Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৫ এপ্রিল, ২০২৩ ০২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং এ দ্বারা বিচিত্র বর্ণের ফল-মূল উদগত করেন। [1] পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ; সাদা, লাল ও মিসমিসে কালো।-আল কুরআন


তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং এ দ্বারা বিচিত্র বর্ণের ফল-মূল উদগত করেন। [1] পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ; সাদা, লাল ও মিসমিসে কালো।-আল কুরআন

وَ لَا الظِّلُّ وَ لَا الۡحَرُوۡرُ

সূরাঃ   ফাতির   আয়াতঃ  ২১-৩০

আর সমান নয় ছায়া ও রৌদ্র, আল-বায়ান

আর ছায়া ও রোদও (সমান নয়)। তাইসিরুল

ছায়া ও রোদ, মুজিবুর রহমান

Nor are the shade and the heat, Sahih International

২১. আর না ছায়া ও রোদ,

তাফসীরে জাকারিয়া

(২১) সমান নয় ছায়া ও রৌদ্র [1]

[1] এটা প্রতিদান ও শাস্তি বা জান্নাত ও জাহান্নামের উদাহরণ।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

:২২ وَ مَا یَسۡتَوِی الۡاَحۡیَآءُ وَ لَا الۡاَمۡوَاتُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یُسۡمِعُ مَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَ مَاۤ اَنۡتَ بِمُسۡمِعٍ مَّنۡ فِی الۡقُبُوۡرِ  

আর জীবিতরা ও মৃতরা এক নয়;* নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনাতে পারেন, কিন্তু যে ব্যক্তি কবরে আছে তাকে তুমি শুনাতে পারবে না। আল-বায়ান

* এই আয়াত ও আগের কয়েকটি আয়াতে ঈমান ও কুফরীকে নানা উপমায় চিত্রিত করা হয়েছে; ঈমান হল দৃষ্টিশক্তি, আলো, সুশীতল ছায়া আর প্রাণবন্ত জীবনের ন্যায়। পক্ষান্তরে কুফরী হল অন্ধত্ব, অন্ধকার, প্রচন্ড খরতাপ আর মৃত্যুতুল্য।

২২. এবং সমান নয় জীবিত ও মৃত। নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছে শোনান; আর আপনি শোনাতে পারবেন না যারা কবরে রয়েছে তাদেরকে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২২) এবং সমান নয় জীবিত ও মৃত।[1] আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শ্রবণ করান; [2] আর তুমি মৃতকে শোনাতে পার না। [3]

[1] أحياء থেকে উদ্দেশ্য হল ঈমানদার মানুষ এবং أموات থেকে উদ্দেশ্য হল কাফের ও অবিশ্বাসী মানুষ অথবা আলেম ও জাহেল অথবা জ্ঞানী ও অজ্ঞ মানুষ।

[2] অর্থাৎ, আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করতে চান এবং জান্নাত যার ভাগ্যে থাকে, তাকে দলীল শ্রবণ ও তা গ্রহণ করার সুমতি দান করেন।

[3] অর্থাৎ, যেরূপ কবরে মৃত ব্যক্তিকে কোন কথা শুনানো যায় না, অনুরূপ কুফরী ও অবিশ্বাস যাদের অন্তরকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে, হে নবী! তুমি তাদেরকে সত্যের বাণী শুনাতে পারবে না। উদ্দেশ্য এই যে, যেমন মৃত্যু ও কবরে দাফন হওয়ার পর মৃতব্যক্তি কোন উপকার লাভ করতে পারে না, তেমনি কাফের ও মুশরিক; যাদের জীবনে দুর্ভাগ্য লিপিবদ্ধ আছে, দাওয়াত ও তবলীগ দ্বারা তাদের কোন উপকার হয় না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

২৩ اِنۡ اَنۡتَ اِلَّا نَذِیۡرٌ

তুমি তো একজন সতর্ককারী বৈ কিছু নও। আল-বায়ান

তুমি তো কেবল একজন সতর্ককারী। তাইসিরুল

তুমি একজন সতর্ককারী মাত্র। মুজিবুর রহমান

You, [O Muhammad], are not but a warner. Sahih International

২৩. আপনি তো একজন সতর্ককারী মাত্র।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৩) তুমি একজন সতর্ককারী মাত্র। [1]

[1] অর্থাৎ, তোমার কাজ হল দাওয়াত ও তবলীগ করা। কারো সুপথ পাওয়া বা না পাওয়া কেবল আল্লাহর এখতিয়ারে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

২৪ اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ بِالۡحَقِّ بَشِیۡرًا وَّ نَذِیۡرًا ؕ وَ اِنۡ مِّنۡ اُمَّۃٍ اِلَّا خَلَا فِیۡهَا نَذِیۡرٌ  

আমি তোমাকে সত্যসহ পাঠিয়েছি সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে; আর এমন কোন জাতি নেই যার কাছে সতর্ককারী আসেনি। আল-বায়ান

২৪. নিশ্চয় আমরা আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে; আর এমন কোন উম্মত নেই যার কাছে গত হয়নি সতর্ককারী।(১)

(১) একথাটি কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, দুনিয়ায় এমন কোন জাতি ও সম্প্রদায় অতিক্রান্ত হয়নি যাকে সত্য-সঠিক পথের সন্ধান দেবার জন্য আল্লাহ কোন নবী পাঠাননি। আরো বলা হয়েছে, “আর প্রত্যেক জাতির জন্য রয়েছে হেদায়াতকারী”। [সূরা আর-রাদ: ৭] অন্যত্র বলা হয়েছে, আর আপনার আগে আমরা আগেকার অনেক সম্প্রদায়ের কাছে রাসূল পাঠিয়েছিলাম। [সূরা আল হিজর: ১০] অন্য সূরায় বলা হয়েছে, আল্লাহর ইবাদাত করার ও তাগূতকে বর্জন করার নির্দেশ দেয়ার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি। [সূরা আন-নাহল: ৩৬] অন্যত্র বলা হয়েছে, আর আমরা এমন কোন জনপদ ধ্বংস করিনি। যার জন্য সতর্ককারী ছিল না। [সূরা আশ-শূ'আরা: ২০৮]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৪) আমি তো তোমাকে সত্যসহ সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; এমন কোন সম্প্রদায় নেই যার নিকট সতর্ককারী প্রেরিত হয়নি।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

২৫ وَ اِنۡ یُّکَذِّبُوۡکَ فَقَدۡ کَذَّبَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ ۚ جَآءَتۡهُمۡ رُسُلُهُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ وَ بِالزُّبُرِ وَ بِالۡکِتٰبِ الۡمُنِیۡرِ  

আর তারা যদি তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে তবে তাদের পূর্বে যারা ছিল তারাও মিথ্যাবাদী বলেছিল; তাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণাদি, গ্রন্থাবলী ও আলোকদীপ্ত কিতাবসহ রাসূলগণ এসেছিলেন। আল-বায়ান

২৫. আর তারা যদি আপনার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তবে এদের পূর্ববর্তীরাও তো মিথ্যা আরোপ করেছিল—তাদের কাছে এসেছিল তাদের রাসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমাণাদি, গ্রন্থাদি ও দীপ্তিমান কিতাবসহ।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৫) এরা যদি তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করে, তবে এদের পূর্ববর্তিগণও তো মিথ্যা মনে করেছিল। তাদের নিকট তাদের রসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী, অবতীর্ণ গ্রন্থ ও দীপ্তিমান গ্রন্থ সহ এসেছিল।[1

[1] যাতে কোন জাতি এই কথা বলতে না পারে যে, ঈমান ও কুফরী কি তা আমরা জানতামই না, কারণ আমাদের নিকট কোন পয়গম্বরই আসেনি। যার জন্য আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক উম্মতের নিকট নবী প্রেরণ করেছেন। স্পষ্ট দলীল স্বরূপ দেখুনঃ সূরা ইউনুস ৪৭ আয়াত, রা’দ ৭ আয়াত, নাহল ৩৬ আয়াত, ফাত্বির ২৪ আয়াত।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

:২৬ ثُمَّ اَخَذۡتُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَکَیۡفَ کَانَ نَکِیۡرِ ﴿

তারপর যারা কুফরী করেছিল তাদেরকে আমি পাকড়াও করেছিলাম; অতএব কেমন ছিল আমার শাস্তি?! আল-বায়ান

২৬. তারপর যারা কুফরি করেছিল আমি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিলাম। সুতরাং (দেখে নিন) কেমন ছিল আমার প্রত্যাখ্যান (শাস্তি)!

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৬) অতঃপর আমি অবিশ্বাসীদেরকে পাকড়াও করেছিলাম। সুতরাং কেমন (ভয়ঙ্কর) ছিল আমার প্রতিকার (শাস্তি)! [1]

[1] অর্থাৎ, কত কঠিন শাস্তি দ্বারা আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি এবং তাদেরকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।

:২৭ اَلَمۡ تَرَ اَنَّ اللّٰهَ اَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً ۚ فَاَخۡرَجۡنَا بِهٖ ثَمَرٰتٍ مُّخۡتَلِفًا اَلۡوَانُهَا ؕ وَ مِنَ الۡجِبَالِ جُدَدٌۢ بِیۡضٌ وَّ حُمۡرٌ مُّخۡتَلِفٌ اَلۡوَانُهَا وَ غَرَابِیۡبُ سُوۡدٌ

তুমি কি দেখনি আল্লাহ আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন, তারপর তা দিয়ে আমি বিচিত্র বর্ণের ফলমূল উৎপাদন করি আর পাহাড়ের মধ্যে রয়েছে নানা বর্ণের শুভ্র ও লাল পথ এবং (কিছু) মিশকালো। আল-বায়ান

২৭. আপনি কি দেখেন না, আল্লাহ্ আকাশ হতে বৃষ্টিপাত করেন; তারপর আমরা তা দ্বারা বিচিত্র বর্ণের ফলমূল উদগত করি। আর পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ—শুভ্ৰ, লাল ও নিকষ কাল।(১)

(১) পর্বতের ক্ষেত্রে جدد বলা হয়েছে। جدد শব্দটি جدة এর বহুবচন। এর প্রসিদ্ধ অর্থ ছোট গিরিপথ। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] কেউ কেউ جدد এর অর্থ নিয়েছেন অংশ বা খণ্ড। [ফাতহুল কাদীর] উভয় অবস্থায় এর উদ্দেশ্য, পাহাড়ের বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন বর্ণবিশিষ্ট হওয়া। এতে সর্বপ্রথম সাদা ও সর্বশেষে কাল রং উল্লেখ করা হয়েছে। মাঝখানে লাল উল্লেখ করে حمرٌ বলা হয়েছে। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৭) তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং এ দ্বারা বিচিত্র বর্ণের ফল-মূল উদগত করেন। [1] পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ; সাদা, লাল ও মিসমিসে কালো। [2]

[1] অর্থাৎ, যেমন মু’মিন ও কাফের, সৎ ও অসৎ দুই শ্রেণীর মানুষ আছে। অনুরূপ অন্য সৃষ্টিতেও পার্থক্য এবং ভেদাভেদ আছে। যেমন ফলের বিভিন্ন রং আছে এবং স্বাদ ও গন্ধ এক অপর থেকে ভিন্ন ভিন্ন। এমন কি একই ফলের কয়েক প্রকার রং ও স্বাদ আছে; যেমন খেজুর, আঙ্গুর, আপেল ইত্যাদি।

[2] অনুরূপ পাহাড় ও তার অংশ বা রাস্তা বিভিন্ন রঙের আছে, সাদা, লাল ও ঘন কালো। جُدَدٌ جِدَّةٌ এর বহুবচন, অর্থ রাস্তা বা দাগ غَرَابِيْبُ-غِرْبِيْبٌ এর বহুবচন এবং سُوْدٌ- أَسْوَدٌ এর বহুবচন। যখন কালো রঙের ঘনত্ব ও গাঢ়তা প্রকাশ করার জন্য أسود শব্দের সাথে غرابيب শব্দটি ব্যবহার করা হয়।أسود غربيب যার অর্থ দাঁড়ায় কুচকুচে বা মিসমিসে কালো।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

:২৮ وَ مِنَ النَّاسِ وَ الدَّوَآبِّ وَ الۡاَنۡعَامِ مُخۡتَلِفٌ اَلۡوَانُهٗ کَذٰلِکَ ؕ اِنَّمَا یَخۡشَی اللّٰهَ مِنۡ عِبَادِهِ الۡعُلَمٰٓؤُا ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیۡزٌ غَفُوۡرٌ

আর এমনিভাবে মানুষ, বিচরণশীল প্রাণী ও চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যেও রয়েছে নানা বর্ণ। বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল। আল-বায়ান

২৮. আর মানুষের মাঝে, জন্তু ও গৃহপালিত জানোয়ারের মাঝেও বিচিত্র বর্ণ রয়েছে অনুরূপ। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই কেবল তাকে ভয় করে(১); নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।

(১) বলা হয়েছে যে, কেবল আলেম ও জ্ঞানীগণই আল্লাহকে ভয় করে। আল্লাহর শক্তিমত্তা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞানময়তা, ক্ৰোধ, পরাক্রম, সার্বভৌম কর্তৃত্ব-ক্ষমতা ও অন্যান্য গুণাবলী সম্পর্কে যে ব্যক্তি যতবেশী জানবে সে ততবেশী তাঁর নাফরমানী করতে ভয় পাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর ব্যাপারে যতবেশী অজ্ঞ হবে সে তাঁর ব্যাপারে তত বেশী নির্ভীক হবে। এ আয়াতে জ্ঞান অর্থ দৰ্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অংক ইত্যাদি স্কুল-কলেজে পঠিত বিষয়ের জ্ঞান নয়। বরং এখানে জ্ঞান বলতে আল্লাহর গুণাবলীর জ্ঞান বুঝানো হয়েছে। এ জন্য শিক্ষিত ও অশিক্ষিত হবার প্রশ্ন নেই। তাই আয়াতে العلماء বা ‘উলামা’ বলে এমন লোকদের বোঝানো হয়েছে, যারা আল্লাহ্ তা'আলার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে সম্যক অবগত এবং পৃথিবীর সৃষ্টবস্তু সামগ্ৰী, তার পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও আল্লাহর দয়া-করুণা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেন।

কেবল আরবী ভাষা, ব্যাকরণ-অলংকারাদি সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তিকেই কুরআনের পরিভাষায় ‘আলেম’ বলা হয় না। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে না সে যুগের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হলেও এ জ্ঞানের দৃষ্টিতে সে নিছক একজন মুর্খ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণাবলী জানে এবং নিজের অন্তরে তাঁর ভীতি পোষণ করে সে অশিক্ষিত হলেও জ্ঞানী। তবে কারও ব্যাপারে তখনই এ আয়াতটির প্রয়োগ ক্ষেত্রে পরিণত হবে যখন তাদের মধ্যে আল্লাহভীতি থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এক হাদীসে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, “যদি আমি যা জানি তা তোমরা জানতে তবে হাসতে কম কাঁদতে বেশী।” [বুখারী: ৬৪৮৬, মুসলিম: ২৩৫৯]

এর কারণ, রাসূল আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী জানেন, তার তাকওয়াও সবচেয়ে বেশী। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একথাই বলেছেন, “বিপুল সংখ্যক হাদীস জানা জ্ঞানের পরিচায়ক নয় বরং বেশী পরিমাণ আল্লাহভীতিই জ্ঞানের পরিচয় বহন করে।” ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, “তারাই হচ্ছে আলেম যারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ সবকিছুর উপর শক্তিমান।” তিনি আরও বলেছেন, “সেই ব্যক্তি রহমান সম্পর্কে আলেম যিনি তাঁর সাথে কাউকে শরীক করেন নি, তাঁর হালালকে হালাল করেছেন, হারামকে হারাম করেছেন, তাঁর অসীয়ত বা নির্দেশাবলীর পূর্ণ হিফাযত করেছেন, আর বিশ্বাস করেছেন যে, একদিন তাকে তার সাথে সাক্ষাত করতে হবে এবং তার যাবতীয় কর্মকাণ্ডের হিসাব দিতে হবে।”

হাসান বাসরী রাহেমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহকে না দেখে বা একান্তে ও জনসমক্ষে যে ভয় করে সেই হচ্ছে আলেম। আল্লাহ যা কিছু পছন্দ করেন সেদিকেই আকৃষ্ট হয় এবং যে বিষয়ে আল্লাহ নারাজ সে ব্যাপারে সে কোন আগ্রহ পোষণ করে না।” সুফিয়ান সাওরী বর্ণনা করেন যে, জ্ঞানী তিন ধরনের হয়। এক, আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক অবগত, তাঁর নির্দেশ সম্পর্কেও জ্ঞানী। দুই, আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক অবগত, কিন্ত তাঁর নির্দেশ সম্পর্কে অজ্ঞ। তিন, আল্লাহর নির্দেশ সম্পর্কে জ্ঞানী, কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞ। সুতরাং যে আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক অবগত ও তার নির্দেশ সম্পর্কেও জ্ঞানী সে হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহকে ভয় করে এবং আল্লাহর ফরয ওয়াজিবের সীমারেখা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে।

আর যে আল্লাহর নির্দেশ সম্পর্কে জ্ঞানী কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞ সে হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহকে ভয় করে কিন্তু তাঁর ফরয ওয়াজিবের সীমারেখা সম্পর্কে জ্ঞান রাখেনা। আর যে আল্লাহর নির্দেশ সম্পর্কে জ্ঞানী অথচ তাঁর সম্পর্কে জ্ঞান রাখেনা সে এ ব্যক্তি যে, আল্লাহকে ভয় করে না। কিন্তু আল্লাহর ফরয ওয়াজিবের সীমারেখা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। সারকথা, যার মধ্যে যে পরিমাণ আল্লাহ ভীতি হবে, সে সেই পরিমাণ আলেম হবে। আহমদ ইবনে সালেহ মিসরী বলেন, অধিক বর্ণনা ও অধিক জ্ঞান দ্বারা আল্লাহভীতির পরিচয় পাওয়া যায় না; বরং কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ দ্বারা এর পরিচয় পাওয়া যায়। সুতরাং যার মধ্যে আল্লাহভীতি নেই, সে আলেম নয়। [দেখুন: তাবারী; বাগভী; কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৮) এভাবে রঙ-বেরঙের মানুষ, জন্তু ও গৃহপালিত পশু রয়েছে।[1] আল্লাহর দাসদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে থাকে। [2] নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, বড় ক্ষমাশীল। [3]

[1] অর্থাৎ, মানুষ এবং জীব-জন্তুও সাদা, লাল, কালো এবং হলুদ রঙের হয়।

[2] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার এই সব ক্ষমতা এবং তাঁর কর্ম-নিপুণতা একমাত্র তারাই বুঝতে সক্ষম, যারা জ্ঞানী। অবশ্য এই জ্ঞানী বলতে কুরআন ও সুন্নাহ এবং আল্লাহ সম্পর্কীয় নানা রহস্যের জ্ঞানী। বলা বাহুল্য তাঁরা যত আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন, ততই আল্লাকে ভয় করেন। সুতরাং যার মধ্যে আল্লাহ-ভীতি নেই, জেনে রাখুন যে, সে সঠিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। সুফ্য়ান সাওরী বলেন, আলেম তিন প্রকারের; প্রথমঃ আলেম বিল্লাহ অআলেম বিআমরিল্লাহ। এই প্রকার আলেম হলেন তাঁরা, যাঁরা আল্লাহকে ভয় করেন এবং তাঁর হদ্দ্ ও ফারায়েযের জ্ঞান রাখেন। দ্বিতীয়ঃ আলেম বিল্লাহ, এঁরা আল্লাহকে ভয় তো করেন; কিন্তু তাঁর হদ্দ্ ও ফারায়েয সম্পর্কে অবগত নন। তৃতীয়ঃ আলেম বিআমরিল্লাহ, এঁরা আল্লাহর হদ্দ্ ও ফারায়েয সম্পর্কে তো অবগত; কিন্তু আল্লাহ-ভীতি থেকে বঞ্চিত। (ইবনে কাসীর)

[3] এটি আল্লাহকে ভয় করার একটি কারণ যে, তিনি অবাধ্যকে শাস্তি ও তওবাকারীর গুনাহ ক্ষমা করতে সক্ষম।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

:২৯ اِنَّ الَّذِیۡنَ یَتۡلُوۡنَ کِتٰبَ اللّٰهِ وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اَنۡفَقُوۡا مِمَّا رَزَقۡنٰهُمۡ سِرًّا وَّ عَلَانِیَۃً یَّرۡجُوۡنَ تِجَارَۃً لَّنۡ تَبُوۡرَ

নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন করে, সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহ যে রিয্ক দিয়েছেন তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করতে পারে যা কখনো ধ্বংস হবে না। আল-বায়ান

২৯. নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং সালাত কায়েম করে, আর আমরা তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করে এমন ব্যবসায়ের, যার ক্ষয় নেই।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৯) নিশ্চয় যারা আল্লাহর গ্রন্থ পাঠ করে,[1] যথাযথভাবে নামায পড়ে,[2] আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; [3] তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যাতে কখনোই নোকসান হবে না। [4]

[1] ‘আল্লাহর গ্রন্থ’র অর্থ হল কুরআন কারীম। ‘পাঠ করে’ অর্থাৎ, নিয়মিত তা গুরুত্ব সহকারে পাঠ করে।

[2] ইক্বামাতে স্বালাতের অর্থ হল, নামায যেভাবে কায়েম ও প্রতিষ্ঠিত করতে বলা হয়েছে, ঠিক সেইভাবে কায়েম ও প্রতিষ্ঠিত করা। অর্থাৎ, তার সময়ের যথাযথ খেয়াল রাখা, আরকানসমূহ পূর্ণভাবে ধীর-স্থিরতার সাথে আদায় করা এবং বিনয় ও নম্রতার সাথে যত্ন সহকারে তা আদায় করা।

[3] অর্থাৎ, দিবারাত্রি প্রকাশ্যে ও গোপনে উভয় পদ্ধতিতে প্রয়োজন মত খরচ করে। অনেকের নিকট গোপনে বলতে নফল দান এবং প্রকাশ্যে বলতে ওয়াজেব দান (যাকাত)-কে বুঝানো হয়েছে।

[4] অর্থাৎ, এই শ্রেণীর মানুষদের প্রতিদান আল্লাহর নিকট সুনিশ্চিত, যাতে নোকসান ও হ্রাস পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

:৩০ لِیُوَفِّیَهُمۡ اُجُوۡرَهُمۡ وَ یَزِیۡدَهُمۡ مِّنۡ فَضۡلِهٖ ؕ اِنَّهٗ غَفُوۡرٌ شَکُوۡرٌ

যাতে তিনি তাদেরকে তাদের পূর্ণ প্রতিফল দান করেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে আরো বাড়িয়ে দেন। নিশ্চয় তিনি অতি ক্ষমাশীল, মহাগুণগ্রাহী। আল-বায়ান

কারণ, তিনি তাদেরকে তাদের প্রতিফল পূর্ণমাত্রায় দান করবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো বেশি দিবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, (ভাল কাজের) বড়ই মর্যাদাদানকারী। তাইসিরুল

এ জন্য যে, আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দিবেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে আরো বেশি দিবেন। তিনিতো ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। মুজিবুর রহমান

That He may give them in full their rewards and increase for them of His bounty. Indeed, He is Forgiving and Appreciative. Sahih International

৩০. যাতে আল্লাহ তাদের কাজের প্রতিফল পরিপূর্ণভাবে দেন এবং তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে আরো বেশী দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম গুণগ্ৰাহী।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩০) এ জন্য যে, আল্লাহ তাদেরকে (তাদের কর্মের) পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে আরও বেশী দেবেন। [1] তিনি তো ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। [2]

[1] لِيُوَفِّيَهُمْ , لَنْ تَبُوْرَ এর সাথে সম্পৃক্ত, অর্থাৎ এই ব্যবসা নোকসান থেকে এই জন্য মুক্ত যে, আল্লাহ তাআলা তাদের নেক আমলের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন। অথবা ঊহ্য ক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত, আর তার অর্থ এই হবে যে, তারা নেক আমল এই জন্য করে অথবা আল্লাহ তাদেরকে সুপথ এই জন্য প্রদর্শন করেছেন, যাতে তিনি তাদেরকে প্রতিদান দেন।

[2] এই বাক্য দ্বারা পূর্ণ প্রতিদান ও আরো বেশী দেওয়ার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি মু’মিন বান্দাদের গুনাহ ক্ষমাকারী এই শর্তের উপর যে, তারা বিশুদ্ধ অন্তরে তওবা করবে। তিনি তাদের আনুগত্যের স্পৃহা ও নেক আমলের কদর বুঝেন; তিনি গুণগ্রাহী। তাই তিনি শুধু প্রাপ্য প্রতিদান দিয়েই ক্ষান্ত হবেন না; বরং নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অনেক বেশি প্রদান করবেন।

মন্তব্য করুন

ব্লগ