Loading..

ব্লগ

রিসেট

০১ এপ্রিল, ২০২৩ ০৫:০৮ পূর্বাহ্ণ

ভারতীয় উপমহাদেশে আগমনের পূর্বে আর্যরা কোথায় থাকতো

ভারতীয় ইতিহাসে যে সমস্ত বিতর্কিত বিষয় রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো, আর্য সমস্যা তথা আর্য জাতির পরিচয় সম্পর্কিত কিংবা এদের আদি বাসভূমি কোথায়, এই নিয়ে বিতর্ক। এবং এই বিতর্কের ধারা আজও সমানভাবে প্রবাহমান।

আর্য মানে কি? এটা নিয়েও মত ভেদ আছে, ভারতীয় হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞদের মতে সংস্কৃত ভাষায় লিখিত প্রাচীন শ্লোক অনুসারে “সর্বে গত্যর্থাঃ জ্ঞানার্থাঃ প্রাপ্ত্যর্থাশ্চ” - সমূদায় গমনার্থক জ্ঞানার্থক ও প্রাপ্ত্যর্থক। সুতরাং, যারা জ্ঞানশীল অথবা যারা (শাস্ত্রসীমায়) গমন করেন কিংবা যারা (শাস্ত্রের পার) প্রাপ্ত হন, তারাই আর্য। সোজা বাংলায় যারা সদ্ববংশজাত তারাই আর্য। প্রাথমিক পর্বে মনে করা হত যে শ্বেতগাত্রবর্ণ, টিকালো নাসিকা, প্রশস্ত ললাট ও দীর্ঘদেহী ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য সম্বলিত মানবপ্রজাতির একটি গোষ্ঠী হল আর্য। এই তত্ত্ব বেশ প্রভাবও বিস্তার করেছিল এবং এর ভিত্তিতে অনেকেই বলতে শুরু করেন যে আর্যরা হলেন নর্ডিক জাতির মানুষ।

main-qimg-ac25197fcfd826e0be44698546c99108-lq

কিন্তু এই কাল্পনিক তত্ত্বের ফানুস ফুটো হয়ে যায় ইরান থেকে বেহিস্তান শিলালিপি আবিষ্কৃত হওয়ার পর। যীশুর জন্মের প্রায় ৪৮৬ বছর আগে উৎকীর্ণ এই লেখতে পারস্য সম্রাট দারায়ুস নিজকে দাবী করেন- ‘A Persian, a son of a Persian and an Aryan of Aryan Descent’ হিসেবে। ব্যস, এরপরই ঐতিহাসিক মহলে তীব্র আলোড়নের সৃষ্টি হল এবং আর্য জাতির সাথে সম্পৃক্ত দেহসৌষ্ঠব সংক্রান্ত তত্ত্ব এক লহমায় বাতিলের খাতায় চলে গেল।

main-qimg-39be51568239e8721f14584ae4588e2c-lq

( দরায়ুস)

  • ভাষাতাত্ত্বিক ভিত্তিতে আর্যদের বসতি নির্ণয়ের চেষ্টা:

নিঃসন্দেহে আর্য জাতির শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি হল বেদ। সংস্কৃত ভাষায় বিরচিত বেদ এক বিস্ময়কর গ্রন্থ। ধর্ম ও দৈনন্দিন জীবনের নানা দিকের অপূর্ব সংমিশ্রণ এই গ্রন্থে লক্ষ্য করা যায়। ষোড়শ শতাব্দীর সময়ে ভারতে আগত ইউরোপীয় পর্যটক ও ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে ভারতীয় ধর্ম, বিশেষত বেদ নিয়ে তুমুল উৎসাহ দেখা দেয়। এরাই প্রথম সংস্কৃত, ইরানীয় ও ইউরোপীয় বেশ কিছু ভাষার মধ্যে সামঞ্জস্য লক্ষ্য করেন। যেমন, গোয়াতে আগত ব্রিটিশ জেসুইট পাদ্রী থমাস স্টিফেন্স ১৫৮৩ সাল নাগাদ তাঁর ভাইয়ের উদ্দেশ্যে প্রেরিত এক চিঠিতে সংস্কৃতের সাথে গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষার সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন। অন্যদিকে ইটালির ফ্লোরেন্সীয় বনিক ফিলিপো সসেটি বানিজ্য সংক্রান্ত কাজে গোয়ায় এসেছিলেন। তিনি এসময় এক স্থানীয় গোয়ান পণ্ডিতের কাছে সংস্কৃত ভাষার অধ্যয়ন করেছিলেন। এরপর ১৫৮৫-তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি বেশ কিছু সংস্কৃত ও ইটালীয় শব্দের সাদৃশ্য উপস্থাপন করেন, যেমন – Deva(Sans.) / Dio(Ita.), Sapta(Sans.)/ Sette(Ita.), Ostta(Sans.)/ Otto(Ita.) ইত্যাদি।

যদিও স্টিফেন্স ও সসেটি কেউই এই সামঞ্জস্যের কারন অনুসন্ধানের প্রয়াস করেননি। কিন্তু তাঁরা নিজেদের অজান্তেই আর্য সংক্রান্ত গবেষণায় এক নয়া সম্ভাবনাময় দিকের উন্মোচন করেছিলেন। এভাবে ভাষাতাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে, সম্পূর্ণ এক নতুন আঙ্গিকে আর্যদের ইতিহাস বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া শুরু হয় যা প্রায় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত বজায় ছিল কিন্তু এই পদ্ধতিও শেষ পর্যন্ত সমাধানসূত্র নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়!

জার্মান ভাষাবিদ জোহানেস স্মিথ আবার ‘Wave Theory’ উপস্থাপন করেছিলেন, যার মূল বক্তব্য ছিল- জলে পাথর ফেললে একটি কেন্দ্র বরাবর ঢেউ যেমন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনই একটি আদিম ভাষা থেকে নতুন নতুন ভাষার উৎপত্তি হয়। আর্যদের উৎস বিশ্লেষণে ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতি খুব একটা কার্যকরী হয়নি। এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হল আর্যদের বাসস্থান কোথায় ছিল, তা নির্ণয় করা যায় নি।

  • বোঘাজকাই লিপির আবিষ্কার ও জটিলতা সৃষ্টি নতুন করে:

দীর্ঘ দুই শতাব্দী ব্যাপী আর্যদের উৎপত্তি সংক্রান্ত প্রেক্ষিতে ভাষাতত্ত্বের কচকচানি চললেও কোন সমাধানসূত্র তো দূরে থাক বরং সমগ্র বিষয়টিই আরও জটিল হয়ে যায়। এশিয়া মাইনরে অবস্থিত বোঘাজকাই যা একদা হিত্তিয়দের রাজধানী ছিল, সেখান থেকে প্রাপ্ত একটি লিপি বা লেখাতে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ইত্যাদি নাম পাওয়া যায়, যারা আবার বৈদিক সাহিত্যে দেবতা হিসেবে স্থান পেয়েছেন।

এছাড়া এই লেখাটি থেকে ঘোড়া বা অশ্বের প্রশিক্ষন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায় এবং এই সম্পর্কিত একই গ্রন্থের উল্লেখও পাওয়া যায়। এই অশ্বের তথ্য এক নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। হিন্দু মতবাদে বিশ্বাসী ঐতিহাসিকরা আর্যদের ভারতীয় রূপে অভিহিত করলেও, অশ্বের সুপ্রাচীন নিদর্শন ভারতে পাওয়া যায়নি। আর্যরা এমন এক জাতি যারা অশ্ব ও অশ্ব-চালিত রথে অভ্যস্ত ছিল অথচ ভারতীয় সভ্যতার সুপ্রাচীন নিদর্শন হরপ্পা সভ্যতাতে ও অশ্বের নিদর্শন নেই। ফলে ভারত আর্যদের আদি বাসস্থান নয় এই তত্ত্বে বিশ্বাসীরা ‘আর্য-অশ্ব’ একদম সমার্থক করে ফেলেছেন। ফলে লাভ কিচ্ছু হয়নি বরং এই দৃষ্টিভঙ্গিগত সীমাবদ্ধতা প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করে ফেলেছে।

  • কুরগান থিওরি:

ঐতিহাসিক মারিয়া গিমবুটাস ‘কুরগান সংস্কৃতি’ র ওপর ভিত্তি করে ককেশাস অঞ্চলে আর্যদের আদি বসতি ছিল বলে মনে করেন। আসলে কুরগান হল সমাধি সংক্রান্ত এক রীতি; এই রীতি অনুসারে সমাহিত ব্যক্তির সাথে অশ্বসহ অন্যান্য গবাদি পশুকেও সমাধিস্থ করা হত।

main-qimg-78c36b51a9e3fdcf2a42d43f8a1b6813-lq

তবে ককেশাস আর্যদের আদি বসতি কিনা তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না, কারন এই অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত সমাধিগুলিতে যে মনুষ্য দেহাবশেষ পাওয়া গেছে তা আবার নরডিক জাতির মানুষের সাথে সমজাতীয়। অনেক ঐতিহাসিক এই থিওরি মানতে চান না।

  • আন্দ্রনোভো সংস্কৃতি থিওরি:

দক্ষিন রাশিয়ার কাজাখস্তান থেকে আবিষ্কৃত ‘আন্দ্রনোভো সংস্কৃতি’র ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, এই সভ্যতার অন্তর্গত পশুপালক গোষ্ঠী অশ্বের সাথে সুপরিচিত ছিল এবং এই অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত গবাদিপশুর দেহাবশেষের মধ্যে আশি শতাংশই অশ্বের। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এলিনা কুজমিনা উল্লেখ করেছেন যে, পন্টিক-কাস্পিক অঞ্চল হল আর্য বা ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর আদি বাসভূমি এবং এখান থেকেই একটি শাখা ইউরোপে চলে যায় ও আরকটি শাখা ইরানে চলে যায়।ইরানের শাখাটি থেকে ভেঙে আরেকটি শাখা আবার ভারতে প্রবেশ করে।

  • তুরস্ক ( আনাতোলিয়ান) থিওরি

আনাতোলিয়া অর্থাৎ বর্তমান তুরস্ক আর্যদের আদি বাসভূমি, ইংরেজ প্রত্নতাত্ত্বিক কলিন রেনফ্রু এই অভিমত পােষণ করেন। (Colin Renfrew, Archaeology and Language-The puzzle of Indo-European Origins (London, 1987), পৃষ্ঠা ৮১ হতে)। ঋগবৈদিক আর্যরা পশুচারক এক অর্ধ যাযাবর গােষ্ঠী, এরূপ ধারণার সঙ্গে তিনি সহমত নন। তার অভিমত, পশুচারণের সঙ্গে কৃষিকার্য ও পশু পালনের সংযােগ অতি ঘনিষ্ঠ। পশুচারক গােষ্ঠীর যে খাদ্য তা মূলত কৃষিজাত; পশুপালনে আভ্যস্ত না হলে পশুচারণ অসম্ভব। পশুচারকেরা তাদের খাদ্য সংগ্রহ করেন প্রতিবেশী কৃষককুলের কাছ থেকে, এই কৃষিজীবীদের নিকট হতেই তারা পশুপালন আয়ত্ত করেন। খ্রিস্টের জন্মের দশ হাজার বছর পূর্ব হতে আনাতোলিয়ায় চাষ-আবাদের কাজ শুরু হয়। এই স্থানই আর্যদের আদি বাসভূমি। এই স্থান হতেই তারা ইউরােপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। কিন্তু ঋগ্বেদ রচনার বহু পূর্বেই তারা ভারতে এসে উপনীত হন। হরপ্পীয়দের তিনি আর্যরূপে শনাক্ত করেছেন, হরপ্পীয়দের ভাষাকে সংস্কৃতরূপে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব একাদশ-দশম সহস্রাব্দে প্রাচীন তুরস্কবাসীরা যে আর্যভাষাভাষী ছিলেন, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

main-qimg-57cc345ff534496c0d13b023a0f01f1c-lq
  • জ্যোতিষ পদ্ধতি বিশ্লেষণ থিওরি:

আর্যরা ভারতীয় না অভারতীয় সেই বিতর্কে ঐতিহাসিক মহলে নানা মুনির নানা মত। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ঐতিহাসিক ও পন্ডিতেরা , আর্যরা বিদেশী এই মতে বিশ্বাসী। জ্যোতির্বিদ রাজেশ কোচাহার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘বেদাঙ্গ জ্যোতিষ’ গ্রন্থের বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, এই গ্রন্থে সর্বদীর্ঘ দিন ও ক্ষুদ্রকালীন রাতের যে তথ্য রয়েছে, তার অনুপাত করলে হয় ৩ঃ২। এই প্রকার বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন অঞ্চলের সম্ভাব্য অবস্থান হতে পারে ৩৫ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখা। একমাত্র হরপ্পা সভ্যতার শোরটুগাই ছাড়া আর অন্য কোন অঞ্চল এত উচ্চ অক্ষরেখায় অবস্থিত নয়, সুতরাং সামগ্রিকভাবে আর্যরা ভারতীয় হতে পারে না।

  • ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মার ( R. S. Sharma) থিওরি:

রামশরণ শৰ্মা আদি আর্যদের বাসভূমি ককেশাস পর্বতমালার দক্ষিণে, অর্থাৎ বর্তমান। (Sharma, Looking for the Arvans (Madras, 1995): Advent of the Aryans in India (New Delhi, 1999)। জর্জিয়া, অর্মেনিয়া ও আজেরবাইজান অঞ্চলে, অবস্থিত বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। স্বমতের সমর্থনে তিনি বিশেষ কোনও যুক্তি প্রদর্শন করেননি কিন্তু ভারতবর্ষে আর্যরা বহিরাগত, এই মত প্রতিষ্ঠায় তিনি বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ভারতের বিপক্ষে তার উত্থাপিত যুক্তিগুলো হলো –

  • ১. ঋগ্বেদ সংহিতা ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পূর্ববর্তী নয়।
  • ২. আনুমানিক ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পূর্বে ভারতবর্ষে অশ্ব ব্যবহারের সুস্পষ্ট নিদর্শন নেই।
  • ৩. কালিবঙ্গান ও লােথালে যজ্ঞবেদি আবিষ্কৃত হয়নি, আবিষ্কৃত হয়েছে চুল্লি।
  • ৪. বৈদিক সাহিত্যে স্বস্তিকা চিহ্নের উল্লেখ নেই, এই মাঙ্গলিক প্রতীকটি এলাম হতে এসেছে।
  • ৫. হরপ্পীয়রা আগুনে পােড়নাে ইট ব্যবহার করেছেন, বৈদিক আর্যরা এ ধরনের ইট ব্যবহার করেননি।
  • ৬. হরপ্পীয়রা অশ্ব ও যুদ্ধরথ সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন, আর্যরা অশ্ব ও যুদ্ধরথ ব্যবহারে সুনিপুণ ছিলেন।
  • ৭. বৈদিক গােষ্ঠী যদু, তুর্বশ, কুরু ও উত্তর মদ্রদের সম্পর্কে বেদ-পুরাণে বলা হয়েছে, তারা হিমালয় পেরিয়ে ভারতে আগমন করেন।

রামশরণ শর্মার অভিমত, আর্যরা খ্রিস্টপূর্ব ৭ম-৬ষ্ঠ সহস্রাব্দে ককেশাস পর্বতমালার দক্ষিণ দিগবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতেন; আনুমানিক ৪৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাদের একটি শাখা পূর্বদিকে অভিযান শুরু করেন। এই পূর্বশাখার আর্যরাই আ. ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে তরঙ্গের পর তরঙ্গের মতাে ভারতের বুকে আছড়ে পড়েন। এখানে এই কথাটি বলা প্রয়ােজন, ককেশাস পর্বতের দক্ষিণে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও প্রত্নবস্তুর সন্ধান পাওয়া যায়নি যা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করে, আর্যরা খ্রিস্টপূর্ব ৭ম-৬ষ্ঠ সহস্রাব্দে এই অঞ্চলে বাস করতেন। কোনও কোনও ঐতিহাসিক কাসপিয়ান সাগরীয় অঞ্চলকে আর্যদের বাসভূমিরূপে চিহ্নিত করেছেন। আর্যগণ প্রথমে পামির মালভূমি অঞ্চলে বাস করতেন এমন মতও ব্যক্ত হয়েছে। জার্মানি আর্যদের আদি বাসভূমি, এ মতও প্রচারিত হয়েছে।

  • মধ্য এশিয়ায় আর্যদের উৎস সন্ধান

আর্যরা যে বিদেশী এই বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে মধ্য এশিয়ায় এদের উৎস অনুসন্ধান করলে তা সফল হবে। আর্য সমস্যার সমাধানের সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হল নিরবিছিন্ন অনুভূমিক উৎখনন, বিশেষত তুরস্ক, ইরান, ইরাক এই সকল অঞ্চলে আর্য সভ্যতার প্রচুর উপাদান এখনও লুক্কায়িত রয়েছে।

main-qimg-11289a754c473f8b6e5df42fddb38898-lq

এটা কোন কাল্পনিক অবতারনা নয়, সাম্প্রতিক কালে তুরস্কের ‘গোবেকেলি টেপে’ অঞ্চলে আবিষ্কৃত প্রায় ছয় হাজার বৎসরের প্রাচীন মন্দির ও ইউক্রেনে প্রাপ্ত স্বস্তিকা প্রতীক

main-qimg-c29ee4036825e71afcdc0631528df75e-lq

আর্য ইতিহাসকে এক নতুন আঙ্গিকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এবং সেখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে প্রাপ্ত এই সমস্ত জিনিসপত্র থেকে ঐতিহাসিকরা কমবেশি একমত হয়েছেন, যে আর্যরা ভারতীয় নন বরং তারা বিদেশ থেকেই এসেছিলেন।

  • আর্যরা ভারতীয়, এই সম্পর্কিত থিওরি:

অন্য পণ্ডিতদের মতে, আর্যরা বাইরে থেকে এসে ভারতবর্ষে বসতি স্থাপন করে। যাঁরা মনে করেন যে ভারতবর্ষ আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল, তাঁরা নিম্নলিখিত যুক্তি পেশ করেছেন,

  • (১) আর্যদের প্রাচীনতম গ্রন্থ হল ‘বেদ’। এই বেদ রচিত হয়েছিল ভারতের মাটিতেই। বেদের মধ্যে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে। বৈদিক সাহিত্যে যে সকল গাছ ও পশু-পাখির উল্লেখ রয়েছে সেগুলি ভারতের এই অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়।
  • (২) পারগিটারের মনে করেন, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আর্যদের ভারত আগমনের কোন নির্দিষ্ট প্রমাণ ভারতের ইতিহাসে নেই, বরং উত্তর-পশ্চিম দিক হতে আর্যদের ভারতের বাইরে চলে যাওয়াটা সম্ভব। ঋগ্বেদের মধ্যে নদী স্তোত্রে যে নদীগুলোর নাম উল্লেখ হয়েছে তা গঙ্গা দিয়ে শুরু হয়ে উত্তর-পশ্চিম হয়ে সরস্বতী নদীতে দিয়ে শেষ হয়েছে। এই নদী স্তোত্র থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায় যে আর্যরা পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিমে গিয়েছিলেন।
  • (৩) আর্যদের মধ্যে যাঁরা দেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস স্থাপন করেন তাঁরা তাঁদের আদি বাসভূমি অর্থাৎ ভারতের কথা স্মরণ করে থাকেন। কিন্তু বৈদিক সাহিত্যে ‘সপ্তসিন্ধু’ ছাড়া অন্য কোন দেশের উল্লেখ পাওয়া যায় না।
  • (৪) আর্যরা যদি বহিরাগত হয় তাহলে তাঁদের আদি বাসভূমিতে বেদের মত কোন গ্রন্থ রচিত হওয়ার কথা ছিল? এসব যুক্তির অবতারণা করে কিছু পণ্ডিত দাবী করেন যে, আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল ভারতবর্ষ।

কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক এই যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করেছেন। তাঁদের যুক্তিগুলো নিচে বর্ণনা করা হলঃ

  • (১) বেদে যেসব গাছপালা ও পশুপাখির নাম উল্লেখ করা হয়েছে তা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলই ছিল আর্যদের আদি বাসস্থান বা আদি বাসভূমি। ভারতে যখন তাঁরা প্রবেশ প্রবেশ করেন প্রথমে তাঁরা ঐ অঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু করেন ফলে ঐ এলাকার গাছপালা ও পশুপাখির সঙ্গে তাদের প্রথম পরিচয় ঘটে। এ কারণেই উক্ত গাছপালা ও পশুপাখির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ এলাকাতেই বেদও রচনা করা হয়েছিল।
  • (২) নদী স্তোত্র দিয়ে আর্য জাতির উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে বাইরে চলে যাওয়া প্রমাণ করা যায় না। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে ৩৯টি নদীর নাম উল্লিখিত রয়েছে। তার মধ্যে ঋগ্বেদের মধ্যেই ২৫টি নদীর নাম পাওয়া যায়, কিন্তু গঙ্গা নদীর নাম শুধুমাত্র একবার উল্লেখ করা হয়েছে। আর্যরা ভারতের মূল নিবাসী বা আদিবাসী হলে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে গেলে গঙ্গা নদীর সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক থাকার কথা ছিল এবং সে ক্ষেত্রে গঙ্গা নদীর নাম বারবার উল্লেখিত হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
  • (৩) ঋগ্বেদের মত উন্নত কোন গ্রন্থ অন্য কোন দেশে রচনা করা হয়নি বলেই একথা বলা যায় না যে ভারতই ছিল আর্য জাতির আদি নিবাস বা আদি বাসভূমি। এটাও হতে পারে যে ভারতে আগমনের আগে বেদের মত উন্নত গ্রন্থ রচনা করার মত প্রজ্ঞা ও সামাজিক উন্নয়ন তাঁদের ঘটেনি। তাছাড়া এও বলা যায় যে ভারতবর্ষ আর্যদের আদি বাসভূমি বা আদি নিবাসী হলে তাঁরা ভারত ছাড়ার আগেই গোটা ভারতবর্ষে আর্য বসতি ও সংস্কৃতি বিস্তার করে ফেলতেন। কিন্তু উত্তর ভারতের বহু এলাকা এবং দক্ষিণ ভারত ছিল আর্য সংস্কৃতির ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
  • (৪) এটাও হতে পারে যে সুদীর্ঘকাল ধরে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে বসবাস করার ফলে আর্য জাতি তাঁদের আদি বাসভূমির সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলেন বলেই বেদে তার কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না।
  • (৫) সংস্কৃত ভাষার মধ্যে তালব্য বর্ণের (ন, ং, ৎ) প্রাধান্য দেখা যায় যা ইউরোপীয় অন্য কোন ইন্দো ইউরোপীয় ভাষার মধ্যে নেই। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে, ইউরোপ থেকে ভারতে আগমনের পর দ্রাবিড় ভাষার প্রভাবে এমনটা হয়েছে। বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে বন্য পশুদের মধ্যে সিংহের উল্লেখ করা থাকলেও বাঘ ও হাতির কোন উল্লেখ নেই। আর্যরা ভারতের আদিবাসী বা মূল নিবাসী হলে ভারতের এই দুটি প্রাণীর নামের উল্লেখ বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে অবশ্যই থাকা উচিৎ ছিল। কিন্তু নেই।
main-qimg-b1c22a16e86a8d8be12f7233b2c58d25-lq
  • আর্যরা বিদেশি, সেই সম্পর্কিত থিওরি:

বহু ঐতিহাসিক এমন রয়েছেন যাঁরা মনে করেন যে, আর্যরা ইউরোপ থেকে ভারতে আগমন করেছিলেন। তাঁদের যুক্তিগুলো নিচে পেশ করা হলঃ

  • (১) বৈদিক সাহিত্যে ওক, উইলো, বার্চ প্রভৃতি গাছ এবং ঘোড়া, গাভী, ষাঁড়, শুয়োর প্রভৃতি জন্তুর উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচ্য দেশের জীবজন্তু যেমন হাতি, বাঘ, উট ইত্যাদির জন্তুগুলির কোনো বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে নাম বা উল্লেখ নেই।
  • (২) আর্য ভাষাগোষ্ঠীর সাতটি ভাষা রয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচটি ভাষা এখনও ইউরোপের ভাষা, শুধুমাত্র সংস্কৃত ভাষা ও পারসিক ভাষা ইউরোপের বাইরের ভাষা। ইউরোপে গ্রিক, জার্মান ল্যাটিন, প্রভৃতি আর্য ভাষাগুলোর যেরকম ঘন সন্নিবেশ লক্ষ্য করা যায় ভারতে তা লক্ষ্য করা যায় না। ইউরোপে আর্য গোষ্ঠীভুক্ত ভাষার অধিক লক্ষ্য করা যায়, সেজন্য একদল ঐতিহাসিক মনে করেন যে, প্রাচীন যুগে আর্য জাতি ইউরোপের মধ্যেই বসবাস করতেন।
  • (৩) অধ্যাপক গাইলস মনে করেন, আর্য জাতির আদি নিবাস বা বাসভূমি ছিল দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপ। আদি ইন্দো ইউরোপীয় ভাষাযর মধ্যে সমুদ্রের কোন উল্লেখ না থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে আর্য জাতির যদি বাসভূমি কোন দ্বীপে বা সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে ছিলনা। আর্যরা যেসব গাছপালা ও পশুপাখির নাম উল্লেখ করেছেন সেগুলো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের আর্যরা তখন স্থায়ীভাবে বসবাস এবং কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন। আর্যদের গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরু, ঘোড়া ও ভেড়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রযয়োজন ছিল। সুতরাং ধরে নিতে হবে যে আর্যদের আদি বাসস্থান এমন একটি অঞ্চলে ছিল যেখানে কৃষিকাজ ও চারণযোগ্য প্রাকৃতিক পরিবেশ কোনটিরই অভাব ছিলনা। সেখানে কৃষিকাজের জন্য কৃষিযোগ্য জমি, ঘোড়া চারণের জন্য বিস্তীর্ণ স্তেপ এবং ভেড়া চরানোর জন্য উঁচু জমি- সবকিছুই ছিল। এসব অনুকুল পরিবেশের দিকে লক্ষ রেখে অধ্যাপক ডঃ গাইলস বর্তমান অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি অঞ্চলকেই আর্য জাতির আদি বাসভূমি বা আদি নিবাস হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
  • অধ্যাপক, ব্র্যান্ডেস্টাইনের মতামত

অপরিকে অধ্যাপক ব্র্যান্ডেস্টাইনের বক্তব্য হল, উরাল পর্বতের দক্ষিণ দিকে কিরঘিজ স্তেপ অঞ্চলই ছিল আর্য জাতিরর আদি নিবাস বা আদি বাসভূমি। এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য অধ্যাপক ব্র্যান্ডেস্টাইন শব্দতত্ত্বের সাহায্য নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, প্রথম দিকের ইন্দো-ইউরোপীয় শব্দাবলীতে কোন পর্বতমালার পাদদেশে বিস্তীর্ণ স্তেপ ভূমিতে আর্য জাতির আদি নিবাসের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পরবর্তীকালের ইন্দো-ইউরোপীয় শব্দাবলীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির গাছপালা, জমি এবং বিভিন্ন জীবজন্তুর সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে শুষ্ক স্তেপভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শব্দাবলীর পরিবর্তে জলাভূমির সুস্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী শব্দাবলী পাওয়া যায়।

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিকই ব্র্যান্ডেস্টাইনের মতকে সমর্থন করেছেন এবং তাঁরা মনে করেন যে, কিরঘিজ অঞ্চলই আর্য জাতির আদি নিবাস বা আদি বাসভূমি।

আর্য বিতর্ক ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় যা’র সঠিক সমাধানসূত্র নির্ণয় অত্যন্ত দুরহ, তবে অসম্ভব নয়। সর্বপ্রথম সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি অতিক্রম করে এই সমস্যাকে আরও বৃহত্তর প্রেক্ষিতে যুক্তি-সংগতভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

সর্বোপরি হরপ্পা সভ্যতায় আর্য প্রভাব খোঁজার প্রয়াস বৃথা। কারন বেদে ইন্দ্রকে ‘পুরন্দর’ রূপে অভিহিত করা হয়েছে, কারন তিনি ‘হরি-গুপয়’ এর যুদ্ধে পুর বা নগর ধ্বংস করেছিলেন; আর এই হরি-গুপয় হল হরপ্পা। হরপ্পার বেশ কিছু সাইটে প্রাপ্ত কঙ্কালগুলির আঘাত পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে অতর্কিত আক্রমণে এদের মৃত্যু হয়েছে।তাছাড়া অনেক জায়গায় কঙ্কালের স্তুপ পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে- এগুলির রীতি মেনে সৎকার হয়নি।

হরপ্পার পতনের পশ্চাতে যে বৈদেশিক আক্রমণকে দায়ী করা হয়, সেই আক্রমণকারীরা আর অন্য কেউ নয়, তারাই হল আর্য। সুতরাং আর্যরা বিদেশী এবং শুনতে খারাপ লাগলেও মেনে নিতেই হয় যে- বৈদিক সভ্যতার জন্মদাতারা ভারতের সুপ্রাচীন নগরসভ্যতার নির্মম ধ্বংসকারী ছিল এবং তারা কোনদিনই নগর সভ্যতার নিরিখে প্রাচীন ভারতীয়দের সাথে পাল্লা দিতে পারেনি


মন্তব্য করুন