সহকারী শিক্ষক
২৪ এপ্রিল, ২০২৩ ০৬:৪০ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘বিদ্যাসাগর ও বিধবাবিবাহ আন্দোলন’
ঊনবিংশ শতকের বঙ্গদেশে যে সব সমাজসংস্কারমূলক আন্দোলন দেখা দিয়েছিল, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনকে এক হিসাবে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৈপ্লবিক বলা চলে। যে সামাজিক সংস্কারের বিনাশ সাধন সেই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, একশো বছর পরেও বর্তমানে ভারতীয় সমাজ সেই সংস্কারের প্রভাব থেকে পুরোপুরিভাবে মুক্ত হয় নি বলা চলে, ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত বিধবাবিবাহের সংখ্যা আজও ভারতীয় সমাজে নগণ্যই বলা চলে। কিন্তু বিধবাবিবাহের বিরোধী সংস্কার ভারতীয় হিন্দু সমাজে বহুদিন ধরে বদ্ধমূল হলেও, একেবারে প্রাচীন যুগে এই সংস্কারের বিরোধী একটি মনোভাবও সক্রিয়রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল, এবং মধ্যযুগে মুসলমান রাজত্বকালেও হিন্দু সমাজে বিধবাবিবাহ কিন্তু সম্পূর্ণভাবে অবলুপ্ত হয় নি বলেই ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতকে এবং ঊনবিংশ শতকে বিদ্যাসাগরের আবির্ভাবের আগেও হিন্দু সমাজে বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য একাধিক আন্দোলন হয়েছিল; যদিও বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের মত সেগুলো কখনোই সুগঠিত ও ব্যাপক রূপ ধারণ করতে পারে নি।
‘রাজেন্দ্রলাল মিত্র’ ১৮৭০ সালে ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’র পত্রিকায় ‘ভারতে হিন্দুজাতির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, প্রাচীন ভারতের হিন্দু সমাজে বিধবাবিবাহের যথেষ্টই প্রচলন ছিল। তখন কোন মৃত ব্যক্তির চিতায় অগ্নি-সংযোগের আগে তাঁর বিধবা স্ত্রীকে চিতা থেকে নামিয়ে আনা হত, এবং পরে সেই মৃত ব্যক্তির কনিষ্ঠ ভ্রাতা বা অন্য কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয়বার বিবাহের ব্যবস্থা করা হত। যিনি সেই বিধবাকে বিবাহ করতেন, তাঁকে বলা হত ‘দিধিযু’, এবং যে বিধবার ঐভাবে পুনর্বিবাহ হত, তাঁকে বলা হত ‘পুনর্ভবা’। ‘তৈত্তিরীয় আরণ্যকের’ ষষ্ঠ প্রপাঠক, প্রথম অনুবাকে এই বিষয়ে একটি মন্ত্র আছে যেটির বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায় - “হে নারী, তুমি যাঁর পাশে শয়ন করে আছ তাঁর প্রাণবায়ু বহির্গত হয়েছে। জীবিতের জগতে তুমি ফিরে এসো, এবং এমন কোনো ব্যক্তিকে পতিত্বে বরণ কর, যে আগে বিবাহিতা মহিলাকে বিবাহ করতে প্রস্তুত আছে, এবং তোমার পাণি গ্রহণে ইচ্ছুক।” ‘ঋগ্বেদের’ পঞ্চম কাণ্ড, দশম প্রপাঠকেও অনুরূপ একটি শ্লোক পাওয়া যায়। ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণে’ বলা হয়েছে যে, কোনো নারীর একই সময়ে একাধিক স্বামী থাকতে পারে না। তাতে পরোক্ষভাবে এটাই স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে, বিভিন্ন সময়ে একজন নারীর একাধিক স্বামী হওয়া সম্ভব। ‘অথর্ববেদের’ নবম কাণ্ড, বিংশতি প্রপাঠকের একটি শ্লোকে বিধবাবিবাহের সুস্পষ্ট সমর্থন পাওয়া যায়, এবং একটি বিশেষ শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানের সাহায্যে দ্বিতীয় পক্ষের স্বামী যে স্ত্রীর সঙ্গে স্বর্গবাস করবার অধিকারী হতে পারেন, সে কথাও সেখানে বলা হয়েছে। বৈদিক যুগে ভারতের নারীদের নিতান্ত অল্প বয়সে বিবাহ হত না, সুতরাং বিধবাবিবাহের এই শাস্ত্রীয় সমর্থন শুধু যে বালবিধবাদের পক্ষেই প্রযোজ্য, একথা মনে করাও সমীচীন হবে না। রামায়ণে সুগ্রীব ও বিভীষণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার বিধবাকে পুনরায় বিবাহ করবার কাহিনী, এবং মহাভারতে অর্জুনের সঙ্গে নাগরাজের বিধবা কন্যা উলুপীর বিবাহ ও দময়ন্তীর দ্বিতীয় স্বয়ংবরের ঘটনাও এই কথাই প্রমাণ করে দেয় যে, মহাকাব্যের যুগের ভারতেও বিধবাবিবাহ সম্পূর্ণ অপ্রচলিত ছিল না। এমনকি স্মৃতি ও পুরাণের যুগের ভারতেও বিধবাবিবাহের যথেষ্ট শাস্ত্রীয় সমর্থন পাওয়া যায়। ‘বিষ্ণু সংহিতা’র পঞ্চদশ অধ্যায়ে ও ‘বশিষ্ঠ সংহিতা’র সপ্তদশ অধ্যায়ে স্বামী-সহবাস হয় নি, এমন বিধবার বিবাহ সমর্থন করা হয়েছে। ‘নারদ সংহিতা’র দ্বাদশ বিবাদপদে বলা হয়েছে যে, কোনো নারীর স্বামী মৃত, ক্লীব, সন্ন্যাসী, সমাজচ্যুত বা নিঃসন্ধান হলে সেই নারী পুনরায় বিবাহ করার অধিকারী। বিভিন্ন বর্ণের (জাতির) নারীরা তাঁদের নিঃসন্ধান স্বামীর জন্য ঠিক কত বছর ধরে অপেক্ষা করতে বাধ্য, সেকথাও সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। ‘যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা’য় সব রকম বিধবারবিবাহকে সমর্থন করে বলা হয়েছে যে, কোনো মৃত ব্যক্তির ঋণ তাঁর বিধবা স্ত্রীকে যিনি বিবাহ করবেন, তিনিই শোধ করতে বাধ্য। ‘পরাশর সংহিতা’য়, যা নাকি কলিযুগের জন্য বিশেষ ভাবে লিখিত (“কলৌ পারাশরঃ স্বতঃ”), সেখানে সুষ্পষ্টভাবেই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারীর পত্যন্তর গ্রহণের সমর্থন রয়েছে, এবং পরাশর সংহিতার চতুর্থ অধ্যায়ের একটি শ্লোককে ভিত্তি করেই বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহের পক্ষে তাঁর সমস্ত শাস্ত্রীয় যুক্তিজাল বিস্তার করেছিলেন। অবশ্য পরাশর সংহিতায় ঠিক পরের শ্লোকেই বিধবার পক্ষে ব্রহ্মচর্য পালনই যে মহাপুণ্যের কাজ, এবং মৃত স্বামীর চিতায় সহমরণ যে আরো পুণ্যের কাজ, সেকথাও বলা হয়েছে। অতীতের হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল-চূড়ামণি ‘মনু’ও স্বামী-সহবাস হয় নি এমন বিধবার পুনর্বিবাহের জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি অন্য রকমের বিধবার বিবাহ সমর্থন না করলেও, তাঁর সময়ে সেই রকমের বিধবাবিবাহ যে হত, সেটার প্রমাণও তাঁর শাস্ত্রেই রয়েছে (মনু, ৯।১৭৫-১৭৬)। সেকালে বিধবাবিবাহের ফলে জাত সন্তানকে ‘পৌনর্ভব’ বলা হত, এবং পৌনর্ভর সন্তান তাঁর প্রথম পিতার সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশের উত্তরাধিকারী হতেন। ‘ব্রহ্মপুরাণ’ এবং ‘অগ্নিপুরাণেও’ মনুর নির্দেশের সমর্থন পাওয়া যায়। ‘পদ্মপুরাণে’ বারাণসীর এক রাজকন্যার অন্ততঃ কুড়ি বার বিবাহের কথা বলা হয়েছে, তবে সেই দৃষ্টান্তটি সম্ভবতঃ কাল্পনিক। হিন্দু ফলিত জ্যোতিষেও গ্রহ-নক্ষত্রের কি ধরণের সমাবেশ রাশিচক্রে ঘটলে কোনো পুরুষের পুনর্ভবা কন্যার সঙ্গে বিবাহ সম্ভব, সেটা বলা হয়েছে। তখনকার সমাজে সেই ধরণের বিবাহ প্রচলিত না থাকলে জ্যোতিষীরা নিশ্চয় সেই বিষয় নিয়ে চিন্তা করতেন না। উপরের প্রমাণগুলি হতে মনে হয় যে, অন্ততঃ খ্রীষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত ভারতবর্ষে বিধবাবিবাহ সমাজের উচ্চ স্তরেও একেবারে অপ্রচলিত ছিল না, যদিও মনুর বিধান অনুযায়ী তখন বিধবার পক্ষে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালনই সাধারণ নিয়ম হয়ে উঠছিল। খ্রীষ্টীয় ১০১৪ সালে লিখিত একটি জৈন গ্রন্থে কোনো একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে বিধবাবিবাহের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ‘আল-বেরুণী’র ভারত-বিবরণ পড়লে মনে হয় যে, হিন্দুসমাজে বিধবাবিবাহ তখন থেকেই প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল।
ইতিহাস বলে যে, ভারতে মুসলমান রাজত্বের আমলে বিধবাবিবাহ হিন্দু সমাজের উচ্চস্তরে অপ্রচলিত ও নিন্দনীয় হয়ে পড়েছিল; এমনকি তখন উচ্চ শ্রেণীর মুসলমানেরাও হিন্দুদের দেখাদেখি বিধবাবিবাহ বর্জন করবার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কথিত আছে যে, ভারতে ওয়াহাবী আন্দোলনের প্রবর্তক ‘সৈয়দ আহমেদ’ মুসলমানদের মধ্যে সেই কুসংস্কার দূর করবার জন্য দিল্লীতে এক রাত্রে পাঁচশো’ মুসলমান বিধবার বিবাহ দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সেই চেষ্টা বিশেষ সফল হয়নি। তবে হিন্দু সমাজের কোনো কোনো অংশে বিধবাবিবাহ কিন্তু কোনোদিনই একেবারে লোপ পায় নি। গুজরাটের ‘মনবাণিয়া’ (বর্তমানে মালবের অধিবাসী) এবং ‘মারু’ বা ‘যোধপুরী ব্রাহ্মণেরা’ তাঁদের নিজেদের সমাজে বরাবরই বিধবাবিবাহ প্রথা প্রচলিত রেখেছিলেন। অতীতে পশ্চিম ভারতে বিধবাবিবাহকে ‘গান্ধর্ববিবাহ’ বা ‘নটরা’ বলা হত। দাক্ষিণাত্যে মারাঠা দেশের ক্ষত্রিয় সমাজে অষ্টাদশ শতকের আগে পর্যন্ত বিধবাবিবাহ প্রচলিত ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে সেখানে ব্রাহ্মণ-প্রাধান্য বৃদ্ধির সঙ্গে তা লোপ পেয়েছিল। ‘Crooke’ সাহেব লিখেছিলেন যে, অতীতের সংযুক্ত প্রদেশে (বর্তমান উত্তর প্রদেশে) উচ্চতম বর্ণগুলি ছাড়া সমাজের অন্যান্য সব বর্ণের মধ্যেই বিধবাবিবাহ অল্প-বিস্তর প্রচলিত ছিল, যদিও সেখানে ব্রাহ্মণ্য প্রভাব এত বেশি ছিল যে, সেই ধরণের বিবাহ কখনোই সেখানে বিশেষ সামাজিক মর্যাদা লাভ করতে পারেনি, এবং সাধারণ বিবাহের কোনো অনুষ্ঠানই সেখানকার বিধবাবিবাহে পালন করা হত না। তখন সেখানে যেসব সম্প্রদায়ের মধ্যে বিধবাবিবাহ প্রচলিত ছিল, তাঁরা সেই প্রথা বর্জন করলে সমাজে তাঁদের মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পেত। আজও উড়িষ্যার কোনো কোনো অংশে বিধবা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রীর সঙ্গে কনিষ্ঠ ভ্রাতার বিবাহের প্রথা সুপ্রচলিত রয়েছে। জাঠ এবং ভারতের কোনো কোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যেও এই ধরণের বিবাহের কথা ‘স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল’ তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন। সেই সব সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিবারের বিধবাকে মূলতঃ পারিবারিক সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়, এবং সহজে তাঁকে পরিবারের বাইরে বিবাহ করতে দেওয়া হয় না। হিন্দু সমাজের উচ্চ বর্ণের নেতারা সময়ে সময়ে বিধবাবিবাহ প্রচলনের চেষ্টা করেছিলেন, এরকম দৃষ্টান্তও যে মধ্যযুগের ইতিহাসে একেবারে পাওয়া যায় না - তা নয়। মোঘল আমলে জয়পুরের রাজা ‘জয়সিংহ’, কোটার ‘রাণা জলিম সিংহ’, এবং পেশোয়ার দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ‘পরশুরাম ভাও’-এর প্রচেষ্টা এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণীয়। জয়সিংহের প্রচেষ্টা তাঁর বিধবা মায়ের বিরোধিতায়, এবং পরশুরাম ভাও-এর প্রচেষ্টা তাঁর স্ত্রীর বিরূপ মনোভাবের জন্য ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলন আরম্ভ হওয়ার কিছু আগে, ১৮৩৭ খ্রীষ্টাব্দে রত্নগিরির এক তেলেগু ব্রাহ্মণ বিধবাবিবাহের সমর্থনে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন। প্রথমে বোম্বাই শহরে সেটি প্রকাশিত হয়েছিল, ও সেখানকার সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘মুম্বাই দর্পণে’ সেটির বিরুদ্ধ সমালোচনা করা হয়েছিল। ওই ঘটনার কিছুদিন পরে ভারতে জৈন সম্প্রদায়ের নেতা ‘বাবা পদ্মনজী’ বিধবাবিবাহ বিষয়ে দুটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন। এরপরে ১৮৪১ খ্রীষ্টাব্দে নাগপুরের এক সম্ভ্রান্ত মারাঠা ব্রাহ্মণ শাস্ত্রীয় যুক্তির অবতারণা করে বিধবাবিবাহ সমর্থনের চেষ্টা করেছিলেন। ১৮৫৩ খ্রীষ্টাব্দে পুণায় ‘রঘুনাথ জনার্দন’ নামের একজন ব্রাহ্মণ ‘চিমাবাই’ নামের এক বিধবার পাণিগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রথমা স্ত্রী তখনো জীবিত থাকায় সেই বিবাহ তখনকার সমাজ-সংস্কারকদের মনঃপূত হয় নি। বঙ্গদেশে বিধবাবিবাহ আন্দোলন সাফল্য লাভ করবার পরে ‘বিষ্ণু শাস্ত্রী’র নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যেও সেই আন্দোলন পূর্ণোদ্যমে চালু হয়েছিল।
বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলন আরম্ভ হওয়ার বহু আগে থেকেই বঙ্গদেশে এই অতিপ্রয়োজনীয় সমাজ সংস্কারের চেষ্টা করা হয়েছিল, যদিও কোনোদিনই সেটা বিশেষ ব্যাপক রূপ ধারণ করতে পারে নি। মধ্যযুগেই শ্রীচৈতন্যের অনুবর্তী বৈষ্ণবসম্প্রদায়ের মধ্যে বিধবা বিবাহের প্রচলন হয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে হিন্দুসমাজ যখন ঘোর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল, তখনো ঢাকার রাজা ‘রাজবল্লভ’ উচ্চবর্ণের বাঙালী সমাজে বিধবাবিবাহ প্রবর্তন করবার একটা চেষ্টা করেছিলেন। ১৭৫৬ সালে নিজের বিধবা কন্যার বিবাহ দেওয়ার জন্য তিনি বিক্রমপুর, নদীয়া, বারাণসী, মিথিলা, দ্রাবিড় ও তৈলঙ্গদেশের পণ্ডিতসমাজের কাছ থেকে শাস্ত্রীয় বিধান প্রার্থনা করেছিলেন। তাঁরা সকলেই সেই ব্যাপারে সম্মতি দিলেও, রাজবল্লভের তিন সভাপণ্ডিত - সার্বভৌম, বিদ্যাবাগীশ ও সিদ্ধান্ত, তাঁদের মধ্যে শেষোক্ত ব্যক্তির বিপরীত আচরণের জন্য ও নবদ্বীপাধিপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বিরোধিতার জন্য শেষপর্যন্ত তাঁর সেই প্রচেষ্টা পণ্ড হয়ে গিয়েছিল। কৃষ্ণচন্দ্রের সেই বিরোধিতার প্রধান কারণ ছিল বৈদ্যবিদ্বেষ। জানা যায় যে, রাজবল্লভের প্রস্তাব শোনামাত্র তিনি বলেছিলেন, “এই ব্যবস্থা শাস্ত্রবিরুদ্ধ না হলেও ব্যবহার-বিরুদ্ধ বলে রাজবল্লভকে নিরাশ করতে হবে। একজন বৈদ্যজাতীয় যে এই চির-অপ্রচলিত ব্যবহার প্রচলিত করে যাবেন, এটা কোনমতেই সহ্য করা যায় না।” রাজবল্লভ কৃষ্ণচন্দ্রের চাতুরী বুঝতে না পেরে তাঁর প্রচেষ্টা থেকে নিবৃত্ত হয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে ‘মহারাজ শ্রীশচন্দ্র’ জানিয়েছিলেন যে, কৃষ্ণচন্দ্র রাজবল্লভের পাঠানো ব্যবস্থাপত্র পাঠ করে বহু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “হায়! আমি কেন আগে এবিষয়ে চেষ্টা করিনি।”
‘রাজা রামমোহন রায়’ তাঁর ‘Ancient Rights of Females’ (1824) গ্রন্থে হিন্দু বিধবাদের দুঃখ দুর্দশার কাহিনী বিশদভাবে বর্ণনা করে স্বামীর সম্পত্তিতে তাঁদের উত্তরাধিকার দাবী করেছিলেন। তবে রামমোহন কখনো প্রকাশ্যে বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের জন্য কোন চেষ্টা করেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায় না, কিন্তু তাঁর বিলাত যাত্রার পরে বঙ্গদেশে এক প্রবল জনরব উঠেছিল যে, তিনি হিন্দু বিধবাদের বিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করবার জন্যই বিলাত গিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে ১৮৫৫ সালে ‘Calcutta Review’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, “We do not know exactly how this impression got abroad, but it was so firm especially in the female mind that the old widows often jocularly talked of their marriage on the return of Rammohan Roy.” ১৮৩৫ সালের ১৪ই মার্চ তারিখের ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় শান্তিপুর নিবাসী কয়েকজন অবিবাহিতা প্রৌঢ়া কুলীনকন্যার প্রেরিত একটি পত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পত্রে তাঁরা তাঁদের নিজেদের দুর্দশার কাহিনী বিবৃত করে তৎকালীন বঙ্গদেশের ব্রাহ্মণও কায়স্থ ঘরে বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য দাবী জানিয়েছিলেন, ও উপস্ত্রীগমন নিরোধ সম্পর্কে আইন প্রণয়ন প্রার্থনা করেছিলেন। এই সালের ২১শে মার্চ তারিখের সমাচার দর্পণ পত্রিকায় চুঁচুড়ার কয়েকজন ভদ্রমহিলার সেই দাবীর সমর্থনে প্রেরিত একটি পত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পত্রে চুঁচুড়ানিবাসী মহিলারা বঙ্গের পিতা ও ভ্রাতাদের কাছে একটি আবেদনে স্ত্রীশিক্ষা প্রচলনের জন্য দাবী জানিয়েছিলেন, স্বচ্ছন্দে পরপুরুষের সঙ্গে নারীদের আলাপ করবার অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন, স্বামী নির্বাচনের ব্যাপারে নারীদের স্বাধীনতা কামনা করেছিলেন, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিরোধের জন্য দাবী জানিয়েছিলেন, পণপ্রথার বিরুদ্ধে আপত্তি প্রকাশ করেছিলেন, এবং সবশেষে বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। খুব সম্ভবতঃ সেই পত্র দুটির পিছনে কোনো রামমোহন-শিষ্যের অনুপ্রেরণা ছিল। ১৮৩৭ সালের ২১শে এপ্রিল তারিখের ‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকায় এই মর্মে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল যে, বাবু ‘মতিলাল শীল’, বাবু ‘হলধর মল্লিক’ প্রমুখ কলকাতার কয়েকজন সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোক বঙ্গদেশে স্ত্রীশিক্ষা ও বিধবাবিবাহের প্রচলনের ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়ার জন্য একটি সভা আহ্বান করতে মনস্থির করেছেন। ‘Harkara’, ‘Courier’, ‘Englishman’, ‘Reformer’, ও ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকার সম্পাদকেরাও তখন বিধবাবিবাহের পক্ষে নিজেদের অভিমত জ্ঞাপন করেছিলেন। প্রায় সময়ে ‘Friends of India’ এবং ‘Bengal Spectator’ পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি পত্রে ও প্রবন্ধে সেই আন্দোলনেরই অনুবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ১৮৪২ সালের এপ্রিল সংখ্যা ‘Bengal Spectator’-এ একজন পত্রলেখক কিভাবে এই আন্দোলনকে সফল করা যায় সে সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন, এবং একটি বিস্তারিত কর্মসূচীও সেখানে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ঐ বছরেরই ২৬শে এপ্রিল তারিখে প্রকাশিত ‘সংবাদ প্রভাকরে’ সেই পত্রের একটি তীব্র সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল, এবং তার পরের মাসেই ‘Bengal Spectator’ পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধে সেই সমালোচনার উত্তর দেওয়া হয়েছিল। বিধবাবিবাহে কোন কোন শাস্ত্রীয় আচার পালনীয়, সেই সম্বন্ধে ওই প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছিল। ১৮৪৩ সালের ১৫ই জানুয়ারী তারিখে ‘Bengal Spectator’ পত্রিকার সম্পাদকের কাছে প্রেরিত একটি পত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পত্রলেখক এইমর্মে আবেদন জানিয়েছিলেন যে, বিধবাবিবাহের স্বপক্ষে যখন কোন শাস্ত্রীয় সমর্থন পাওয়া যায় না, এবং ভবিষ্যতে তা পাওয়া গেলেও সেটা যখন আদালতের কাছে গ্রাহ্য হবে না, তখন সরকারের সাহায্য ছাড়া এই আন্দোলনে সাফল্য লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। সেই সাহায্য যাতে পাওয়া যায় সেটার জন্য সকলকেই চেষ্টা করতে হবে। বিদ্যাসাগরের হস্তক্ষেপের প্রায় ১০ বছর আগে কলকাতার বহুবাজার নিবাসী ‘নীলকমল বন্দ্যোপাধ্যায়’ অন্যান্য কয়েকজন সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকের সহযোগিতায় হিন্দুসমাজে বিধবাবিবাহ প্রচলনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। এর কিছুদিন আগে কৃষ্ণনগরের মহারাজা ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠাবিষয়ে সাফল্য লাভ করে বিধবাবিবাহ প্রবর্তনে প্রয়াসী হয়েছিলেন। তখন বিধবাবিবাহের শাস্ত্রীয় ব্যবস্থা লাভের জন্য নবদ্বীপের পণ্ডিতমণ্ডলীর একটি সভা আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু নবদ্বীপের পণ্ডিতেরা প্রথাটির শাস্ত্রীয়তা স্বীকার করেও সেই বিষয়ে সহসা কোন লিখিত ব্যবস্থাপত্র দিতে রাজী হন নি। শেষপর্যন্ত কৃষ্ণনগরের রাজার বিশেষ অনুরোধে তাঁরা সেই কাজে সম্মত হয়েছিলেন, কিন্তু মহারাজ শ্রীশচন্দ্রের সেই চেষ্টাও সাফল্য লাভ করে নি। বাবু ‘ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়’ ও বারাসত-নিবাসী ‘কালীকৃষ্ণ মিত্র’ পরিচালিত কৃষ্ণনগরের ‘নব্যসম্প্রদায়’ কর্তৃক বিধবাবিবাহ প্রবর্তন আন্দোলনও সেই সময়েই আরম্ভ হয়েছিল। কিন্তু বীরনগর (উলা) নিবাসী ‘বামনদাস মুখোপাধ্যায়ের’ বিরোধিতায় সেই আন্দোলন ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ১৮৪৫ সালে কলকাতার ‘British India Society’ বিধবাবিবাহের ব্যাপারে ‘ধর্মসভা’ ও ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’র সঙ্গে কিছুকাল পত্রালাপ চালিয়েছিল; কিন্তু সেই পত্রালাপে বিশেষ কোনো সুফল পাওয়া যায় নি। বিদ্যাসাগরের আন্দোলন আরম্ভ হওয়ার ঠিক আগেই, কলকাতার পটলডাঙ্গা নিবাসী ‘শ্যামাচরণ দাস’ তাঁর নিজের বালিকা বিধবা কন্যার বিবাহ দেওয়ার জন্য স্মার্ত ভট্টাচার্যদের কাছে ব্যবস্থাপ্রার্থী হলে ‘কাশীনাথ তর্কালঙ্কার’, ‘তারাশঙ্কর বিদ্যারত্ন’, ‘রামতনু তর্কসিদ্ধান্ত’, ‘ঠাকুরদাস চূড়ামণি’, ‘মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ’ প্রভৃতি কয়েকজন স্মার্ত ভট্টাচার্য বিধবাবিবাহের বৈধতাকে স্বীকার করে নিয়ে একটি ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা কেবলমাত্র শূদ্রদের পক্ষেই সেই ব্যবস্থাকে শাস্ত্রসম্মত বলে ঘোষণা করেছিলেন, এবং পরিশেষে তাঁদের ব্যবস্থাপত্রও প্রত্যাহার করে নিয়ে শ্যামাচরণ দাসকে সেই কাজ থেকে নিবৃত্ত করেছিলেন। সেই সময়েই ‘রাজা রাধাকান্ত দেবের’ বাড়িতে আয়োজিত একটি বিতর্ক সভায় বহু পণ্ডিতের উপস্থিতিতে নবদ্বীপের প্রসিদ্ধ স্মার্ত ‘ব্রজনাথ বিদ্যারত্নের’ সঙ্গে বিচারে, উপরের স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অন্যতম ‘ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন’ বিধবাবিবাহের পক্ষ সমর্থন করে জয়ী হয়েছিলেন, এবং রাজবাড়ী থেকে একজোড়া শাল পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন সেই পুরস্কারের শাল গায়ে দিয়েই বিধবাবিবাহের বিপক্ষীয়দের সাহায্য করেছিলেন, এবং ‘মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ’ও তাঁর দৃষ্টান্তকে অনুসরণ করেছিলেন। বিদ্যাসাগর তাঁর বিধবাবিবাহ বিষয়ক প্রথম পুস্তকের বিজ্ঞাপনে ওই সব পণ্ডিতদের আচরণের তীব্র নিন্দা করেছিলেন।
এইভাবে বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের বহু আগে থেকেই বঙ্গদেশে বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু বিদ্যাসাগরই প্রথম সেই ব্যাপার নিয়ে এক দেশব্যাপী আলোড়নের সূচনা করেছিলেন, এবং বিধবাবিবাহের স্বপক্ষে প্রবল জনমত গঠন করেছিলেন। তাঁর বহু সমাজসংস্কার প্রচেষ্টার মধ্যে বিধবাবিবাহ আন্দোলনই যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈপ্লবিক সম্ভাবনাযুক্ত ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এমনকি বিদ্যাসাগর নিজেও সেই আন্দোলনের গুরুত্ব সম্বন্ধে যথেষ্ট অবহিত ছিলেন। নিজের পুত্র ‘নারায়ণচন্দ্রের’ বিধবাবিবাহ প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগর তাঁর সহোদর ও জীবনীকার ‘শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন’কে যে পত্রটি লিখেছিলেন, তাতে তিনি স্পষ্টভাষায় জানিয়েছিলেন, “বিধবাবিবাহের প্রবর্তন আমার জীবনের সর্ব্বপ্রধান সৎকর্ম্ম - জন্মে ইহা অপেক্ষা অধিক কোন সৎকর্ম্ম করিতে পারিব তাহার সম্ভাবনা নাই; এবিষয়ের জন্য সর্ব্বস্বান্ত করিয়াছি এবং আবশ্যক হইলে প্রাণান্ত স্বীকারেও পরাঙ্মুখ নই, সে বিবেচনায় কুটুম্ব বিচ্ছেদ অতি তুচ্ছ কথা।” বিদ্যাসাগরের জীবনীকার ‘চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়’ ঠিকই বলেছিলেন যে, লোকে বিদ্যাসাগরের জীবনকাহিনীতে তাঁর শৈশবে দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম, তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য, তাঁর স্বাধীনচিত্ততা, তাঁর বঙ্গভারতীর সেবা, দরিদ্র আতুর জনের প্রতি তাঁর সহৃদয়তা ও মমত্ববোধ ইত্যাদি সব কিছুই ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু ভারতে হিন্দু বিধবার বিবাহ প্রবর্তন তাঁরা কোনোদিনই ভুলতে পারবে না। একথা সত্যি যে, সতীদাহ নিবারণে রামমোহনের মতো বিধবাবিবাহের সমর্থনে বিদ্যাসাগরও বহু শাস্ত্রীয় যুক্তি ও তত্ত্বের অবতারণা করেছিলেন, কিন্তু শাস্ত্রে বিধবাবিবাহের সমর্থন আছে বলেই যে তিনি সেই বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন - তা নয়। উৎপীড়িত অসহায় জনের প্রতি যে নিবিড় সহানুভূতি এবং মানবজীবনের প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধাবোধ তাঁর অন্তরের স্বাভাবিক গুণ ছিল, সেটাই তাঁকে সেই আন্দোলনে যোগদান করতে প্রেরণা দিয়েছিল। শাস্ত্রীয় যুক্তি ও তত্ত্ব কেবলমাত্র তাঁর কুসংস্কারাচ্ছন্ন দেশাচারবিমূঢ় দেশবাসীর জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের জন্যই ব্যবহৃত হয়েছিল। বাংলার নারীদের দুর্দশা মোচনের জন্য বিদ্যাসাগর তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বিধবাবিবাহ আন্দোলন তাঁর সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টার একটা অংশমাত্র ছিল। অনেকের ধারণা রয়েছে যে, বিদ্যাসাগর তাঁর জননীর অনুরোধে সেবিষয়ে প্রথম চিন্তা করতে আরম্ভ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে ‘Joseph Chailley’ তাঁর ‘Administrative Problems of British India’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “At the instigation of his mother he interested himself in the lot of child widows and studied the sacred books to see if he could find anything in their favour.” কিন্তু এই বহুল প্রচলিত ধারণাটি আদৌ ঠিক নয়। বিদ্যাসাগরের জীবনীকার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মা ও ছেলে’ গ্রন্থে ‘ভগবতী দেবী’র চরিতকাহিনী সম্বন্ধে কয়েকটি আখ্যায়িকা পাওয়া যায়। বিদ্যাসাগর নিজে সেগুলি চণ্ডীচরণকে দেখে দিয়েছিলেন। বিধবাবিবাহ প্রচলন বিষয়ে তাঁর জননীর কতটুকু সম্বন্ধ ছিল, সেকথাও প্রসঙ্গক্রমে সেখানে লেখা হয়েছিল, কিন্তু তাতে তাঁর জননীর অনুরোধের অন্ততঃ কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
১৮৫৪ সালের ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় কয়েকটি প্রবন্ধ লিখে বিদ্যাসাগর প্রথম সেই আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন। তখন সেই প্রবন্ধগুলি প্রকাশিত হওয়ার পরে বঙ্গদেশের শিক্ষিত সমাজে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল। সেই সময়ে কালীকৃষ্ণ মিত্রও কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত একটি সভায় তাঁর পঠিত প্রবন্ধে বিধবাবিবাহের আবশ্যকতা, ও বিদ্যাসাগরের প্রদত্ত শাস্ত্রীয় প্রমাণগুলির বৈধতা প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করেছিলেন, এবং তাঁর সেই বক্তৃতার ফলে কৃষ্ণনগরে তখন করে সেই আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটেছিল। ১৮৫৫ সালের জানুয়ারী মাসে বিদ্যাসাগরের ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ নামের পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। বহুদিন ধরে চিন্তা করে, বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন করে বিদ্যাসাগর সেই পুস্তিকাটি রচনা করেছিলেন, এবং জনসমাজে সেটি প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রধানতঃ পরাশর সংহিতার চতুর্থ অধ্যায়ের একটি শ্লোককে ভিত্তি করেই বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহের স্বপক্ষে তাঁর শাস্ত্রীয় যুক্তিজাল বিস্তার করবার চেষ্টা করেছিলেন।
(তথ্যসূত্র:
১- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, চণ্ডীচরণ বন্দোপাধ্যায়।
২- বিদ্যাসাগর গ্রন্থাবলী, সমাজ, সাহিত্যপরিষৎ সংস্করণ, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ।
৩- ক্ষিতীশবংশাবলী চরিত, দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায়।
৪- বিদ্যাসাগর জীবনচরিত, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন।
৫- আত্মচরিত, রাজনারায়ণ বসু।
৬- মা ও ছেলে, চণ্ডীচরণ বন্দোপাধ্যায়।
৭- সংবাদপত্রে সেকালের কথা, ২য় খণ্ড, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় সম্পাদিত।
৮- The North- Western Provinces Of India, W. Crooke.
৯- Memoirs of My Indian Career, Vol. I, G. Campbell.
১০- Administrative Problems of British India, J. Chailley
৫৩
৯১ মন্তব্য