Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৬:৩০ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গদেশে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক ( চতুর্থ / শেষ পর্ব)

‘বঙ্গদেশে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক’

মোঘল-পাঠান-যুগের অবসান ঘটবার পরে ভারতে যখন ইংরেজ শাসনের যুগ শুরু হয়েছিল, তখন তথাকথিত সুসংস্কৃত জাতি ইংরেজও ফের ইতিহাসের চাকাকে পিছন দিকে গড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ভারতে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কের পুরনো টানাপোড়েনকে তাঁরা প্রথমাবধি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে বারবার নানা উপায়ে উভয় সম্প্রদায়ের পুরনো ক্ষত খুঁচিয়ে জাগিয়ে তুলেছিলেন। পরাধীন ভারতের ইতিহাসের সরণি লক্ষ্য করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, এদেশে ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কংগ্রেসের নেতৃত্বে শুরু হলেও, ক্রমশঃ সেটা একপেশে হয়ে পড়েছিল। দেশকে মাতৃরূপে বন্দনা করা, তার সঙ্গে পৌত্তলিকতাকে ওতপ্রোত করে ফেলা, অনগ্রসর মুসলমান সমাজকে আন্দোলনের মূল স্রোতে না নিয়ে আসা - এইসব কার্যকারণে ভারতের তথাকথিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কখনোই একটা সর্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করতে পারেনি। মুসলমান জনগোষ্ঠী ক্রমশঃ সেই আন্দোলন থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। আর ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীরা সেই সুযোগটি বেশ ভালভাবেই নিজেদের কাজে লাগিয়েছিলেন। তাঁরা হিন্দু ও মুসলমানকে বিচ্ছিন্ন করবার পরিকল্পনায় দুই সম্প্রদায়কেই নিজস্ব রাজনৈতিক দল গড়ার ইন্ধন যুগিয়েছিলেন। কেবল উৎসাহ যোগানোই নয়, বঙ্গদেশে তাঁরা সেটার অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টিরও নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দুই সম্প্রদায়কে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষী করে তোলবার নানা চক্রান্তকে তাঁরা ফলপ্রসূও করেছিলেন। শেষপর্যন্ত, ১৯০৫ সালে তাঁরা সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বৃহত্তর বাংলাকে বিভক্ত করবার প্রথম উদ্যোগটি নিয়েছিলেন। যদিও সেক্ষেত্রে সেই সময়ের বাংলার আয়তনের বিস্তৃতির অজুহাত দেখানোর মাধ্যমে প্রশাসনিক অসুবিধার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু সেটার মধ্যে আসলে ইংরেজদের সুকৌশলী মনোভাবই নিহিত ছিল। হিন্দু-মুসলমান-সমৃদ্ধ বৃহত্তর বাঙালি-জনগোষ্ঠীকে বিভাজিত করলে যে সম্মিলিত শক্তি অনেকটাই ক্ষুণ্ণ হবে, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী সেটা বুঝতে পেরেছিল। সেই কারণে, ইতিহাস বিখ্যাত ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির প্রযোগ করে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা সারা ভারতের মতো বাংলাতেও একাধিপত্য স্থাপনের জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই ইংরেজ-সরকার একদিকে পশ্চিমবাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা; এবং অন্যদিকে পূর্ববঙ্গ ও অসমকে রেখে বৃহত্তর বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছিল। এর ফলে ওই সময়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সামাজিকভাবেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এর আগে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা একটি প্রাদেশিক শাসনের অধীনে ছিল। ১৮৭৪ সালে অসমকে অবশ্য একজন পৃথক মুখ্য প্রশাসকের অধীনে একটি পৃথক প্রদেশের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। এর আগে ভৌগোলিক কারণে সংযুক্ত বঙ্গকে শাসন করবার কিছু প্রশাসনিক অসুবিধা হওয়ার ফলে সেই বিরাট প্রদেশকে প্রশাসনিক কারণে বিভক্ত করবারও কিছু যৌক্তিকতা ছিল। ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকার আপাতভাবে বঙ্গভঙ্গের জন্য সেই যুক্তি দেখালেও, সেটার পিছনে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই মুখ্য ছিল, তা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ও ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকারের বিভিন্ন নীতি, সরকারি ভাষ্য ও নানা নথিপত্র ঘেঁটে ঐতিহাসিকেরা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। বস্তুতঃপক্ষে, ওই সময়ে বঙ্গ-বিভাগের আসল কারণটি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক ছিল। ইতিহাস বলে যে, ভারতে মুসলমান-শাসনকাল থেকে শুরু করে ইংরেজ শাসনের প্রথম পর্ব পর্যন্ত মুসলমান-জনগোষ্ঠী কেবলমাত্র নিজেদের ধর্মকে কেন্দ্র করেই জীবন কাটিয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে সাধারণের মধ্যে শিক্ষা-বিস্তারের জন্য তেমনভাবে যেমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, তেমনি মুসলমানেরাও সেরকমভাবে শিক্ষাগ্রহণের ব্যাপারে কোনও আগ্রহও দেখান নি। এর ফলে, ক্রমশঃই হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানেরা অনেক পিছিয়ে পড়েছিলেন। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে সিপাহী-যুদ্ধের আগে পর্যন্ত হিন্দুরা ব্রিটিশদের সঙ্গে যেরকম সহযোগিতা করেছিলেন, মুসলমানেরা সেটা করেন নি। ওই সময়ে নবগঠিত হিন্দু-ধনিকশ্রেণী নিজেদের স্বার্থের জন্য ইংরেজদের সঙ্গে সেই সহযোগিতার পথে চললেও উচ্চবিত্ত মুসলমানেরা কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তেমন কিছু করেন নি। ইংরেজিশিক্ষা-গ্রহণে হিন্দুরা আগ্রহ দেখালেও, মুসলমানেরা প্রথমদিকে তাতে তেমন কোন আগ্রহবোধ করেন নি। এসবের ফলে মুসলমানেরা তখন ক্রমশঃই প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র থেকে ছিটকে পড়ছিলেন। বিপরীতে, একদিকে ইংরেজ-সহযোগিতা, অন্যদিকে ইংরেজি-শিক্ষা হিন্দুদের অর্থনৈতিকভাবেও ক্রমশঃ সম্পন্ন করে তুলেছিল। আর সেই অর্থনৈতিক বিভেদের ফলেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাও তখন ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। সেই সময়ের হিন্দু-ভূস্বামীরাও শ্রেণীস্বার্থে মুসলমান প্রজা ও কৃষি শ্রমিকের উপরে নানা ধরণের অত্যাচার ও শোষণ চালিয়েছিলেন। ১৮৫৭ সালের সিপাহী-বিদ্রোহ ইংরেজদেরকে খুব বড় একটি ধাক্কা দিয়েছিল। তখন থেকেই মুসলমান উচ্চবিত্ত সমাজও ক্রমশঃ নিজেদের স্বার্থেই ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতার অবস্থান গ্রহণ করেছিল, আর সুচতুর ইংরেজরাও সেই সুযোগটি পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করেছিলেন। কেননা, ইতিমধ্যেই হিন্দু-উচ্চবিত্তশ্রেণী কংগ্রেসের মাধ্যমে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়বার ফলে ব্রিটিশ সরকার সঠিকই বুঝতে পেরেছিল যে, ওই আন্দোলন ক্রমশঃ সুদূরপ্রসারী হবে। ফলে তাঁরা সেই আন্দোলনের সূচনাতেই সেটাকে প্রতিরোধ করবার জন্য সক্রিয় হয়েছিলেন। নিজেরা আড়ালে থেকে সেই প্রতিরোধের কাজটি তাঁরা অন্য কোনও অভ্যন্তরীণ শক্তির সাহায্যেই করতে চেয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে ভারতের মুসলমান-সমাজকেই তাঁরা নিজেদের স্বার্থপূরণের অবলম্বন হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। অন্যদিকে কংগ্রেস দেশের মুসলমান-সম্প্রদায়কে তাঁদের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সেভাবে শামিল করতে পারেনি। ব্রিটিশ সরকার সেই সুযোগটিও তখন গ্রহণ করেছিল। তাঁদের পক্ষে মুসলমানদের একথা বোঝানো খুবই সহজ হয়েছিল যে, ওই আন্দোলনের সঙ্গে তাঁদের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক স্বার্থের ন্যূনতম কোন যোগ নেই। তবে কেবলমাত্র বোঝানোই নয়, মুসলমান-সম্প্রদায়কে তাঁরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে সংঘর্ষের পরিবেশও সৃষ্টি করেছিলেন। তৎকালীন হিন্দু-মধ্যবিত্তশ্রেণীর অপেক্ষাকৃত দ্রুত বিকাশ, এবং তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান সঙ্কুচিত করবার জন্যই সেই তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী পথটিকে তাঁরা খুব ভেবেচিন্তেই খুঁজে নিয়েছিলেন। ‘লর্ড কার্জনের’ তৎকালীন কয়েকটি ভাষণ, এবং চিঠিপত্রকে উদ্ধৃত করে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ‘সুমিত সরকার’ তাঁর ‘দি স্বদেশি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল: ১৯০৩-১৯০৮’ গ্রন্থে এই তত্ত্বই প্রতিপাদ্য করেছিলেন যে, ওই সময়ের হিন্দু-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের ব্রিটিশ-বিরোধিতাকে লর্ড কার্জন মুসলমান-বিরোধিতার দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিলেন; এবং সেই তাগিদে বঙ্গবিভাগ তাঁদের সার্বিক পরিকল্পনারই অঙ্গ ছিল। অবশেষে, ১৯০৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর তারিখে ইংরেজরা সেই পরিকল্পনা রূপায়ণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সেদিনই বঙ্গবিভাগের ঘোষণা প্রথম সরকারিভাবে প্রচারিত হয়েছিল। প্রকাশ্যে প্রশাসনিক অসুবিধার কথা বলে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ইংরেজ যুক্তি-বিস্তার করলেও কার্জনের পরবর্তী ভাইসরয় ‘লর্ড মিন্টো’, ১৯০৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে ভাবতসচিব ‘মর্লি’র কাছে লেখা একটি চিঠিতে বঙ্গভঙ্গের নিহিত উদ্দেশ্যটি সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, “বাঙালী রাজনৈতিক আন্দোলনের হ্রাসপ্রাপ্তি উদ্বেগের একটি গুরুতর কারণ দূরীভূত করতে সাহায্য করবে। ... অতীব বুদ্ধিগত উৎকর্ষতা ও নিজেদের বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে যোগ্যতাসম্পন্ন একটি জনগোষ্ঠী, যে জনগোষ্ঠী ভারতের অন্যান্য অনেক জাতির মধ্য থেকে শারীরিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে শক্তিশালী না হলেও আমাদের জনমতকে ক্ষতিকরভাবে প্রভাবিত করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব নয়। পুরাতন প্রদেশের প্রশাসনিক অসুবিধার কথা বাদ দিলেও তাই আমি বিশ্বাস করি বিভাগের প্রয়োজন খুব বেশি ছিল।” (দি স্বদেশি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল: ১৯০৩-১৯০৮, সুমিত সরকার, অনুবাদ: বদরুদ্দিন উমর) দেশে খুব স্বাভাবিক কারণেই সেটার অপরিসীম প্রভাব পড়েছিল। এর ফলে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক আবার এক দ্বন্দ্বমূলকতার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। তৎকালীন মুসলমান-সম্প্রদায় এর ফলে সাময়িকভাবে উপকৃত হলেও, বঙ্গভঙ্গ আদতে তাঁদের যে কোনও সার্বিক উন্নয়নের দিশা দেখাতে পারবে না, সেটা তখনও তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন নি। অন্যদিকে, সম্পত্তিগত ও চাকুরিগত ক্ষেত্রে হিন্দু-মধ্যবিত্ত সমাজ তখন অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, জমিদারি ব্যবস্থা কিন্তু ক্রমশঃই অবনতির মুখোমুখি হচ্ছিল। একই সাথে ওই সময় থেকে মুসলমানেরা হিন্দু-কুক্ষিগত আর্থিক সুবিধাগুলিতে ভাগ বসানোর ফলে বাঙালি-হিন্দুদের আর্থিক অবস্থা অনেকটাই খারাপ হতে শুরু করেছিল। তাঁদের মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেয়েছিল। স্বভাবতঃই তাঁরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। যার ফলে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা সেই আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। তবে কেবলমাত্র হিন্দুরাই নন, দুই বাংলার মুসলমানদের একটি অংশও সেই রাজনৈতিক-উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বঙ্গভঙ্গকে নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁরা এক-ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে ধর্মের নামে বিচ্ছিন্ন করবার সুদূরপ্রসারী ফল যে কোন সম্প্রদায়ের পক্ষেই ভাল হবে না, সেটা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। তখনকার ওই সব সচেতন মুসলমানেরাও হিন্দুদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। আবুল কাসেম, লিয়াকত হোসেন, আবদুল গফুর, রসুল, গজনভি, আবুল হোসেন, দীন মোহম্মদ, দেদার বক্স এবং ইসমাইল হোসেন সিরাজি প্রমুখ বেশ কয়েকজন মুসলমান-নেতা তখন সেই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন। তবে তাঁদের প্রগতিশীল চিন্তাধারা যে সমগ্র মুসলমান-সমাজকে যুক্ত আন্দোলনে প্রাণিত করতে পেরেছিল, তা নয়। তখন থেকে ক্রমশঃই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই সামগ্রিক মুসলমান-সমাজকে বেশি অধিকার করে নিচ্ছিল। সেই ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ ও অসমের লেফটেন্যান্ট-গভর্নর ‘ব্যামফিল্ড ফুলার’ তখন প্রবল প্ররোচনা যুগিয়েছিলেন। অন্যদিকে, হিন্দু-স্বাদেশিকতার সঙ্গে মুসলমান জাতীয়তাবাদীদের মানসিক সংযোগেরও তখন অভাব ঘটছিল। সেই সময়ের ওই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ‘বদরুদ্দিন উমর’ তাঁর ‘বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকারী হিন্দুরা ছিলেন প্রধানতঃ মধ্যশ্রেণীর লোক এবং বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চিন্তার দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত। এ কারণে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁরা বঙ্কিমরচিত ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা প্রদান করেন, এবং তাঁদের বিভিন্ন সভা সমিতিতে সেই সঙ্গীত গীত হতে থাকে। ... মুসলমানরা বিপ্লবী আন্দোলনকে সে সময় খুব সন্দেহের চোখেই দেখতেন এবং তার থেকে দূরে থাকতেন।” বলাই বাহুল্য যে, ইংরেজরা সম্পূর্ণভাবেই সেই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা মুসলিম লিগের মাধ্যমে দেশে সাম্প্রদায়িকতার বাতাবরণ তৈরী করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এমনকী, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে দুই বাংলায় তীব্র গণ-আন্দোলনের চাপে ইংরেজরা ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর তারিখে বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরপরে পূর্ব ও পশ্চিমবাংলাকে পুনরায় একীভূত করে একটি সংযুক্ত প্রদেশ গঠন করা হলেও, ইতিমধ্যে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করবার কোন সদিচ্ছাও ইংরেজ-সরকারের ছিল না। আন্দোলনের চাপে ইংরেজরা তখন বঙ্গভঙ্গকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলেও, ওই দীর্ঘ পাঁচবছরে তাঁদের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে সিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল - হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যেকার রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণ হয়েছিল। ইংরেজদের রাজনীতির সঙ্গে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে মিশিয়ে দেওয়ার মৌলিক ষড়যন্ত্রটিও একই সাথে সফল হয়েছিল।

১৯২০ সালে ভারতের সামগ্রিক রাজনীতিতে ‘খেলাফত’ ও ‘অসহযোগ’ আন্দোলন বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। দুই সম্প্রদায় আলাদাভাবে সেই আন্দোলন দুটি শুরু করলেও একটা সময়ে দুটির মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল। এর ফলে ওই সময়ের বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যেকার বিদ্বেষ ও বিচ্ছিন্নতা কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছিল। অবশ্য সেই আন্দোলন দুটি ওই সময়ের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবিদাওয়াকে বিশেষ প্রাধান্য না দিয়ে ধর্মকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। ফলে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আন্দোলন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল, এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আবার সামনে এসে গিয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহৃত হলেও ১৯৪০ সাল থেকেই মুসলিম লিগ আরও বৃহত্তর প্রেক্ষিতে দেশভাগের দাবি তুলেছিল। সেবারে ‘মহম্মদ আলি জিন্নাহ’ বাংলার মুসলমান সমাজকেও নিজস্ব ভূখণ্ডের স্বপ্নে শামিল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ওই সময়ে মুসলিম লিগ প্রাথমিকভাবে দেশের উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলবার দাবি তুলেছিল। কিন্তু লিগের লাহোর প্রস্তাবে (১৯৪০) আপাতভাবে তখন খণ্ডিত রাষ্ট্র গড়বার কথা বলা হলেও, আসলে মুসলিম লিগ শুরু থেকেই অখণ্ড পাকিস্তান গঠনের কথাই ভেবেছিল। এর দীর্ঘ ছয় বছর পরে মুসলিম লিগের বঙ্গীয় প্রাদেশিক নেতারা সেই লাহোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে নব-নির্বাচিত লিগ-বিধায়কদের সম্মেলনে জিন্নাহ সরকারিভাবে অখণ্ড পাকিস্তানের দাবি তুলেছিলেন। সেই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, “That zones comprising Bengal and Assam in the North-East and Punjab, North-West Frontier Province, Sind and Baluchistan in the North-West of India, namely Pakistan zone where the Muslims are in a dominant majority be constituted into a sovereign independent state and that an unequivocal undertaking be given to implement the establishment of Pakistan without delay.” তখন মুসলিম লিগের বঙ্গীয় প্রাদেশিক শাখার সাধারণ সম্পাদক ‘আবুল হাসিম’ জিন্নাহর সেই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেও কিন্তু শেষপর্যন্ত পাকিস্তান-গঠনের দাবি থেকে জিন্নাহপন্থীদের সরাতে পারেন নি। বলা বাহুল্য যে, ইংরেজরাও নীতিগতভাবে জিন্নাহর সেই দাবিকে মেনে নিয়েছিলেন। ওই পরিস্থিতিতে ভারতীয় হিন্দু মহাসভার সভাপতি ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়’ ১৯৪৭ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি তারিখে বাংলার গভর্নর ‘স্যর ফেভারিখ বারোজের’ সঙ্গে দেখা করে বাংলাকেও সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভাগ করবার জোরালো দাবি পেশ করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল যে, সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ভারত-ভাগ হলে, সেই একই যুক্তিতে বাংলাকেও দ্বিখণ্ডিত করা উচিত। তৎকালীন কংগ্রেস-সভাপতি ‘আচার্য কৃপালনী’ও শ্যামাপ্রসাদের সেই বক্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন। তখন কংগ্রেস থেকে শুধু কৃপালনী একা নন, ভারতের ইতিহাসে অসাম্প্রদায়িক তথা সমাজবাদী হিসাবে বহুল পরিচিত ‘পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু’ পর্যন্ত শ্যামাপ্রসাদের ওই বক্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন। বস্তুতঃ, শ্যামাপ্রসাদের আগেই তিনি একই যুক্তির আশ্রয় নিয়েছিলেন। উক্ত প্রসঙ্গে ১৯৪৭ সালের ২৭শে জানুয়ারি তিনি ‘স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস’কে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “The British Government has to decide once for all its policy in regard to this matter. It can no longer sit on the hedge. It can not force Pakistan on India, in the form demanded by Jinnah, for that certainly will lead to civil war ... Even if the Muslims as a whole support the League and Pakistan, that can only mean a division of both Punjab and Bengal-Jinnah has indignantly rejected this. What then? Compulsions of other areas to join Pakistan, that is inconceivable and impossible. Thus the crux of the Pakistan issue is this: A Pakistan consisting of only part of Punjab and part of Bengal, or no separation at all.” (Partition of Bengal - 1947, Journal of Indian History, A. K. Majumdar) অর্থাৎ, হিন্দু মহাসভাকে যাঁরা ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসাবে চিহ্নিত করেন, তাঁদের তার আগে তৎকালীন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের মৌলিক সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকেও ইতিহাসের সূত্রে মেনে নেওয়া উচিত। বিশেষতঃ, জিন্নাহর আগেই নেহরু যখন সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বাংলা ও পাঞ্জাবকে খণ্ডিত করবার দাবি তুলেছিলেন, এবং সেটার রূপায়ণে ব্রিটিশ সরকারের উপরে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন; তখন স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ ভাবতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর প্রচারিত মহিমা মানুষের কাছে অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে বাধ্য। ইতিমধ্যে দেশজুড়ে দাঙ্গার আগুন জ্বলে উঠেছিল। ১৯৪৬ সালে নোয়াখালিতে বীভৎস দাঙ্গা হয়েছিল, ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে উত্তর ভারতের সর্বত্রই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে দুই সম্প্রদায়ের রক্তে ভারতের মাটি ভিজে উঠেছিল। সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলোর ওই সব দাঙ্গার পিছনে যে ইংরেজদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল, সেটা এখন আর কারোরই অজানা নয়। ইংরেজরা ততদিনে তাঁদের ক্ষমতা যে ছেড়ে দিতে হবে, সেটা ভালভাবেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন। এর ফলে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে একটি শেষ ষড়যন্ত্রকে তাঁরা খুব সফলভাবেই রচনা করতে পেরেছিলেন। ‘লর্ড মাউন্টব্যাটেন’ সেই পরিকল্পনাকে ঠাণ্ডা মাথায় সার্থকভাবে রূপায়ণ করেছিলেন। ওই সময়ের ইতিহাস থেকে লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, মুসলিম লিগ, কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা কিন্তু একযোগেই ধর্মীয় জনসংখ্যার নিরিখেই বাংলাকে ভাগ করবার উদ্যোগ নিয়েছিল। তাঁদের কেউই বাংলার অখণ্ড ভাষা-সংস্কৃতির সূত্রটিকে যেমন আমল দেয়নি, তেমনি মানুষের নিজস্ব ভূমির ভাবাবেগকেও গ্রাহ্য করেনি। সেই সময়ে ‘শরৎচন্দ্র বসু’র মতো কয়েকজন নেতা ওই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তখন কেউ কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সার্বভৌম বাংলার দাবিও তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতো উপনিষদবাদী মনীষীরা বাংলার ‘সাধারণ ভাষা, সাধারণ সংস্কৃতি এবং সাধারণ ইতিহাসের’ কথা বারবার মনে করিয়ে দিলেও, তখন কেউই তাতে কর্ণপাত করেন নি। শরৎচন্দ্র বসু সেই বিষয়ে গান্ধীজিকে প্রভাবিত করবার একটা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। অন্যদিকে, শ্যামাপ্রসাদ মুসলমান-নেতা ‘সুহরাওয়ার্দি’র সার্বভৌম বাংলা-গঠনের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, ভারত যদি শেষপর্যন্ত অবিভক্তও থাকে, তাহলেও বাংলাকে ভাগ করতেই হবে। (মহাত্মা গান্ধী: দ্য লাস্ট ফেজ, ২য় খণ্ড, পেয়ারেলাল) সেই সময়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বদরুদ্দিন উমর লিখেছিলেন, “সার্বভৌম বাঙলার বিরুদ্ধে হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের মধ্যে অবস্থিত সাম্প্রদায়িক ও হিন্দু মহাসভাপন্থী নেতারা যেমন নিজেদের তৎপরতা শুরু করেছিলেন ঠিক তেমনিভাবে বাঙলার মুসলীম লীগের মধ্যে চরম সাম্প্রদায়িক, এবং ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলীম লীগ নেতৃত্ব থেকে উৎখাত হয়ে যাওয়া অংশটিও সার্বভৌম বাঙলার বিরুদ্ধে নিজেদের তৎপরতা শুরু করে। খাজা নাজিমুদ্দীন সার্বভৌম বাঙলা রাষ্ট্রগঠনের ব্যাপারে অন্যদের সঙ্গে মুসলীম লীগের পক্ষে, শরৎ বসু প্রভৃতি কংগ্রেসী নেতাদের সঙ্গে যৌথ আলোচনায় একদিন উপস্থিত থাকেন, এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাঙলার পক্ষে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ দু’-একটি বিবৃতি প্রদান করলেও তাঁরা সুহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশীমের নেতৃত্বাধীন সার্বভৌম বাঙলা রাষ্ট্রগঠনের বিরোধী ছিলেন, এবং সেই বিরোধিতা করতে গিয়ে নানা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমেও এ-সময় সাম্প্রদায়িক বক্তব্যকেই সামনে নিয়ে এসে তাঁরা অখণ্ড বাঙলায় মুসলমানদের আধিপত্য, এবং ইসলামের মূল নীতি প্রতিষ্ঠার কথাই জোরে জোরে প্রচার করতে থাকেন।” (বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বদরুদ্দিন উমর) তখন কংগ্রেসের অবস্থানও আলাদা কিছু ছিল না। অবিভক্ত ভারতে কংগ্রেস মূলতঃ সম্পদশালী ও মধ্যবিত্ত হিন্দুদের প্রতিনিধিস্থানীয় দল হিসাবেই গড়ে উঠেছিল। মুসলমানদের স্বার্থকে তাঁরা প্রথমাবধি উপেক্ষা করে আসলেও, কার্যতঃ, অসাম্প্রদায়িক দল হিসাবেই নিজেদের প্রচার করত। বস্তুতঃ, মুসলমানদের শুধু নয়, ওই সময়ের সমাজের নিম্ন শ্রেণীর স্বার্থকে উপেক্ষা করবার জন্যই তারা যে নিজেদের ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে পরিচিত করেছিল, সেটাও বিভিন্ন ঐতিহাসিকেরা সুস্পষ্টভাবে বলে গিয়েছেন। তৎকালীন কংগ্রেসের তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক চারিত্র্য বিশ্লেষণ করে বদরুদ্দিন উমর তাঁর ‘বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “... বিভিন্ন ধরনের সংখ্যালঘু স্বার্থ, বিশেষতঃ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক স্বার্থ অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে উপেক্ষা করাই কার্যক্ষেত্রে কংগ্রেসের সুস্পষ্ট নীতি ছিল। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির আড়ালে হিন্দু সম্পত্তিশালী এবং অগ্রসর শ্রেণীর স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার উপযোগী বাস্তব পরিস্থিতির কারণে কংগ্রেসের মধ্যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের প্রভাব প্রথম থেকেই ক্রমশঃ বৃদ্ধিলাভ করতে থাকে। ... সে কারণেই বালগঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রাই, গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন, আচার্য কৃপালনী প্রভৃতির মতো হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদী ও ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদী ব্যক্তিরা উচ্চতম পদে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন।” ১৯৪৭ সালের জুন মাসে শরৎচন্দ্র বসু গান্ধীজীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমার ভাবতে কষ্ট হয় যে, যে কংগ্রেস একদা এক মহান জাতীয় প্রতিষ্ঠান তা দ্রুত কেবলমাত্র উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চলেছে।” (আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি, আবুল হালিম) নিষ্ঠুর হলেও ওই সময়ের ইতিহাস এই তথ্যই দেয় যে, তৎকালীন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বে আসীন হয়ে জওহরলাল নেহরু বল্লভভাই প্যাটেলের সহযোগিতা ও সমর্থনে সাম্প্রদায়িক স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে জিন্নাহর চেয়েও চরমপন্থী হয়ে উঠেছিলেন। এমনকী, মাউন্টব্যাটন এবং তাঁর স্ত্রীর প্রীতিভাজন হিসেবে তিনি বাংলা ও পাঞ্জাব-ভাগের ইংরেজ সিদ্ধান্তে সম্মতও হয়েছিলেন। তবে কেবল সম্মত হওয়াই নয়, নানা ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘেঁটে ঐতিহাসিকেরা একথাও জানিয়েছেন যে, নেহরু সেক্ষেত্রে “মাউন্টব্যাটেনের এক অতি প্রীতিভাজন এজেন্ট হিসেবেই কাজ করেছিলেন।” (বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বদরুদ্দিন উমর)

তখন হিন্দু ও মুসলমান দুই জনগোষ্ঠীকেই তাঁদের রাজনৈতিক নেতারা বুঝিয়েছিলেন যে, বাংলা ভাগ হলে, ভারত ভাগ হলে, স্ব-স্ব জনগোষ্ঠীর ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুদিন সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে উভয় সম্প্রদায়ের নেতারাই তখন কেবলমাত্র ধর্মে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। দুই সম্প্রদায়ের মানুষই সেক্ষেত্রে ক্ষমতালোভী কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের নিছক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছিল। মুসলমানেরা যেমন বুঝতে চাননি যে, ধর্ম ছাড়া সংস্কৃতি ও জীবনচর্চায় হিন্দুদের সঙ্গে তাঁদের কোনও অমিল নেই; তাঁরা যেমন বুঝতে চাননি যে, সুদূর আরবের আরোপিত সংস্কৃতি তাঁদের নিজস্ব কৃষ্টি নয় - এই বাংলার জল-মাটি-আলো-বাতাসেই তাঁদের প্রাণ, গান, সংস্কৃতি নিহিত হয়েছে। আরবীয় কোর্মা-কাবাব-পোলাওয়ে নয়, হিন্দুদের মতো মাছ-ভাতেই তাঁদের ক্ষুন্নিবৃত্তি তৃপ্ত হয়, হিন্দুদের মতোই তাঁরাও ওলাবিবি বা সত্যনারায়ণের সিন্নিতে আগ্রহী। কেননা, সুদূর আরবে নয়, তাঁদের শিকড় এই বাংলাতেই প্রোথিত রয়েছে। তেমনি অন্যদিকে, হিন্দুরাও নিজেদের প্রতিবেশী মুসলমানকে অন্ধ উন্নাসিকতায় মেনে নিতে পারেন নি। ফলে সীমান্তে কাঁটাতার পড়েছে। গৃহহীন, ভূমিহীন মানুষ দাবার ঘুঁটির মতোই রাজনীতির খেলার শেষে ভূলুণ্ঠিত হয়েছেন। ভাঙা ঘর, পরিত্যক্ত ভূমি, আর প্রতিবেশীর শবের উপর নিরর্থক স্বাধীনতা-ধ্বজা - অশোকচক্র আর চাঁদতারা-উজ্জ্বল ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উড্ডীয়মান হয়েছে। ওই পরিস্থিতিতে যা অনিবার্য ছিল, শেষপর্যন্ত সেটাই ঘটেছিল। নোয়াখালির ভয়ঙ্কর দাঙ্গা, বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভক্তির বিনিময়ে, ভারত-ভাগের বিনিময়ে, সাম্প্রদায়িক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ইংরেজরা মুসলিম লিগ ও কংগ্রেসকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে, ক্ষমতা পাওয়ার লোভে, নেহরুর অসাম্প্রদায়িক মুখোশ যেমন খসে পড়েছিল, তেমনই স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেই তিনি প্রথমে নিজের সমাজতান্ত্রিকতার মুখোশটিও খুলে ফেলেছিলেন। পাঞ্জাব ও বাংলার লক্ষ-লক্ষ নিরপরাধ মানুষের জীবনে দেশভাগের করাল ছায়া নেমে এসেছিল। কংগ্রেস ক্রমশঃ বানিয়া-শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বে আত্মনিয়োগ করেছিল। তথাকথিত স্বাধীনতার সঙ্গে সুচতুর ইংরেজরা সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ বপন করে দিয়েছিলেন, ওই সময়ের ও পরবর্তীকালের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বারেবারে সেই বীজে জলসিঞ্চন করেছে। সেই বীজ থেকে চারা গাছ হয়ে বৃক্ষ হয়েছে, আর সেই বৃক্ষ ক্রমে মহীরূহ হয়ে দেশের নানা প্রান্তে নিজের ডালপালা ছড়িয়ে দিয়েছে। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করে রাজনৈতিক নেতারা বারবার ক্ষমতার অলিন্দে সদর্প পদচারণা করলেও, যাঁদেরকে তাঁরা ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তাঁরা কিন্তু সেই একই অবস্থানে থেকে গিয়েছেন।

(তথ্যসূত্র:

১- বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, বিনয় ঘোষ।

২- বাংলা ও বাঙালী, অতুল সুর।

৩- বাঙলার সামাজিক ইতিহাসের ভূমিকা, সতীন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায়।

৪- বাঙ্গালার ইতিহাস (সামাজিক বিবর্তন), ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত।

৫- বাংলা দেশের ইতিহাস, রমেশচন্দ্র মজুমদার।

৬- বাঙ্গালীর ইতিহাস, নীহাররঞ্জন রায়।

৭- বাঙ্গালার ইতিহাস, রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়।

৮- বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর: স্বাধীন সুলতানদের আমল, সুখময় মুখোপাধ্যায়।

৯- ভেদাভেদের কথাসাহিত্য, গৌতম ঘোষ দস্তিদার।

১০- সুলতান আমলে বাংলা সাহিত্য, ওয়াকিল আহমদ।

১১- আদিমধ্য ও মধ্যযুগের ভারত: ৬৫০-১৫৫৬, সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়।

১২- মধ্যযুগের বাংলা ও বাঙ্গালী, সুকুমার সেন।

১৩- দি স্বদেশি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল: ১৯০৩-১৯০৮, সুমিত সরকার।

১৪- বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বদরুদ্দিন উমর।

১৫- Partition of Bengal - 1947, Journal of Indian History, A. K. Majumdar.

১৬- মহাত্মা গান্ধী: দ্য লাস্ট ফেজ, ২য় খণ্ড, পেয়ারেলাল।

১৭- আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি, আবুল হালিম।

১৮- আধুনিক ভারত (১৮৮৫-১৯৪৭), সুমিত সরকার।)

মন্তব্য করুন

ব্লগ