Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ এপ্রিল, ২০২৩ ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে পাঠ দান করা। বেশি বেশি করে রিডিং পড়লে খুব সহজেই সাব্অলিল পাঠক হবে।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শেখার পত্তন’। রামনিধি গুপ্ত বলেছেন, ‘নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষা পুরে কি আশা’। তাছাড়া ‘Exposure’ এবং ‘Contextual Clarity’ ইংরেজি এই শব্দ দুটি পৃথিবীর বিখ্যাত শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীদের দ্বারা পরীক্ষিত ও ব্যবহৃত। Exposure শব্দের অর্থ হলো প্রকাশ/প্রভাবিত করা/উদঘাটন/অভিজ্ঞতার অনুশীলনের সুযোগ। আর Contextual Clarity শব্দের মানে হলো কোনো বিষয়কে দেখে, শুনে এবং অনুভবের সমম্বয় শেখা। এই দুই বিষয়ের সমন্বয় হলেই কেবল প্রকৃত শিক্ষালাভ সম্ভব।


প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম বাহন মাতৃভাষা। কিন্তু আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের বেশিরভাগ শিশুর বাংলায় পঠন দক্ষতা প্রত্যাশিত মানে পৌঁছুতে পারছে না। পেশাগত কারণে মাঝে মাঝে কর্মসহায়ক গবেষণা পরিচালনা করতে হয়। ‘বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও কেন আমাদের শিশুরা বাংলা সাবলীলভাবে পড়তে পারে না : সমস্যাসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক একটি কর্মসহায়ক গবেষণা পরিচালনা করি। প্রথম শ্রেণী থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিশুদের বাংলা বিষয়ে পাঠগত অবস্থান নির্ণয় করার জন্য শ্রেণী ভিত্তিক কিছু মূল্যায়ন-উপকরণ/টুলস তৈরি করে কয়েক মাসব্যাপী বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ কর্মসহায়ক গবেষণা সম্পাদন করি। মূল্যায়ন-উপকরণ তৈরির ক্ষেত্রে শ্রেণিভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতাগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের পাঠগত অবস্থান নির্ধারণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাবলীল পাঠক তৈরিতে আমাদের করণীয় বিষয়েও অভিজ্ঞ শিক্ষক ও বাংলা বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করা হয় এবং মতামত ও পরামর্শ/সুপারিশ নেয়া হয়।


দেখা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের একটা বড় অংশ ঠিকমতো বাংলা পড়তে ও লিখতে পারে না। নিজ মাতৃভাষায় দুর্বলতার কারণে ছাত্রছাত্রীদের অন্যান্য পাঠ্য বিষয়েও কাক্সিক্ষত যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। বাংলা বিষয়ে ফলাফল ভালো না হলে বাংলায় লিখিত অন্যান্য বিষয়, যেমন- বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, প্রাথমিক বিজ্ঞান, ধর্ম ও মৌলিক শিক্ষা, প্রাথমিক গণিত ইত্যাদি বিষয়েও তাদের অবস্থান ভালো নেই।


কর্মসহায়ক গবেষণায় পাওয়া তথ্য ও উপাত্ত থেকে বাংলা পঠনের ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সাধারণত যে সব সমস্যা চিহ্নিত হয় সেগুলো হলো- কিছু ছাত্র বর্ণ চেনে না, কিছু ছাত্র বানান করতে পারে কিন্তু উচ্চারণ করতে পারে না, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যে বানান করে পড়ার প্রবণতা, অনেকে বানান করে কিন্তু উচ্চারণ হয় ভিন্ন, অনেক শিক্ষার্থীর পড়ার ক্ষেত্রে জড়তা দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী একই শব্দ বারবার উচ্চারণ করে, অনেকের ‘কার’ চিহ্ন ব্যবহার করে শব্দ উচ্চারণে অসুবিধা হয়, অনেক শিশুর দীর্ঘ শব্দ বানান করে উচ্চারণ করতে অসুবিধা হয়, অনেকে শব্দের শেষের বর্ণ উচ্চারণ করে না, অনেক শিক্ষার্থী বর্ণ সঠিকভাবে চিনতে পারে না, কিন্তু মুখস্ত উচ্চারণ করতে পারে। আবার অনেকে কার চিহ্ন চিনতেই পারে না।


দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সাধারণত যে সব পঠন সমস্যা হয় সেগুলো হলো- অনেকের ‘কার’ চিহ্ন দিয়ে উচ্চারণ সঠিক হয় না, কিছু শিক্ষার্থী শব্দের সঙ্গে নতুন বর্ণ বা শব্দ যোগ করে পড়ে, অনেকে বানান করে পড়ে, কারও কারও যুক্ত অক্ষর উচ্চারণ করে পড়তে সমস্যা হয়। আবার অনেকের বর্ণ সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণা, পড়ার ক্ষেত্রে জড়তা থাকা, শব্দ ছেড়ে ছেড়ে পড়া, একই শব্দ বারবার পড়া- এ ধরনের সমস্যাও দেখা যায়। অনেকে আবার একেবারে পড়তেই পারে না। কিছু শিক্ষার্থী সঠিক উচ্চারণ করতে পারে না, কঠিন শব্দ বাদ দিয়ে পড়ে, অনেকে পড়া মুখস্থ করে কিন্তু শব্দ চেনে না। আবার অনেকের মধ্যে সম্পূর্ণ বাক্য মুখস্ত করার প্রবণতা দেখা যায়- স্বাভাবিক গতিতে পড়তে পারে না।


তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সাধারণত যে সব পঠন সমস্যা হয় সেগুলো হলো- অনেকে স্পষ্ট উচ্চারণে পড়তে পারে না, কিছু শিক্ষার্থী বানান করে শুদ্ধ উচ্চারণে পড়তে পারে না, অনেকে ‘কার’ চিহ্ন দিয়ে সঠিক উচ্চারণে পড়তে পারে না। আবার অনেকে স্বাভাবিক গতিতে পড়তে পারে না, অনেকে যুক্তবর্ণের সঙ্গে ‘কার’ চিহ্ন দিয়ে পড়তে পারে না। অনেকে অতিরিক্ত শব্দ যোগ দিয়ে পড়ে, আবার অনেকে কঠিন শব্দ বাদ দিয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী বাক্য তৈরি করতে পারে না। অনেকে আবার কিছু কিছু বর্ণ চিনতে পারে না, একই শব্দ বারবার উচ্চারণ করে পড়ে, যুক্তাক্ষর সঠিক উচ্চারণ করতে পারে না। কেউ কেউ আবার সুর করে পড়ে। কারও কারও দাঁড়ি, কমা সঠিক রেখে পড়তে সমস্যা হয়।



এই যখন অবস্থা তখন আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে- কী করা যায়। কিভাবে বাংলা বিষয় আরও ভালোভাবে শিশুদের শেখানো যায়। এ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণিতে যারা বাংলা বিষয় পড়ান এবং বাংলা বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণে যারা প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিলেন তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যারা বাংলা বিষয় পড়ান সে সব শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি বাবা-মা ও অভিভাবকদেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রতি জোর দেন।


শিশুকে প্রকৃত শিক্ষায় পরিপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হলে পঠন-দক্ষতা অর্জন করানো আবশ্যক। পড়া শুধু বর্ণ বা শব্দ চিনে আউড়ে যাওয়া নয়- পাঠ্য বিষয়টির মর্মার্থ অনুধাবন করার অর্থ পঠন-দক্ষতা অর্জন করা। পঠন-দক্ষতা অর্জন করানোর জন্য প্রথম থেকেই নানা উপকরণের মাধ্যমে শিশুকে আবশ্যিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে পাঠদান করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুর পক্ষে পড়ার প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করা কষ্টকর হয়। সেই জন্য পঠন-দক্ষতা অর্জনে শিশুকে সহায়ক/সম্পূরক উপকরণের ব্যবহার ও তার প্রয়োগ কৌশল জানানো প্রয়োজন।


প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সব শিশুকেই সাবলীল পাঠক হিসেবে গড়ে তোলা। এখন প্রশ্ন থাকতে পারে সাবলীল পঠন কী? আমরা সাবলীল পঠনকে আবার শ্রেণীভিত্তিক ভাগ করতে পারি। যেমন- প্রথম শ্রেণীতে সাবলীল পঠন বলতে আমরা বুঝব- শিক্ষার্থীর প্রথম শ্রেণীর আমার বাংলা বই ও প্রথম শ্রেণীর উপযোগী সম্পূরক পঠনসামগ্রী অর্থ বুঝে পড়তে পারা। আবার দ্বিতীয় শ্রেণীতে সাবলীল পঠন বলতে আমরা বুঝব- শিক্ষার্থীর দ্বিতীয় শ্রেণীর আমার বাংলা বই ও দ্বিতীয় শ্রেণীর উপযোগী সম্পূরক পঠনসামগ্রী অর্থ বুঝে, বানান ছাড়া, বিরাম চিহ্ন ব্যবহার করে পড়তে পারা। তৃতীয় শ্রেণীতে সাবলীল পঠন বলতে আমরা বুঝব- শিক্ষার্থীর তৃতীয় শ্রেণীর আমার বাংলা বই ও তৃতীয় শ্রেণীর উপযোগী সম্পূরক পঠনসামগ্রী বানান ছাড়া, বিরামচিহ্ন ব্যবহার করে স্বরভঙ্গি ও স্বরাঘাত বজায় রেখে বিষয়বস্তুর অর্থ ও মূলভাব বুঝে পড়তে পারা। সাবলীল পঠনের শর্তসমূহ হচ্ছে- শব্দ ও বাক্য সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারা, শুদ্ধ ও স্পষ্ট উচ্চারণ করতে পারা, স্বাভাবিক গতিতে পড়তে পারা, পঠিত বিষয়ের মর্ম বুঝতে পারা, বিরামচিহ্ন ব্যবহার করে, স্বরাঘাত ও স্বরভঙ্গি বজায় রেখে পড়তে পারা।


শিশুরা সবাই মৌখিক ভাষার ব্যবহার জানে। তাদের আয়ত্তে একটি সমৃদ্ধ মৌখিক শব্দ-ভান্ডার ও বাক্য-কাঠামো থাকে। এ সব শব্দ দিয়ে সে বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী শব্দ ব্যবহার করে ছোট ছোট বাক্য গঠন করতে পারে। প্রথমে শিশুর এ দক্ষতা শুধু বলা ও শোনার মধ্যেই সীমিত থাকে। শিক্ষকরা ধীরে ধীরে মৌখিক ভাষার যে একটি লিখিত রূপ আছে তার সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করান। লিখিত কোনো কিছু কারো কোনো রকম সাহায্য ছাড়া অর্থ বুঝে, বিরামচিহ্ন ঠিক রেখে সাবলীলভাবে পড়তে পারার ক্ষমতাকে পঠন-দক্ষতা বলা যেতে পারে। মানসম্মত পঠন দক্ষতা হলো প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি বয়সী শিশুদের প্রতি মিনিটে ৪৫-৬০টি শব্দ পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারা।


আমাদের দেশে বিদ্যালয়গুলোতে একই শ্রেণীর সব শিক্ষার্থীর মেধা ও পাঠগত অবস্থান এক রকম নয়। কাজেই শ্রেণীতে সব শিশুকে একভাবে শেখানো যুক্তিসঙ্গত নয়। তাই বছরের শুরুতেই বেজলাইন সার্ভের মাধ্যমে শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের শ্রেণীতে পাঠগত অবস্থান যাচাই করে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে স্তরভিত্তিক/লেভেলভিত্তিক পাঠদানের ব্যবস্থা করবেন ( যেমন- বর্ণ চিনতে অক্ষম দল, সাবলীলভাবে পড়তে পারা দল, শিক্ষকের আংশিক সহায়তায় পড়তে পারা দল, শিক্ষকের সম্পূর্ণ সহায়তায় পড়তে পারা দল)।


বর্ণ শেখানো বা চেনানো, বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তোলা, দৃষ্টির আয়ত্তাধীন শব্দভান্ডার বাড়ানো, বানান কৌশল শেখানো ইত্যাদি কৌশলের মাধ্যমে পঠন দক্ষতা অর্জন করানো সম্ভব। বর্ণমালা শেখানোর জন্য বর্ণ-গেমের ব্যবহার, বর্ণের চার্ট ও কার্ড থেকে বর্ণ পড়ানো, শব্দ থেকে বর্ণ চিহ্নিত করা (যেমন- কলা, কাক থেকে ‘ক’ বর্ণ শেখানো), বর্ণমালা সেট করা খাতা/ওয়ার্ক শিটে লেখা, চার্ট থেকে বর্ণ লেখা ইত্যাদি কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে। পঠন-দক্ষতা উন্নয়নে ছবি চার্ট, শব্দ কার্ড, বাক্য কার্ড, মিলকরণ খেলা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


শব্দ শেখানোর ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম অনুসরণ করা যেতে পারে; যেমন- একসঙ্গে খুব বেশি শব্দ না শেখানো, শিক্ষার্থীর চাহিদা অনুযায়ী শব্দ শেখানো বেশি কার্যকর, ধারাবাহিক ও নিয়মিতভাবে নতুন শব্দ শেখানো উচিত, শব্দভান্ডার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভাষার চারটি দক্ষতারই (শোনা, বলা, পড়া, লেখা) সমন্বয় করা আবশ্যক, শিক্ষার্থীর সরব পাঠের পূর্বেই পাঠ্যাংশে ব্যবহৃত নতুন শব্দগুলো শেখানো প্রয়োজন, পর্যায়ক্রমে শব্দের প্রমিত উচ্চারণ, বানান, অর্থ ও পাঠ্যাংশ বহির্ভূত বাক্যে প্রয়োগ শেখানো আবশ্যক। তাছাড়া ধারণামূলক শব্দ (যেমন- মমতা, আনন্দ, অসীম ইত্যাদি) সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা/বিশ্লেষণ/তুলনা ও সহজ বাক্য গঠন করে বোঝানো যেতে পারে। শব্দভান্ডার বৃদ্ধির জন্য প্রচুর পরিমাণে অনুশীলন করানো আবশ্যক।


পঠন-দক্ষতা বাড়ানোর জন্য দৃষ্টির আয়ত্তাধীন শব্দভান্ডার বাড়ানো খুব জরুরি। প্রতিদিন রিডিং পড়ানোর মাধ্যমে, বিভিন্ন রিডিং গেম করানোর মাধ্যমে, শব্দ গেমের মাধ্যমে, বর্ণ দিয়ে শব্দ তৈরির মাধ্যমে, নিজস্ব চিন্তায় খাতায় লিখতে দেয়ার মাধ্যমে, ছবি ও শব্দের মিল করার মাধ্যমে দৃষ্টির আয়ত্তাধীন শব্দভান্ডার বাড়ানো সম্ভব। আমাদের প্রথম শ্রেণী থেকে তৃতীয় শ্রেণীর বইগুলোতে এইজন্য একই শব্দ বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।


শিশুদের বানান শেখানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন- প্রথম শুধু বর্ণ ব্যবহার করে এবং উচ্চারণের মধ্যে মিল রেখে (যেমন- বই-মই, কল-বল ইত্যাদি) শেখানো যেতে পারে। স্বরচিহ্ন চেনানোর ক্ষেত্রে ১ম ধাপে ১টি স্বরচিহ্ন ব্যবহার করে (যেমন- আ-কার (া) ব্যবহার করে- কাজ, নাক, শাক ইত্যাদি) এবং ২য় ধাপে ২টি স্বরচিহ্ন ব্যবহার করে (যেমন- আ-কার (া) কার ব্যবহার করে- কাকা, বাবা, খাতা ইত্যাদি)। এভাবে পর্যায়ক্রমে সমস্ত চিহ্ন ব্যবহার করে বানান কৌশল শেখানো যায়। যে সব শিক্ষার্থী কিছু কিছু পড়তে পারে, বানানের কৌশল ব্যবহার করে শব্দ বানাতে পারে তাদের পড়াটা শ্রেণীকক্ষে সীমাবদ্ধ না রেখে বাড়িতে পড়ার সুযোগ দিতে হবে। অতিরিক্ত বই বাড়িতে পড়তে দেওয়ার সময় ক্লাসে যে বইটি পড়েছে তার চেয়ে সহজ বই দিতে হবে- যাতে ভালোভাবে পড়তে পারে। তাহলে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে পড়তে পারবে। নতুবা পড়াটা তাদের কাছে অতিরিক্ত বোঝা মনে হবে।


কোমলমতি শিশুদের পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। বইয়ের ছবি দেখিয়ে গল্প বলা, পাঠ্য বইয়ের ছবি নিয়ে আলোচনা করা, প্রতিদিন রিডিং পড়ানো, বেশি করে ছবির বই দেখতে দেয়া, পছন্দমতো বই দেখতে দেয়া, শিশুদের উপযোগী পত্র-পত্রিকা পড়তে দেয়া, কোনো লেখা পড়তে দেয়া, দেশ-বিদেশের খবর শোনানো ইত্যাদি উপায়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায়।


শিশুদের পঠন-দক্ষতা বাড়ানার জন্য বেশি বেশি বই পড়তে দিতে হবে। তবে শিশুদের যে কোনো বই পড়তে দিলেই হবে না- এতে হিতে বিপরীতও হতে পারে। শিশুদের বই নির্বাচনের সময় কিছু বিশেষ দিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। যেমন- বইটি বড় বড় অক্ষরে স্পষ্ট করে লেখা থাকবে, শিশুদের বইয়ে শিশুদের পরিচিত শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি থাকবে, বাক্যগুলো অর্থপূর্ণ হবে, বাক্যের মধ্যে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে, শিশুদের পরিচিত জগৎ সম্পর্কে কথা থাকতে হবে, বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল রেখে আকর্ষণীয় রঙিন ছবি থাকতে হবে, শব্দের পুনরাবৃত্তি থাকতে হবে, বইয়ের লেখাগুলো পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ামূলক হতে হবে। শিশুদের জন্য বইয়ের লেখাগুলো যেন মুখের কথার মতো মনে হয়।


শিশুর পঠন-দক্ষতা বাড়ানোর জন্য রিডিং-চার্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। পাঠ্যবইয়ের পড়ানো গল্পের সংক্ষিপ্তসার বড় কাগজে লিখে রিডিং-চার্ট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এ চার্ট বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া শ্রেণীতে পঠিত অংশের শব্দ নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক গল্প, ছড়া, কবিতা তৈরি করতে পারেন এবং সেগুলো বড় বড় করে চার্ট ও কার্ডে লিখে রিডিং চার্ট ও রিডিং কার্ড তৈরি করবেন। শ্রেণী কক্ষে চার্ট টানিয়ে শিক্ষক নির্দেশক কাঠি ব্যবহার করে জোরে জোরে পড়বেন। সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও পড়বে। পড়া শেষে চার্ট দেখে শিক্ষার্থীরা লিখবে এবং ছোটদলে/জোড়ায় বসে একজন পড়বে অন্যজন দেখবে। অনুরূপভাবে প্রতি বেঞ্চে তিনজন শিক্ষার্থী বসিয়ে একটি করে কার্ড দিয়ে পড়ানো যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে একজন পড়বে অন্যরা দেখবে। পড়া শেষে লিখবে এবং একে অন্যেরটা দেখবে। শিক্ষক পুরো শ্রেণী কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখবেন। প্রয়োজনে শিক্ষক যাচাই করে দেখতে পারেন শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে পড়ছে কি না। রিডিং-চার্ট থেকে একটি অনুচ্ছেদ বোর্ডে লেখা যেতে পারে যাতে মাঝে মাঝে শব্দ বাদ দিয়ে লেখা থাকবে। শিক্ষার্থীরা উপযুক্ত শব্দ দিয়ে শূন্যস্থান পুরণ করবে। এক্ষেত্রে বইয়ের শব্দ হুবহু না এসে নতুন শব্দ আসতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার পরিচয়ও পাওয়া যাবে।


শিশুদের যোগ্যতা ও দক্ষতা বিবেচনা করে বিভিন্ন শিশুতোষ গল্প ও কবিতার বই সংগ্রহ করে শিশুদের নিয়মিত পড়তে দিতে হবে। এ ব্যাপারে শিশু একাডেমি, ব্র্যাক, সংবাদপত্রের শিশু-কিশোর কলাম বা অন্য যে কোনো প্রকাশনার উপকরণ বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি বইয়ে যতগুলো গল্প আছে তা কেটে নিয়ে শক্ত কাগছে পেস্ট করে অপর পৃষ্ঠায় ওই গল্পের ওপর কিছু প্রশ্ন লিখে দিতে হবে। প্রতিটি গল্প লেমিনেটিং করে বা পলিথিনের স্বচ্ছ প্যাকেটে মুড়ে দিলে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যেতে পারে। সপ্তাহে এক বা দু’দিন এ উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। দলগতভাবে পড়তে দিলে অল্প সংখ্যক বই দিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে। কিছু কিছু উপকরণ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিজে তৈরি করবেন। তখন লক্ষ রাখবেন যেন গল্পে ব্যবহৃত শব্দ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের উপযোগী শব্দ হয়। প্রতি বেঞ্চে তিনজন শিক্ষার্থীকে ১টি করে গল্প বা কবিতা সরবরাহ করা যেতে পারে। আবার দল গঠন করে দলীয়ভাবেও শিক্ষার্থীদের গল্প/কবিতা পড়তে দেয়া যায়। তবে লক্ষ রাখতে হবে দলীয় সদস্যগণের মধ্যে যেন সবল ও দুর্বল শিক্ষার্থীর মিশ্রণ থাকে।


শ্রেণীর সব শিক্ষার্থীর পঠন-দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষক পালাক্রমে সব শিক্ষার্থীর ১ মিনিট রিডিং এককভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন (One to one approach) এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবেন। অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দেবেন।


শিশুকে সাবলীল পাঠক তৈরিতে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি পরিবারকেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিদিন পারিবারিকভাবেও একটি নির্দিষ্ট সময় পড়ার অভ্যাস করতে হবে। বড়দের পড়তে দেখলে শিশুরাও পড়তে উৎসাহিত বোধ করে এবং শিশুর আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। শিশুর বই রাখতে হবে হাতের কাছে- তার যখন ইচ্ছে তখন যেন পড়তে পারে। যেমন- বেডরুমে, ড্রয়িংরুমে, গাড়িতে, রিডিং-কর্নারে। পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য শিশুকে মাঝে মাঝে বইয়ের দোকানে বা পাঠাগারে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে এবং তার পছন্দ মতো বই কিনে দিতে হবে। নতুন বই পেলে শিশুর পড়ার আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। বাবা-মা/অভিভাবকদের উচিত শিশুকে পড়ার জন্য উৎসাহিত করা। আবার পড়তে না পারার জন্য কখনও তিরস্কার করা যাবে না।


জ্ঞানার্জনে তথ্য আহরণের অন্যতম প্রধান উপায় হলো পড়া। কোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে সার্বিক ধারণা লাভের জন্য ভাষার দক্ষতাগুলোর মধ্যে পড়া বা পাঠ্যাভাস অন্যতম। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রারম্ভে শিশুকে ভাষা শিক্ষাদানে যে পদ্ধতিই অনুসরণ করা হোক-না কেন, শিশুকে বর্ণের ধ্বনি, শব্দ, বাক্য ইত্যাদি প্রমিত উচ্চারণে পড়ানো উচিত। এতে শিশুর ভিত্তি শক্তিশালী হয়। এরপর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে তার পড়ার পরিসর বিস্তৃত হতে থাকে। ফলে যোগ হয় নতুন নতুন মাত্রা। পঠন-দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ধ্বনি সচেতনতা, বর্ণজ্ঞান, শব্দভান্ডার, সাবলীলতা ও বোধগম্যতা এই পাঁচটি বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। আবার মনে রাখতে হবে, শিশুকে সব সময় পড়ার জন্য চাপ দেয়া যাবে না। বেশি চাপ দিলে হিতে বিপরীতও হতে পারে। এতে শিশু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এবং এক সময় বিরক্তিবোধ থেকে পাঠের প্রতি অনীহা আসতে পারে। শিক্ষকগণ পঠন-দক্ষতা অর্জনে বিভিন্ন ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের সাবলীল পাঠক তৈরিতে সচেষ্ট থাকবেন। প্রতিটি শিশুর পঠন-দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনে আলাদাভাবে তাদের করণীয় দিকগুলো নির্ধারণ করবেন। বছর শেষে সব শিক্ষার্থী বাংলা বিষয়ে নির্ধারিত শ্রেণীভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতাগুলো অর্জন করবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা

মন্তব্য করুন

ব্লগ