Loading..

ব্লগ

রিসেট

২০ এপ্রিল, ২০২৩ ১০:৪৮ অপরাহ্ণ

ইউরিক এসিড থেকে ভালো থাকার উপায়।

ইউরিক এসিড থেকে ভালো থাকার উপায়।


        বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষ স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন । আমাদের প্রত্যেকের পরিবারে বৃদ্ধ মানুষ আছেন তাদেরকে কখনোই ভাবা যাবে না সংসারের কিংবা সমাজের বোঝা কারণ এই মানুষগুলোই একসময় আমাদের মতই তরতাজা সুস্বাস্থের অধিকারী ছিলেন । তাদের কারনেই আজ আমরা এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি। এই আমরাও একদিন, দিনে দিনে বার্ধক্যের দিকে ধাবিত হব। একদিন ওই জায়গায় পৌঁছে যাব , সেই সাথে নানান অসুস্থতায় জর্জরিত হয়ে যাব।


       কেন এতগুলো কথা বললাম,  এমন একটি সমস্যা এবং সমাধান নিয়ে আজ আলোচনা করব একটু সচেতনতা আমাদেরকে অনেক বড় বড় সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে থাকে।


আজকের আলোচনার বিষয় ইউরিক অ্যাসিড :


        মানুষের দেহে পটাশিয়াম ,সোডিয়াম বাইকার্বনেট বা অ্যালকালাইন অর্থাৎ ইলেক্ট্রোলাইটস এর ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য ইউরিক এসিড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।


       আমাদের দেহের অভ্যন্তরে যে ইউরিক এসিড উৎপন্ন হয়, তার তিনভাগের দুইভাগ  ইউরিক অ্যাসিড যকৃত বা লিভার থেকে  তৈরি হয় ।বাকি এক ভাগ খাবারের মধ্যে থাকা পিউরিন ভেঙে যে ইউরিক অ্যাসিড উৎপন্ন হয় তা পূরণ করে থাকে।


      সবার দেহে রক্তে খুব অল্প পরিমাণে ইউরিক এসিড বিদ্যমান যা কিনা দেহের ডেড সেল এবং খাদ্যের উপাদান পিউরিন থেকে উৎপন্ন হয় মূলত এটি দেহের একটি টক্সিন উপাদান ।


       আমাদের শরীরে জেনেটিক্যাল হিসাবে সেলের মধ্যে অথবা কেমিকাল কম্পাউন্ড হিসেবে যে উপাদানটি থাকে তাকে পিউরিন বলে । আমরা যখন পিউরিন জাতীয় খাবার খাই তখন লিভার মেটাবলিজম( বিপাকীয় প্রক্রিয়ার) মাধ্যমে পিউরিন ভেঙে বাইপ্রোডাক্ট হিসাবে ইউরিক এসিড উৎপন্ন করে । অতঃপর রক্তের মধ্যে প্রবেশ করে ।


    আরো সহজ ভাবে বললে যখন আমরা পিউরিন জাতীয় খাবার খাই তখন শরীরের মধ্যে বিপাকীয় পদ্ধতিতে পিউরিন ভেঙে ইউরিক এসিড তৈরি করে রক্তের মাধ্যমে কিডনিতে পৌঁছে দেয়।


        ইউরিক অ্যাসিড যখন লিভার থেকে কিংবা খাবার থেকে স্বাভাবিকের চাইতে বেশি উৎপন্ন করে ফেলে তখন কিডনি ইলেকট্রোলাইসিস পদ্ধতিতে প্রস্রাব দিয়ে বের করে দেয় । এভাবেই ইউরিক এসিড ভারসাম্য রক্ষা করে কিন্তু দীর্ঘদিন যদি অতিমাত্রায় রক্তে ইউরিক এসিডের ঘনত্ব বাড়তে থাকে তখন দেহের বিভিন্ন অঙ্গে জমতে থাকে যেমন পায়ের জয়ন্টের গিট গুলোতে অথবা পায়ের আঙ্গুলের জয়েন্টে জমে থাকে ফলশ্রুতিতে তীব্র ব্যথা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, এমনকি হাড় বাঁকা পর্যন্ত হয়ে যায় উক্ত যায়গা গুলির বহিরাবরণে ত্বক লালচে হয়ে যাওয়া কিংবা ইনফেকশনের মত জটিল অবস্থা দেখা যায়।


    এছাড়াও কিডনিতে রেনাল স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ফলে কিডনি ঠিকমতো বর্জ্য পদার্থ বের করতে পারে না ফলশ্রুতিতে কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে থাকে এক পর্যায়ে কিডনি ড্যামেজ হয়ে যায়। কি করে বুঝবো রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে । পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় ,পুরুষদের ক্ষেত্রে  প্রতি ডিসি মিলিলিটার রক্তে ৭ মিলি গ্রাম আর মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রতি  ডিসি মিলিলিটার রক্তে ৬ মিলি গ্ৰাম ইউরিক এসিডের বেশি থাকলে ভেবে নিতে হবে রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে।


ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে যে সমস্ত সমস্যা দেখা দেয়  :


১. জয়েন্টে, জয়েন্টে ব্যথা

২.  পা ফুলে যাওয়া

৩. হাই ব্লাড প্রেসার

৪. হার্ট অ্যাটাক

৫. ব্রেন স্ট্রোক 

৬. কিডনি ফেইলিওর

৭.ওজন বৃদ্ধির সাথে সাথে উচ্চ কলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া ।

৮. গউট বা গেটে বাত নামক রোগটি সৃষ্টি হয়।

এই ধরনের সমস্যাগুলো  পুরুষ-মহিলা, ছোট-বড় উভয়ের ক্ষেত্রেই হতে পারে । বয়স্কদের এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি দেখা যায় । মাত্রা অতিরিক্ত ইউরিক এসিডের কারণে তীব্র যন্ত্রণা দেখা দেয় যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক ।


 ইউরিক এসিডে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিম্নের খাবারগুলি থেকে এড়িয়ে চলা উচিত  :


১. সবজি : বাঁধাকপি, পালং শাক ,মটরশুঁটি ,মাশরুম ইত্যাদি।


২. মাছ : চিংড়ি মাছ ,টোনা ফিস, স্যামন মাছ এবং যে মাসের মধ্যে ওমেগা ৩ আছে সেই ধরনের মাছ ।


৩. প্রাণীজ : রেডমিট, প্রাণিজ খাবার, কলিজা, মগজ ইত্যাদি


৪. শস্য দানা :  মসুর ডাল, ছোলার ডাল, শিমের বীজ ,কুমড়া বীজ ইত্যাদি ।


৫ . ইস্ট : পাউরুটি কেক ইত্যাদি ।


৬. ফল : আম ,কলা , সফেদা, তাল, খেজুর, কিসমিস ইত্যাদি


        চিনি, অ্যালকোহল এই ধরনের খাবার খেলে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যায় কিডনির কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ফলে হার্ট অ্যাটাক , স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ।অতএব ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে গেলে খাবারের দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত।


যে সমস্ত কারণে শরীরে ইউরিক অ্যাসিড জমা হয়:


১. যে সমস্ত মানুষ উচ্চমাত্রার প্রোটিন জাতীয় খাবার খেয়ে থাকেন ।


২.  প্রোটিন জাতীয় খাবার বেশি খেয়ে থাকেন


৩. কিডনির সমস্যার কারণে শরীর থেকে যদি ইউরিক এসিড প্রস্রাবের মাধ্যমে ঠিকমতো বের করে দিতে না পারলে ।


৪. প্রস্রাব বর্ধক ঔষধ এসপিরিন জাতীয় ঔষধ ইত্যাদি ইউরিক এসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় ।


৫. অতিরিক্ত ওজনের কারণে ইউরিক এসিড জমা হয় ।


৬. অনেক বেশি পরিমাণে অ্যালকোহল পান করলে ।


৭. প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে ।


৮. ক্যান্সের পেশেন্টরা 


       কিছু প্রাকৃতিক উপায়ে আমরা ইউরিক এসিডকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে পারি। জেনে নেই কোন কোন প্রাকৃতিক উপাদান আমাদের শরীরের ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণ করে।


১.  পানি :  প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে কারণ একমাত্র পানিই পারে শরীর থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ইউরিক অ্যাসিড কিডনি থেকে ফিল্টার করে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দিতে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন বিশেষ করে ঘুম থেকে উঠে এবং ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে ।


২.  লেবু :  যেকোনো ধরনের লেবুর রস কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে সকালে খালি পেটে এবং দিনে দুই-তিনবার খেতে পারলে ইউরিক এসিডের মাত্রা কমে যায় কারণ লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড শরীর থেকে ইউরিক অ্যাসিড বের করে দিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে ।


৩.  গ্রিন টি :  প্রতিদিন নিয়ম করে ২/৩  কাপ গ্রিন টি খাওয়া উচিত । গ্রিন টি খেলে ইউরিক এসিডের লেভেল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে ।


৪.  অ্যাপেল সিডার ভিনেগার ; নিয়ম করে তিন চার চামচ অ্যাপেল সিডার ভিনেগার পানির সাথে মিশিয়ে দিনে দুই-তিনবার খেলে উপকার পাওয়া যায় ।


৫. কফি : একটি গবেষনায় দেখা গিয়েছে যে , যে সমস্ত মানুষ প্রতিদিন ৩/৫  কাপ কফি পান করেন তাহলে তাদের ইউরিক এসিডের মাত্রা কমে যায় ফলে গআউট হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কমে যায় । আর যাই হোক কফি দীর্ঘমেয়াদে খেলে কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় আর মহিলাদের মধ্যে হাড়ের ভঙ্গুরতা সম্ভাবনা বেড়ে যায় এক্ষেত্রে ঝুঁকির কথা চিন্তা করে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে খাওয়া উচিত ।


৬. চেরি : চেরি খেলে গাউটে আক্রান্ত ব্যক্তির ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায় ।


৭. ভিটামিন সি : যে সমস্ত খাবারের মধ্যে ভিটামিন সি আছে যেমন লেবু, আমলকি, আমড়া, পেয়ারা ইত্যাদি সি জাতীয় খাবার ইউরিক এসিডের ঝুঁকি বহুলাংশে কমাতে সহযোগিতা করে ।


৮. জোয়ান : জোয়ান এক ধরনের মসলা জোয়ান প্রাকৃতিক মূত্র বর্ধক । জোয়ান খেলে প্রস্রাবের সাথে ইউরিক এসিড বের হয়ে যায়।


৯ . অলিভ অয়েল  : খাবারের সাথে কিংবা সালাদের সাথে অলিভ অয়েল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন কারণ অলিভ অয়েলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন "ই" থাকে । ভিটামিন "ই" ইউরিক এসিডের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করে ।


১০. ত্রিফলা : ত্রিফলা হচ্ছে তিন ফলের সমাহার যেমন আমলকি, হরতকি এবং বহেরা নিয়ম করে প্রতিদিন ত্রিফলা চূর্ণ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ,ভালো সুফল পাওয়া যাবে কারণ ত্রিফলা শরীর থেকে যাবতীয় টক্সিন এবং ইউরিক অ্যাসিড বের করে দেওয়ার মহৌষধ বলা চলে ।


১১ . তেজপাতা :  তেজপাতা জাল দেওয়া পানি মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে ।


১২. লেমনগ্রাস : লেমনগ্রাস এর বৈশিষ্ট্য প্রস্রাবের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া ।


      একজন চিকিৎসক রোগীর সমস্যার উপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ঔষধ প্রদান করে থাকেন বিশেষ ধরনের খাবারগুলো নিয়ম করে খেলে এবং যে খাবারগুলো খেলে ইউরিক এসিড বেড়ে যায় সেই খাবারগুলো থেকে বিরত থাকলে গাউটের ঝুঁকি থেকে অনেকাংশেই কমে যায়। 


      ইউরিক এসিডে আক্রান্ত হবার পূর্বেই জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন আনতে হবে। সেই সাথে রক্তের উচ্চতর ইউরিক এসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রন করার জন্য প্রাকৃতিক কিছু খাবার নিয়ম করে খেলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায় ।


     এই লেখাটি কোন চিকিৎসাপত্র নয় । এক জন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইউরিক এসিড এর পেসেন্ট ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

     

     বাড়ির আঙ্গিনায় বড় গাছটি ফল দেয় না বিধায় কেটে ফেলবেন না। বয়সের কারণে ফল হয়তো দেয় না কিন্তু ছায়াতো দেয় শুধু তাই নয় বড় ঝড়-ঝাপটা থেকে বাড়িটাকে রক্ষা করে ।


       ঠিক তেমনি বৃদ্ধ মানুষগুলো হয়তো সংসারের কিংবা সমাজের কোন কাজে আসেনা কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি পাহাড় পরিমাণ তাই তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব আমার, আপনার, সমাজের । আমাদের একটু সহানুভূতি, ভালোবাসা তাদের অসুস্থতার কষ্ট অনেকাংশেই লাঘব হয়ে যাবে । সবশেষে একটি কথাই বলবো  একটি বার আপনার সন্তানের কথা ভাবুন পাশাপাশি মুরুব্বীরা আমাদের জন্য কোন অংশে কম করেছেন কিনা ? বিবেক মানুষের বড় আদালত । সবাই ভালো থাকি ভালো থাকার চেষ্টা করি ।

মন্তব্য করুন