সারা পৃথিবীজুড়ে কলা একটি জনপ্রিয় খাদ্য এর দাম এবং পুষ্টিগুণের জন্য। কলা সাধারণত সারা বছরই হয়ে থাকে। তাই, সব মৌসুমেই ফল-ফ্রুটসের দোকানে সব ফলের মাঝে কলাকে দেখতে পাওয়া যার সর্বাগ্রে। পাকা কলা কিংবা কাঁচা, দুই ধরণের কলাই উপকারি শরীর এবং স্বাস্থ্যের জন্য। এই আর্টিকেল পড়ে কলার উপকারিতা ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারব।
কলা (kola)
কলার বৈজ্ঞানিক নাম হলো ‘MUSA’. এছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির কলার বিভিন্ন আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। আমাদের দেশে-
- সাগর কলা
- চাম্পা কলা
- সবড়ি কলা
- কাঠালী কলা ও
- বাংলা কলা বেশ জনপ্রিয়।
কলার পুষ্টিগুণ
কলা যেমন পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে, তেমনি কলার রয়েছে বেশ কিছু উপকারী গুণ। সাধারণত প্রতি ১০০ গ্রাম পরিমাণ কলায় যে খাদ্যগুণ আছে তার বিশ্লেষণ নিম্নরূপঃ
| উপাদানের নাম | পরিমাণ |
| পানি (জল) | ৭০.১% |
| আমিষ | ১.২% |
| ফ্যাট (চর্বি) | ০.৩% |
| খনিজ লবণ | ০.৮% |
| আঁশ | ০.৪% |
| শর্করা | ৭.২% |
কলার উপকারিতাঃ
১। কিডনী সুরক্ষায় কলা
কলার রয়েছে বহুবিধ গুণাবলী। এতে যে পরিমাণ পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে, যা কিডনীকে সঠিকভাবে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে দারুণ ভাবে সহযোগীতা করে। এর পটাশিয়াম লেভেল রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ সহ কিডনির কার্যক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে বেশ উপকারী।
এছাড়াও দৈনিক কলা খেলে কিডনিতে পাথর হওয়া, মুত্রনালীর ইনফেকশন হওয়া, মস্তিষ্কের স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা, আলসারের ঝুঁকি ইত্যাদিও কমে যায়।
এছাড়াও, একটা জরিপে দেখা গিয়েছে, প্রতিদিন কলা খেলে কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ ভাগ কমে যায়।
২। ওজন হ্রাস এবং বৃদ্ধি করতে কলার ভূমিকা
ওজন কমানো এবং বৃদ্ধি করাতেও রয়েছে কলার দারূণ উপকারী ভূমিকা। কলায় যে রেজিস্ট্যান্স ও পেকটিন ফাইবার রয়েছে তার জন্য কলা হজম হতে দেরী হয়।
ফলে, একটি কলা খেলে তা অনেকক্ষণ পর্যন্ত পেট ভরা রাখে। এজন্য, যারা ওজন কমাতে চায়, তাদের দৈনিক অন্তত একটি করে কলা খাওয়া উচিত।
ওজন বৃদ্ধি করার জন্য একটু কম পাকা কলা খাওয়া উত্তম। যদিও কম পাকা কলাতে রেসিস্ট্যান্স বেশি থাকে, যার ফলে ক্ষুধা মন্দ হয়ে ওজন কমারও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রতিদিন সকালের নাস্তায় কলার পাশাপাশি নির্দিষ্ঠ পরিমাণ গরুর দুধ ও ডিম খেলে তা ওজন বাড়াতে সাহায্য করে।
৩। ত্বকের যত্নে কলাঃ
ত্বকের যত্ন নেয়ার ক্ষেত্রেও কলার রয়েছে কার্যকরী ভূমিকা। কলায় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ফটোকেমিক্যাল থাকে, তা ত্বক, শরীর এবং চুলকে পুষ্টি প্রদান করে। কলা ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে, ব্রণ দূর করতে, মুখের কালো দাগ ও বলিরেখা দূর করতে দারুণভাবে সাহায্য করে। বিভিন্ন ঘরায়া উপায় অবলম্বন করে কলাকে ব্যবহার করে ত্বকের যত্ন নেয়ার কাজে কলাকে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও কলায় একধরণের ম্যাঙ্গানিজ থাকে, যা আমাদের শরীরে ম্যাঙ্গানিজের যে চাহিদা রয়েছে তা পূরণ করে। ম্যাঙ্গানিজ ত্বকের কোলাজেন গঠনে ভূমিকা রাখে এবং ত্বক ও অন্যান্য কোষকে ফ্রি র্যাডিকেলজনিত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।
৪। কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করতে কলার ভূমিকাঃ
যে সকল ব্যাক্তির কোষ্ঠকাঠিন্য জনিত সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য কাঁচা কলা ঔষধের মত কাজ করে। এখনো আমাদের দেশে, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য জনিত সমস্যার প্রধান উপায় হিসেবে কাঁচা কলা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কলাতে অন্যান্য পুষ্টিগুণের পাশাপাশি রয়েছে ফাইবার। যা কোষ্ঠকাঠিন্যতা দূর করতে বেশ কার্যকারী। এছাড়াও কলা হজম শক্তি বৃদ্ধির জন্যও বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে। একটি মাঝারি আকারের কলাতে রয়েছে তিন গ্রাম ফাইবার। কলায় সচরাচর দুই রকমের ফাইবার পাওয়া যায়। পেকটিন ও রেজিস্ট্যান্স স্টার্চ। রেজিস্ট্যান্স স্টার্চের জন্য কলা হজমের ক্ষেত্রে কিছুটা অসুবিধা হয়ে থাকে। তবে, পেকটিন কোলন ক্যানসার প্রতিরোধের ক্ষমতা রাখে। নিয়মিত কলা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য, পাকস্থলীর আলসার ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা অনেকক্ষেত্রে দূরীভূত হয়।
৫। শক্তিবর্ধক হিসেবে কলার ভূমিকাঃ
শক্তিবর্ধক হিসেবে কলা একটি দারুণ উপাদেয় খাদ্য। একটি কলাতে অনেক পরিমাণ এনার্জি পাওয়া যায়, তার জন্য খেলোয়াড়, এথলেটদের খেলা চলাকালীন সময়ে কলা খেতে দেখার ঘটনা খেলার মাঠে খুব স্বাভাবিক। অধিক পরিশ্রম শেষে কলা খেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই হারানো দৈহিক শক্তি আবার ফিরে আসে। কারণ কলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ, যা সহজেই রক্তে মিশে যায়। এছাড়াও কলাতে রয়েছে অ্যামিনো এসিড, শর্করা, এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থ। কলার এই উপাদানগুলো দেহের প্রয়োজনীয় শক্তি বৃদ্ধির জন্য সহায়ক।এছাড়াও, গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন যারা অন্তত একটি করে কলা খায়, তাদের স্মৃতিশক্তি তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে প্রখর হয়। তাই একজন স্বুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দৈনিক অন্তত একটি করে কলা খাওয়া উচিত।
৬। তারুণ্য ধরে রাখতে কলার ভূমিকাঃ
- তারুণ্য ধরে রাখতে কোলাজনের কোন বিকল্প নেই। কলার ম্যাগনেসিয়াম ত্বকের কোলাজেন গঠনে এবং ত্বককে ফ্রি রেডিকেলজনিত ক্ষতির হাত থেকে সুরক্ষিত করে। কলার মধ্য যে সকল ভিটামিন ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ রয়েছে তা আমাদের কোষগুলোকে দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। পৃথিবীর দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দেশ সমূহতে মানুষরা তারুণ্যোজ্জ্বল ত্বকের জন্য কোলাজেন ডায়েট করে থাকে। তারা তাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় এমন সকল খাবার রাখে, যা কোলাজেন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এজন্যই অন্যান্য দেশের তুলনায় জাপান, চীন, কোরিয়ার মানুষদেরকে তাদের বয়সের চেয়ে বেশি তরুণ দেখায়।
৭। গর্ভবতী নারীদের জন্যঃ
কলায় যে ভিটামিন বি-৬ বা পাইরিডক্সিন থাকে তা গর্ভবতী নারীদের বমি বমিভাব থেকে মুক্তি দেয়। এছাড়াও গর্ভাবস্থায় কলা খেলে-
- শিশুর মধ্যে জন্মগত ক্রটি হ্রাস পায়
- অ্যানিমিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে
- শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে সাহায্য করে
- হাড়ের বিকাশে সহায়তা করে
- গর্ভবতী মায়ের ক্ষুধা যোগায়।
- এছাড়াও গর্ভকালীন সময়ে নারীদের শরীর দূর্বল থাকে এবং বিভিন্ন ধরণের সমস্যাও দেখা যায় শরীরে। সেজন্য দূর্বলতা কাটানোর জন্য কলা খাওয়া যেতে পাড়ে অনায়াসে। তবে গর্ভাবস্থায় কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে কলা খাওয়াটা উত্তম।
৮। বিষন্নতা ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে কলার ভূমিকাঃ
- কলায় ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামের পাশাপাশি থাকে ট্রিপটোফ্যান নামক এক ধরণের অ্যামিনো এসিড। কলা খাওয়ার পর, এই এসিড রক্তে মিশে গিয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সেরোটোনিন নামক এক ধরণের উপাদান তৈরি করে, যা আমাদের আনন্দদায়ক অনুভূতি সৃষ্টি করার জন্য কাজ করে। তাই মনকে ফুরফুরে করার জন্য, মানসিক চাপ, হতাশা এবং বিষন্নতা দূর কারার জন্য কলা খাওয়া যেতে পাড়ে।
৯। আলসার নিরাময়ে কলার ভূমিকাঃ
- পেটে আলসার হয়ে থাকলে ডাক্তাররা কলা খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকে। কারণ কলায় যে মিউসিলেজ থাকে তা পাকস্থলীর ভেতরের প্রাচীরে ক্ষতিগ্রস্থ মিউকাস পর্দাকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। এছাড়াও, খাদ্য হজম করতে আমাদের পাকস্থলিতে যে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোক্লোরিক এসিড নির্গত হয়, যা থেকে পরবর্তীতে আলসার সহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে, সেই হাইড্রোক্লোরিক এসিডকে দূরীভূত করার জন্য কলার ক্ষার এর সাথে বিক্রিয়া করে পাকস্থলীর অম্লতা ভাব দূর করে। নিয়মিত কলা সেবনে পাকস্থলী সম্পর্কিত এই সকল সমস্যা থেকে নিরাময় লাভ করা যায়।
১০। রক্ত স্বল্পতা দূর করতে কলার ভূমিকাঃ
- আমাদের শরীরের রক্তস্বল্পতা তখনি তৈরি হয়, যখন আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায়। কলাতে যেহেতু প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে, তাই এটি সহজেই রক্তে মিশে গিয়ে শরীরের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়িয়ে তুলে। এছাড়াও কলার ভিটামিন বি-৬ রক্তের লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি করে।
কলার জুসঃ
- কলা যেমন এমনিতে খাওয়া যায় তেমনি কাঁচা কলা রান্না করেও খাওয়া যায়। এছাড়াও কলা দিয়ে তৈরি করা যায় বিভিন্ন রকমের জুস। যা গরমের দিনে আপনাকে এনে দিতে পারে প্রশান্তি।
- মোঃ আজাহার আলী সরদার
- সহকারী শিক্ষক
- রাজারামপুর সরফ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়
- রাজারামপুর, ফুরবাড়ী, দিনাজপুর।
৪
৪ মন্তব্য