সহকারী শিক্ষক
২০ এপ্রিল, ২০২৩ ০৭:১৯ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
৷৷ আম্বেদকরের জীবন সংগ্রাম ৷৷
আজ এই মহান ব্যক্তির ১৩৩-তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মধ্যপ্রদেশের মহোও অঞ্চলে সামরিক সেনানিবাসে ১৮৯১ সালের ১৪ এপ্রিল এক গরিব 'মহর' পরিবারে আম্বেদকর জন্মগ্রহণ করেন । সেইসময় 'মহর'-দের অস্পৃশ্য জাতি হিসাবে গণ্য করা হত ।পিতা রামজী মালোজী শাকপাল ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর সেনা ছিলেন । মা ভীমাবাই । তাঁদের আদি নিবাস মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি জেলার আম্বোভাদ গ্রাম ।
আম্বেদকর তাঁর পৈতৃক উপাধি নয়। ঐ উপাধিটি তাঁর স্কুলের হেডমাস্টার মশাইয়ের। কিন্তু কেন ? সে বড়ই করুণ, বড়ই লজ্জার কাহিনী। এক দলিত পরিবারে চরম দারিদ্রের মধ্যে জন্ম ভীমরাও রামজী সকপালের। বাড়িতে
বারো তেরোটি ভাই বোন ৷ ঘরে দারিদ্রের যন্ত্রণা , বাইরে সমাজের যন্ত্রণা ! তারা যে
দলিত, অচ্ছুত। তাদের স্পর্শ করে ফেললে উচ্চবর্ণের লোকেদের স্নান করতে হত।
একপাত্র থেকে খেলে কিংবা পাশাপাশি বসে খাবার খেলে তো কথাই নেই। জাত যেত
উচ্চবর্ণের লোকেদের। তখুনি তাদের মাথা মুড়িয়ে, গোবর খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে
হত। কেউ আপত্তি করলে তাকে একঘরে করা হত। এরকম দলিত ঘরের কোন ছেলের পক্ষে স্কুলে গিয়ে পড়াশুনা করার প্রশ্নই ওঠে না।
কিন্তু ভীমরাও-এর বাবা ইংরেজের সৈন্যবাহিনীতে চাকরি করার সূত্রে তাঁর
ছেলে-মেয়েরা বিনাবেতনে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়ে ছিল। কিন্তু চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর সে সুযোগ আর থাকল না।
ভীমরাওকে ভর্তি করে দেওয়া হল স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলে। কিন্তু সে যে অস্পৃশ্য, তাকে ছুঁলে যে অন্য ছাত্রদের , এমনকি শিক্ষকদেরও জাত যাবে। তাই অন্যান্য ছাত্রদের সাথে নির্দিষ্ট বেঞ্চে না বসে তাকে ক্লাসের এক কোণে মেঝেতে বসতে হত। খাতাই কিছু লিখে বা অঙ্ক কষে মাস্টারমশাইকে দেখাতে এলে তিনি খাতাটি স্পর্শ করতেন না। মাস্টারমশাইয়ের মুখে শুনে নিজে নিজেই সংশোধন করে নিত সে৷ কিন্তু ঐ স্কুলেরই একজন সহৃদয় শিক্ষক ছিলেন। তিনি প্রতিদিন এই ছোট্ট ছেলেটির উপর সমাজের অত্যাচার দেখে খুব দুঃখ পেলেন এবং এক বুদ্ধি বের করলেন। এই শান্ত ভদ্র বুদ্ধিমান ভীমরাও-এর নামের
সঙ্গে নিজের "আম্বেদকর" পদবীটা জুড়ে দিলেন। সেই থেকে নিচু জাতের "সকপাল"
পদবী ত্যাগ করে ভীমরাও হলেন "ভীমরাও আম্বেদকর"।
মেধাবী ছাত্র ছিলেন আম্বেডকর। এলফিনস্টোন কলেজ থেকে ভালো নম্বর নিয়ে বি.এ পরীক্ষায় পাশ
করলেন। বরোদার রাজা এই ছেলেটির মেধার পরিচয় পেয়ে তাঁকে ডেকে চাকরি দিলেন এবং সেই সঙ্গে আরও পড়ার জন্যে তাকে আমেরিকা পাঠালেন। আমেরিকে ও লন্ডনে অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে পড়াশুনার পাঠ শেষ করে ভীমরাও ভারতে ফিরে বরোদার
রাজার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজে যোগ দিলেন। পরবর্তী সময়ে "মাহার"
অর্থাৎ ছোট জাতের পরিচয় পেয়ে ভীমরাও-এঁর অধীনে থেকে তাঁর হুকুম মত
কাজ করতে কোন কর্মচারিই রাজি হল না। ভীমরাও বুঝলেন কুসংস্কারাছন্ন এই সমাজের ভিতেই ধরেছে পচন। তাকে সারিয়ে তোলা আগে দরকার। তিনি আন্দোলন শুরু করলেন বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে। গান্ধীজি
অস্পৃশ্যদের নাম দিয়েছিলেন "হরিজন"। আম্বেদকরের মতে 'এভাবে "হরিজন" নাম
দিয়ে অস্পৃশ্যদের আলাদা করে দেখানো বড়োই অপমানকর'। কিন্তু ভারত সরকার তাঁর যুক্তিতে কর্ণপাত করল না। তিনি দেখলেন
তাঁর বা তাঁর শ্রেণীর মানুষের কোন কথার কোন গুরুত্বই দেয় না উচ্চবর্গের মানুষের
সরকার। এরপর ভারত স্বাধীন হতে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সংবিধান রচনার জন্য
তাঁকে আহ্বান জানালেন। সংবিধান রচনাকারী
পন্ডিতদলের তিনি হলেন চেয়ারম্যান। প্রায় দু-বছর ধরে লেখা হল ভারতীয় সংবিধান ৷
আম্বেদকর স্বাধীন দেশের প্রথম আইনমন্ত্রী হিসেবে হিন্দু আইনেরও বেশ কিছু সংশোধন
আনলেন। কিন্তু অন্যেরা বিরোধিতা করায় তাঁর আনা হিন্দু আইনের বিল পাশ না করে আটকে দেওয়া হল। প্রচন্ড অপমানিত হয়ে
ডঃ আম্বেদকর ত্যাগ করলেন
আইনমন্ত্রীর পদ। এতভাবে লাঞ্ছিত ও উপেক্ষিত হতে হতে তিনি বুঝতে পারলেন
দেশ স্বাধীন হোক আর পরাধীনই থাকুক তাঁর মত অস্পৃশ্য দলিতদের অবস্থা সেই
একই। তবুও তিনি হতাশ না হয়ে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজতে লাগলেন। শেষে ১৯৫৬ সালের ১৪ অক্টোবর অনুগামীদের নিয়ে ভীমরাও আম্বেদকর হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেন। বৌদ্ধধর্মের
ক্ষমা ও প্রেমের মন্ত্রে জুড়িয়ে গেল দীর্ঘ অপমানের দগদগে ক্ষতস্থান। ১৯৫৬ সালে ৬ ডিসেম্বর গভীর রাত্রে ঘুমের
মধ্যে অমৃতলোকে যাত্রা করলেন তিনি।
(গুগল সহায়তায় সম্পাদিত)
৫
৫ মন্তব্য