Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ মার্চ, ২০২৩ ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

যদি চিনি খেতেই হয়, লাল চিনি খান। সেটা বাংলাদেশ সরকারেরই হোক, কিংবা কৃষকের হাতে হোক..


আমি, আপনি ধবধবে সাদা চিনি খেয়ে ডায়াবেটিস,হার্ট এট্যাক ও লিভার বিকল করছি,সে খবর কি রাখছেন?

*****

আখ থেকে তৈরি হয় হাতের চিনি, যা তৈরি করে প্রান্তিক কৃষক। পরিশোধন করা হয়না বলে এই চিনি যথেষ্ট পরিমাণে খনিজ উপাদানে ভরপুর।  আবার বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন আখ থেকে তৈরি করে মোটা দানার আখের চিনি। এই চিনিও যথেষ্ট পুষ্টিগুণ সম্পন্ন।

কিন্তু সাদা চিনি? যেটা সচরাচর বাজার থেকে কেনা হয়, সেটা? সাবধান!!!! ১০০ হাত দুরে থাকুন এই চিনি থেকে।  পরিবার, বিশেষ করে শিশুদের কথা বিবেচনা করে হলেও সাদা চিনি বর্জন জরুরি।


কয়েক ধরনের চিনি চেনার উপায়..


১. এই চিনি লাল নয়, বাদামী রংয়ের। স্বাদ খাঁটি গুড়ের মতো। আখের রস জ্বাল দিয়ে শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয়।

২.  বাজারে কয়েক কোয়ালিটির লাল চিনি রয়েছে- তবে এক নম্বর লাল চিনি সিজন ছাড়া পাওয়া খুব কঠিন, যা শুধুমাত্র গুটি কয়েক কৃষকের ঘরেই থাকে। সাংসারিক বা গৃহস্থালি প্রয়োজন মেটাতে অল্প অল্প বিক্রি করে থাকে, এভাবে সাড়া বছর চলে।

৩. বেপারীগন চিনি তৈরির সিজনে কৃষকের কাছ ভালো ও নিম্ন মানের কয়েক কোয়ালিটির চিনি কিনে থাকে। যা সাড়া বছর উপযুক্ত কেমিক্যাল দিয়ে সংরক্ষণ করে বিক্রি করে। 

৪. অফ সিজনেও বেপারিরা কৃষকের কাছ থেকে ভালো মানের চিনি কিনে পুরাতন চিনির সাথে মিশিয়ে এক নাম্বার চিনি হিসেবে বিক্রি করে থাকে। এতে তাদের মোটামুটি ভালো লাভ হয়। 

৫. বাজারে একটু ঝরঝরে একটু সাদা হালকা ব্রাউন যে চিনি পাওয়া যায় তা মূলত হাইড্রোজ দেওয়া। অতএব ঝরঝরে চেনে দেখে ভালো মনে করার কোন কারন নাই 

বাজারে অপরিশোধিত হাতে তৈরি লাল চিনি, বাংলাদেশ সরকারের মোটা দানার আখের চিনি, পরিশোধিত মিহি দানার সাদা চিনি দেখা যায়।  আজ আপনাদের তিন ধরনের চিনি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবো। । 

প্রথমে বলি ফুলবাড়িয়ার হাতে তৈরি অপরিশোধিত  বিখ্যাত লাল চিনি নিয়ে -

৬. সিজনের সময় সংগৃহীত এই চিনি নিয়ে অত্র এলাকার অনেক ব্যবসায়ী  কিংবা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য জেলার  ব্যাবসায়ীরা এটাকে আরো প্রক্রিয়াজাত করে।

এক্ষেত্রে লাল চিনির সাথে বাজারে সাদা চিনি মেশিনে গুড়ো করে মিশিয়ে বিক্রি করা করে।  

এতে আখের চিনির ফ্লেভার থাকে, মিষ্টি একটু বেশি থাকে, দাম একটু কম থাকে। এইটা দেশের অন্যান্য স্থানে 80 /90 /100 টাকায় পাওয়া যায়। 

৭.  অর্থাৎ একমাত্র কৃষক ছাড়া এবং সিজন ছাড়া চিনি ক্রয় করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ভালো চিনি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।

৮. সবচেয়ে ভালো হয় সিজনের সময় বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে চিনি সংগ্রহ করে রাখা। কিন্তু এভাবে বেশি পরিমাণে চিনি সংগ্রহ করে রাখা সম্ভব হয়না 

৯. অন্য সময়গুলোতে (অফ সিজনে)

যদি ভালো চিনি পেতে চান অবশ্যই বিশ্বস্ত কোন ব্যক্তির কাছ থেকে অথবা কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি চিনি কেনাই ভালো। 

১০. তবে সব কৃষকের কাছে মান সম্পন্ন চিনি থাকে না, কিন্তু তারা নিজেদেরটা ভালো দাবী করে। না চিনলে নিম্নমান সম্পন্ন চিনিই খুশি মনে কিনে বাড়ি ফিরতে হবে। অতএব বুঝে শুনে।

১১. আদ্র পরিবেশে চিনি খোলা অবস্থায় রেখে দিলে গলে যায়, পানি ছেড়ে দেয়। তাই রোদে শুকানোর পর এয়ারটাইট অবস্থায় রেখে দিলে চিনি ঝরঝরে থাকে। বাজারের অনেক লাল চিনি এমনিতেই ঝরঝরে থাকে, এর পিছনের কারণটা কিন্তু ভালো নয়।


(যাইহোক, আমরা সবসময় নির্দিষ্ট কৃষকের কাছ থেকে চিনি সংগ্রহ করি। আমরা কখনো কোন আড়তদার বা ব্যাপারির কাছ থেকে চিনি সংগ্রহ করি না।)

লাল চিনির পুষ্টি গুণ বাজারের সাদা চিনির চেয়ে অনেক বেশি।

তাই, যদি খেতেই হয়, সেক্ষেত্রে ঝকঝকে, ঝরঝরে মিহি দানার চিনির বদলে মোটা দানার বাদামী চিনি গ্রহণ করাই ভাল। এটিই স্বাস্থ্যকর।


বাজার থেকে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত চিনি না কিনে ভাল চিনি কেনার অভ্যাস সহজেই গড়ে তোলা যায়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে ঝকঝকে সাদা চিনি। ঝরঝরে মিহি দানার এই চিনি আকর্ষণীয় প্যাকেটে বাজারজাত করার কারণে ক্রেতাদের বেশি টানে। অন্যদিকে দেশে তৈরি আখের চিনি স্বাস্থ্যকর হলেও এটি দেখতে লালচে, এর আর্দ্রতা বেশি। অনেক সময় ক্রেতারা এই চিনি কিনতে আগ্রহ দেখান না। কিন্তু দেশীয় চিনিকলে উৎপাদিত চিনি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং শিশু খাদ্য হিসেবে উপযোগী।

 


লাল চিনি হলো সরাসরি আখ থেকে তৈরি অপরিশোধিত চিনি। লাল চিনিতে থাকে আখের সব উপাদান। যেমনঃশর্করা,ক্যালসিয়াম,পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম,লৌহ,ম্যাঙ্গানিজ,উপকারি অ্যামাইনো অ্যাসিড,জিঙ্ক,থায়ামিন,রিবোফ্লবিন,ফলিক এসিড, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ইত্যাদি।


সাদা চিনির নামে যে চিনি আমরা খাচ্ছি তা আসলে সোডিয়াম সাইক্লামেট, বোনচারকোল, হাড়ের গুড়ো, ফসফোরিক এসিড, ডি-কালারিং এজেন্ট, রাইজিং প্রভৃতি..


লাল চিনিতে ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিন, এনজাইম এবং অন্যান্য উপকারি পুষ্টি উপাদান থাকলেও সাদা চিনিতে একেবারেই থাকেনা বললেই চলে, কারণ এগুলো নষ্ট হয়ে যায় ।

*****

লাল চিনির উপকারী মাত্র কয়েকটি দিক বলছি।

১) প্রচুর মাত্রায় ক্যালসিয়াম থাকার কারণে লাল চিনি খেলে হাড় শক্তপোক্ত হয়। সেই সঙ্গে দাঁতের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটে। ক্যাভিটি এবং ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হওয়ার আশঙ্কাও দূর হয়।

২) আখের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করে এবং শরীরের ভিতরে উপস্থিত ক্ষতিকর টক্সিক উপাদান বের করে দেয়।

৩) লিভার সুস্থ রাখে।

৪) জন্ডিসের প্রকোপ কমায়।

৫) কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর করে।

৬) আখে থাকা অ্যালকেলাইন প্রপাটিজ গ্যাস-অম্বলের প্রকোপ কমাতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

৭) শরীরের মিনারেল তথা খনিজ পদার্থের চাহিদা পূরণ করে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ স্বাভাবিক রাখে,যা স্ট্রোক প্রতিরোধ করে।

৮) শরীরের ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করে।

*****

শিল্প-কারখানা রিফাইনিং (পরিশোধিত) পদ্ধতিতে চিনি তৈরির সময় ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিন, এনজাইম এবং অন্যান্য উপকারি পুষ্টি উপাদান দূর হয়ে যায়।বাংলাদেশ খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় দেখা গেছে, আমদানিকৃত পরিশোধিত এবং দেশে উৎপাদিত পরিশোধিত চিনি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আখ থেকে উৎপাদিত দেশি চিনিতে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ১৬০ দশমিক ৩২, যা পরিশোধিত চিনিতে ১ দশমিক ৫৬ থেকে ২ দশমিক ৬৫ ভাগ। পটাশিয়াম দেশি চিনিতে ১৪২ দশমিক ৯ ভাগ, পরিশোধিত চিনিতে শূন্য দশমিক ৩২ থেকে শূন্য দশমিক ৩৫ ভাগ। ফসফরাস দেশি চিনিতে ২ দশমিক ৫ থেকে ১০ দশমিক ৭৯ ভাগ আর পরিশোধিত চিনিতে ২ দশমিক ৩৫ ভাগ। আয়রন দেশি চিনিতে শূন্য দশমিক ৪২ থেকে ৬ ভাগ আর পরিশোধিত চিনিতে শূন্য দশমিক ৪৭ ভাগ। ম্যাগনেশিয়াম দেশি চিনিতে শূন্য দশমিক ১৫ থেকে ৩ দশমিক ৮৬ ভাগ আর পরিশোধিত চিনিতে শূন্য দশমিক ৬৬ থেকে ১ দশমিক ২১ ভাগ। সোডিয়াম দেশি চিনিতে শূন্য দশমিক ৬ ভাগ, আর পরিশোধিত চিনিতে শূন্য দশমিক ২ ভাগ।

 লাল চিনি রিফাইন বা পরিশোধন করতে গিয়ে ভিটামিন,মিনারেল,প্রোটিন,এনজাইম এবং অন্যান্য উপকারি পুষ্টি উপাদান দূর হয়ে যায়। চিনি পরিশোধন করতে ব্যবহার করা হয় সালফার এবং হাড়ের গুঁড়ো।

সাদা চিনি বা রিফাইন করা চিনি যে শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সে সম্পর্কে ডঃউইলিয়াম কোডা মার্টিন এক গবেষণাপত্র বের করেছিলেন। ডঃউইলিয়াম কোডা মার্টিন গবেষণাপত্রে বলেন-

"চিনি রিফাইন করে সাদা করার জন্য চিনির সাথে যুক্ত প্রাকৃতিক ভিটামিন ও মিনারেল সরিয়ে শুধু কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা রাখা হয়। কিন্তু শুধু কার্বোহাইড্রেট শরীর গ্রহণ করতে পারে না। মিনারেল ও ভিটামিনবিহীন কার্বোহাইড্রেট দেহের মধ্যে টক্সিক মেটাবোলাইট সৃষ্টি করে। এতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে থাকে। ফলে কোষ অক্সিজেন পায় না এবং অনেক কোষ মারা যায়।"।

*****

ডঃউইলিয়াম কোডা মার্টিন গবেষণা লব্ধ ফলাফল দিয়ে প্রমাণ করেন- রিফাইন করা চিনি খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। হার্ট ও কিডনী ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং ব্রেনের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে।

*****

আরো সহজ করে সাদা চিনির ক্ষতিকর দিক বর্ণনা করা যায়।

১) যেহেতু পরিশোধনের সময় চিনির মিনারেল বা প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান দূর হয়ে যায়। তাই সহজেই বলা যায়,এতে করে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ কমে যায়। নিউরন কোষগুলো ধীরে ধীরে মারা যায়। যা স্ট্রোক ঘটায়।

২) ভিটামিন সরিয়ে ফেলায় শরীর পুষ্টি উপাদান পায় না।

৩) সাদা চিনিতে অতিরিক্ত পরিমাণে ফ্রুক্টোজ থাকে। ফ্রুক্টোজ হজম করাতে সাহায্য করে লিভার বা কলিজা। কিন্তু অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ লিভার হজম করাতে না পারায় লিভারে তা ফ্যাট আকারে জমা হয়। এতে করে লিভার ড্যামেজ বা লিভার নষ্ট হয়ে যায়।

৪) চিনি পরিশোধনে ব্যবহার হয় সালফার আর হাড়ের গুড়ো যা কিডনি বিকলাঙ্গ করে দেয়।

৫) সালফার ইনসুলিন নিঃসরণে প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শরীরের গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং ডায়াবেটিস হয়।

*****

এত এত অপকারী বা বিধ্বংসী দিক থাকার কারণেই ডঃউইলিয়াম কোডা মার্টিন সাদা চিনিকে বিষ বলেছেন। আমাদের দেশের মানুষ টাকা দিয়ে ধবধবে সাদা বিষ খাবে তবুও লাল চিনি কিনবে না। নিজে তো মরছে,দেশীয় চিনিকলের শ্রমিকদেরও বিনাবেতনে মারছে।

..

যদি চিনি খেতেই হয়, লাল চিনি খান। সেটা বাংলাদেশ সরকারেরই হোক, কিংবা কৃষকের হাতে হোক..

মন্তব্য করুন

ব্লগ