Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ এপ্রিল, ২০২৩ ১১:০৫ অপরাহ্ণ

বঙ্কিম সাহিত্য সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথ।

‘বঙ্কিম সাহিত্য সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ১৬ বছর বয়সে ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ লিখিত ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের উপরে একটি দীর্ঘ সমালোচনা লিখেছিলেন। তাঁর সেই প্রবন্ধটি ‘ভারতী’ পত্রিকার প্রথম বর্ষেই (১২৮৪ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত হয়েছিল। সেই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মাইকেলকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছিলেন। যদিও পরে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই অল্প বয়সের ওই আক্রমণাত্মক প্রবন্ধের জন্য আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, “আমার বয়স তখন ঠিক ষোল। কিন্তু আমি ‘ভারতীর’ সম্পাদক-চক্রের বাহিরে ছিলাম না। ইতিপূর্বে আমি অল্প বয়সের স্পর্ধার বেগে মেঘনাদ বধের একটি তীব্র সমালোচনা লিখিয়াছিলাম। কাঁচা আমের রসটা অম্লরস - কাঁচা সমালোচনাও গালিগালাজ। অন্য ক্ষমতা যখন কম থাকে, তখন খোঁচা দেবার ক্ষমতাটা খুব তীব্র হইয়া উঠে। আমিও এই অমর কাব্যের উপর নখরাঘাত করিয়া নিজেকে অমর করিয়া তুলিবার সর্বাপেক্ষা সহজ উপায় অন্বেষণ করিতেছিলাম। এই দাম্ভিক সমালোচনাটা দিয়া আমি ভারতীতে প্রথম লেখা আরম্ভ করিলাম।” ওই একই প্রবন্ধেই রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গক্রমে ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ লিখিত ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসটি সম্পর্কেও কয়েকটি কথা বলিয়াছিলেন। তিনি ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের আলোচনায় ট্র্যাজেডির উত্থাপন করে প্রসঙ্গক্রমে লিখেছিলেন, “... ইহাকেই বলে ট্র্যাজেডি। আরও নামিয়া আসা যাক, ঘরের কাছে একটি উদাহরণ মিলিবে। সূর্যমুখীর সহিত নগেন্দ্রের শেষকালে মিলন হইয়া গেল বলিয়াই কি ‘বিষবৃক্ষ’ ট্র্যাজেডি নহে? সেই মিলনের মধ্যেই কি চিরকালের জন্য একটা অভিশাপ জড়িত হইয়া গেল না? যখন মিলনের মুখে হাসি নাই, যখন মিলনের বুক ফাটিয়া যাইতেছে, যখন উৎসবের কোলের উপরে শোকের কঙ্কাল, তখন তাহার অপেক্ষা আর ট্র্যাজেডি কি আছে? কুন্দনন্দিনীর সমস্ত শেষ হইয়া গেল বলিয়া বিষবৃক্ষ ট্র্যাজেডি নহে - কুন্দনন্দিনী ত এ ট্র্যাজেডির উপলক্ষ মাত্র। নগেন্দ্র ও সূর্যমুখীর মিলনের বুকের মধ্যে কুন্দনন্দিনীর মৃত্যু চিরকাল বাঁচিয়া রহিল - মিলনের সহিত বিয়োগের চিরস্থায়ী বিবাহ হইল - আমরা বিষবৃক্ষের শেষে এই নিদারুণ অশুভ বিবাহের প্রথম বাসরের রাত্রি মাত্র দেখিতে পাইলাম - বাকিটুকু কেবল চোখ বুজিয়া ভাবিলাম - ইহাই ট্র্যাজেডি। অনেকে জানেন না, সমস্তটা নিকাশ করিয়া ফেলিলে অনেক সময় ট্র্যাজেডির ব্যাঘাত হয়। অনেক সময়ে সেমিকোলনে যতটা ট্র্যাজেডি থাকে দাঁড়িতে ততটা থাকে না।” এর পরের  বছর রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কবিতা পুস্তকের’ উপরে একটি দীর্ঘ সমালোচনা লিখেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কবিতা পুস্তক’টি তখন সবেমাত্র প্রকাশিত হয়েছিল। ‘বঙ্গদর্শন’ ও ‘ভ্রমর’ পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি ক্ষুদ্র কবিতা এবং বঙ্কিমচন্দ্রের বাল্য-রচনা ‘ললিতা ও মানস’ সেই কবিতা পুস্তকে পুনর্মুদ্রিত করা হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের কবিতা পুস্তকের উপরে রবীন্দ্রনাথের লেখা সেই সমালোচনা প্রবন্ধটি ‘ভারতী’ পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষের (১২৮৫ বঙ্গাব্দ) ভাদ্র সংখ্যায় ২৩৪-৪০ সংখ্যক পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল। ওই সমালোচনা প্রবন্ধটিতে কিন্তু লেখক হিসাবে কারো নাম ছিল না। তবে অনেকেই তখন বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেটি আদতে রবীন্দ্রনাথেরই লেখা। পরবর্তীকালে ‘সজনীকান্ত দাস’ও একই ধরণের অনুমান করে রবীন্দ্রনাথকে সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি সেটা তাঁর নিজের রচনা ছিল বলে সজনীকান্তের কাছে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। (রবীন্দ্রনাথ: জীবন ও সাহিত্য, সজনীকান্ত দাস) বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কবিতা পুস্তকের’ সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “বঙ্কিমবাবুর কবিতা পুস্তক আমাদিগের ভাল লাগিল না। জ্ঞানের কথা এ স্থলে উল্লেখ করাই বাহুল্য মাত্র, কিন্তু আমোদ-সাধারণ, সামান্ত, অকিঞ্চিৎকর আমোদ পর্যন্ত এ পুস্তকের কোন স্থল পাঠ করিয়া আমরা পাইলাম না। বঙ্কিমবাবুর কোন গ্রন্থই যে এরূপ নীরস, নির্জীব, স্বাদ গন্ধহীন, কিছুই না হইবে, তাহা আমরা কখন স্বপ্নেও ভাবি নাই। প্রথম কবিতা পৃথ্বীরাজ মহিষী সংযুক্তার বিষয়। … সমস্ত কবিতাটিতে এমন একটি ভাব নাই, এমন একটি কথা নাই, যাহাতে হৃদয় নাচিয়া উঠে, যাহাতে ধমনী দিয়া রক্ত প্রবলতর বেগে প্রবাহিত হয় - যাহাতে আর্য-গৌরবের কণামাত্রও কল্পনার চক্ষে বিভাসিত হয়। - অনর্থক শব্দ আড়ম্বরে কবিতাটির কারা বৃদ্ধি হইয়াছে - অসঙ্গত মেদস্ফীত রোগীর ন্যায় ইহার লাবণ্য-শ্ৰী নাই - জীবনের আভাষ মাত্রও আছে কিনা সন্দেহ।” এইভাবে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমের ‘কবিতা-পুস্তকের’ অনেকগুলি কবিতা নিয়েই একে একে তীব্র সমালোচনা করে সবশেষে লিখেছিলেন, “সমস্ত কবিতা-পুস্তকের মধ্যে তিনটি গদ্য-পদ্যই আমাদের ভাল লাগিয়াছে। উপসংহার কালে আমরা একটি মাত্র কথা বলিব - বঙ্কিমবাবু উপন্যাস লিখিয়া যতদূর প্রতিষ্ঠাবান হইয়াছেন, এই নিকৃষ্ট কবিতা খানির প্রভাবে তাঁহার সে যশ কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হইবে না। আমরা বিলক্ষণ জানি যে, ভাল একজন উপন্যাস লেখক, ভাল কবি হইতে পারেন না।”

বঙ্কিমচন্দ্রের যে মাসে মৃত্যু হয়েছিল, সেই ১৩০০ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে, রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের উপরে একটি সমালোচনা লিখে ‘সাধনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সেই সমালোচনা দেখেছিলেন কিনা তা জানা যায় না। তবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই সমালোচনায় যা লিখেছিলেন, তাতে তিনি মূলতঃ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশংসাই করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “রাজসিংহ প্রথম হইতে উল্টাইয়া গেলে এই কথাটি বারম্বার মনে হয় যে, কোনো ঘটনা, কোনো পরিচ্ছেদ কোথাও বসিয়া কালক্ষেপ করিতেছে না, সকলেই অবিশ্রাম চলিয়াছে, এবং সেই অগ্রসরগতিতে পাঠকের মন সবলে আকৃষ্ট হইয়া গ্রন্থের পরিণামের দিকে বিনা আয়াসে ছুটিয়া চলিয়াছে। ... সম্রাটের অন্তঃপুরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া বাদশাহজাদীর সহিত মোবারকের প্রণয় ব্যাপার, তাহা লইয়া দুঃসাহসিকা আতরওয়ালী দরিয়ার প্রগল্‌ভতা, চঞ্চলকুমারীর নিকট আপন পরামর্শ ও পাঞ্জা-সমেত যোধপুরী বেগমের দূতীপ্রেরণ, সেনাপতির নিকট নৃত্য কৌশল দেখাইয়া দরিয়ার পুরুষ- বেশী অশ্বারোহী সৈনিক সাজিবার সম্মতি গ্রহণ - এ সমস্ত যে একেবারেই সম্ভবাতীত তাহা না হইতে পারে, কিন্তু ইহাদের সত্যতার বিশিষ্ট প্ৰমাণ আবশ্যক। বঙ্কিমবাবু এক একটি ছোটো ছোটো পরিচ্ছেদে ইহাদিগকে এমন অবলীলাক্রমে অসংকোচে ব্যক্ত করিয়া গেছেন যে, কেহ তাঁহাকে সন্দেহ করিতে সাহস করে না। ভীতু লেখকের কলম এই সকল জায়গায় ইতঃস্ততঃ করিত, অনেক কথা বলিত এবং অনেক কথা বলিতে গিয়াই পাঠকের সন্দেহ আরো বেশি করিয়া আকর্ষণ করিত। ... রাজসিংহ দ্বিতীয় বিষবৃক্ষ হয় নাই বলিয়া আক্ষেপ করা সাজে না ৷ বিষবৃক্ষের সুতীব্র সুখ-দুঃখের পাকগুলা প্রথম হইতেই পাঠকের মনে কাটিয়া কাটিয়া বসিতেছিল, অবশেষে শেষ কয়টা পাকে হতভাগ্য পাঠকের একেবারে কণ্ঠরুদ্ধ হইয়া আসে। রাজসিংহের প্রথম দিকের পরিচ্ছেদগুলি মনের উপর সেরূপ রক্তবর্ণ সুগভীর চিহ্ন দিয়া যায় না, তাহার কারণ রাজসিংহ স্বতন্ত্র জাতীয় উপন্যাস। ... পর্বত হইতে প্রথম বাহির হইয়া যখন নির্ঝরগুলা পাগলের মতো ছুটিতে আরম্ভ করে, তখন মনে হয় তাহারা খেলা করিতে বাহির হইয়াছে, মনে হয় না তাহারা কোন কাজের। পৃথিবীতেও তাহারা গভীর চিহ্ন অঙ্কিত করিতে পারে না। কিছুদূর তাহাদের পশ্চাতে অনুসরণ করিলে দেখা যায়, নির্ঝরগুলা - নদী হইতেছে, ক্রমেই গভীরতর হইয়া, পর্বত ভাঙিয়া, পথ কাটিয়া, জয়ধ্বনি করিয়া, মহাবলে অগ্রসর হইতেছে। সমুদ্রের মধ্যে মহাপরিণাম প্রাপ্ত হইবার পূর্বে তাহার আর বিশ্রাম নাই। রাজসিংহেও তাই। তাহার এক একটি খণ্ড এক একটি নির্ঝরের মতো দ্রুত ছুটিয়া চলিয়াছে। প্রথম প্রথম তাহাতে কেবল আলোকের ঝিকি মিকি এবং চঞ্চল লহরীর তরল কলধ্বনি; তাহার পর ষষ্ঠ খণ্ডে দেখি ধ্বনি গম্ভীর, স্রোতের পথ গভীর এবং জলেব বর্ণ ঘনকৃষ্ণ হইয়া আসিতেছে। তাহার পর সপ্তম খণ্ডে দেখি কতক বা নদীর স্রোত, কতক বা সমুদ্রের তরঙ্গ, কতক বা অমোঘ পরিণামের মেঘ গম্ভীর গর্জন, কতক বা সুতীব্র লবণাশ্রুনিমগ্ন হৃদয়ের সুগভীর ক্রন্দনোচ্ছ্বাস, কতক বা ব্যক্তি বিশেষের মজ্জমান তরণীর প্রাণপণ হাহাধ্বনি। সেখানে নৃত্য অতিশয় রুদ্র, ক্রন্দন অতিশয় তীব্র এবং ঘটনাবলী ভারত-ইতিহাসের একটি যুগাবসান হইতে যুগান্তরের দিকে ব্যাপ্ত হইয়া গিয়াছে।” ইতিপূর্বে ১২৯০ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসের ‘ভারতী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বাউলের গাথা’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের কয়েকটি উপন্যাস সম্বন্ধে প্রসঙ্গক্রমে লিখেছিলেন, “বঙ্কিমবাবু যখন ‘দুর্গেশনন্দিনী’ লেখেন, তখন তিনি যথার্থ নিজেকে আবিষ্কার করিতে পারেন নাই। ... কেহ যদি প্রমাণ করে যে, কোনো একটি ক্ষমতাশালী লেখক অন্য একটি উপন্যাস অনুবাদ বা রূপান্তরিত করিয়া দুর্গেশনন্দিনী রচনা করিয়াছেন, তবে তাহা শুনিয়া আমরা আশ্চর্য হই না। কিন্তু কেহ যদি বলে, বিষবৃক্ষ, চন্দ্রশেখর বা বঙ্কিমবাবুর শেষ বেলাকার .লেখাগুলি অনুকরণ, তবে সেকথা আমরা কানেই আনি না।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ঐতিহাতিহাক উপ্যাস’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “বিষবৃক্ষে নগেন্দ্র-সূর্যমুখী-কুন্দনন্দিনীর বিপদ-সম্পদ হর্ষ-বিষাদ আমরা আপনার করিয়া বুঝিতে পারি, কারণ সে-সমস্ত সুখ-দুঃখের কেন্দ্রমূল নগেন্দ্রের পরিবারমণ্ডলী। নগেন্দ্রকে আমাদের নিকট প্রতিবেশী বলিয়া মনে করিতে কিছুই বাধে না।” বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের আয়তনের প্রশংসা করে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধু ‘লোকেন পালিত’কে একবার একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমার মনে হয়, বঙ্কিমবাবুর নভেলগুলি ঠিক নভেল যত বড় হওয়া উচিত তার আদর্শ। ভাগ্যে তিনি ইংরেজি নভেলিষ্টের অনুকরণে বাঙ্গলায় বৃহদায়তনের দস্তুর বেঁধে দেন নি, তাহলে বড় অসহ্য হয়ে উঠত। এক একটা ইংরেজি নভেলে এত অতিরিক্ত বেশি কথা, বেশি ঘটনা, বেশি লোক যে, আমার মনে হয় - ওটা একটা সাহিত্যের বর্বরতা।” (সাধনা, ১২১৮ বঙ্গাব্দ, পৃ- ৩২৪) ১৮৮৮ সালে লেখা ‘ছিন্নপত্রের’ একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “বঙ্কিমবাবু ঊনবিংশ শতাব্দীর পোষ্যপুত্র আধুনিক বাঙালীর কথা যেখানে বলেছেন, সেখানে কৃতকার্য হয়েছেন। কিন্তু যেখানে পুরাতন বাঙালীর কথা বলতে গিয়েছেন, সেখানে তাঁকে অনেক বানাতে হয়েছে। চন্দ্রশেখর, প্রতাপ প্রভৃতি কতকগুলি বড় বড় মানুষ এঁকেছেন (অর্থাৎ তাঁরা অন্য সব জাতীয় লোক হতে পারতেন, তাঁদের মধ্যে জাতির এবং দেশকালের বিশেষ চিহ্ন নেই) কিন্তু বাঙ্গালী আঁকতে পারেন নি। আমাদের এই চিরপীড়িত, ধৈর্যশীল, স্বজন-বৎসল, বাস্তুভিটাবলম্বী, প্রচণ্ডকর্মশীল পৃথিবীর এক নিভৃত প্রান্তবাসী শান্ত বাঙালীর কাহিনী কেউ ভাল করে বলে নি।”

১২৮৭ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাস থেকে ১২৮৯ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, এবং ১২৮৯ বঙ্গাব্দেই সেটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ পড়ে রবীন্দ্রনাথের তখন ভাল লাগেনি, এবং সেকথা তিনি পরিষ্কারভাবে পত্রযোগে ‘চন্দ্রনাথ বসু’কে জানাতে কোন দ্বিধাও করেন নি। সেই পত্রে তিনি লিখেছিলেন, “বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে individual-এর চরিত্র ফুটাইয়া তুলিবার চেষ্টা করিয়াছেন, সেইখানে তিনি চমৎকার সফল হইয়াছেন। তাঁহার শক্তির যথেষ্ট পরিচয় দিয়াছেন। কিন্তু যেখানে মানুষের সমষ্টি লইয়া নাড়াচাড়া করিয়াছেন, সেইখানে সমস্তটা একটা পিণ্ডবৎ তাল পাকাইয়া গিয়াছে। কোন ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিবার চেষ্টা আদৌ দেখিতে পাওয়া যায় না। আনন্দমঠের সমস্ত ‘আনন্দ’গুলিই যেন এক রকমেরই। একটা প্রকাণ্ড idea-কে, যে বিচিত্র মানবপ্রকৃতিকে revolution-এর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত ও কেন্দ্রীভূত করিয়াছে, তাহাদের প্রকৃতিগত পার্থক্য, তাহাদের বিচিত্র কর্মপ্রবাহ, বিচিত্র ভাবপ্রবাহ, নানা শক্তির উন্মেষ যে একটা প্রকাণ্ড আবর্তে পড়িয়া একটা দিকে চলিয়াছে, বঙ্কিমবাবু তাহা দেখাইলেন কৈ? কেন তিনি তাঁহার আনন্দগুলিকে বৈশিষ্ট্য দিলেন না।” (রবীন্দ্রজীবনী, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়) বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালেও ওই ধরণের বিরূপ মত প্রচার করেছিলেন। ‘শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের’ ৫৫ তম জন্মতিথিতে ‘প্রেসিডেন্সী কলেজের’ ‘বঙ্কিম-শরৎ সমিতি’ শরৎচন্দ্রকে অভিনন্দন জানানোর জন্য যে সভার আহ্বান করেছিলেন, তাতে তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে সভাপতি করবেন বলে প্রথমে ঠিক করেছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত কোন অনিবার্য কারণবশতঃ রবীন্দ্রনাথ সেই সভায় উপস্থিত থাকতে পারেন নি। তখন তিনি ওই সভার উদ্যোক্তাদের অনুরোধে সভায় পড়ে শোনাবার জন্য নিজের একটি লিখিত বাণী পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই বাণীতে তিনি বাংলা কথা-সাহিত্যের ক্রম বিকাশের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখে দিয়েছিলেন। সেই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ সম্বন্ধে বলেছিলেন, “... ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইলের’ তুলনায় ইহার সাহিত্যিক মূল্য সামান্যই। ইহার মূল্য স্বদেশ-হিতৈষণায় মাতৃভূমির দুঃখ দুর্দশার বিবরণে, তাহার প্রতিকারের উপায় প্রচারে, তাহার প্রতি প্রীতি ও ভক্তি আকর্ষণে। অর্থাৎ ‘আনন্দমঠে’ সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের সিংহাসন জুড়িয়া বসিয়াছে, প্রচারক ও শিক্ষক বঙ্কিমচন্দ্র।” তবে ‘আনন্দমঠ’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উপরোক্ত মতকে অনেকেই কিন্তু স্বীকার করেন নি। যেমন, অতীতের বিখ্যাত সাহিত্য সমালোচক ‘মোহিতলাল মজুমদার’ এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “... এই রূপমোহের, এই ইন্দ্রিয় পারবশের চুড়ান্ত ট্রাজেডি - ‘আনন্দমঠ’। যাঁহারা এই উপন্যাসকে একখানি উদ্দেশ্যমূলক স্বদেশ প্রেমের কাব্য বলিয়াই সংক্ষেপে ইহার বিচার শেষ করেন, তাঁহারা বঙ্কিমচন্দ্রের কবি প্রতিভার সম্যক ধারণা করিতে পারেন নাই। এই উপন্যাসও ‘সীতারামের’ মতই বঙ্কিমচন্দ্রের পরিণত প্রতিভার অন্যতম নিদর্শন। ... সকল বড় কাব্যের লক্ষণই এই যে, তাহাতে জীবনের একটা জটিল ও গভীর অভিজ্ঞতা কোন একটি বিশিষ্ট ভাব কল্পনার ঐক্যসূত্রে সুসম্বদ্ধ আকার ধারণ করে। ‘আনন্দমঠে’ দেশপ্রেমের কল্পনা সূত্রে কবি বঙ্কিম তাঁহার আজীবন সঞ্চিত গভীর ও জটিল অভিজ্ঞতাকেই একটি রসরূপ দান করিয়াছেন। দেশপ্রেমকেই পুরুষের একটি মহৎ ধর্মরূপে স্থাপন করিয়া তিনি সে একই সমস্যাকে বাস্তব ও আদর্শের বিরোধকে, দেহ-আত্মার দ্বন্দ্বকে - আরও সরল স্বচ্ছ দৃষ্টিতে দেখিয়া লইতে চাহিয়াছেন; যেন দেশপ্রেমের তাড়িত-শক্তি উৎপন্ন করিয়া তাহার রাসায়নিক ক্রিয়ার সাহায্যে মানুষের দেহ-মন-প্রাণকে তরলিত ও মথিত করিয়া তিনি মনুষ্যত্বের মূল উপাদান পরীক্ষা করিয়াছেন। দেশপ্রেমরূপ একটা ভাবাবেগমূলক ধর্মের সংঘাতে, মানুষের সামাজিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক যত কিছু সংস্কারকে বিধ্বস্ত ও উৎক্ষিপ্ত করিয়া তিনি তাঁহার শক্তি ও অশক্তির সীমা নিরীক্ষণ করিয়াছেন। এই ক্ষুদ্র কাব্যখানির ঘনীভূত একাগ্র কল্পনায় - যৌন-প্রবৃত্তি বা রূপমোহ, দাম্পত্যপ্রেম, সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কার, সংসার ত্যাগ বা সন্ন্যাসের আদর্শ, যুগধর্ম ও সনাতন শাশ্বত পন্থা - এই সকলই একটি ভাব-সত্যের আশ্রয়ে সুসমাহিত হইতে পারিয়াছে। এই গ্রন্থের আদি হইতে শেষ পর্যন্ত যে একটি নৈশগভীর অরণ্যচ্ছায়া পরিব্যাপ্ত হইয়া আছে, তাহাতে যে একটি atmosphere বা মনোভূমির সৃষ্টি হইয়াছে, এবং সেজন্য চরিত্র বা ঘটনাগুলির মধ্যে যে ভাবগত সামঞ্জস্য ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহাও শ্রেষ্ঠ কবিশক্তির নিদর্শন। এইজন্য ‘আনন্দমঠ’ কেবল দেশপ্রেমের উদ্দেশ্যমূলক একখানি দ্বিতীয় শ্রেণীর কাব্য নয়, উহা বঙ্কিমচন্দ্রের পরিণত লেখনীর একখানি উৎকৃষ্ট রসরচনা।” রবীন্দ্রনাথ ‘আনন্দমঠ’কে উদ্দেশ্যমূলক, অর্থাৎ, “আনন্দমঠে সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের সিংহাসন জুড়িয়া বসিয়াছে, প্রচারক ও শিক্ষক বঙ্কিমচন্দ্র” - বলবার জন্য তখন ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথকে পাল্টা আক্রমণ করে তাঁর সেই বক্তব্যের প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন - “... ‘বৌ-ঠাকুরাণীর হাট’ ও ‘চিত্রাঙ্গদা’ যুগের কয়েকটি ছাড়া রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী যুগের বহুতর উপন্যাস ও নাট্য উদ্দেশ্যমূলক। তিনি উদ্দেশ্য ছাড়া লিখতেই পারেন না। ...” (শনিবারের চিঠি, আশ্বিন, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ) বঙ্কিমচন্দ্রের কোন কোন উপন্যাস সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ যে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন, সেসবেরই উত্তর হিসাবে পরবর্তীকালে মোহিতলাল মজুমদার লিখেছিলেন, “বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক হইতে একদল সাহিত্যিক (অধিকাংশ রবীন্দ্র-শিষ্য) রব তুলিয়াছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র বাঙ্গলা সাহিত্যের যত বড় লেখকই হউন, তিনি যে উপন্যাসগুলি লিখিয়াছিলেন, তাহা উৎকৃষ্ট আর্টের দিক দিয়া ব্যর্থ হইয়াছে। ... স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলির সম্বন্ধে মাঝে মাঝে যে সকল বাক্য উচ্চারণ করিয়াছেন; তাহার দৃষ্টান্তে সৌখিন সাহিত্যিক মজলিসে যে উঁচুদরের সাহিত্য আলোচনা হইয়া থাকে, এবং যাহা মৌলিক সমালোচনা প্রবন্ধরূপে - বাঙ্গলা মাসিক অর্থাৎ হীনযান ও মহাযান উভয় সম্প্রদায়ের সাহিত্য-রসিক পাঠকগণের দরবারে প্রকাশিত হইয়া থাকে, তাহাতে বঙ্কিমবাবুকে অপদস্থ না করিলে আধুনিক হওয়া যায় না। ... রবীন্দ্রনাথের বিমুখতা, বিশেষতঃ এই শেষ বয়সে একটু বিচিত্র বটে, কারণ রবীন্দ্রনাথের কবিধৰ্ম অতিশয় স্বতন্ত্র হইলেও তাহার প্রতিভা খুবই আত্মসচেতন; এবং সেইজন্য আত্ম-সংস্কারকে অতিশয় অবোধ instinct-কেই অবলম্বন করিয়া তিনি বঙ্কিমচন্দ্র অথবা অন্য কোনও ভিন্নধর্মা শক্তিমান সাহিত্যিকের কবি-কীর্তির মূল্য নিরূপণ করিবেন - তাঁহার সাহিত্য সমালোচনার যে ভঙ্গির পরিচয় আমরা বহু পূর্বেই পাইয়াছিলাম, তাহাতে তাহা বিশ্বাস করা কঠিন। একমাত্র কারণ এই হইতে পারে যে, কবি-ব্যক্তিত্বের বহুত্বই তাঁহার যেমন কাম্য, তেমনই সমালোচনা বা যুক্তিচিন্তার ক্ষেত্রেও তিনি বহু বচনের পক্ষপাতী। তা ছাড়া, সকল কালের সমবয়সী হওয়ার বা সর্বদা ‘আপ-টু-ডেট’ থাকিবার যে সাধনা, তাহাতে তিনি অতি মাত্রায় বিশ্বাসী; তিনি বৃদ্ধ হইবেন না - এবং স্থাবরতাই স্থবিরতার লক্ষণ - সেজন্য স্থাবরতাকে বর্জন করিতে হইবে; এমন একটা সংকল্প তাঁহার ইদানীন্তন সাহিত্যিক প্রয়াসগুলির মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। কাল-ধর্মে বঙ্কিমচন্দ্র যখন বাতিল হইতে বসিয়াছেন, তখন অতিশয় সজাগ থাকিয়া সেই কালের অনুবর্তন করিতে না পারিলে, তিনিও বাতিল হইয়া যাইবেন - এ ভয় তাঁহার প্রবল। তাহার প্রমাণ অতি আধুনিকদের সঙ্গে বার বার রফা করিবার চেষ্টায় নিত্যই পাওয়া যাইতেছে।” (বঙ্কিম বরণ, পৌষ, ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ) রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র-শিষ্যদের সম্বন্ধে মোহিতলাল যখন উপরোক্ত উক্তিটি করেছিলেন, তখনও রবীন্দ্রনাথ জীবিত ছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথ বা কোন ‘রবীন্দ্র-শিষ্য’ মোহিতলালের সেই উক্তির কোন উত্তর দিয়াছিলেন কিনা - তা জানা যায় না। তবে রবীন্দ্রনাথ আনন্দমঠ সম্পর্কে কখনো কোন উচ্চ প্রশংসা-সূচক কথা না বললেও, আনন্দমঠ সম্পর্কে আবার কখনো এমন কথাও বলেছিলেন যে, আমাদের দেশে লোকশিক্ষার জন্য সুগায়ক কথকের মুখ দিয়ে কথকতার আকারে আনন্দমঠের প্রচার হওয়ার দরকার রয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি তাঁর ‘ইতিহাসকথা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “আমাদের দেশে লোকশিক্ষা দিবার যে দুটি সহজ উপায় অনেক দিন হইতে প্রচলিত আছে, তাহা যাত্রা এবং কথকতা। ... আজকালকার দিনে কেবলমাত্র পৌরাণিক যাত্রা ও কথা আমাদের সম্পূর্ণ উপযোগী নহে। ইতিহাস এমন কি, কাল্পনিক আখ্যায়িকা অবলম্বন করিয়া আমাদিগকে লোকশিক্ষা বিধান করিতে হইবে। যদি বিদ্যাসুন্দরের গল্প আমাদের দেশে যাত্রায় প্রচলিত হইতে পারে, তবে পৃথ্বীরাজ, গুরুগোবিন্দ, শিবাজী, আকবর প্রভৃতির কথাই বা লোকের মনোরঞ্জন না করিবে কেন। এমন কি আনন্দমঠ, রাজসিংহ প্রভৃতির ন্যায় উপন্যাসই বা সুগায়ক কথকের মুখে পরম উপাদেয় না হইবে কেন?”

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ গ্রন্থে ‘শকুন্তলা, মিরন্দা ও দেসদিমোনা’ নামের একটি প্রবন্ধ রয়েছে। একদা বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সেই ‘শকুন্তলা, মিরন্দা ও দেসদিমোনা’ প্রবন্ধে শকুন্তলা ও মিরন্দা সম্পর্কে লিখেছিলেন, “উভয়েই ঋষিকন্যা; প্রস্পেরো এবং বিশ্বামিত্র উভয়েই রাজর্ষি। উভয়েই ঋষিকন্যা বলিয়া অমানুষিক সাহায্য প্রাপ্ত। মিরন্দা এরিয়ল-রক্ষিতা, শকুন্তলা অপ্সরা-রক্ষিতা। … উভয়েই অরণ্য মধ্যে প্রতিপালিতা; সরলতার যে কিছু মোহমন্ত্র আছে, উভয়েই তাহাতে সিদ্ধ। ... কিন্তু শকুন্তলা সরলা হইলেও অশিক্ষিতা নহেন। তাঁহার শিক্ষার চিহ্ন লজ্জা। লজ্জা তাঁহার চরিত্রে বড় প্রবলা; তিনি কথায় কথায় দুষ্মন্তের সম্মুখে লজ্জাবনতমুখী হইয়া থাকেন, লজ্জার অনুরোধে আপনার হৃদগত প্রণয় সখীদের সম্মুখেও সহজে ব্যক্ত করিতে পারেন না। মিরন্দার সেরূপ নহে। মিরন্দা এত সরলা যে তাঁহার লজ্জাও নাই। ... অথচ স্বভাবদত্ত স্ত্রী চরিত্রের যে পবিত্রতা, যাহা লজ্জার মধ্যে লজ্জা, তাহা মিরন্দার অভাব নাই। এজন্য শকুন্তলার সরলতা অপেক্ষা মিরন্দার সরলতায় নবীনত্ব এবং মাধুর্য অধিক। … মিরন্দা সংস্কার-বিহীনা, কিন্তু মিরন্দা পরদুঃখ-কাতরা, মিরন্দা স্নেহশালিনী, মিরন্দার লজ্জা নাই। কিন্তু লজ্জার সারভাগ যে পবিত্রতা তাহা আছে। যখন রাজপুত্রের সঙ্গে মিরন্দার সাক্ষাৎ হইল, তখন তাঁহার হৃদয় প্রণয় সংস্পর্শ শূন্য ছিল, কেননা শৈশবের পর পিতা ও কালিবন ভিন্ন আর কোন পুরুষকে তিনি কখন চোখে দেখেন নাই। শকুন্তলাও যখন রাজাকে দেখেন, তখন তিনিও শূন্য-হৃদয়, ঋষিগণ ভিন্ন পুরুষ দেখেন নাই। উভয়েই তপোবন মধ্যে - একস্থানে কণ্বের তপোবন, অপর স্থানে প্রস্পেরোর তপোবন - অনুরূপ নায়ককে দেখিবামাত্র প্রণয়শালিনী হইলেন। কিন্তু কবিদিগের আশ্চর্য কৌশল দেখ; তাঁহারা পরামর্শ করিয়া শকুন্তলা ও মিরন্দা চরিত্র প্রণয়নে প্রবৃত্ত হয়েন নাই, অথচ একজনে দুইটি চিত্র প্রণীত করিলে যেরূপ হইত, ঠিক সেইরূপ হইয়াছে। যদি একজনে দুইটি চরিত্র প্রণয়ন করিতেন, তাহা হইলে কবি শকুলার প্রণয়-লক্ষণ ও মিরন্দার প্রণয়-লক্ষণে কি প্রভেদ রাখিতেন? তিনি বুঝিতেন যে, শকুন্তলা সমাজ-প্রদত্ত সংস্কারসম্পন্না, লজ্জাশীলা, অতএব তাঁহার প্রণয় মুখে অব্যক্ত থাকিবে, কেবল লক্ষণেই ব্যক্ত হইবে। কিন্তু মিরন্দা সংস্কারশূন্যা, লৌকিক লজ্জা কি তাহা জানে না। অতএব তাঁহার প্রণয়-লক্ষণ বাক্যে অপেক্ষাকৃত পরিস্ফুট হইবে। পৃথক পৃথক কবি প্রণীত চিত্রদ্বয়ে ঠিক তাহাই হইয়াছে। ... শকুন্তলার সঙ্গে মিরন্দার তুলনা করা গেল - কিন্তু ইহাও দেখান গিয়াছে যে, শকুন্তলা ঠিক মিরন্দা নহে। কিন্তু মিরন্দার সহিত তুলনা করিলে শকুন্তলা চরিত্রের এক ভাগ বুঝা যায়।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পাদিত নবপর্যায়ের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ২য় বর্ষের (১৩০৯ বঙ্গাব্দ) আশ্বিন সংখ্যায় ‘শকুন্তলা’ নামের একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। পরে তিনি সেই প্রবন্ধটিকে তাঁর ‘প্রাচীন সাহিত্য’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই সুদীর্ঘ শকুন্তলা প্রবন্ধের মধ্যে লিখেছিলেন, “আমাদের সমালোচকেরা অনেক সময় নাটক-নভেল হইতে তাহার নায়ক ও নায়িকাকে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়া অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তাঁহাদের উৎকর্ষ-অপকর্ষ বিচার করিয়া থাকেন। আসামীকে কাঠ-গড়ার মধ্যে দাঁড় করাইয়া যে বিচার, সে বিচার কাব্যের নহে। তাহা রাজার বিচার, শাস্ত্রের বিচার, জ্ঞানের বিচার বা ধর্মনীতির, বিচার হইতে পারে, কিন্তু সাহিত্যের বিচার নহে। কাব্যের নায়িকাকে লজ্জা বেশি করিয়াছে বা কম করিয়াছে, কে আত্মত্যাগ বেশি দেখাইয়াছে বা কম দেখাইয়াছে, এ সমস্ত আলোচনা অধিকাংশ স্থলেই অনর্থক। ... মিরান্দার অগ্নিপরীক্ষা হয় নাই, সংসার জ্ঞানের সহিত তাঁহার আঘাত ঘটে নাই, - আমরা তাঁহাকে কেবল প্রথম অবস্থার মধ্যে দেখিয়াছি, শকুন্তলাকে কবি প্রথম হইতে শেষ অবস্থা পর্যন্ত দেখাইয়াছেন। এমন অবস্থার তুলনার সমালোচনা বৃথা। ... এই দুই কাব্যকে পাশাপাশি রাখিলে উভয়ের ঐক্য অপেক্ষা বৈসাদৃশ্যই বেশি ফুটিয়া উঠে।” রবীন্দ্রনাথ যদিও তাঁর প্রবন্ধের কোথাও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের বা বঙ্কিমচন্দ্রের নাম পর্যন্ত করেন নি, তবুও তাঁর এই কথাগুলি পড়ে মনে হতে পারে যে, তিনি হয়ত তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের পূর্বোক্ত প্রবন্ধটির কিছুটা প্রতিবাদ হিসাবেই উপরোক্ত কথাগুলি বলেছিলেন। মহাকবি ‘গ্যেটে’ কালিদাসের শকুন্তলা নাটক সম্বন্ধে বলেছিলেন, “কেহ যদি তরুণ বৎসরের ফুল ও পরিণত বৎসরের ফল, কেহ যদি মর্ত্য ও স্বৰ্গ একত্রে দেখিতে চায়, তবে শকুন্তলায় তাহা পাইবে।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শকুন্তলা’ প্রবন্ধে প্রধানতঃ গ্যেটের সেই বিখ্যাত উক্তিটি নিয়েই আলোচনা করেছিলেন, এবং ওই আলোচনার মাধ্যমে তিনি সেই উক্তির সার্থকতা দেখিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধের মাঝে মাঝে শকুন্তলা ও মিরন্দা চরিত্র নিয়ে আলোচনা করলেও, তিনি প্রধানতঃ সমগ্রভাবে শকুন্তলা নাটকের সঙ্গে ‘টেম্পেষ্ট’ নাটকেরই তুলনামূলক আলোচনা করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধটি অতি সংক্ষিপ্ত ছিল। তিনি তাঁর প্রবন্ধে প্রধানতঃ শকুন্তলা ও মিরন্দা উভয় চরিত্রের সরলতা, তাঁদের সেই সরলতার গুণগত পার্থক্য এবং সেই পার্থক্যের জন্য প্রণয়-নিবেদন ব্যাপারে কে কি ধরণের ব্যবহার করেছিলেন, সেসবই মূলতঃ আলোচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধটি অতি দীর্ঘ ছিল। কিন্তু তিনিও তাঁর প্রবন্ধে শকুন্তলা ও মিরন্দা চরিত্রের সরলতা, তাঁদের সরলতার তারতম্য এবং প্রণয়-নিবেদন ব্যাপারে শকুন্তলার ‘আভাষ-ইঙ্গিতের’ কথাও স্বীকার করে নিয়েছিলেন। শকুন্তলার সরলতা সম্বন্ধে তিনি তাঁর প্রবন্ধে একাধিকবার বলেছিলেন, “ইহা শকুন্তলার সরলতার নিদর্শন।” কিংবা, “ইহাও তাঁহার সরলতার নিদর্শন।” শকুন্তলা ও মিরন্দা উভয়েরই সরলতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “টেম্পেষ্টের মিরন্দা সরল মাধুর্যে গঠিত, কিন্তু সে সরলতার প্রতিষ্ঠা অজ্ঞতা-অনভিজ্ঞতার উপরে, - শকুন্তলার সরলতা অপরাধে, দুঃখে, অভিজ্ঞতায়, ধৈর্যে ও ক্ষমায় পরিপক্ক, গম্ভীর ও স্থায়ী।” রবীন্দ্রনাথ মিরন্দার সরল মাধুর্যের কথা বলেছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্রও

মিরন্দার সরলতার মাধুর্যের কথা বলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ শকুন্তলার সরলতার অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্রও শকুন্তলার অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বলেছিলেন, “শকুন্তলা সমাজ প্রদত্ত সংস্কার-সম্পন্না।” রবীন্দ্রনাথ কালিদাসের লেখনী-সংযমের প্রসঙ্গেই কথাটি বললেও, তিনি শকুন্তলার প্রেমালাপের ‘আভাষ-ইঙ্গিতের’ সম্বন্ধে বলেছিলেন, “দুষ্মন্ত শকুন্তলার মধ্যে যেটুকু প্রেমালাপ আছে, তাহা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তাহার অধিকাংশই আভাবে-ইঙ্গিতে ব্যক্ত হইয়াছে।” বঙ্কিমচন্দ্রও তাঁর প্রবন্ধে সেই একই কথাই বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “তাঁহার প্রণয় মূখে অব্যক্ত থাকিবে, কেবল লক্ষণেই ব্যক্ত হইবে।” আগেই বলা হয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথের ‘শকুন্তলা’ প্রবন্ধের কয়েকটি কথা পড়ে মনে হতে পারে যে, সেটা আদতে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘শকুন্তলা, মিরন্দা ও দেসদিমোনা’ প্রবন্ধের প্রতিবাদ। রবীন্দ্রজীবনীকার ‘প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়’ সেটাই মনে করে লিখেছিলেন, “তিনি (রবীন্দ্রনাথ) ‘শকুন্তলার’ একটি দীর্ঘ সমালোচনা লিখিলেন। এই সমালোচনা যথার্থ সাহিত্য-সমালোচনা। তবে এই সমালোচনাটি লিখিবার সময় কবির সম্মুখে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ অন্তর্গত ‘শকুন্তলা, মিরন্দা এবং দেসদিমোনা’ প্রবন্ধটি ছিল বলিয়া মনে হয়। বঙ্কিম শকুন্তলার চরিত্রের সহিত মিরন্দার (বা অভিজ্ঞান শকুন্তলার সহিত টেম্পেটের) যে তুলনা-মূলক আলোচনা করিয়াছিলেন, তাহারই অসংগতি এই সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথ বিস্তৃতভাবে দেখাইলেন। তিনি বলিলেন, ‘এই দুই কাব্যকে পাশাপাশি রাখিলে উভয়ের ঐক্য অপেক্ষ৷ বৈসাদৃশ্যই বেশি ফুটিয়া উঠে।’ আর বঙ্কিম লিখিয়াছিলেন যে, ‘কালিদাস ও সেক্সপীয়র পরামর্শ করিয়া শকুন্তলা ও মিরন্দা চরিত্র প্রণয়নে প্রবৃত্ত হয়েন নাই, অথচ একজনে দুইটি চিত্র প্রণীত করিলে যেরূপ হইত, ঠিক সেইরূপ হইয়াছে।’ দুই সাহিত্যিকের দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে পার্থক্য যে কত গভীর, তাহা উভয় প্রবন্ধ পাঠ না করা পর্যন্ত বুঝা যাইবে না, আর রবীন্দ্রনাথের যথার্থ সাহিত্য-বিদগ্ধ চিত্তের পরিচয়ও রহিয়া যাইবে অসম্পূর্ণ।” প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে যে প্রথমতঃ, বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধে কোথাও কোন অসংগতি নেই; এবং দ্বিতীয়তঃ,তিনি যে দুই সাহিত্যিকের দৃষ্টিভঙ্গীর গভীর পার্থক্যের কথা বলেছিলেন, সে সম্বন্ধে দেখা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা ‘যথার্থ সাহিত্য-সমালোচনা’ হলেও বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ক্ষুদ্র প্রবন্ধে শকুন্তলা ও মিরন্দার যে সরলতা ও তাঁদের সরলতার গুণগত পার্থক্যের কথা বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধে শকুন্তলা ও মিরন্দার সেই সরলতার কথাই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তৃতীয়তঃ, শকুন্তলা ও মিরন্দা চরিত্র সৃষ্টি সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, “একজনে দুইটি চিত্র প্রণীত করিলে যেরূপ হইত ঠিক সেইরূপ হইয়াছে।” শকুন্তলা ও মিরান্দা চরিত্রের সৃষ্টিতে দুটি চরিত্রে পার্থক্যের প্রসঙ্গেই বঙ্কিমচন্দ্র যে সেকথা বলেছিলেন, প্রভাতকুমার সম্ভবতঃ সেটা লক্ষ্য করেন নি। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধটি পড়লে দেখতে পাওয়া যায় যে, বঙ্কিমচন্দ্র শকুন্তলা ও মিরন্দা চরিত্রের সম্পূর্ণ সাদৃশ্যের কথা কখনোই বলেন নি। বরং ওই উভয় চরিত্রে যে বৈসাদৃশ্য বা স্বাতন্ত্র্য রয়েছে, সেই স্বাতন্ত্র্যের কথা চিন্তা করেই বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন যে, একজন কবি শকুন্তলা ও মিরন্দা উভয়ের স্বভাবের স্বাতন্ত্র্যের কথা জেনে ঐ দুটি চরিত্র সৃষ্টি করলে চরিত্র দুটি পরস্পরের স্বভাবের স্বাতন্ত্র্যবশতঃ যেমন আলাদা আলাদা হত, কালিদাস ও শেক্সপীয়র পরস্পরের মধ্যে আলোচন৷ না করলেও তাঁদের পরস্পরের সৃষ্ট চরিত্রে ঠিক সেটাই হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর বাল্যকালের ‘বঙ্গদর্শন’ পাঠের কথা উল্লেখ করে তাঁর ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছিলেন, “বঙ্গদর্শন যেন তখন আষাঢ়ের প্রথম বর্ষার মতো ‘সমাগতো রাজবদুন্নতধ্বনি”, এবং “মুষলধারে ভাববর্ষণে বঙ্গ-সাহিত্যের পূর্বাবহিনী পশ্চিমাবাহিনী সমস্ত নদী নির্ঝরিণী অকস্মাৎ পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হইয়া যৌবনের আনন্দবেগে ধাবিত হইতে লাগিল”, তেমনি তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিভিন্ন রচনাতেও বঙ্কিমের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটির উচ্চ প্রশংসাও করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সুবিখ্যাত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটি চার বছর (১২৭৯-১২৮২ বঙ্গাব্দ) ধরে সম্পাদনা করেছিলেন। ১২৮৪ বঙ্গাব্দে তিনি তাঁর ‘বঙ্গদর্শনের’ স্বত্ত্বটি একটি লিখিত দানপত্রের মাধ্যমে তাঁর মধ্যম ভ্রাতা ‘সঞ্জীবচন্দ্র’কে দান করে দিয়েছিলেন। সঞ্জীবচন্দ্র ১২৮৪ বঙ্গাব্দ থেকে পাঁচ বছর ধরে ‘বঙ্গদর্শন’ সম্পাদনা করেছিলেন। সঞ্জীবচন্দ্রের আমলে বঙ্কিমচন্দ্র কেবলমাত্র বঙ্গদর্শনে লিখিতেনই না, নিজের আমলের মত তখনও তিনি বঙ্গদর্শনের উপরে নজরও রাখতেন। সঞ্জীবচন্দ্রের সম্পাদনার কয়েক বছর পরে বঙ্কিমচন্দ্র ও সঞ্জীবচন্দ্রের জীবিতকালেই ‘শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের’ সম্পাদনায় ও পরিচালনায় আরেকবার ‘বঙ্গদর্শন’ প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র ও সঞ্জীবচক্রের বন্ধু ‘চন্দ্রনাথ বসু’ সেই সময়ে শ্রীশচন্দ্রকে বঙ্গদর্শন সম্পাদনার কাজে সাহায্য করতেন, এবং পরে তিনিই বঙ্গদর্শনের সম্পাদক হবেন বলে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু ওই সময়ে বঙ্গদর্শন দু’-তিন সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পরেই বঙ্কিমচন্দ্র লিখিত নির্দেশ দিয়ে বঙ্গদর্শন প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বঙ্গদর্শন পরিচালনার ব্যর্থতার সেই গ্লানি শ্রীশচন্দ্র অনেকদিন পর্যন্ত ভুলতে পারেন নি। তাই শেষে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য-উত্তরাধিকারী রবীন্দ্রনাথকেই বঙ্গদর্শন সম্পাদনার একমাত্র উত্তরাধিকারী চিন্তা করে, তাঁকেই বঙ্গদর্শন সম্পাদনা করবার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বন্ধু শ্রীশচন্দ্রের অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে বঙ্গদর্শনের সম্পাদক হতে সম্মত হয়েছিলেন, এবং ১৩০৮ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩১২ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেই নবপর্যায় বঙ্গদর্শন সম্পাদনা করতে গিয়ে, পত্রিকাটির ১ম বর্ষের ১ম সংখ্যার ‘সূচনা’য় বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর বঙ্গদর্শন সম্বন্ধে লিখেছিলেন, “যে নামকে বঙ্কিমচন্দ্র গৌরবান্বিত করিয়া গিয়াছেন, সে নামের মধ্যে সেই স্বর্গীয় প্রতিভার একটি শক্তি রহিয়া গিয়াছে। সেই শক্তি এখনও বঙ্গদেশ ও বঙ্গ-সাহিত্যের ব্যবহারে লাগিবে। সেই শক্তিকে আমরা বিনাশ হইতে দিতে পারি না। বর্তমানে ও ভবিষ্যতে এ পত্রের সম্পাদক যিনিই হউন না কেন, ‘বঙ্গদর্শন’ নামের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং বিরাজ করিতেছেন। ... সম্পাদক এ কথা ভুলিতে পারিবেন না যে, বঙ্গদর্শনের নামের মধ্যে বঙ্কিম স্বয়ং উপস্থিত থাকিয়া তাঁহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া আছেন। সেই বঙ্কিমের কঠিন আদর্শ ও কঠোর বিচার তাঁহাকে সর্বপ্রকার শৈথিল্য হইতে রক্ষা করিবে। ... লোকমনোমোহিনী বহুমুখী প্রতিভার বলে বঙ্গদর্শন প্রতিষ্ঠিত, মঙ্গলময়ের মঙ্গলাশীর্বাদে সে প্রতিষ্ঠা রক্ষিত হউক।” রবীন্দ্রনাথ তাঁহার ‘সমাজ’ নামক পুস্তকের অন্তর্গত ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “অধুনাতন কালে দেশের মধ্যে যাঁহারা সকলের চেয়ে বড়ো মনীষী তাঁহারা পশ্চিমের সঙ্গে পূর্বকে মিলাইয়া লইবার কাজেই জীবন যাপন করিয়াছেন। তাহার দৃষ্টান্ত রামমোহন রায়। ... দক্ষিণ ভারতে রাণাডে পূর্ব-পশ্চিমের সেতুবন্ধন কাজে জীবন যাপন করিয়াছেন। ... অল্পদিন পূর্বে বাঙ্গলা দেশের যে মহাত্মার মৃত্যু হইয়াছে, সেই বিবেকানন্দও পূর্ব ও পশ্চিমকে দক্ষিণে ও বামে রাখিয়া মাঝখানে দাঁড়াইতে পারিয়াছিলেন। … একদিন বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শনে যেদিন অকস্মাৎ পূর্ব-পশ্চিমের মিলন যজ্ঞ আহ্বান করিলেন - সেইদিন হইতে বঙ্গ-সাহিত্য মহাকালের অভিপ্রায়ে যোগদান করিয়া সার্থকতার পথে দাড়াইল। বঙ্গ-সাহিত্য যে দেখিতে দেখিতে এমন বুদ্ধিলাভ করিয়া উঠিতেছে, তাহার কারণ এ সাহিত্য কৃত্রিম বন্ধন ছেদন করিয়াছে, যাহাতে বিশ্ব-সাহিত্যের সহিত ইহার ঐক্যের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। ইহা ক্রমশই এমন করিয়া রচিত হইয়া উঠিয়াছে, যাহাতে পশ্চিমের জ্ঞান ও ভাব ইহা সহজে আপনারই করিয়া গ্রহণ করিতে পারে। বঙ্কিম যাহা রচনা করিয়াছেন, কেবল তাহার জন্যই যে তিনি বড়ো তাহা নহে, তিনিই বাংলা সাহিত্যে পূর্ব-পশ্চিমের আদান- প্রদানের রাজপথকে প্রতিভাবলে ভালো করিয়া মিলাইয়া দিতে পারিয়াছেন। এই মিলনতত্ত্ব বাংলা সাহিত্যের মাঝখানে প্রতিষ্ঠিত হইয়া ইহার সৃষ্টিশক্তিকে জাগ্রত করিয়া তুলিয়াছে।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিক্ষার হের-ফের’ প্রবন্ধের মধ্যে এক জায়গায় বলেছিলেন, “যখন প্রথম বঙ্কিমবাবুর ‘বঙ্গদর্শন’ একটি নূতন প্রভাতের মতো আমাদের দেশে উদিত হইয়াছিল, তখন দেশের সমস্ত শিক্ষিত অন্তর্জগৎ কেন এমন একটি অপূর্ব আনন্দে জাগ্রত হইয়া উঠিয়াছিল! য়ুরোপের দর্শনে বিজ্ঞানে ইতিহাসে যাহা পাওয়া যায় না, এমন কোনো নূতন তত্ত্ব নূতন আবিষ্কার বঙ্গদর্শন কি প্রকাশ করিয়াছিল! তাহা নহে। বঙ্গদর্শনকে অবলম্বন করিয়া একটি প্রবল প্রতিভা আমাদের ইংরেজী শিক্ষা ও আমাদের অন্তঃকরণের মধ্যবর্তী ব্যবধান ভাঙিয়া দিয়াছিল - বহুকাল পরে প্রাণের সহিত ভাবের একটি আনন্দ সম্মিলন সংঘটন করিয়াছিল। প্রবাসীকে গৃহের মধ্যে আনিয়া আমাদের গৃহকে উৎসবে উজ্জ্বল করিয়া তুলিয়াছিল। এখন আমাদের গৃহে, আমাদের সমাজে, আমাদের অন্তরে একটা নূতন জ্যোতি বিকীর্ণ হইল। আমরা আমাদের ঘরের মেয়েকে সূর্যমুখী কমলমণিরূপে দেখিলাম, চন্দ্রশেখর এবং প্রতাপ বাঙালী পুরুষকে একটা উচ্চতর ভাবলোকে প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিল। আমাদের প্রতিদিনের ক্ষুদ্র জীবনের উপরে একটি মহিমরশ্মি নিপতিত হইল। বঙ্গদৰ্শন সেই যে এক অনুপম নূতন আনন্দের আস্বাদ দিয়া গেছে তাহার ফল হইয়াছে যে, আজকালকার শিক্ষিত লোক বাংলা ভাষায় ভাব প্রকাশ করিবার জন্য উৎসাহী হইয়া উঠিয়াছে।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সাহিত্যের পথে’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘বাংলা-সাহিত্যের ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন,

“বঙ্গদর্শন মাসিকপত্র দেখা দিল। তখন থেকে বাঙালীর চিত্তে নব্য বাংলা-সাহিত্যের অধিকার দেখতে দেখতে অবারিত হল সর্বত্র। ইংরেজি ভাষায় যারা প্রবীন তাঁরাও একে সবিস্ময়ে স্বীকার করে নিলেন।”

রবীন্দ্রনাথ কেবলমাত্র তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধেই নয়, তাঁর উপন্যাসের মধ্যেও বঙ্গদর্শনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। যেমন, তিনি তাঁর ‘গোরা’ উপন্যাসের এক জায়গায় লিখেছিলেন, “বিনয় নূতন-প্রকাশিত বঙ্কিমের ‘বঙ্গদর্শন’ লইয়া আনন্দময়ীকে শুনাইতেছিল। …”

(তথ্যসূত্র:

১- বঙ্কিম-প্রসঙ্গ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত।

২- রবীন্দ্রজীবনী, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

৩- বঙ্কিমচন্দ্র: জীবন ও সাহিত্য, গোপালচন্দ্র রায়।

৪- রবীন্দ্র রচনাবলী।

মন্তব্য করুন