সিনিয়র শিক্ষক
২২ মার্চ, ২০২৩ ১০:৩৮ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
যদি কেউ নিয়মিত ব্যায়াম করে, প্রয়োজনীয় ঘুমসহ পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয় ও বদ-অভ্যাস ত্যাগ করে, তবে তার হৃদরোগের ঝুঁকি ৮০ শতাংশ, ডায়াবেটিস ৯০ শতাংশ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ কমে যায়। সুস্থ জীবনের জন্য ব্যায়ামের বিকল্প নেই। অলস জীবন মানেই অসংখ্য রোগের আশঙ্কা। প্রতিদিন দুই মাইল বা তিন কিলোমিটার হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রথমদিকে অল্প দূরত্ব টার্গেট করে হাঁটা শুরু করা দরকার। আস্তে আস্তে দূরত্ব ও হাঁটার গতি এমন পর্যায়ে বাড়ানো উচিত, যাতে হৃৎস্পন্দন বাড়ে। হাঁটার জন্য নরম ও হালকা-পাতলা জুতা ব্যবহার করলে হাঁটায় গতি ও আরাম পাওয়া যায়। বাইরে খোলামেলা জায়গায় দূষণমুক্ত বাতাস ও সূর্যের আলোয় হাঁটার উপকারিতা ও আনন্দই আলাদা। এতে সারা দিনের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, অবসাদ ও দুশ্চিন্তা দূর হবে। ব্যায়াম করলে রাতের ঘুম ভালো হয়। হাঁটা ছাড়াও সাইকেল চালানো, সাঁতার কাঁটা অথবা জিমনেসিয়ামে ব্যায়াম করা যেতে পারে। প্রতিদিন ৩০ মিনিট দ্রুতবেগে হাঁটলে আপনার শরীরের ওজন ঠিক থাকবে, রক্তচাপ, সুগার লেভেল কমে আসবে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ার কারণে অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সতেজ থাকবে, মেটাবলিক প্রক্রিয়া ভালো কাজ করবে। প্রতিদিন হাঁটতে না পারলে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন হাঁটা চাই। আলস্য, কর্মব্যস্ততা বা অন্য কোনো অজুহাতে আপনি যদি হাঁটার অভ্যাস ত্যাগ করেন বা অনিয়মিত হয়ে পড়েন, তবে আপনি আপনার লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারবেন না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৩০ মিনিট হাঁটার জন্য- এটা খুব বেশি সময় নয়। তবে রোজার মাসে হাঁটা কষ্টকর মনে হলে না হাঁটাই ভালো। জোর করে হাঁটতে গেলে শরীরের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যেতে পারে।
রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং সঠিক ওষুধ সঠিক মাত্রায় সঠিক সময়ে গ্রহণ করুন। সব রোগের জন্য ওষুধের প্রয়োজন হয় না। আমরা বিনা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করে শরীরের ক্ষতি সাধন করি। তবে তার অর্থ এই নয় যে প্রয়োজনে আমরা ওষুধ সেবন করব না। বহু ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে এমন সব রোগের উৎপত্তি হয়, যা নিয়ে হেলাফেলা করলে জীবন বিপন্ন হতে পারে। আপনি যদি ইতিমধ্যে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন, তবে দুশ্চিন্তা না করে জীবনকে সহজভাবে গ্রহণ করুন ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হোন। জটিল রোগে আক্রান্ত বহু রোগী নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে খুব সুস্থ থাকেন। আপনি যদি শরীর ও মনের প্রকৃত চাহিদা ও সমস্যা বোঝেন, তাহলে শরীর ও মন আপনাকে সুস্থ-সুন্দর জীবনের প্রতিশ্রুতি দেবে।
১৮৭৯ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত মানুষ গড়ে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা ঘুমাত। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের কারণে মানুষের কাজ, কর্মচাঞ্চল্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘোরাফেরা, আনন্দ-উল্লাস তথা মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে গেল। ফলে ঘুম কমে গেল। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে মানবদেহে শক্তি উৎপাদন, গ্লুকোজ মেটাবলিজম কমে যায় ও বয়োবৃদ্ধি বা এইজিং প্রক্রিয়া বেড়ে যায়। শরীরে শক্তি সংরক্ষণ, কোষপুঞ্জ তৈরি ও মেরামত, শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন, মস্তিষ্ককে কোষের ধ্বংসাবশেষ থেকে পরিষ্কার রাখার জন্য পর্যাপ্ত ও নিরুপদ্রব ঘুমের একান্ত প্রয়োজন। শরীর তার ক্ষয়পূরণ ও মেরামত করে ঘুমের ডেল্টা পর্যায়ে, যা সাধারণত সকালের গভীর ঘুমের সময় সংঘটিত হয়ে থাকে। ভরা পেটে ঘুমাতে গেলে ভালো ঘুম হয় না। আর ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে রাতের খাবার খেলে সর্বোচ্চ পরিমাণে গ্রোথ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রাতে বেশি পানি পান করলে বারবার টয়লেটে যেতে হয় বলে ঘুমের বিঘ্ন ঘটে। এটাও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।
পানি মানে জীবন। আমাদের শরীরের ৭২ শতাংশ ওজন আসে পানি থেকে। এমনকি হাড়ের এক-চতুর্থাংশ, পেশির তিন-চতুর্থাংশ ও মস্তিষ্কের ৮৫ শতাংশ হলো পানি। আমাদের রক্ত ও ফুসফুসের ৮০ শতাংশ পানি দিয়ে গঠিত। জীবনের জন্য অক্সিজেনের পরই পানির স্থান। অনেকেই মনে করেন, কফি, চা ও সোডা থেকে তাঁরা পর্যাপ্ত পানি আহরণ করেন। চা ও কফিতে রয়েছে ক্যাফেইন, যা সাধারণত ডাইইউরেটিক হিসেবে কাজ করে। ডাইইউরেটিকের কাজ হলো শরীর থেকে পানি বের করে দেওয়া। শরীরের ওজনের সঙ্গে পানি পানের পরিমাণের একটি সুসম্পর্ক রয়েছে। কারো শরীরের ওজন যদি ১২০ পাউন্ড হয়, তার জন্য প্রতিদিন ৬০ আউন্স পানি দরকার হবে, যা সাধারণত আট কাপ পানির সমান। পরীক্ষায় দেখা গেছে, পানিস্বল্পতার কারণে শরীরের শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা বহুলাংশে কমে যায়। বেশি পানি পান করলে শরীর থেকে অতি সহজে বর্জ্য পরিষ্কার হয়ে যায় এবং কোষে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি ঢুকতে পারে। প্রতিদিন আট থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করলে ৮০ শতাংশ ভুক্তভোগীর পিঠ ও গিঁটের ব্যথা সেরে যায়। শরীরে ২ শতাংশ পানিস্বল্পতা দেখা দিলে সাময়িকভাবে স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে। ফলে সাধারণ অঙ্কসহ কম্পিউটার মনিটরে মনঃসংযোগে বিঘ্ন ঘটতে পারে। প্রতিদিন পাঁচ গ্লাস পানি পান করলে মলাশয়ের ক্যান্সার-ঝুঁকি ৪৫ শতাংশ, স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ৭৯ শতাংশ ও ব্লাডার ক্যান্সারের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ কমে যায়। সুস্থ থাকার জন্য শরীরে পর্যাপ্ত পানির উপস্থিতি অপরিহার্য। তাই আমাদের সবার প্রচুর পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে প্রতিবছর লাখ লাখ লোক পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় দূষিত পানি ব্যবহার ও পান করার কারণে।
রোদ বা সূর্যালোক উপভোগ করুন। কারণ সূর্যালোক সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যা ছাড়া শরীরে ভিটামিন-ডি তৈরি হয় না। আর ভিটামিন-ডির ঘাটতি হলে শরীরের ক্যালসিয়াম বিশোষণে বিঘ্ন ঘটে। ক্যালসিয়াম শরীরের জন্য খুব প্রয়োজনীয় একটি উপকরণ। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট সূর্যস্নান করা দরকার। সূর্যালোক উপভোগ করার ভালো সময় সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত।
আপনার দাম্পত্যজীবন সুন্দর ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলুন। দাম্পত্যজীবনের অশান্তি মানুষের শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি ও খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে অহরহ দাম্পত্য কলহ মানুষের সুখ-শান্তি কেড়ে নেয়। যে সুখী নয়, সে সুস্থও নয়।
সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস রাখুন। আমাদের শরীর শুধু রক্ত-মাংসে গড়া কোনো বস্তু নয়। আমাদের শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মন বা আত্মা। আবেগ-অনুভূতি আমাদের শরীরের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলে। বস্তুজগতে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মাৎসর্য, অসূয়া বা ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা আমাদের দুঃখ, কষ্ট, অশান্তি, অসুস্থতা ও ধ্বংসের মূল কারণ। সৃষ্টিকর্তা সবাইকে সুস্থ জীবন দান করুন- এই কামনা করি। (সংগৃহিত)
৫
৫ মন্তব্য