সহকারী শিক্ষক
০২ মে, ২০২৩ ১১:০১ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘বাঙালীর বাণিজ্যের সোনালী অতীত’
‘বিশ্বকোষে’ বলা হয়েছে, অতীতে “তাম্রলিপ্ত পূর্বদেশীয় বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল।” সেই কারণে বাংলার বাণিজ্যের ইতিহাসে আজও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত সুপ্রাচীনকালের তাম্রলিপ্ত জনপদের বিপুল গৌরব জ্বলজ্বল করছে বলে দেখতে পাওয়া যায়। ‘পেরিপ্লাসের’ মতে অতীতের তাম্রলিপ্ত ছিল সেই বন্দর যেখান থেকে বাঙালী সওদাগরেরা পান, সুপারী বা গুবাক, নারকেল, রেশম, মসলিন, তেজপাতা, পিপুল এবং আরো নানা রকমের পণ্য নিয়ে সরাসরি সিংহলে, দক্ষিণ-পূর্বে আরাকান উপকূল ধরে সুবর্ণদ্বীপে (ব্রহ্মদেশ), কোণাকুণিভাবে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে সুদূর মালয় উপদ্বীপে চলে যেতেন। খৃষ্টীয় চার অথবা পাঁচ শতকের মালয়ের একটি তাম্রশাসনে সেকালের মহানাবিক ‘বুদ্ধগুপ্তের’ কথা পাওয়া যায়। বুদ্ধগুপ্ত বণিক, এবং রক্তমৃত্তিকানিবাসী ছিলেন। ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন যে, রক্তমৃত্তিকা অর্থাৎ রাঙামাটির দেশ, সম্ভবতঃ বঙ্গদেশ। তাই অনুমান করা যায় যে, বণিক বুদ্ধগুপ্ত সেই তাম্রলিপ্ত থেকেই ব্রহ্মদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। পঞ্চম শতাব্দীতে সেই বন্দর থেকেই একটা বিশাল সওদাগরী জাহাজ ধরেই প্রায় দু’শো জন আরোহীর সঙ্গে ফা-হিয়েন সিংহল হয়ে স্বদেশের দিকে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেকালের বৌদ্ধভিক্ষু অথবা পরিব্রাজকদের বিবরণেই তাম্রলিপ্তের বন্দরের ইতিবৃত্ত বেশী করে পাওয়া যায়। ‘রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়’ তাঁর ‘ইণ্ডিয়ান শিপিং’ গ্রন্থে স্পষ্ট করেই তাম্রলিপ্ত সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, “Great Buddhist harbour of the Bengal seaboard”; অর্থাৎ, বাংলার উপকূলে বৌদ্ধদের বিশাল বন্দর। ফা-হিয়েনের ঠিক দু’শো বছর পরে, অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীতে আরেক বৌদ্ধ-পরিব্রাজক ‘য়ুয়ান-চোয়াঙ’ (Yuan Chwang) বা ‘হুয়েন সাঙ’ বঙ্গদেশে এসেছিলেন। তিনিও তাম্রলিপ্ত প্রসঙ্গে বলেছিলেন, এটি “বঙ্গোপসাগরের মুখে খুব গুরুত্বপূর্ণ বন্দর - এখানে সাগরের জল আর মাটি মুখোমুখি মিশেছে।” য়ুয়ান চোয়াঙ তাঁর লেখায় তখনকার তাম্রলিপ্তের অধিবাসীদের আর্থিক সমৃদ্ধির কথাও বলেছিলেন। য়ুয়ান-চোয়াঙ যে বছর (৬৩০ খৃষ্টাব্দে) ভারতে এসেছিলেন, ঠিক তার দীর্ঘ তেতাল্লিশ বছর পরে (৬৭৩ খৃষ্টাব্দে) তাম্রলিপ্তের মাটিতে আরেকজন স্বনামধন্য বৌদ্ধভিক্ষু ‘ই-ৎ-সিঙের’ (I. Tsing) পায়ের ধুলো পড়েছিল। তাঁর বিবরণ থেকেও বন্দর হিসেবে তাম্রলিপ্তের খ্যাতির কথা জানতে পারা যায়। তিনি বলেছিলেন, “এই বন্দর থেকেই আমরা চীনে ফিরে যেতাম।” তাম্রলিপ্তে কিছুদিন থাকবার পরে তিনি যখন স্থলপথে বুদ্ধগয়ায় রওনা হয়েছিলেন, তখন সেকালের শত শত বণিক তাঁর সহযাত্রী হয়েছিলেন। এথেকে অনুমান করা যায় যে, অতীতের তাম্রলিপ্তের বাণিজ্য-ব্যবসায়ীরা শুধু যে ব্যবসা করতেন তা নয়, তাঁরা ধর্মচর্চাও করতেন। ই-ৎ-সিঙ-এর লেখা থেকে জানা যায় যে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে আরও অসংখ্য চীনা ভিক্ষু তাম্রলিপ্তে এসেছিলেন। স্বনামধন্য সেই চৈনিক পরিব্রাজক বাংলার ওই প্রাচীন বন্দরটি সম্বন্ধে লিখেছিলেন, “ভারতের পূর্বপ্রান্ত থেকে চল্লিশ যোজন দূরে তাম্রলিপ্ত বন্দর অবস্থিত। এখানে পাঁচ-ছয়টি বৌদ্ধবিহার আছে। অধিবাসীরা ধনী।” চীনা পরিব্রাজকদের ভ্রমণ বৃত্তান্তের ভেতরে তাম্রলিপ্তের ইতিহাসকে ঐতিহাসিকেরা নির্ভরযোগ্য বলে ধরে থাকেন। এছাড়া রামায়ণে, মহাভারতে, বেদে, পুরাণে, সংস্কৃত সাহিত্যে - ‘পাণ্ডববিজয়’, ‘দিগ্বিজয় প্রকাশ’,বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ - ‘মহাবংশ’, ‘রত্নবিজয়’ প্রভৃতিতে তাম্রলিপ্তের উল্লেখ থাকলেও, সেগুলো দূর অতীতের কুয়াশায় আচ্ছন্ন; সেসব তথ্যের কোন দৃঢ় ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তবে ঐসব উল্লেখ থেকে এটা অনুমান করা যায় যে, সেই পৌরাণিককাল থেকেই তাম্রলিপ্ত জনপদের সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ণ ছিল। খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতকের কাছাকাছি সময়ে প্রাচীন ভূগোলবিদ ‘টলেমি’র লেখা থেকে তাম্রলিপ্তের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ পাওয়া যায়। “The Greek geographer refers to the city as Tamalities and places it on ganges in a way which suggests connection with the country of Mandalai.” টলেমি তাঁর লেখায় তাম্রলিপ্তকে গঙ্গার ওপরের শহর বলে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। গ্রীকদূত ‘মেগাস্থিনিস’ তাঁর লেখায় গঙ্গার পরপারে ‘তালোক্তি’ (Taluctae) নামের এক জাতির কথা উল্লেখ করেছিলেন। মেগাস্থিনিসের লেখার অনুবাদক ‘মাক্রিণ্ডল’ সাহেবের মতে তালোক্তি অর্থ হল তাম্রলিপ্তবাসী। পেরিপ্লাসে বলা হয়েছে যে, অতীতের তাম্রলিপ্ত থেকে শুধু যে নীল, তুঁতে, পশম রপ্তানীই হত তা নয়, সেখানে সিংহল থেকে মুক্তা, প্রবাল, রূপো (সিংহলে রূপোর খনি ছিল) আমদানীও করা হত। ঐতিহাসিক ‘রমেশচন্দ্র মজুমদার’ জানিয়েছিলেন যে, বাংলার বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে হিন্দুযুগের শেষপর্যন্ত তাম্রলিপ্তের খ্যাতি অক্ষুণ্ণ ছিল। এছাড়া হাজারীবাগ জেলার দুধপানি পাহাড়ে উৎকীর্ণ করা উদয়মালার একটা লিপি থেকেও অতীতের তাম্রলিপ্তের সংবাদ পাওয়া যায়। খৃষ্টীয় অষ্টম শতকের সেই লিপিতে বলা হয়েছে -
“অথ কস্মিং শ্চি(ৎ) (স)ময়ে বাণিজ্যভ্রাতরস্ত্রয়ঃ।
তাম্রলিপ্তি (ম) যোধ্যায়া যযুঃ পূৰ্বস্বনিজয়া৷৷”
খৃষ্টীয় আটের শতকের মাঝামাঝি সময়ে সুদূর অযোধ্যা থেকে তিন ভাই তাম্রলিপ্তে ব্যবসা করতে এসেছিলেন। কিছুকালের মধ্যেই তাঁরা সেখান থেকে প্রচুর ধন উপার্জন করে নিজেদের দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। তাম্রলিপ্ত থেকে অযোধ্যা - এই দূরগামী পথ ধরেই অতীতে চীন থেকে বঙ্গদেশে সিল্ক আমদানী করা হত; এছাড়া রেশমের গুটি, আরবী ঘোড়াও আসত। আবার তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে সেইসব পণ্যই সিংহলে, দূরপ্রাচ্যে রপ্তানী করা হত। পশ্চিমগামী সেই পথেই বাংলা থেকে উত্তর ভারতবর্ষে রাজরাজড়ারা সামরিক অভিযানে যেতেন। আধুনিককালের তমলুক শহর যে পুরানোকালের তাম্রলিপ্ত, ‘পেরিপ্লাস অফ এরিথেইয়ান সী’র অজ্ঞাতনামা লেখক সেকথা জানিয়েছিলেন। তমলুক বহু নামে ইতিহাসের পাতায় খ্যাত - ‘তাম্বলিপ্তি’, ‘দামলিপ্তি’, ‘তামালিপি’ ইত্যাদি। বৃটিশ আমলের ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে বলা হয়েছিল, “... it first emerges in authentic history as a port.” ইতিহাসের পাতায় একটা বন্দর হিসেবেই তাম্রলিপ্তের অস্তিত্বের কথা প্রথম পাওয়া যায়। তাম্রলিপ্ত সেকালে কেন অত বড় বন্দর, এবং বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, সেটা জানতে হলে সবার আগে তাম্রলিপ্তের ভৌগোলিক অবস্থানটা জানা দরকার। গঙ্গা নদীর মোহনার ঠিক মুখে একটু পশ্চিমে আর সমুদ্রের উত্তরদিকে তাম্রলিপ্তের অবস্থান ছিল। ঐতিহাসিক ডক্টর রমেশ মজুমদার জানিয়েছিলেন, “The city which controlled the mouth of Ganges, was commercially most important in Eastern India.” অর্থাৎ, তখন যে শহর গঙ্গার একেবারে মোহনায় অবস্থিত হত, সেই শহরই পূর্বভারতের প্রসিদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠত। তাই যতদিন গঙ্গা তাম্রলিপ্তের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছিল, ততদিন সেই বন্দরের গৌরব অক্ষুণ্ণ ছিল। কিন্তু যেই গঙ্গার গতিপথ বদলে গিয়েছিল, অমনি ষোড়শ শতাব্দী থেকে ‘সপ্তগ্রাম’ বাংলার বিখ্যাত বন্দর হিসেবে গড়ে উঠেছিল। তারপরে নদী আবার সরে গিয়েছিল, ফলে সপ্তগ্রামও ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গিয়েছিল। তারপরে বন্দর হিসেবে গড়ে উঠেছিল হুগলী, এবং হুগলীর পরে কলকাতা। খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর ধনেজনে সমৃদ্ধ তাম্রলিপ্তের পরিধি একশো পঁচিশ ক্রোশ ছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। তখন গঙ্গা ও সমুদ্রকে কাছে পেয়ে তাম্রলিপ্ত দিনে দিনে বিপুল সমৃদ্ধিতে ভরে উঠেছিল। বিদেশীদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সেকালের বিখ্যাত তাম্রলিপ্ত নগরের বৃক্ষশোভিত রাজপথের দু’পাশে অসংখ্য বিপণিশ্রেণী বিপুল সম্ভার নিয়ে ঝলমল করত। সেখানকার বাঙালী বণিকেরা তখন শুধু গ্রীষ্ম সমাগম থেকে শুরু করে বর্ষা পর্যন্ত স্বগৃহে বাস করতেন। এরপরে যেই বর্ষার কালো মেঘ আকাশ থেকে মিলিয়ে যেত, আর শরতের সোনা রোদে চারিদিক ঝলমল করে উঠতো, তখনই সেখানকার বাঙালী সওদাগরদের দূরদেশে সমুদ্র অভিযানের আয়োজন শুরু হত। যে গঙ্গ৷ একদা তাম্রলিপ্তকে ধৌত করে সমুদ্রে পড়ত, কোন একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই গঙ্গা নিজের গতিপথ পরিবর্তন করেছিল। ফলে দূরপ্রাচ্যগামী বন্দর হিসেবে তাম্রলিপ্তের সমস্ত গৌরব নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবে গঙ্গা মরে গেলেও তার গতিপথের ওপরে যে খাল ছিল, সেই খাল অনেক যুগ ধরে, অর্থাৎ ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত নৌবাহন যোগ্য ছিল। তারপরে সেই সংকীর্ণ জলপথের গর্ভেও একটু একটু করে বালি জমেছিল, এরপরে দেখতে দেখতে একদা সেই বিখ্যাত নদী ভরাট হয়ে গিয়েছিল, আর তাম্রলিপ্তের বুক জুড়ে বিস্মৃতির অমানিশা নেমে এসেছিল।
ইতিহাসে এবং প্রাচীনদিনের মহাকাব্যে বাংলার ‘বরেন্দ্রভূমি’ নামক বিশাল জনপদটি ‘বরেন্দ্রমণ্ডল’, ‘পুণ্ড্রবর্দ্ধন’ কিংবা ‘গৌড়’ নামে খ্যাত। সেই সুদূরকাল থেকেই পুণ্ড্রবৰ্দ্ধন, অর্থাৎ উত্তর বাংলার ব্যবসাবাণিজ্যের খ্যাতির কথা দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতে’ এবং ‘হিউয়েন সাঙের’ বিবরণে পাওয়া যায়। প্রাচীনদিনের একটি ব্রাহ্মী শিলালিপি বলে যে, পুণ্ড্রবৰ্দ্ধনই হল আধুনিককালের বাংলাদেশের বগুড়া থেকে সাত মাইল দূরে করোতোয়া নদীর ধারে অবস্থিত ‘মহাস্থানগড়’। ঐতিহাসিক ডক্টর মজুমদার জানিয়েছিলেন যে, অতীতে তিনটি কারণে পুণ্ড্রবর্দ্ধনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রথমতঃ পুণ্ড্রবর্দ্ধন একটি বৌদ্ধতীর্থস্থান ছিল; দ্বিতীয়তঃ, পুণ্ড্রবর্দ্ধন বঙ্গ-প্রদেশের রাজধানী ছিল; আর তৃতীয়তঃ, উত্তর বাংলার প্রধান বাণিজ্য পথের ওপরে সেই নগরের অবস্থান ছিল। এবারে সেখানকার ব্যবসার কথায় আসা যাক। তাম্রলিপ্তের মতই বরেন্দ্রভূমিও একটি প্রাচীন দেশ। বিদ্যায় আর সংস্কৃতিতে, ব্যবসায় আর বাণিজ্যে অতীতের বরেন্দ্রভূমির প্রতিটি অঞ্চলই অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। সেই দেশ তখন প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। সেখানে দূর দূর দেশ থেকে আসতো বিদেশীরা বাণিজ্য করতে, এবং প্রলুব্ধ হয়ে লুণ্ঠন করতে আসতেন। যুগের পর যুগ ধরে বহির্দেশীয় আক্রমণ মত্ত হাতীর মত আক্রোশ নিয়ে সেই শান্ত রসাস্পদ জনপদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পৌরাণিককালের শক্তিশালী নৃপতি ‘পরশুরাম’, শিবের উপাসক মহাপরাক্রমশালী ‘রাজা বানের’ স্মৃতি বিজড়িত সেই বরেন্দ্রভূমির দুটি প্রধান অঞ্চল ছিল - মালদহ আর দিনাজপুর। বিভিন্ন প্রাচীন পুস্তকে উক্ত দুটি জেলার অতীতের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির কথা পাওয়া যায়। আজও মালদহের বিভিন্ন জায়গায় পথে-প্রান্তরে লাটাগাছের ঝোপের মধ্যে সরু সরু ইঁটের তৈরী এক একটি প্রাচীন কুঠিবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় গ্রামের মানুষেরা সেগুলিকে ‘রেশমকুঠি’ বলে থাকেন। কে জানে কত যুগ আগে সেই রেশমকুঠিগুলি শত শত মানুষের পদশব্দে মুখরিত হয়ে থাকত। হয়ত শত শত শতাব্দী আগে মালদহের কাটুনী মেয়েরা গান গেয়ে গেয়ে সিল্কের সুতো কাটতেন আর দীর্ঘ করে সেই সুতো রোদে শুকোতে দিতেন। তখন না জানি কত দূর দূর দেশ থেকে বণিকেরা উত্তর বাংলার সেই রেশম কিনতে আসতেন। অতীতের মালদহের রেশম শিল্প সম্পর্কে উইলিয়াম হান্টারের ‘ইম্পিরিয়াল গেজেটিয়ার’-এ বলা হয়েছিল, “... Staple industry of the district is silk. The industry is said to date back to Hindu Kingdom of Gaur.” গৌড়ের হিন্দু রাজাদের সময়েও বঙ্গদেশে সিল্কের প্রচলন ছিল। তখন ঢাকা, সোনারগ্রাম, সপ্তগ্রাম, এবং আরো দূরের অনেক দেশে বাংলা থেকে পট্টবস্ত্র রপ্তানী করা হত। সেই পট্টবস্ত্রের চাহিদা আজও কিন্তু অম্লান রয়েছে। হিন্দুদের পূজায়, যাগযজ্ঞে ও বিবাহে আজও পট্টবস্ত্রের ব্যবহার অপরিহার্য। গৌড়ের শেষতম হিন্দু রাজার ওপরে ‘বখতিয়ার খিলজী’র লুব্ধ তরবারি ঝলসে উঠেছিল। মুসলমান শাসকেরা তাদেরনিজেদের সঙ্গে বঙ্গদেশে রণবিদ্যা-নিপুণ দুর্ধর্ষ সৈন্যদল নিয়েছিলেন। প্রায় একই সাথে বাংলায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য শত শত পীরেরা এসেছিলেন। সেই পীরেরা সেই সময়কার বাংলার ঘরে ঘরে বহুমূল্য ঝলমলে সিল্কের কাপড় দেখতে পেয়েছিলেন। ইসলামের উপাসকদের কাছে বিলাসিতা এক অমার্জনীয় অপরাধ। তাই তাঁরা রেশমের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। ফলে বাংলার রেশম ব্যবসার ওপরে দুৰ্যোগ নেমে এসেছিল। কিন্তু ধর্মজয়ের চেয়ে সংস্কার অনেক বড় হয়। ততদিনে বাংলার শত শত হিন্দু-মুসলমানের রক্তের ভেতরে রেশমের গুটিসুতোর কাজের নেশা মিশে গিয়েছিল। তাই ধর্ম আর রাজভয়কে তুচ্ছ করে, রাত্রির অন্ধকারে গোপন পদসঞ্চারে সেকালের বাঙালীদের সেই সুপ্রাচীন রেশম ব্যবসা একটু একটু করে পুনরুজ্জীবিত হতে শুরু করেছিল। কিন্তু তাঁদের সেই প্রচেষ্টাও অচিরেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কারণ, বখতিয়ার খিলজীর অনুচরেরা যেখানে মাঠের পর মাঠ জুড়ে মালবেরী গাছ ছিল, যে গাছে রেশম গুটির জন্ম হয় - সেই সমস্ত গাছ নির্মূলভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তারপরে সেই ধূ ধূ শূন্য মাঠ, নিদারুণ অভিশাপের মত দূর দূরান্তে প্রসারিত হয়ে পড়েছিল। ওই ঘটনার সুদীর্ঘ তিনশো পঁয়ত্রিশ বছর পরে, ১৫৩৯ খৃষ্টাব্দে আবার কেমন করে বাংলার রেশমের ব্যবসা শুরু হয়েছিল, সেই ইতিহাস এখন রোমাঞ্চকর ও বিচিত্র এক কিংবদন্তীতে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে। সেই তুঁতগাছ শূন্য মাঠে একদিন সকলের অলক্ষ্যে এক টুকরো সবুজের আশীর্বাদ, একটি মালবেরী গাছের চারা দেখা দিয়েছিল। ততদিনে পীরেরা নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে, সমস্ত রেশম গুটির গাছ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাঁরা এবং কোন জনপ্রাণীই জানত না যে, সেই জনহীন প্রান্তরে নিশি রাতের স্তব্ধতাকে তুচ্ছ করে এক দুর্ভাগিনী নারী নিঃশব্দ পায়ে অত্যন্ত সন্ত্রস্তভাবে যাতায়াত করেন। শূন্য মাঠের বুকে সেই সবুজ চারাগাছটির গায়ে তিনি পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিতেন, জল ঢেলে পরিচর্যা করতেন, আর গভীর রাতের তারা-জ্বালা আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবতেন। তারপরে যখন ধীরে ধীরে রাত শেষ হয়ে আসত, ভোরের আকাশে শুকতারাটা জ্বলজ্বল করে উঠত, তখন আবার সেই রহস্যময়ী নারী দ্রুতপায়ে লোকালয়ের দিকে ফিরে চলে যেতেন। কে ছিলেন সেই নারী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে আরও আগে চলে যেতে হবে। মুসলিম পীরেরা শুধু রেশমের ব্যবসা বন্ধ করতেই চেষ্টা করেন নি, তাঁদের নির্দেশে ওস্তাদ কাটুনীদের হত্যাও করা হয়েছিল। সেকালে মালদহ থেকে কিছুদূরে অবস্থিত জালালপুরের ‘নুরুদ্দীন’ রেশম গুটি থেকে সুতো বের করতে অত্যন্ত সুপটু ছিলেন। রাজরোষকে তুচ্ছ করে গোপনে সেই কাজ করতে গিয়ে তিনিও ধরা পড়েছিলেন। বিচারে তাঁর প্রাণদণ্ড হয়েছিল। সেদিন জালালপুর গ্রামের একেবারে প্রান্তে অবস্থিত একটি কুটীরের অন্ধকার কোণে বসে সেই দৃপ্ত অসমসাহসী নারী শুধু নীরবে নিজের চোখের জলই ফেলেন নি; বুক-ভাঙা শোক, সদ্য স্বামী বিয়োগের সেই মর্মভেদী ব্যথাটাই তাঁর মনের ভেতরে তখন একটি কঠোর প্রতিজ্ঞায় একটু একটু করে রূপান্তরিত হয়েছিল। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, যতদিন তাঁর দেহে প্রাণ থাকবে, ততদিন তিনি রেশমের ব্যবসাকেই বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা করে যাবেন। তাতে প্রাণ গেলে যাবে। তাই স্বামীর মৃত্যুর দু’দিন পরেই তিনি তাঁর ভাইকে নিয়ে মুর্শিদাবাদে চলে গিয়েছিলেন। সেখানকার মাঠে মাঠে তখন রেশমগুটি গাছের অবারিত ঐশ্বর্য ছিলেন। সেখান থেকে কয়েকটি বীজ নিয়ে তিনি আবার স্বগ্রামে ফিরে এসেছিলেন, তারপরে তাঁর নিজের জমিতে মালবেরী গাছের সেই বীজ রোপন করে দিয়েছিলেন। হয়ত অপরিণামদর্শী ধর্ম-প্রচারকদের হাতে তাঁকেও একদিন নুরুদ্দীনের মতই নিজের প্রাণ হারাতে হত, কিন্তু হঠাৎই তখতে শাসকের পরিবর্তন হয়েছিল। ১৫৩৯ খৃস্টাব্দে ‘খিজির খাঁ’ গৌড়ের তখতে আসীন হয়েছিলেন। তিনি ইসলামধর্মে এমন কোন অনুশাসন খুঁজে পাননি, যেখানে বলা হয়ে যে, রেশমের বস্ত্র ব্যবহার করলে ইসলামকে অবমাননা করা হয়। তাই তিনি আদেশ দিয়েছিলেন যে, বাঙালী হিন্দু-মুসলমান বণিকেরা পুনরায় অবাধে রেশমের ব্যবসা করতে পারবেন। এরপরে আবার বরেন্দ্রভূমির দিকে দিকে রেশমের সেই অবলুপ্তপ্রায় প্রাচীনতম ব্যবসা জেগে উঠেছিল। আর সেই সাথে বাংলার রেশম ব্যবসার ইতিহাসের সঙ্গে সেই নুরুদ্দীন-স্ত্রী ‘সীতাবাসিনী’র নাম চিরকালের জন্য জড়িয়ে গিয়েছিল। আজও মহানন্দার তীরে অবস্থিত জালালপুর গ্রামের প্রান্তে সেই সীতাবাসিনীর সমাধির জায়গাটি দেখতে পাওয়া যায়। এখন মহাকাল সেই কবরকে জীর্ণ করে দিয়েছে, সেটার অস্তিত্বকে লুপ্ত করে দিয়েছে, কিন্তু সীতাবাসিনীর আত্মাব অমর মহিমাকে ধ্বংস করতে পারেনি। তাঁর প্রতিজ্ঞা, তাঁর বাসনা, তাঁর স্বপ্নই আজও আধুনিক মালদহের শত শত রেশম সুতোর কাটুনীর বাহুতে বাহুতে আলোড়িত হয়।
বরেন্দ্রভূমি যেমন প্রাচীন, তেমনি সেখানকার নদীগুলিও পৌরাণিক কালের। সেই নদীগুলি ওই অঞ্চলের জীবন-সরণি। রামায়ণে, মহাভারতেও সেগুলির নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। করতোয়া নদীর তর্পণঘাটে মহাকবি বাল্মীকির আশ্রম ছিল। পঞ্চপাণ্ডযেরা তাঁদের অজ্ঞাতবাসকালে একদিন আত্রাই নদী অতিক্রম করে করদহ গ্রামে গিয়েছিলেন। করতোয়া, আত্রাই, পুনর্ভবা, টাঙ্গন, মহানন্দা - এই পঞ্চ নদী পঞ্চকন্যার মত যুগ যুগ ধরে উত্তর বাংলার রুক্ষ-কঠিন মাটিকে শস্যে সম্পদে শ্রীময়ী করে রেখেছিল। অতীতে করতোয়া আর আত্রাই, পুনর্ভবা আর টাঙ্গনের স্রোতে বজরা ভাসিয়ে দূর দূর দেশ থেকে বাঙালী বণিকেরা সেখানে উপস্থিত হতেন। তারপরে বরেন্দ্রভূমির ঘাটে ঘাটে নিজেদের তরী বেঁধে পণ্যসম্ভার নিয়ে তাঁরা দেশের অভ্যন্তরে জনবহুল নগরের দিকে চলে যেতেন। মাত্র কয়েক শতাব্দী পার করে বর্তমানে আত্রাই, পুনর্ভবার কৃশ-করুণ, রিক্ত-রূপের দিকে তাকিয়ে এখন কল্পনাই করা যায় না যে, একদিন সেই নদী-পথেই বগুড়া, দিনাজপুর জেলার বাণিজ্য সুসম্পন্ন হত। করতোয়ার দু’পাড়ের রুক্ষ-অনুর্বর প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে এখন আর কেউ সেই নদীর দুই তীরে, সুদূর অতীতের নিবিড় শালবনের অপরূপ ছবিটি কল্পনাও করতে পারবেন না। অতীতের করতোয়ার তীরের সেই শালের ঘন অরণ্য তখনকার বাঙালী কাষ্ঠব্যবসায়ীদের কাছে শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিল। সেই সময়ে, নদীর তীরে নৌকা নোঙর করে তাঁরা লোকজন নিয়ে অরণ্যে কাঠ সংগ্রহ করতে যেতেন। এছাড়া বিভিন্ন দূর দেশ থেকে কবিরাজদের অনুচরেরাও সেখানে আসতেন। তাঁরা নিজেদের লুব্ধদৃষ্টিতে সেখানকার জঙ্গলে থাকা অনন্তমূল, শতমূলী খুঁজে বেড়াতেন। তখনকার আয়ুর্বেদ বিজ্ঞানমতে ওষুধ প্রস্তুতকারী ব্যবসায়ীরা ভারে ভারে সেখান থেকে শতমূলীর শিকড়, অনন্তমূলের গাছ নিয়ে যেতেন। কিন্তু, তখন উত্তর বাংলার ওই অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যসম্ভার ছিল - তণ্ডুল। সেই সময়ে সেখানে মাঠের পর মাঠ জুড়ে বছরে মাত্র একবার অপর্যাপ্ত পরিমাণে আমন ধানের ফলন হত। যেই আষাঢ় মাসের আকাশ কালো করে মেঘ জমে উঠত, অমনি সেখানকার কৃষকদের মুখে হাসি ফুটে উঠত। তারপরে একসময়ে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামত। বরিন্দের আদিগন্ত প্রান্তর তখন মহাসমুদ্রের রূপ নিত। কৃষকেরা সময়মত নিজেদের জমিতে ধানের বীজ ছড়িয়ে দিতেন। তখন ভাদ্র-আশ্বিন মাসে উত্তর বাংলার মাঠগুলিকে সবুজের সমুদ্র বলে মনে হত। আর সেই ধান পাকলে সেটা আরেক অপরূপ দৃশ্যে পরিণত হত। মনে হত, মাঠে-মাঠে কারা যেন সোনার স্তূপ সাজিয়ে রেখেছেন। তখন সেখানকার ধানের বিপুল সম্ভারে ভূমিলক্ষ্মীর হাসি দিক দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ত। অতীতে ঠিক সেই সময়েই ঢাকা, পাবনা থেকে বাঙালী তণ্ডুল-ব্যবসায়ীরা সেখানে আসতে শুরু করতেন। তখন মহানন্দা নদী দিয়ে দিনাজপুরের পশ্চিম অংশের চাল রপ্তানী করা হত, ফলে মহানন্দা নদীর বুকে ব্যাপারীদের নৌকার ভিড় লেগেই থাকত। সেখানকার নদীতীরে বড় বড় আড়তগুলিতে মজুত-চাল বস্তায় করে বোঝাই করা হত। তারপরে সেই বাণিজ্যতরীর বহর আবার একদিন নিজেদের সাদা পাল তুলে বিহারে ও উত্তরপ্রদেশের সুদূর অভ্যন্তরে চলে যেত। তখন ওই এই জেলার পূর্বপ্রান্তের সমস্ত তণ্ডুল-রপ্তানী - তিস্তার উপনদী আত্রাই, করতোয়া আর পুনর্ভবার নদীপথে করা হত। ‘কল্পদ্রুমে’ ও পুরাণে অতীতের বাংলার সেই ধানের ব্যবসার ইতিহাস সবিস্তারে লেখা রয়েছে। তা থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে, সেকালের বাংলার সমগ্র গণসমাজকে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে নিজেদের উদরান্ন সংগ্রহ করতে হত। তখনও পর্যন্ত জমিদারী প্রথা চালু হয় নি। ফলে বাঙালীর মেরুদণ্ডের হাড়ে হাড়ে তখনও পর্যন্ত অলসতা আর স্বপ্ন-বিলাসের বিষও প্রবাহিত হতে শুরু করেনি নি। সেই সময়ে বাঙালীরা হয় কৃষিকাজ, নয়ত কার্পাসশিল্প কিংবা তাঁতের কাজ করে নিজেদের জীবিকা অর্জন করতেন। এই প্রসঙ্গে পাবনা জেলার অতি পুরোনো ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারেও একই কথা লেখা হয়েছিল - “The weaving of cotton cloths on handlooms is old industry in Pabna.” বস্ত্রবয়ন সেকালের পাবনার অতি সুপ্রাচীনকালের একটি শিল্প ছিল। অনেক ঝড়-দুর্যোগ, বহু বাঁধা-বিপত্তি কাটিয়ে সেই তাঁতের কাপড়ের ব্যবসা বহুযুগ ধরে সেখানকার সাধারণ মানুষের পেটের ভাতের যোগান দিয়েছিল। অতীতের একটা সময়ে পাবনার তাঁতের সুতোর খ্যাতি সুদূর চট্টগ্রাম ও ঢাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে ঢাকার সেই ইতিহাস বিখ্যাত মসলিন যে সুতো দিয়ে তৈরী করা হত, সেই সুতোর মত মসৃণতা আর সূক্ষ্মতা পাবনার কাটুনীদের সুতোর মধ্যে ছিল না। প্রাচীন বাংলার বস্ত্রশিপ্লের কথা বলতে গিয়ে শুধু মালদহের রেশমবস্ত্র নয়, পাবনার সূক্ষ্ম সুতোর প্রশংসা না করলে সেই বস্ত্র-ব্যবসার সব কথা বলা হয় না। খৃষ্টীয় দশম শতকে ‘ইবন খুর্দদবা’ নামের একজন একজন আরবীয় ভৌগোলিক বঙ্গদেশে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি বঙ্গদেশকে ‘রহমি বা রহম’ বলে নিজের লেখায় অভিহিত করেছিলেন। সেই ‘রহমিদেশ’ সম্বন্ধে আরেক আরব দেশীয় সওদাগর ‘সুলেমান’ জানিয়েছিলেন, “এদেশে একপ্রকার সূক্ষ্ম ও সুকোমল বস্ত্র উৎপন্ন হইত, অন্য কোন দেশে এমন সূক্ষ্ম বস্ত্র উৎপন্ন হইত না, এ বস্ত্র এত সূক্ষ্ম ও কোমল ছিল যে, একটা আংটির ভিতর দিয়া তাহাকে চালাইয়া দেওয়া যাইত।” খুর্দদবা ও সুলেমানের শত শত শতাব্দী আগে আরেকজন বিদেশী বঙ্গদেশের বিভিন্ন শহরে নগরে পরিভ্রমণ করেছিলেন। তিনি বঙ্গদেশের বিদ্যা ও সংস্কৃতির খ্যাতি তিনি শুনে থাকলেও, জ্ঞানে গরিমায় উন্নত সেই সময়ের বাংলার বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন। সেই বিদেশীর নাম ছিল - ‘চাও-জু-কুয়া পিংকলো’। তিনিও বাংলার কার্পাসবস্ত্রের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। ১২৯০ খৃষ্টাব্দে দুঃসাহসী অভিযাত্রী ‘মার্কোপোলো’ বঙ্গদেশে এসেছিলেন। তিনিও সেই সময়কার অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের কার্পাস-প্রীতি দেখে কয়েকটি অমূল্য কথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন - “এদেশের লোকেরা প্রচুর কার্পাস উৎপন্ন করে, এবং তাহাদের ব্যবসা খুবই সমৃদ্ধ। …” এর অনেক অনেক দিন পরে ১৪০৫ খৃষ্টাব্দে ‘মা হুয়ান’ নামের আরও একজন চীনা পরিব্রাজক বঙ্গদেশে এসেছিলেন। তাঁর বিবরণের ভেতরে এদেশের অতীতের গৌরবোজ্জ্বল সুখী আর সম্পন্ন জীবনধারার ছবিটি খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি লিখেছিলেন, “... এদেশে ছয় প্রকারের সূক্ষ্ম কার্পাসবস্ত্র প্রস্তুত হয়; এদেশে রেশমের কীট পালিত ও রেশমনির্মিত বস্ত্র বয়ন করা হয়। …” বাংলার অতীত ইতিহাসে যেন শুধু কার্পাসশিল্পের খ্যাতির মহিমাই ছড়িয়ে রয়েছে। সেকালের বাংলার বস্ত্রশিল্প, তাঁতশিল্প বাঙালীর সুদূর অতীতের জীবনকে, মনকে একেবারে কুয়াশার মত যেন বেষ্টন করে রেখেছিল। শুধু ত্রয়োদশ শতক অথবা পঞ্চদশ শতকে নয়, একেবারে পৌরাণিককালের সেই রামায়ণ-মহাভারতকে ছুঁয়ে চর্যাগীতিরকালেও বঙ্গদেশের কার্পাসের প্রশস্তি শুনতে পাওয়া যায়। চর্যাগীতি মূলতঃ আনন্দ-সংগীত। সুদূর অতীতের সেই গানে আবেগ আছে, উচ্ছ্বাস আছে। গাঙ্গুলির সব কথা হয়ত স্পষ্ট নয়, কিন্তু তবুও বুঝতে পারা যায় যে, গায়ক তুলোর বন্দনা করতে গিয়ে গেয়ে উঠেছিলেন -
“হেরি সে মেরি তইলা বাড়ি খসমে সমতুলা৷৷
সুকভ এসে রে কপাসু ফুটিলা৷৷
ভইলা বাড়ির পাশেঁর জোহা বাড়ি উএলা৷৷
ফিটেলি অন্ধ্যারি রে আকাশ ফুলিঅ৷৷”
চর্যাগীতির এই ক’টি লাইনকে তিব্বতী অনুবাদ থেকে সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ করবার পরে দাঁড়িয়েছিল -
“মম উদ্যানবাটিকাং দৃষ্টা
খসম সমতুল্যাম্
কার্পাসপুষ্পম্ প্রস্ফুটিতম অত্যর্থং
আনন্দিতঃ ভবতি।”
সোজা বাংলায় - “বাড়ির বাগানে কার্পাসের ফুল ফুটিয়াছে দেখিয়াই আনন্দ যেন ঘরের চারপাশে উজ্জ্বল হইল, আকাশের অন্ধকার টুটিল।”
‘শান্তিপাদের’ একটি পদে রয়েছে -
“তুলা ধুঁনি আঁসু রে আলু।
আম্মু ধুনি ধুনি নিরবর সেলু॥
তুলা ধুঁনি ধুঁনি শুনে আহারিউ।
পুন লইয়া অপনা চটারিউ॥”
অর্থাৎ, “তুলো ধুনিয়া ধুনিয়া আঁশ বাহির করা হইতেছে - আঁশ ধুনিয়া ধুনিয়া আর কিছুই বাকী থাকে না। তূলা ধুনিয়া শূন্যে উড়াইতেছি। আবার তাহাই লইয়া ছড়াইয়া দিতেছি।”
সেকালের বাংলার বস্ত্রশিল্প যে বাঙালীর জীবনে কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল, চর্যাপদ থেকে উপরোক্ত তুলো-ধোনার বাস্তব চিত্রটি সেটারই একটা ঐতিহাসিক প্রমাণ। তখন শুধু উত্তরবঙ্গে নয়, পূর্ব ও দক্ষিণবঙ্গেও ব্যবসাবাণিজ্য বিপুল সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। ইতিহাসে অতীতের বাংলার নিম্নভূমির কয়েকটি জায়গার খ্যাতি সেকালের ইতিহাসের পাতায় এখনো সোনার লেখার মত জ্বলজ্বল করছে।
সেনযুগে ঢাকা জেলার বিক্রমপুর বাংলার একটি প্রসিদ্ধ ব্যবসাকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। অতীতে যখন চন্দ্র এবং বর্মণবংশীয় রাজারা সেই প্রাচীন ভূখণ্ডের উপরে রাজত্ব করতেন, সেই সুপ্রাচীনকাল থেকেই বিক্রমপুরের শস্যশ্যামলা উর্বর প্রান্তরে অপর্যাপ্ত পরিমাণে ফসল ফলতো। মসলিনের জন্য ওই অঞ্চলের খ্যাতি পৃথিবীর বহুদূরদেশ পর্যন্ত ব্যপ্ত ছিল; আর ওই অঞ্চলের পথে-প্রান্তরে তখন প্রচুর কার্পাস হত। সেখানকার ঘরে ঘরে তখন চরকা কাটা চলত। মাঠে অপর্যাপ্ত পরিমাণে আমন ধান ফলত। ফলে স্বগৃহের সন্নিহিত ভূমিজাত ফসলেই সেখানকার মানুষের স্বচ্ছন্দে অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান হয়ে যেত। দেববংশীয় খ্যাতিমান নৃপতি ‘দশরথ দেবের’ সময় পর্যন্ত বাংলার অন্যতম প্রধান ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে বিক্রমপুরের গুরুত্ব বজায় ছিল। দেববংশীয় পরবর্তী রাজারা তাঁদের রাজ্যের রাজধানী সুবর্ণগ্রামে অর্থাৎ সোনারগাঁওতে স্থানান্তরিত করেছিলেন। তখনকার বিশাল ভয়ঙ্কর নদী লক্ষ্মীয়া, আর মেঘনার মাঝখানে সোনারগাঁও-এর অবস্থান ছিল। খৃষ্টীয় দশম শতকের দ্বিতীয়ার্দ্ধে বঙ্গদেশের ‘হরিকেলা’ (Harikela) নামের আরো একটি বর্ধিষ্ণু জনপদের খ্যাতি অনেক অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই হরিকেলা সম্পর্কে বিখ্যাত চীনা পর্যটক ‘ই-ৎ-সিঙ’ (I. tsing) জানিয়েছিলেন, “It was the eastern limit of East India.” কুয়াশায় ঢাকা সুদূর ও অস্পষ্ট অতীতের সেই ধনেজনে সমৃদ্ধ জনপদ হরিকেলার অবস্থান যে ঠিক কোথায় ছিল, সেটা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেক মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, চন্দ্ৰ-বংশীয় রাজা ‘ত্রৈলোক্যচন্দ্র’ যে ‘চন্দ্রদ্বীপে’ রাজত্ব করতেন, সেই চন্দ্রদ্বীপই ছিল হরিকেলা, যেটা আধুনিককালের বাখরগঞ্জ জেলা। আবার কেউ কেউ বলেন যে, শ্রীহট্টই নাকি সেকালের হরিকেলা। বর্তমানে হরিকেলার অবস্থান নিয়ে যে বিতর্কই চালু থাকুক না কেন, একথা অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই যে, দশম শতকে বাঙালীর ব্যবসার সমৃদ্ধি কিন্তু সেই হরিকেলাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল।
(তথ্যসূত্র:
১- বিশ্বকোষ, সপ্তম ভাগ।
২- বাঙ্গালীর ইতিহাস, নীহাররঞ্জন রায়।
৩- Indian Shipping, R. K. Mukherji.
৪- Life in Gupta age, R. N. Saltore.
৫- History of Bengal, Hindu Period, R. C. Majumdar.
৬- Imperial Gazetteer, Provincial Series, Vol. 2.
৭- Malda District Gazetteer, Lambourn.
৮- Pabna District Gazetteer.
৯- Marco Polo travels, Edited by Marsden.
১৩
১৭ মন্তব্য