা যে যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গেই বিরাজিত ছিলেন, সেটা তাঁদের বিভিন্ন পদবি ও খেতাবের ব্যবহার থেকেও বোঝা যায়। বাংলায় মুসলমান-বিজয়ের প্রথম দু’শো বছর নৈরাজ্য ও অশান্তিতে অতিবাহিত হলেও চতুর্দশ শতকের শেষে এখানে স্বাধীন ইলিয়াস শাহী বংশের আধিপত্য স্থাপিত হলে দেশে সুস্থিতি ফিরে এসেছিল। তখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষও অনেক কমে যাওয়ার ফলে সুলতানেরা তাঁদের নিজেদের স্বার্থেই প্রশাসনে হিন্দু-কর্মচারীদের নিয়োগ করেছিলেন, এবং তাঁদের যথাবিহিত সম্মান প্রদানও করেছিলেন। তখন সেই উদ্দেশ্যে দ্বিস্তর পদবি-প্রদান পদ্ধতির প্রচলন করেছিলেন। সেটার প্রথম (প্রাচীন) স্তরে ছিলেন নিয়োগী ও চৌধুরী (মুকুন্দরাম লিখেছিলেন - “নিয়োগী চৌধুরী নহি না করি তালুক।”); এবং দ্বিতীয় (নবীন) স্তরে ছিলেন শিকদার, ডিহিদার, মজুমদার, বকসি ইত্যাদি। ওই সময়ে হিন্দু-বাঙালির পরিচ্ছদেও মুসলমানি প্রভাব দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। রাজ-দরবারের হিন্দু-রাজা ও সেনাপতিরা মুসলমানি পোশাক পরা শুরু করেছিলেন। আচার্য সুকুমার সেন সম্পাদিত রূপরাম চক্রবর্তীর ‘ধর্মমঙ্গল’ ও ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে (সম্ভবতঃ সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে রচিত হয়েছিল) এই তথ্যের সমর্থন পাওয়া যায় -
“পরিল ইজার খাসা নাম মেঘমালা
কাবাই পরিল দশ দিগ করে আলা
পামরি পটুকা দিয়া বান্ধে কোমর বন্ধ …”
রূপরাম সুলতানের (শাহসুজা) হিন্দু-সেনাপতি লাউসেনের কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন। সমসাময়িক গ্রন্থগুলি থেকে তৎকালীন বাংলার শহরে ও গ্রামে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্কের তারতম্যও লক্ষ্য করা যায়। তখন সাধারণতঃ গ্রামীণ জীবনে সেই সম্পর্ক অনেক প্রীতিপূর্ণ ছিল। বস্তুতঃ, গ্রাম-জীবনে স্বার্থের প্রশ্নটি যেখানে তখন অনেকটাই সীমায়িত ছিল, সেখানে সম্পর্কের জটিলতাও তখন হ্রস্ব ছিল। ঐ সময়ে ব্রাহ্মণেরা তথাকথিত ম্লেচ্ছ-আচার বর্জন করলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে কিন্তু মুসলমানদের সঙ্গে সুসম্পর্কই বজায় রেখে চলতেন। অন্যদিকে মুসলমানরাও তখন হিন্দু-পণ্ডিতদের প্রতি যথোচিত সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন। প্রসঙ্গতঃ কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে শ্রীচৈতন্যদেব ও কাজীর বাদানুবাদ-অংশে কাজীর সংলাপে সেই গ্রাম-সম্পর্কের বিবরণ লক্ষ্য করা যেতে পারে। চৈতন্যদেবের প্রকাশ্যে কীর্তনের উপরে কাজী নিষেধাজ্ঞা জাবি করবার ফলে চৈতন্যদেব সদলবলে
কাজীর বাড়িতে চড়াও হয়েছিলেন। কাজী চৈতন্যর রুদ্রমূর্তি দেখে তখন তাঁর সঙ্গে চৈতন্যর গ্রাম-সম্পর্কের উল্লেখ করে বলেছিলেন -
“গ্রাম-সম্পর্কে চক্রবর্ত্তী হয় মোর চাচা,
দেহ-সম্বন্ধে হইতে হয় গ্রাম-সম্বন্ধ সাঁচা।
নীলাম্বর চক্রবর্ত্তী হয় তোমার নানা,
সে সম্বন্ধে হও তুমি আমার ভাগিনা।”
আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার কাজীর এই উক্তিকে বিদ্রূপ বলে গণ্য করলেও, অন্যান্য ঐতিহাসিকদের মতে ওই সময়ের এহেন গ্রাম-সম্পর্ককে একেবারে তুচ্ছ মনে করবারও কোন কারণ নেই। বাংলার ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, ধর্মান্তরের পরেও তখনকার বহু নবীন মুসলমানই তাঁদের আগেকার হিন্দু-নামই রক্ষা করে চলেছিলেন। ‘বিবি মালতী’ বা ‘শুভোধন’ ইত্যাদি নামগুলি এই সত্যিকেই প্রতিষ্ঠা করে। ওই সময়ে হিন্দুদের নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে মুসলমানদের অংশগ্রহণও ক্রমশঃ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কাজীরা প্রাতিষ্ঠানিক কারণে নাম-সঙ্কীর্তনে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও ওই সময়ের সাধারণ মুসলমান সমাজ কিন্তু সেটাকে যথেষ্ট উপভোগ করতেন। বিজয়গুপ্তর ‘মনসামঙ্গল’ এবং বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ (আদি) গ্রন্থেও অনুরূপ বিবরণ পাওয়া যায়।
মধ্যযুগে সারা পৃথিবীর ধর্ম ও সমাজ অবিচ্ছিন্ন সূত্রে গ্রথিত ছিল। তৎকালীন এশিয়া ও ইউরোপের চিত্রটিও একই রকমের ছিল। ভারতের ক্ষেত্রেও সেটার কোনও অন্যথা ঘটেনি। তৎকালীন বাংলায় ধর্ম-কেন্দ্রিক শাসন-পদ্ধতি দুই সম্প্রদায়কে পরস্পর-বিদ্বেষী করে তুলেছিল। ওই সময়ের সুলতানরা রাজ্যজয়ের পরে ইসলামের প্রসারের প্রতীক হিসাবে একদিকে যেমন মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, অন্যদিকে তেমনি মন্দির চূর্ণ করেছিলেন। তখন অনেক সময়ে যেমন মন্দিরই মসজিদে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল, তেমনি অনেক বৌদ্ধস্তূপের উপরেও মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। অবশ্য এর একটি অন্য দিকও রয়েছে। ওই সব রূপান্তরিত মসজিদ, দরগা, কবর, মাজারগুলিকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে হিন্দু-মুসলমান জনগোষ্ঠী এক অন্যতর ঐক্যে পরস্পর-সম্পৃক্ত হয়েছিল। বহু দরগা বা মাজারে দুই ধর্ম-সম্প্রদায়ই যুক্তভাবে উপাসনায় ব্রতী হয়েছিল। বাংলায় এখনও সেরকম দৃষ্টান্ত কম কিছু নেই। মালদহে সুলতান সিকন্দর শাহ নির্মিত আদিনা মসজিদ বা নুর কুতুব আলমের মসজিদ ও দরগা, গৌড়ে ভাগীরথীর তীরে জালালুদ্দিন ফতে শাহের গুণবন্ত মসজিদ, রাজশাহীর নিমাই শাহের দরগা, চব্বিশ পরগনার হাড়োয়া গ্রামে বৈষ্ণব গোরাচাঁদের মসজিদ বা ঘুটিয়ারি শরিফে পীরগাজী মুবারক আলির দরগা ও মসজিদ, মল্লিকপুরের কাছে মহিনগরে হুসেন শাহের উজির পুরন্দর খানের (হিন্দু-নাম গোপীনাথ বসু) মসজিদ, সুন্দরবন অঞ্চলে ধবধবি গ্রামে বরখান গাজীর দরগা (সেখানে স্থাপিত গাজীর মূর্তির সামনে এখনও প্রতি শুক্রবার মুসলমানেরা নামাজ পড়েন), লক্ষ্মীকান্তপুরে মণিবিবির কবর ও মসজিদ, গোবরডাঙ্গায় পীর ঠাকুরের থান বা ওলাবিবির থান, বীরভূমের পাথরচাপুড়িতে দাতা মাহবুব শাহর মাজার, কালনায় বদর সাহেব ও মজলিম সাহেবের কবর ইত্যাদি অজস্র হিন্দু-মুসলমান যৌথ ধর্মাচরণের ক্ষেত্র এখনও রয়েছে। এছাড়া মুসলমানদের মহরম তাজিয়ার সঙ্গেও মুসলমান-সংস্কারকরা হিন্দু-পৌত্তলিকতার মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। অতীতের গোঁড়া মুসলমানরা হিন্দুদের দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জন বা রথযাত্রার সঙ্গে মহরমের সমুহ সাদৃশ্য লক্ষ্য করেছিলেন, এবং সেই কারণে তাঁরা মহরম উপলক্ষ্যে ওই ধরণের কোন অনুষ্ঠানকে ধর্মবিরুদ্ধ অনুষ্ঠান বলে ঘোষণাও করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে ‘জেমস ওয়াইস’ জানিয়েছিলেন যে, অতীতের পাটনা ও বিহার শরিফ অঞ্চলের ১,৪০০ তাজিয়া শোভাযাত্রার মধ্যে ৬০০টির পরিচালনার সঙ্গেই কোন না কোন ভাবে হিন্দুরা যুক্ত ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিকতার বিপরীতে গিয়ে নিতান্ত সাধারণ মানুষের ভাবাবেগ তখন ওভাবেই প্রবাহিত হয়েছিল। ওই সময়ের স্থানীয় লোকাচারগুলির সঙ্গেও হিন্দু-মুসলমানের যৌথ ভাবাবেগ জড়িয়ে গিয়েছিল। জ্যোতিষশাস্ত্র, ওঝা, মন্ত্রতন্ত্র, ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি বিষয়ে তখন সম্প্রদায়-নির্বিশেষে যথেষ্ট সাদৃশ্য তৈরি হয়েছিল (আজও রয়েছে)। তখন বাংলা-বিহারের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে ওলাওঠা রোগের কবল থেকে বাঁচবার জন্য দুই সম্প্রদায়ই ‘ওলাদেবী’ তথা ‘ওলাবিবি’র পূজা সেই মধ্যযুগ থেকে আজও করে চলেছেন। একইভাবে হুরি-পরিকে দুই সম্প্রদায়ই বিশ্বাস করেছিল। এমনকি হিন্দুদের সহমরণ প্রথানুসরণে জীবিত মুসলমান স্ত্রীও ক্ষেত্রবিশেষে মৃত স্বামীর সঙ্গে কবরস্থ হয়েছিলেন। ক্রমশঃ হিন্দুদের বিবাহ-পণপ্রথা বা আড়ম্বর মুসলমান সমাজেও নিজের স্থান করে নিয়েছিল। অর্থাৎ লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, তৎকালীন সমাজের বা রাজনীতির উপর-স্তরে স্বার্থবাহিত যে-ভেদবুদ্ধি প্রবহমান ছিল, নীচের মহলে কিন্তু সেটার বিপরীত মিলনাভিলাষী ঢেউই প্রবাহিত হয়েছিল। হয়তো শিক্ষার অভাবেই ওই সমাজের নিম্নবর্গীয় দরিদ্র মানুষেরা নানা কুসংস্কারের ক্ষেত্রেই একীভূত হয়েছিলেন; কিন্তু, উচ্চবর্ণের তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ যে উন্নাসিকতা ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিতে পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত হতেন বা এখনও হন, সেটাকেও খুব সু-সংস্কার বলা যায় না। রাজনীতি, বিধান বা শরিয়তের বাইরে অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী জীবনের প্রয়োজনে, আবেগের বশে সম্মিলনের যে গুরুত্ব তখন অনুধাবন করেছিলেন, সেটা নিশ্চয়ই ছোট করে দেখবার নয়। স্থানীয়ভিত্তিক নানা লোকাচার-তথ্যের গভীর অনুধাবনই বুঝিয়ে দেয় যে, ধর্ম বা রাজনীতি নয় - মানুষই শেষ কথা। অন্ততঃ লোকসংস্কৃতির গবেষকরা সেই কথাই বলে থাকেন। বাংলার সূফী-সাধক ও পরবর্তীকালের বাউল-সম্প্রদায় কিন্তু সেই সমন্বয়ের বাণীই প্রচার করেছিলেন। অন্যদিকে মুসলমান শাসনে নাভিশ্বাসগ্রস্ত হিন্দুধর্মের নবজাগরণের জন্য শ্রীচৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩) তখন একক প্রচেষ্টা করেছিলেন। নাম-সঙ্কীর্তনের মায়ায় তিনি মুসলমান শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। মধ্যযুগের বঙ্গদেশে চৈতন্যকে কেন্দ্র করেই বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হিন্দুধর্ম এক নবজাগরণের মুখোমুখি হয়েছিল। তাঁর প্রচারিত বৈষ্ণবধর্মে ‘যবন হরিদাসের’ও স্থান হয়েছিল। তিনি মুসলমান শাসনের বিরোধিতা করলেও মুসলমানকে কখনোই অপাংক্তেয় বলে মনে করেননি। তিনিও গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতাই করেছিলেন।
(তথ্যসূত্র:
১- বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, বিনয় ঘোষ।
২- বাংলা ও বাঙালী, অতুল সুর।
৩- বাঙলার সামাজিক ইতিহাসের ভূমিকা, সতীন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায়।
৪- বাঙ্গালার ইতিহাস (সামাজিক বিবর্তন), ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত।
৫- বাংলা দেশের ইতিহাস, রমেশচন্দ্র মজুমদার।
৬- বাঙ্গালীর ইতিহাস, নীহাররঞ্জন রায়।
৭- বাঙ্গালার ইতিহাস, রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়।
৮- বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর: স্বাধীন সুলতানদের আমল, সুখময় মুখোপাধ্যায়।
৯- ভেদাভেদের কথাসাহিত্য, গৌতম ঘোষ দস্তিদার।
১০- সুলতান আমলে বাংলা সাহিত্য, ওয়াকিল আহমদ।
১১- আদিমধ্য ও মধ্যযুগের ভারত: ৬৫০-১৫৫৬, সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়।
১২- মধ্যযুগের বাংলা ও বাঙ্গালী, সুকুমার সেন।)
৫৩
৯১ মন্তব্য