সহকারী শিক্ষক
০২ এপ্রিল, ২০২৩ ০২:৩৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘ইলিয়াসশাহী বংশের উত্থান’
দিল্লীশ্বর ‘মহম্মদ তুঘলকের’ অমূল্য সব পরিকল্পনার জন্য জনসাধারণের দুর্দশা যখন চরমে উঠেছিল, ঠিক সেই সময়ে ‘সামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ’ পূর্ব ভারতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তুঘলক বংশীয় তখন সুলতান অসহায় ছিলেন, কারণ তাঁর খামথেয়ালীর জন্য সর্বত্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল, সাম্রাজ্য ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। তৎকালীন এলাহাবাদ ও বাহরাইচের পূর্ব দিকে যেসব হিন্দু নরপতিরা ছিলেন, তাঁরা তখন দিল্লীর আনুগত্য ত্যাগ করে স্বাতন্ত্র্যতা অবলম্বন করেছিলেন। তাঁদের দমন করতে গিয়ে তুঘলকী বাহিনী রিক্ত হস্তে দিল্লীতে ফিরতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সামন্ত বিদ্রোহের ফলেই দিল্লীর সঙ্গে গৌড়ের সম্পর্ক তখন আরেকবারের জন্য ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, ও ইলিয়াস শাহ নিরুদ্বেগে নিজের আত্মপ্রসারের সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমে মিথিলার দুই অংশে তখন ‘শক্তিসিংহ’ ও ‘কামেশ্বর সিংহ’ রাজত্ব করছিলেন। একে তাঁদের রাজ্যগুলি ছোট ছিল, তার উপরে তাঁদের পরস্পরের মধ্যে যথেষ্ট তিক্ততা ছিল। সেই কারণে ইলিয়াস শাহ খুব সহজেই ওই উভয় রাজ্য বশীভূত করে ১৩৪৬ খৃষ্টাব্দে নেপালের দিকে ধাবিত হয়েছিলেন। পাহাড় পর্বত অতিক্রম করে কোন সমতলবাসী সৈন্যবাহিনী যে তাঁদের দেশে প্রবেশ করতে পারে, সেই সময়ে এমন কথা কোন নেপালী কল্পনাও করতে পারতেন না। তৎকালীন নেপালাধীশ ‘জয়রাজদেব’ বা তাঁর মন্ত্রী ‘জয়স্থিতিবান’ ইলিয়াস শাহের সেই আক্রমণের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। তাই তিনি প্রায় বিনা বাধায় কাঠমাণ্ডু পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিলেন, এবং স্বয়ম্ভুনাথ স্তূপ ও শাক্যমুনির পবিত্র মূর্তি ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অতর্কিত আক্রমণের ধাক্কা সামলে নিয়ে নেপালী সৈন্যরা যখন তাঁর সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখন তিনি অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে স্বরাজ্যে পালিয়ে চলে এসেছিলেন। নেপালের সেই অভিজ্ঞতায় উৎসাহিত হয়ে ইলিয়াস শাহ তার পরের বছর উড়িষ্যায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করবার জন্য হানা দিয়েছিলেন। সেখানকার শাসকেরাও প্রথমদিকে তাঁর অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। এর আগে তাঁরাই বরাবর তুর্কী রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু কোন তুর্কী ফৌজ এসে যে তাঁদের রাজ্যে প্রবেশ করতে পারে, সেকথা তাঁরা কখনো ভাবতে পারেন নি। ইলিয়াস শাহের নিজের মনেও উড়িষ্যার গঙ্গাসাম্রাজ্যের শক্তি সম্বন্ধে কোন ধরণের ভ্রান্ত ধারণা ছিল না। সবার চোখ ঝলসে দেওয়ার জন্য তিনি একটি বিরাট সৈন্যবাহিনী সহ উড়িষ্যায় প্রবেশ করেছিলেন, এবং রাজধানী ও রক্ষাদুর্গগুলি পাশ কাটিয়ে একেবারে চিলকা হ্রদের তীরে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর সৈন্যরা পথের উভয় পাশে অবস্থিত বহু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত নেপালের মত সেখানেও গঙ্গাবাহিনী পৌঁছে তাঁকে সম্মুখ সমরে আহ্বান করবার পরে তিনি তাঁর বাহিনীসহ পশ্চাদপসারণ করতে শুরু করেছিলেন। এরপরে যেমন ত্রস্ত গতিতে ইলিয়াসশাহী বাহিনী চিল্কা তীরে গিয়ে পৌঁছেছিল, তেমনি ত্রাস্ত গতিতে তাঁরা পুনরায় গৌড়ে ফিরে এসেছিল। কিছু লুন্ঠিত মণিমাণিক্য ও চল্লিশটি হাতী ছাড়া সেই ব্যয়বহুল অভিযান থেকে ইলিয়াস শাহের আর কোন লাভ হয় নি। নেপাল ও উড়িষ্যার এক সূচ্যগ্র পরিমাণ ভূমি অধিকার করতে না পারলেও এরপরে ইলিয়াস শাহ তাঁর উৎসাহের আতিশয্যে দিগ্বিজয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। তুঘলকী সাম্রাজ্যের সর্বত্র তখন বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ায়, দিল্লী তাঁর অন্যতম লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল। লাহোর থেকে সোনারগাঁ পর্যন্ত বিস্তীর্ন ভূভাগ অধিকার করে নিয়ে তিনি দক্ষিণে দৌলতাবাদে ও উত্তরে সমরখন্দ-বোখারায় নিজের অধিকারকে সম্প্রসারিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন খলিফার মত মর্যাদা। ইলিয়াস শাহ যখন ওই ধরণের দিবাস্বপ্ন দেখছিলেন, তখন দিল্লীর নতুন সুলতান ‘ফিরোজ তুঘলক’ তাঁর বিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্যের সংহতি সাধনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। সেই আয়োজন সম্পূর্ণ হওয়ার পরে তিনি নব্বই হাজার অশ্বারোহী ও এক হাজার রণতরী সম্বলিত একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে ১৩৫৩ খৃষ্টাব্দে পূর্বাঞ্চল জয়ের জন্য দিল্লী থেকে রওনা হয়েছিলেন। অযোধ্যার যেসব হিন্দু সামন্ত ইতিপূর্বে তুঘলকী সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা অবলম্বন করেছিলেন, তাঁরা সেই বিশাল বাহিনীর সামনে প্রতিরোধ করা নিরর্থক বুঝতে পেরে সুলতান ফিরোজের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কিন্তু আয়তন ও লোক সংখ্যায় ইলিয়াস শাহের রাজ্য তখন তুঘলকী সাম্রাজ্যের চেয়ে কম কিছু ছিল না। তাই তিনি ভয় না পেয়ে সুলতান ফিরোজের সম্মুখীন হওয়ার জন্য নিজের বিরাট বাহিনীসহ পশ্চিম দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন, শেষে অযোধ্যায় ঘর্ঘরা নদীর তীরে দিল্লী বাহিনীর সঙ্গে তাঁর বাহিনীর সাক্ষাৎ হয়েছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধে তিনি বিশেষ সুবিধা করতে পারেন নি। ওই যুদ্ধে ইলিয়াস শাহ পরাজিত হয়ে পিছু হটতে শুরু করলে, ফিরোজশাহী সৈন্যরা তাঁর বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করে গৌড়ের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন। তখন মহানন্দা ও কালিন্দী নদীর সঙ্গমস্থল থেকে তিন ক্রোশ দূরে অবস্থিত ইলিয়াস শাহের রাজধানী ‘ফিরোজাবাদ’ একটি অরক্ষিত নগরী ছিল। সেখানে না ছিল কোন দুর্গ, না ছিল নদী পাহাড় প্রভৃতির স্বাভাবিক রক্ষা ব্যবস্থা। সেই কারণে ওই রাজধানীর প্রবেশদ্বারে দিল্লীর সৈন্যদের প্রতিরোধ করা অসম্ভব বিবেচনা করে, তাঁরা যখন কোশী নদী পার করবার জন্য পুল তৈরী করতে ব্যস্ত ছিলেন, সেই অবসরে ইলিয়াস শাহ সেখান থেকে তাঁর সমস্ত রাজকোষ ও সৈন্যসামন্তদের লখনৌতির রক্ষাদুর্গ একডালায় অপসারিত করে দিয়েছিলেন। সেই মহাদুর্গে তাঁর সৈন্যবাহিনী ছাড়াও আমীর ওমরাহদের পরিবারবর্গেরও জায়গা হয়েছিল। ওই অপসারণ কার্য্য যখন সম্পন্ন হয়েছিল, তখন দিল্লী বাহিনী ফিরোজাবাদে পৌঁছে দেখতে পেয়েছিল যে সেখানে সব শূন্য, সবাই একডালায় চলে গিয়েছেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে বল্লালসেন নির্মিত একডালা দুর্গকে পরবর্তী বিভিন্ন তুর্কী সুলতান যথেষ্ট সম্প্রসারিত করেছিলেন। ষাট ফুট প্রশস্ত ও পর পর দুইটি পরিখা দিয়ে ঘেরা সেই বিশাল দুর্গটি অধিকার করবার জন্য ফিরোজ শাহ নিজের প্রাণপাত চেষ্টা করেছিলেন। ওই দুর্গের অধিকার নিয়ে হওয়া যুদ্ধে, উভয় পক্ষের নিক্ষিপ্ত শরে প্রতি দিন অসংখ্য সৈন্য হতাহত হয়েছিলেন। কিন্তু দিল্লীর সৈন্যরা কিছুতেই দুর্গের পরিখা অতিক্রম করতে পারেন নি, তাঁরা লখনৌতির সৈন্যদের ওই দুর্গ থেকে বের করে আনতেও পারেন নি। ঐভাবে ভাবে মাসের পর মাস যুদ্ধ চলবার পরে, শেষে একডালার ভ্যাপসা গরম ও মশার কামড়ে দিল্লীর ফৌজ অস্থির হয়ে উঠেছিল। তার উপরে দিল্লীর সৈন্যদের মধ্যে দীর্ঘকালব্যাপী আত্মীয় বিচ্ছেদজনিত চিত্তচাঞ্চল্যও সৃষ্টি হয়েছিল। সৈন্যদের মধ্যে সেই অস্থিরতা লক্ষ্য করে সুলতান ফিরোজ অবশেষে একডালা থেকে তাঁর বাহিনীর তাঁবু তোলবার আদেশ দিয়েছিলেন। সে খবর ইলিয়াস শাহের কাছে গোপন ছিল না, কিন্তু কয়েকজন কালান্দারী ফকির তাঁর কাছে গিয়ে দিল্লীর ফৌজের ফিরে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জানিয়েছিলেন যে, নিজের সৈন্যদের মধ্যে আসন্ন বিদ্রোহ পরিহার করবার জন্য সুলতান ফিরোজ দিল্লী ফিরে যাচ্ছেন। সেই ফকিরদের কথায় বিশ্বাস করে, দিল্লী সৈন্যরা যখন চলে যাচ্ছিলেন, ইলিয়াস শাহ তখন তাঁর সমস্ত সৈন্যবাহিনী নিয়ে দুর্গের বাইরে এসে শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন শুরু করেছিলেন। তা দেখে ফিরোজ শাহ পলায়নের ভান করে সেখান থেকে সাত ক্রোশ দূরের এক খালের ওপারে গিয়ে থমকে দাঁড়ালে, ইলিয়াস শাহ সেখানেই তাঁকে আক্রমণের উদ্যোগ করেছিলেন। উন্মুক্ত প্রান্তরের মধ্যে ওই ধরণের রণক্ষেত্রই সুলতান ফিরোজ চেয়েছিলেন; নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীকে সেখানে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্যই তিনি কালান্দারী ফকিরদের একডালায় পাঠিয়েছিলেন। তাঁর ব্যূহ অটুট ও সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত ছিল। ইলিয়াস শাহ দেখতে পেয়েছিলেন যে, একডালা দুর্গের ভিতর থেকে যুদ্ধ করবার জন্য যেসব সুযোগ সুবিধাগুলি তিনি এর আগে ভোগ করছিলেন, সেসবের কিছুই সেখানে ছিল না। কিন্তু তবুও তিনি সেখানে যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁর পাইকেরা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে শত্রুর অশ্বারোহীদের আক্রমণ করেছিলেন। ওই লোমহর্ষক সংগ্রামে উভয় পক্ষের হাজার হাজার সৈন্য হতাহত হয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় সুলতানই অশ্বপৃষ্ঠে ঘুরে নিজেদের বাহিনীর সৈন্যদের যেমন উৎসাহ দিয়েছিলেন, তেমনি আবার তাঁদের উভয়েই মাঝে মাঝে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনাও জানিয়েছিলেন। ওই ভাবে সারা দিন ধরে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলবার পরে দেখা গিয়েছিল যে, ইলিয়াস শাহের সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে একডালার দিকে পালিয়ে চলেছেন, আর তাঁদের সুলতানের রাজচ্ছত্র ফিরোজ শাহের মাথায় শোভা পাচ্ছে। সেই পলায়নপর ইলিয়াসশাহী সৈন্যেরা একডালায় ফিরে আসবার পরে আবার সেই মহাদুর্গের তোরণদ্বার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদিও তখন ইলিয়াস শাহের সংখ্যা যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছিল, তাঁর বাহিনীর সামরিক অফিসারদের মধ্যে অনেকেরই মৃত্যু ঘটেছিল। তাঁদের পিছনে ধাওয়া করে ফিরোজ শাহও মহা উৎসাহে একডালায় ফিরে এসেছিলেন, এরপরে তাঁর অগ্রগামী বাহিনী দুর্গের একটি পরিখাও পার করে নিয়েছিল। সেই দৃশ্য দেখে তখন দুর্গের ভিতরে যে সব খানদানি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে শত্রুর সঙ্গে সন্ধি করবার জন্য ইলিয়াস শাহের উপরে চাপ দিতে শুরু করেছিলেন। ইলিয়াস দিল্লীর সুলতানের সামনে নত হতে রাজী ছিলেন না। তাই তাকে একপ্রকার উপেক্ষা করেই, দুর্গের ভিতরে অবস্থান করা অভিজাত পরিবারের রমণীরা দিল্লীর সুলতানের কাছে জীবনভিক্ষা চেয়েছিলেন। আগের দিনের যুদ্ধে ফিরোজ শাহ জয়ী হলেও, তাঁর বাহিনীও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একডালা দুর্গের প্রবেশপথ খোলা খুব একটা সহজ কাজ হবে না। তাঁর অসংখ্য সৈন্য রণক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছিলেন, বাকিরা রণক্লান্ত ছিলেন। তাই সবদিক বিবেচনা করে, নিজের ক্ষতির পরিমান আর না বাড়িয়ে, তিনি তাঁর বাহিনীকে দিল্লীর দিকে ফিরে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আগের দিনের যুদ্ধে ইলিয়াস শাহের বাহিনীর যে ২৭টি হাতী তাঁর হস্তগত হয়েছিল, সেগুলি নিয়ে তাঁর ফৌজ দিল্লীর পথে পা বাড়িয়েছিল। ইলিয়াস শাহ ছিলেন ‘ভাঙরা’, অর্থাৎ ভাঙখোর। তিনি সকাল সন্ধ্যায় ভাঙ সেবন করতেন বলে জনসাধারণ আড়ালে আবডালে তাঁকে সেই নাম ডাকতেন। কিন্তু নেশাখোর হোলেও তিনি সাধু-ফকিরদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। তাঁর সময়ে দিল্লী থেকে পীরের পীর ‘আখি সিরাজউদ্দীন ওসমান’ গৌড়ে এসে নিজের আস্তানা স্থাপন করেছিলেন। তাঁর মুরশিদ ‘নিজামুদ্দীন আউলিয়া’ তাঁকে ‘হিন্দুস্থানের দর্পণ’ বলতেন। সেই মুরশিদের আদেশে তিনি গৌড়ে এসে বিভিন্ন সুলতানের কাছ থেকে যথেষ্ট সাহায্য ও সম্মান লাভ করেছিলেন। তিনি ছাড়া ‘শেখ বিয়াবনী’ নামের ওপর এক সুফী সাধক তখন পাওয়ার উপকণ্ঠে এক জঙ্গলে বাস করতেন। তাঁর প্রতিও ইলিয়াসের যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল। দিল্লী সৈন্যরা যখন একডালা দুর্গ অবরোধ করে তাঁবু ফেলেছিল, তখন সেই সাধকের মৃত্যু হয়েছে শুনে তিনি এক ফকিরের ছদ্মবেশ পরে দুর্গের বাইরে চলে গিয়েছিলেন, এবং তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সব ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রবাদ রয়েছে যে, সেই সময়ে তিনি ফিরোজ শাহের শিবিরে গিয়ে তাঁর সঙ্গেও আলাপ করেছিলেন। কিন্তু দিল্লীশ্বর তাঁকে একজন সামান্য ফকির ছাড়া অন্য কিছু মনে করতে পারেন নি। ফিরোজ শাহের প্রস্থানের পরে দেখা গিয়েছিল যে, সব যুদ্ধে পরাজিত হয়েও ইলিয়াস শাহের রাজ্য অক্ষুন্ন থেকে গিয়েছিল। এমন কি দিল্লীশ্বর তাঁর বিজিত অঞ্চলগুলিতেও নিজের কোন শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে পাবেন নি। ওদিকে যুদ্ধশেষে ইলিয়াস শাহও বুঝে গিয়েছিলেন যে, দিল্লীর সঙ্গে বিবাদ চালালে শেষপর্যন্ত তাঁর কিছুই লাভ হবে না। তাই পূর্ব তিক্ততার কথা ভুলে গিয়ে তিনি নিজের একজন দূতকে মূল্যবান উপঢৌকনসহ দিল্লীতে ফিরোজ শাহের দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সুলতান ফিরোজ ইলিয়াসের সেই আনুগত্যে খুশী হয়ে দূতের মুখে অনুরোধ পাঠিয়েছিলেন যে, তাঁকে কয়েকটি উচ্চমানের হাতী প্রদান করা হয় ৷ সেই অনুরোধ রক্ষা করে পরের বছর ১৩৫৭ খৃষ্টাব্দে, ইলিয়াস শাহ পুনরায় দিল্লীতে উপঢৌকন পাঠানোর পরে ফিরোজ শাহ প্রতিদানে তাঁকে কয়েকটি তুর্কী ও আরবী ঘোড়া ও কিছু খোরাসানি মেওয়া উপহার দিয়েছিলেন। ওই ভাবে দুই সুলতান পরোক্ষে পরস্পরের স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করে নিয়ে মিত্রতাসূত্রে অবিদ্ধ হয়েছিলেন। ইলিয়াস শাহ যখন বুঝতে পেরেছিলেন যে ,দিল্লী থেকে তাঁর আর কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই, তখন তিনি তাঁর বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে পূর্ব দিকে - ‘কামরূপ’ রাজ্য অধিকার করবার জন্য এগিয়ে গিয়েছিলেন। এর শতাব্দীকাল আগে সুলতান ‘গিয়াসুদ্দীন ইওজ’ ঐ রাজ্য জয় করতে গিয়ে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পর থেকে, বাংলার আর কোন তুর্কী সুলতান সে দিকে পা বাড়াবার সাহস করেন নি। কিন্তু ইলিয়াস শাহের কথা স্বতন্ত্র ছিল। তিনি যখন নেপাল ও উড়িষ্যা আক্রমণ করে বহু দূর পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন, সেখানে কামরূপ তো তাঁর কাছে একেবারেই তুচ্ছ ছিল। তাছাড়া ওই রাজ্য আক্রমণে তাঁর তখন অনেক সুবিধাও ছিল। গুপ্তচরদের কাছ থেকে তিনি খবর পেয়েছিলেন যে, পূর্ব দিক থেকে অহমরা মাঝে মাঝেই ওই রাজ্যে আক্রমণ চালাচ্ছে বলে সেখানকার মূল সৈন্যবাহিনী পূর্ব সীমান্তে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে। ফলে কামরূপের পশ্চিম সীমান্ত প্রায় রক্ষীশূন্য অবস্থায় রয়েছে। তাই সেই সুযোগে তিনি হঠাৎ ওই রাজ্যটি আক্রমণ করবার ফলে সেখানকার রাজা ‘ইন্দ্রনারায়ণ’ তাঁর গতিরোধ করতে অসমর্থ হয়েছিলেন। তবে সমগ্র কামরূপ জয় করাটা ইলিয়াস শাহের পক্ষে সম্ভব না হলেও, বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার অধিকাংশ অঞ্চলই তাঁর অধিকারভুক্ত হয়েছিল।
১৩৫৮ খৃষ্টাব্দে সুলতান সামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের মৃত্যু হওয়ার পরে, জ্যেষ্ঠ পুত্র ‘সিকান্দার শাহ’ মসনদে আরোহণ করেছিলেন। নিজের পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি দিল্লীশ্বরের সঙ্গে সদ্ভাব রক্ষা করবার জন্য অভিষেকের পরেই পাঁচটি হাতী ও নানাবিধ খিলাৎসহ এক দূতকে দিল্লী দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সুলতান ফিরোজ সেসব উপহার গ্রহণ করলেও খুশী হন নি। ইলিয়াস শাহকে বারবার যুদ্ধে পরাজিত করা সত্বেও সমগ্র গৌড় যে তাঁর সাম্রাজ্যের থেকে গিয়েছিল, সেকথা তিনি কখনো ভুলতে পারেন নি। তখন তাঁর সামনে গৌড় দখল করবার আরেকটি মহা সুযোগ উপস্থিত হয়েছিল। যে ‘ফকরুদ্দীন’কে সবংশে নিধন করে ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁ দখল করেছিলেন, তাঁর জামাতা ‘জাফর খাঁ’ দিল্লীতে পালিয়ে গিয়ে সুলতান ফিরোজের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই সময়ে তাঁকে বার্ষিক চার লক্ষ টাকা বেতনে গৌড়ের নায়েব-উজীর পদে নিযুক্ত করে সুলতান ফিরোজ শাহ সিকান্দার শাহের কাছে দিল্লীর অধীনতা মেনে নেওয়ার চরমপত্র পাঠিয়েছিলেন। এরপরে দিনের পর দিন কেটে গেলেও গৌড় থেকে সেই চরমপত্রের কোন উত্তর দিল্লীতে পৌঁছায় নি। সুযোগসন্ধানী ফিরোজ শাহও সেটাই চেয়েছিলেন। সিকান্দারকে দমনের জন্য তিনি ৮০ হাজার অশ্বারোহী ও ৪৭০টি হাতী সম্বলিত একটি বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে গৌড়ে হানা দিয়েছিলেন। এরপরে ঠিক আগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। পিতৃ রণনীতি অনুসরণ করে সিকান্দার শাহও তাঁর রাজ্যের সীমান্তে আক্রমণকারীদের কোন বাধা দেননি, উল্টে বিনা যুদ্ধে তিনি রাজধানীকে তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক আগের মতই তাঁর সমস্ত সৈন্যবাহিনী ও রাজকোষ একডালা দুর্গে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল; সুলতান ও সম্ভ্রান্ত নাগরিকদের পরিবারবর্গও সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এরপরে আগের মতোই উভয় পক্ষের সেই মহাযুদ্ধ একডালার চারপাশে আবর্তিত হতে শুরু করেছিল। দিনের পর দিন ধরে আক্রমণকারীরা ওই দুর্গের উপরে আঘাত হেনেও কোথাও বিন্দুমাত্র ফাটল ধরাতে পারেন নি। কিন্তু তারপরেই একদিন একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে সেই যুদ্ধে একটি কৌতুকব্যঞ্জক ধারা সংযোজিত হয়েছিল। সিকান্দারের নামাঙ্কিত একটি গম্বুজ তাঁরই লোকজনের ভারে ভেঙ্গে পড়বার ফলে দুর্গ প্রাকারের একটি অংশে একটি ফাটল বেরিয়ে পড়লে, দূর থেকে সেটা দেখে সুলতান ফিরোজ তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে, সিকান্দার শাহ বুঝি তাঁর সৈন্যদের দুর্গের ভিতরে টেনে নিয়ে গিয়ে পিষে মারবার চক্রান্ত করেছেন। সেবিষয়ে তিনি কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই তাঁর কিছু সৈন্য নিজেদের উৎসাহের আতিশয্যে সেই ফাটলের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেলেও তাঁদের ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। আসলে ফিরোজ যেটাকে চক্রান্ত বলে ভেবেছিলেন, সেটা কোন চক্রান্ত ছিল না। কিন্তু তাঁর হিসেবের ভুলেই সেবার তুঘলকী বাহিনীর হাত থেকে একডালা দুর্গ অধিকার করবার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। এরপরে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও যুদ্ধের কোন ফলাফল সামনে আসেনি। শেষে উভয় পক্ষই সমঝোতার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ায় ফিরোজ শাহের দলভুক্ত একজন বাঙালি সামরিক অফিসার, সেই মধ্যস্থতা করবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। সেই অফিসার ফিরোজ শাহের হয়ে যুদ্ধ করলেও, তাঁর দুই পুত্র সিকান্দার শাহের পক্ষে যুদ্ধ করছিলেন। ফলে উভয় শিবিরেই তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। তাঁর দূতিয়ালীর ফলে শেষপর্যন্ত একদিন বিবদমান সুলতানদ্বয়ের মধ্যে একটি সম্মানজনক সন্ধি স্থাপিত হয়েছিল। পরস্পরের মধ্যে খিলাৎ আদানপ্রদানের পরে সুলতান ফিরোজ তাঁর নিজের রাজধানীর দিকে ফিরে গিয়েছিলেন, আর সিকান্দার শাহও একডালা দুর্গ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। গৌড়ের খানদানি ব্যক্তিরা পুনরায় তাঁদের নিজের নিজের জায়গীরে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম শুরু করেছিলেন। এরপরে দীর্ঘ কাল ধরে দিল্লীর কোন সুলতান গৌড়ের উপরে নিজের আধিপত্য দাবী করেন নি। যুদ্ধ শেষে কোন সীমান্ত থেকে বিপদের আশঙ্কা না থাকবার জন্য সিকান্দার শাহ ইসলামের সেবায় নিজের মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছিলেন। এক দিকে তিনি যেমন মোল্লা-মৌলবীদের দরাজ হস্তে সাহায্য করেছিলেন, তেমনি অন্য দিকে রাজ্যের নানা জায়গায় মসজিদ, মিনার ও দরগা নির্মাণ করে তিনি নিজের শিল্পানুরাগের পরিচয় দিয়েছিলেন। পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ তাঁর শিল্পানুরাগের একটি প্রকৃষ্ট নিদর্শন। ওই মসজিদের নির্মাণকার্য্য ১৩৬৪ খৃষ্টাব্দে শুরু হয়ে ১৩৬৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত চলেছিল। মসজিদশিল্পে সারা ভারতে সেটির কোন তুলনা নেই। অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত দামাস্কাসের মহামসজিদের সমতুল্য উক্ত মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৫০৭ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২৮৫ ফুট দীর্ঘ ছিল। বর্তমানে সেটি পরিত্যক্ত হলেও এক সময়ে হাজার হাজার ধার্মিক ব্যক্তি সেখানে সমবেত হয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন। রাজধানীর সকল নমাজী যাতে একজায়গায় সমবেত হয়ে প্রার্থনা করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্য নিয়েই সিকান্দার শাহ ওই মসজিদটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। উক্ত মসজিদটি সম্বন্ধে ‘পার্শী ব্রাউন’ লিখেছিলেন, “সীমাহীন খিলানে ঘেরা এই মসজিদের ভিতরকার চতুষ্কোণ প্রাঙ্গণে দাড়িয়ে দর্শক যদি চারি দিকে নিরীক্ষণ করেন তাহলে তিনি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়বেন; তাঁর মনে হবে যে মুসলমানের প্রার্থনাগৃহে না এসে কোন পুরাযুগীয় নগরীর সার্বজনীন মিলনক্ষেত্রে এসে সমবেত হয়েছেন। হাজার হাজার নমাজীর স্থান সংকুলানের জন্য এটি নির্মিত হলেও কোথাও স্কেলের অসাম্য নেই; এর বাদশাহী আভিজাত্য দর্শকদের দৃষ্টি এড়ায় না। অন্যান্য মসজিদের তুলনায় আদিনা এমন কিছু সুষমামণ্ডিত না হলেও এর নিজস্ব একটি বৈশিষ্ট্য আছে।” ওই বিরাট মসজিদটি নির্মাণের জন্য যথারীতি হিন্দু মন্দির ও বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস করে সেগুলি থেকে মালমশলা সংগৃহীত করা হয়েছিল। রাজমহল পাহাড় এমন কিছু দূরে না হওয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে পাথর আনবার আয়াসটুকুও সুলতান সিকান্দার করেন নি; তিনি কাছাকাছি অবস্থিত মন্দিরগুলি ভেঙে পাথর সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই সব ভাঙা মন্দিরের গায়ে যে সব মূর্তি খোদিত ছিল, সেগুলিকে তুলে দিয়ে পাথর চৌরস করবার পরিবর্তে মূর্তিসহ সেই পাথর উল্টো করে বসিয়ে মসজিদের দেওয়াল গাঁথা হয়েছিল। পার্শী ব্রাউনের মতে ওই একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য লক্ষ্মণাবতীর সর্বোৎকৃষ্ট হর্মরাজি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, “এর মিনারগুলি যে বৌদ্ধস্তূপ থেকে এনে বসানো হয়েছে তার চিহ্ন এখনও বিদ্যমান রয়েছে। স্তম্ভগুলিও তাই - হিন্দু মন্দিরের স্তম্ভ। দরজা। এমন কি বাদশাহ-তখতের দরজা পর্যন্ত এক হিন্দু মন্দিরের।” আদিনা মসজিদ ছাড়া আখি সিরাজউদ্দীনের সমাধির উপরে একটি দরগা ও মসজিদও সিকান্দার শাহ নির্মাণ করেছিলেন। আজও গৌড় নগরীর প্রবেশদ্বারে যে ‘কোতয়ালী দরজা’র ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায় সেটিও তাঁর কীর্তি ছিল। গৌড়ের তুর্কী সুলতানদের মধ্যে হর্ম নির্মাণে তিনি ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছেন।
চতুর্দশ শতাব্দীর গৌড়েশ্বর সিকান্দার শাহের সঙ্গে পরবর্তীকালের দিল্লীশ্বর শাহজাহানের যথেষ্ট সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। তাঁরা উভয়েই শিল্পানুরাগী ও পুত্রবৎসল ছিলেন, আবার তাঁরা উভয়েই নিজের নিজের পুত্রদের উৎপীড়নের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাজমহল নির্মাণের পরে শাহজাহান যেমন দেখেছিলেন যে, তাঁর চার পুত্র পরস্পরের সঙ্গে ও পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন; আদিনা মসজিদ নির্মাণের পরে সিকান্দার শাহও তেমনি দেখেছিলেন যে, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ‘গিয়াসুদ্দীন’ তাঁরই বিরুদ্ধে সসৈন্যে এগিয়ে আসছেন। অথচ নিজের সেই পুত্রকেই তিনি সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন। তাঁর প্রধানা বেগমের একমাত্র সন্তান গিয়াসুদ্দীন তাঁর চোখের মণি ছিলেন। সেই পুত্রের বহু সদগুণের জন্য তাঁর গর্বের কোন অন্তঃ ছিল না। রূপেগুণে অন্যান্য বেগমদের ষোল পুত্রের কেউই তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না। সেই কারণে বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই তিনি গিয়াসুদ্দীনকে সোনারগাঁর ক্ষত্রপ নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর পরেই দেখা গিয়েছিল যে, গিয়াসুদ্দীনের উচ্চাকাঙ্খা অতি প্রবল, নিজের পিতাকে দূরীভূত করে মসনদ অধিকার করাটা তাঁর মনের চরম অভিলাষ। পুত্র বিপক্ষে যেতে শুরু করেছে দেখে সুলতান সিকান্দার অনেক সদুপদেশ দিয়ে তাঁর পুত্রকে একটি পত্রে লিখেছিলেন, “তুমি আমার জ্যেষ্ঠ ও যোগ্যতম সন্তান, আমি পরলোক গমন করলে সমগ্র রাজ্য তোমার। আর কিছু দিন অপেক্ষা করো, তখতে তুমিই বসবে।” কিন্তু তাঁর সেই চিঠির কোন ফল হয়নি। পিতা বৃদ্ধ হলেও যে আরো ৫০ বছর বাঁচবেন না, সেটার নিশ্চয়তা কোথায় ছিল? গিয়াসউদ্দীন নিজে তত দিন নাও বাঁচতে পারেন, আর বাঁচলেও বৃদ্ধ অথর্ব হয়ে রাজ্যসুখে লাভ কি? তাই মসনদ তাঁর তখনই দরকার ছিল, এবং সেই মসনদ অধিকারের জন্য তিনি সসৈন্যে রাজধানীর দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন। সিকান্দার শাহও প্রস্তুত ছিলেন। ফলে পাওয়ার অদূরে সোনারকোট নামক জায়গায় উভয় সৈন্যবাহিনীর সাক্ষাৎ হয়েছিল। পিতা শেষ চেষ্টা করে একটি শেষ পত্রে পুত্রকে জানিয়েছিলেন, “গিয়াসুদ্দীন এখনও নিরস্ত হও। এ রাজ্য তোমার - কেন তুমি যুদ্ধ করতে এসেছ? তুমি যদি চাও তো এখনই তোমার মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিয়ে আমি মক্কায় চলে যাবো।” কিন্তু যুদ্ধের জেদে অনড় থেকে গিয়াসুদ্দীন তাঁর বাহিনীকে আক্রমণ শুরু করবার আদেশ দিয়েছিলেন। ফলে পিতাপুত্রের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বেধে গিয়েছিল। পুত্র সেই যুদ্ধের উদ্যোক্তা হলেও তাঁর বিবেক তাঁকে একেবারে ত্যাগ করে যায় নি। তাঁর পিতা নিজে সৈন্য চালনা করছেন জানতে পেরে তিনি তাঁর বাহিনীর সৈন্যাধ্যক্ষদের প্রতি আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁর পিতার দেহ লক্ষ্য করে যেন কোন অস্ত্র ধরণের নিক্ষেপ না করা হয়। তিনি তাঁর পিতার রাজ্য অধিকার করতে চাইলেও পিতৃহত্যার কলঙ্ক নিতে চাননি। তাঁর সৈন্যেরা সেই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন, কিন্তু অপরাহ্নকালে কোন এক অজ্ঞাত সৈনিকের নিক্ষিপ্ত লক্ষ্যভ্রষ্ট বর্শা হঠাৎই সুলতান সিকান্দার শাহের বক্ষ ভেদ করে চলে যাওয়ার ফলে তিনি হতচৈতন্য হয়ে হস্তীপৃষ্ঠ থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। গিয়াসুদ্দীনের কাছে সেই সংবাদ পৌঁছানোর পরে তিনি মুমূর্ষু' পিতার কাছে এসে প্রথমে মার্জনা চেয়েছিলেন, তারপরে পিতার মস্তক নিজের কোলের উপর রেখে তাঁর শুশ্রূষা করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে সুলতান সিকান্দারের সময় হয়ে এসেছিল, তাই নিজের পুত্রকে আশীর্বাদ করে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। সেই সঙ্গেই পিতা-পুত্রের মধ্যেকার যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল।
(তথ্যসূত্র:
১- Ain-i-Akbari, ii, Abul Fazl Allami, Jarret’s translation.
২- Riyas-us-Salatin, Ghulam Hussain Salim.
৩- Memoirs of Gaur and Pandua, Abid Ali Khan.)
৫
৫ মন্তব্য