Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ মার্চ, ২০২৩ ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ

সাধারণ অর্থে বলা যায় মানসিক দিক থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদেরকে যারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন তাদেরকে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পেশাজীবী বা পেশাদার ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

|| মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী কারা? ||

সাধারণ অর্থে বলা যায় মানসিক দিক থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদেরকে যারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন তাদেরকে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পেশাজীবী বা পেশাদার ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১৮ বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত পেশাজীবী বলতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাইকিয়াট্রিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, এডুকেশনাল সাইকোলজিস্ট, চাইল্ড সাইকোলজিস্ট, স্কুল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলর সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিক সোস্যালওয়ার্কার, সাইকোথেরাপিস্ট এবং সাইকিয়াট্রিকনার্স (মনোরোগ বিষয়ক সেবক/সেবিকা)-দের নাম উল্লেখযোগ্য। ইংল্যান্ড ও আমেরিকাসহ বিশ্বের সকল দেশে কম বেশি উপরোক্ত পেশাজীবীরা মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকেন। মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা শুধু মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসা প্রদান করেন না। যারা মানসিকভাবে সুস্থ তাদেরকেও তাঁরা পরবর্তী জীবনে সফলতা আনয়নের ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। নিম্নে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্তাবলী তুলে ধরা হলো


১) মনোবিজ্ঞানী (Psychologist): মনোবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি ধারী ব্যক্তিরা মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার ফলে তাঁরা মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করতে পারেন। তবে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি যেমন-এম.ফিল, পিএইচডি, সাইডি (PsyD), থাকলে তাদেরকে প্রকৃত পেশাজীবী হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের মানসিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানের অভিজ্ঞ হতে হয়।


২) চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী (Clinical Psychologist): চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরা মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁরা চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানে ১ থেকে ১.৫ বছরের মাস্টার্স সম্পন্ন করে পেশাদার চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন। আজকাল বাংলাদেশেও মনোবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্সসহ ১ থেকে ১.৫ বছরের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে তাঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করছেন। তবে এক্ষেত্রে উন্নত দেশে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে PhD বা সমমানের ডিগ্রি দরকার হয়। মূলত চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী হতে হলে মানসিক রোগ নির্ণয় ও সাইকোথেরাপি প্রদানে অভিজ্ঞ হতে হয়। DSM-5 মানদণ্ড ও অন্যান্য মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরা রোগ নির্ণয় করে থাকেন। ক্লায়েন্ট-এর জন্য কোন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি দেওয়া হবে তা নির্ভর করে চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা ও ডিগ্রির উপর। চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীদের মানসিক হাসপাতালে ইন্টার্ন হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ইন্টার্নীশীপ সম্পন্ন করার পর একজন চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী হিসেবে পরিগণিত হয়। চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরা ডক্টর অব সাইকোলজি (Doctor of Psychology) বা PsyD ডিগ্রি গ্রহণ করেন। PsyD ডিগ্রির ক্ষেত্রে মানসিক রোগ নির্ণয়ে মূল্যায়ন ও চিকিৎসার কৌশল সম্পর্কে ব্যাপকভাবে জ্ঞান প্রদান করা হয়ে থাকে।


৩) মনোরোগবিদগণ (Psychiatrists): মনোরোগবিদরা মানসিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানে অত্যন্ত দক্ষ। সাইকিয়াট্রিস্ট হতে হলে তাকে চিকিৎসাশাস্ত্রে MD ডিগ্রি নিতে হয়। তাঁরা মানসিক রোগের শারীরবৃত্তীয় কারণগুলো খুঁজে বের করেন। তাঁরা মানসিক রোগীদের চিকিৎসায় ফার্মাকোলজিক্যাল (Pharmacological Treatment) চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। মনোবিজ্ঞানী বা চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরা মানসিক রোগ নিরাময়ে ঔষধ প্রয়োগ করতে পারেন না। কিন্তু সাইকিয়াট্রিস্টরা ঔষধ প্রয়োগ করতে পারেন। সাইকিয়াট্রিস্টরা মানসিক হাসপাতালে অভিজ্ঞ মনোচিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ নিয়ে মনোচিকিৎসার কিছু কৌশল ব্যবহার করে থাকেন। মনোরোগবিদগণ নিউরো-বিকাশমূলক মানসিক বৈকল্যের চিকিৎসা বেশি দিয়ে থাকেন।


৪) সাইকিয়াট্রিক নার্স (Psychiatric Nurse): মনোরোগ বিষয়ক নিবন্ধিত সেবক-সেবিকা যারা মানসিক রোগীদের চিকিৎসায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, যাদের নার্সিং-এ মাস্টার্স ও পিএইচডি থাকে, তাঁরা ডাক্তারের সুপারভিশনে মানসিক রোগীদের ঔষধ প্রয়োগ করে থাকেন।


৫) কাউন্সেলর (Counselor): মনোবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স ও কাউন্সেলিং বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কাউন্সেলিং করে থাকেন। এরা সর্বদা সুপারভিশন নিয়ে থাকেন। কাউন্সেলরগণ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দৈনন্দিন জীবনের মানসিক সমস্যার বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। কাউন্সেলর হিসেবে পারিবারিক, বৈবাহিক, মাদকাসক্ত, ধর্মীয় ও শিক্ষা বিষয়ক কাউন্সেলর এর নাম উল্লেখযোগ্য। 


৬। মনোঃসমীক্ষণবিদ ( Psychoanalyst ): মনোঃসমীক্ষণবাদে যাঁরা বিশ্বাসী তাঁরা মানুষের অবদমিত চাহিদাগুলো অবচেতন মন থেকে বের করে এনে সেগুলোর সন্তোষজনক সমাধান নিয়ে থাকেন। মনোবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী ও সাইকিয়াট্রিস্টরাও মনঃসমীক্ষণবাদে প্রশিক্ষণ নিয়ে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা করে থাকেন। তবে বর্তমানে আমেরিকার মনোঃসমীক্ষণ ইনস্টিটিউটে শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিগ্রি নিতে হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মনোবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে মনোঃসমীক্ষণে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে মনোঃসমীক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।


৭। স্কুল মনোবিজ্ঞানী (School Psychologist) : বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে স্কুল সাইকোলজিস্টরা পেশাদার মনোবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করছেন। স্কুল মনোবিজ্ঞানীরা মনোবিজ্ঞানে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি ও ছয় মাসের ইন্টার্ন হিসেবে স্কুলে সরাসরি কাজ করেন। তাঁরা স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ও স্কুল পরিবেশ থেকে সৃষ্ট সমস্যার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন।


৮। শিশু মনোবিজ্ঞানী (Child Psychologist) : শিশু মনোবিজ্ঞানীরা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাঁরা মনোবিজ্ঞানে অনার্সসহ মাস্টার্স পর্যায়ে ৬ মাসের ইন্টার্নশীপ সম্পন্ন করেন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে শিশু মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে শিশুদের মানসিক রোগের কারণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ শিশু মনোবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদান করে থাকে। তাঁরা বিভিন্ন স্কুলে বিশেষ করে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা ও অটিজম বিকাশ কেন্দ্রে কাজ করে তাদের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে জ্ঞান প্রদান করে থাকেন।


৯। শিল্প-সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানী ( Industrial-Organizational Psychologist): মনোবিজ্ঞানে অনার্সসহ শিল্প ও সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানে মাস্টার্স ও ৬ মাসের ইন্টার্নশীপ সম্পন্নকারী মনোবিজ্ঞানী শিল্প ও সংগঠনে পেশাদার মনোবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন। শিল্প ও সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানীরা কর্মচারী নির্বাচনে মনোবৈজ্ঞানিক অভীক্ষা প্রয়োগ করে তাদেরকে সঠিক কাজে যোগদান করান। কাজে যোগদান করার পর কাজ থেকে সৃষ্ট বা কাজের পরিবেশ থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপ, মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি, একঘেয়েমি, উপযোজনমূলক সমস্যা ও নিউরোটিক সমস্যাগুলো কিভাবে দূর করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আজকাল কিছু সংগঠনে Industrial Counselor-রা কাজ করছেন যারা Workplace কাউন্সেলিং-এ প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা অর্জন করেছেন। এজন্য সম্প্রতি শিল্প ও সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানীদের পেশাজীবী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।


১০। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তি সমাজকর্মী (Trained Social Worker): সমাজকর্মে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী এবং সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সমাজকর্মীরা মানসিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন-এজন্য তাদেরকে পেশাজীবী বলা হয় ।


১১। স্পিচ থেরাপিস্ট (Speech Therapist): স্পিচ থেরাপিস্টকে স্পিচ ল্যাংগুয়েজ প্যাথলজি-তে মাস্টার্স ডিগ্রির প্রয়োজন হয়। এছাড়া থেরাপিস্ট হিসেবে চিকিৎসা প্রদানে পেশাগত লাইসেন্স দরকার হয়। তাঁরা শিশুর ভাষা বিকাশের উপর কাজ করেন বিশেষ করে তাঁরা নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের যোগাযোগমূলক দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।


এছাড়া বর্তমান বিশ্বে যে সকল প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ সাধারণের মানসিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান করে থাকেন তাদেরকে পেশাজীবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের মনোবিজ্ঞানে PhD বা PsyD এবং মেডিক্যাল ডিগ্রি না থাকলেও সম্প্রতি তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে পেশাজীবী বা প্রাকটিশনার হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। যদিও এ বিষয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।


------------------------------------------------------ 

?

অনুলিখনঃ জান্নাতুন নূর হায়দার চৌধুরী, হেড, পরিকল্পনা বিভাগ, বন্ধু। 

সম্পাদনাঃ মাহাদী-উল-মোর্শেদ, হেড, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিভিশন, বন্ধু। 


সহায়ক গ্রন্থঃ নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস (২০২১), ৩২-৩৫, প্রত্যয় প্রকাশনী, নীলক্ষেত, ঢাকা।

মন্তব্য করুন

ব্লগ