সিনিয়র শিক্ষক
০৯ মে, ২০২৩ ০৭:৩৬ পূর্বাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
কোনো অবদান ছিল না। সরকারের অতিরঞ্জনের কারনে তাকে সবাই ফেরেশতা মনে করে।
বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনতে শুনতে তো আপনারা সবাই অভ্যস্ত। তাহলে চলুন সেই ভাষনের একটা লাইন আপনাদের শুনিয়ে দেই।
ভাইয়েরা আমার, ২৫ তারিখে অ্যাসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি যে ওই শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে কিছুতেই মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না।
কিন্তু নিচের ছবিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জুলফিকার আলী ভুট্টো হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল ঢাকাতে ঠিকই যোগদান করেছিলেন। ২৩-০৩-১৯৭১। দ্বিমুখীনীতি কাহাকে বলে। ছবিটি সংগ্রহে সাহায্য করেছেন হিমেল খাঁন ভাই।
ছবিতে : বঙ্গবন্ধুর সাথে ভুট্টো
সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জনগণকে একা ফেলে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাওয়াকে আপনি অবদান বলতেছেন? ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগ পযর্ন্ত বঙ্গবন্ধুর অনেক অবদান ছিল, বিশেষ করে তার প্রতি জনগণের সমর্থন যে উচ্চ শিখায় পৌছে গিয়েছিল তা আর বলার প্রশ্ন রাখেনা।
সব ঝামেলা শুরু হয় নির্বাচনে জয়লাভ করবার পরে। পাকিস্তান সরকার বুঝেছিল বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা যে উচ্চ শিখরে পৌছে গিয়েছে এটাকে যদি দমন করা না যায় তাহলে পূর্ব পাকিস্তানকে আমাদের হারাতে হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যে লোভ তাকে দেখানো হয়েছিল সেই লোভের কাছেই তার সমস্ত নীতি বিসর্জন হয়ে যায়। কিন্তু ভাগ্যের কি লিখন ! পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে না পারলেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি ঠিকই হয়েছিলেন।
যেই ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে জাতিসংঘ পর্যন্ত যাওয়া হয়েছে, এই ভাষণ থেকে নাকি জনগণ অনুপ্ররেণা পেয়েছিল। কিন্তু জনগণ যে ভাষণের আশা পোষণ করেছিল বঙ্গবন্ধু তো সেই ভাষন দেনই নি। প্রকৃতপক্ষে ওইদিনেই স্বাধীনতা ঘোষণা করার কথা ছিল কিন্তু তিনি কখনও স্বাধীনতার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন নি।
অ্যান্থনী মাসকারেনহাস লিখেছেন,
সেদিনকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভা— বাঙালিদের সংগ্রামের একটি নাটকীয় মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কিন্তু জনগণ যা আশা করেছিল তা হয় নি। শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্বশাসন অর্জনের জন্য একটি কর্মসূচী দেয়ায় প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সভায় উপস্থিত দশ লক্ষাধিক লোক জানতে এসেছিল অন্য কিছু : স্বাধীনতার ঘোষণা।
অর্থাৎ, তৎকালীন জনগণ যা আশা করেছিল সেদিন তার কিছুই হয় নি। তারা ভেবেছিল স্বাধীনতার ঘোষণা দিবেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন না।
এ কথা স্পষ্টত : জানা যায় যে, স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য বারবার আহ্বান করা সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান তা মেনে নেন নি বরং জনতার আহ্বান তখনও এড়িয়ে গিয়েছেন।
রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় শেখ মুজিব স্বাধিকার অর্জনের জন্য আইন অমান্য আন্দোলন চালিয়ে যেতে বললেন,"এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম" বলে ঘোষণা দিলেন। জনগণ প্রত্যাশিত ঘোষণা সরাসরি পেল না সেজন্য অনেকে হতাশ হলো। এই আন্দোলন ইয়াহিয়া খান চক্রের কাছে যতই ধ্বংসাত্মক ও অপ্রিয় হোক না কেন, এটা সামরিক প্রস্ততির জন্য তখনো আকাঙ্ক্ষীত সময় দিয়েছিল।
এর দ্বারা বুঝা যায়, ওই সময়ে যদি স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে যেত, তাহলে পূর্ব পাকিস্তানের উপর সামরিক প্রভাব ততটা গুরুতর হতো না।
বিপ্লবী নেতা হিসেবে আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান যে সুনাম অর্জন করেছিলেন, তা দিয়ে তিনি চার মাইল দূরে পূর্বাঞ্চল সেনানিবাসের প্রধান দপ্তরে লক্ষ লক্ষ দৃঢ়চেতা বজ্রমুষ্টি বাঙালিদের নেতৃত্ব দিয়ে টিক্কা খানকে আত্মসমর্পণ করাতে পারতেন। বাঙালিরা তা করতে প্রস্তত ছিল, সামরিক বাহিনীকে উৎখাত করার জন্য কয়েকশত আত্মহুতিও দিতে প্রস্তত ছিল।
তাহলে বাংলাদেশ সামান্য ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হতে পারতো। পরবর্তীকালে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, অজস্র লোকের বাস্তহারা ও সামরিক নৃশংসতার শিকার হয়ে দেশত্যাগ করতে হতোনা।
শেখ সাহেব যে স্বাধীনতা চাননি এটার প্রমাণ অনেক দেওয়া যায়। মূল ক্ষমতার প্রতি তার যে লোভ ছিল, তার প্রতিদান এদেশের সাধারণ মানুষকে দিতে হয়েছিল।
শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামীলীগ বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণের অজ্ঞতার পরিচয় এবারই শুধু একবার দেননি। তাদের চোখ ও কানের সম্মুখে অসংখ্য বেদনাদায়ক সাক্ষ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তারা ইয়াহিয়া খানের চালে বোকা বনে "ম্যাড হাট্টার'' নাচের 'সাংবিধানিক সূত্রের আলোচনায়' অংশ নিলেন এবং পরিণতিতে জনগণকে মেষের মতো কসাই পাকসেনার হাতে জবাই হতে হলো।?-১
মূলত শেখ সাহেবের ৭ ই মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণা না দেওয়ার পিছনে ইয়াহিয়া খানের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এ.কে খন্দকার উল্লেখ করেন,
ইয়াহিয়া খান অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে সাতই মার্চ যদি বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তাহলে এই আন্দোলনকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবেনা। তাই তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ''তুমি এমন কিছু করোনা, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। আমি আলোচনা করার জন্য ঢাকা আসছি"।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্পর্কে তিনি আরো বলেন,
ওই কথাগুলো (ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ) শক্তিশালী ছিল বটে কিন্তু তবে তা বাস্তবে রুপ দেওয়ার পরিকল্পনা আওয়ামীলীগের নেতাদের ছিল না। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কিন্তু আমার মনে হয়েছে, কীভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে তা তিনি পরিষ্কার করেন নি। তাছাড়া জনগণকে যুদ্ধ করার জন্য যেভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন, তা করা হয়নি। ভাষণে চূড়ান্ত কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া গেল না। ভাষণটির পর মানুষজন ভাবতে শুরু করলো—এরপর কী হবে?
এছাড়া ৭ই মার্চের ভাষণে শেখ সাহেব পাকিস্তানের কতৃত্ব পোষণ করার জন্য ভাষণের শেষে "জয় পাকিস্তান" শব্দটি বলেছিলেন। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকার (বীরউত্তম) তার বইতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করিনা। এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল, "জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান" ! এটি যে যুদ্ধের ডাক বা স্বাধীনতার আহ্বান, তা প্রচণ্ডভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং তর্কাতীতও নয়। যদি আওয়ামীদের নেতাদের কোনো যুদ্ধ-পরিকল্পনা থাকতো, তাহলে মার্চের শুরু থেকে জনগণ এবং সরকারি, বেসরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের স্বল্প সময়ে সঠিকভাবে সংগঠিত করা যেত। ?-২
শেষে জয় পাকিস্তান বলার ব্যাপারটা আহমদ ছফা তার লেখা বইতেও উল্লেখ করেছিলেন।
একটা কথা বলি, শেখ সাহেব যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে "জয় বাংলা"র সঙ্গে সঙ্গে "জয় পাকিস্তান" শব্দটিও উচ্চারণ করেছিলেন। এখন এই ভাষণ নিয়ে নানা বিতর্ক-বিতণ্ডা চলছে। আমি এত ছোট্ট মানুষ ! আমাকে সাক্ষ্য দিতে কেউ ডাকবেন না। আমি যেমন শুনেছি তেমনি বললাম। ?-৩
এছাড়া বদরুদ্দীন উমর তার নিজের লেখা "আমার জীবন (৩য় খণ্ড)" বইতে উল্লেখ করেছিলেন। বইটার পিডিএফ কপি আমি পাইনি। সেজন্য এই ছবিটি সংগ্রহ করে যুক্ত করতে হলো।
মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী তার বইতে উল্লেখ করেন,
জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে যিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন তিনি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মুখের বেসরকারি ঘোষণা "You are the Next Prime Minister of Pakistan" উচ্চারিত হওয়ার পর থেকে সেভাবেই নিজেকে তৈরি করেছিলেন।
গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হবার পর তিনি সবাইকে সরে যেতে বললেও নিজে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে কেন থেকে গেলেন? কেনই বা মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হয়েও শত্রুপক্ষের হাতে ধরা দিলেন? এসব প্রশ্ন সহজেই উঠেছে। যার কোনো যথার্থ জবাব মেলেনি।
বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি জবাবে বলেছিলেন, আমি ধরা না দিলে বাংলার মাটি শ্মশানে পরিণত হতো। কিন্তু ধরা দেবার পরেও যা হয়েছে তা কি শ্মশানের চেয়ে কম? কিন্তু বিপ্লবের নেতা জনগণের মধ্যে থেকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। এটাই দুনিয়াজোড়া রীতি। তিনি কেন ভাঙলেন এই রীতি, এটা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। নাকি তিনি অ্যারেস্ট হয়েও জেলখানায় সংলাপের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন?
স্বাধীনতার ঘোষণা যে শেখ সাহেব দেন নি বরং এটা তার নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় কামাল লোহানীর লেখা বই থেকে।
এটা তো ঠিক, বঙ্গবন্ধু ধরা দেয়ায় মুক্তিযুদ্ধ ঘোষণা ও পরিচালনা ইত্যাদি নিয়ে কত বিড়ম্বনাই হয়েছে? তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিয়ে গেলেন না, অযচ ধরাও দিলেন, তখন আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে গেলাম তার কি হাল হলো? কত কনফিউশনই না দেখা দিল।
ঘোষনা তো একটা দিতেই হবে, না হলে কি করে মানুষ সংঘবদ্ধ হবেন, এমন সময় বঙ্গবন্ধুর নাম দিয়ে ঘোষণার লিফলেট বেরুল। ঢাকার বলধা গার্ডেনে একজন প্রকৌশলী কিংবা কারিগরি বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি একটি ট্রান্সমিটার বানিয়ে তাতে নিজ কণ্ঠে একটি ঘোষণা পাঠ করলেন। অনেকে একেই বঙ্গবন্ধুর নিজ গলার ঘোষণা বলেছেন কারণ ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর বঙ্গবন্ধুর মতোই ছিল। ?-৪
৭ই মার্চের ভাষনের ভিতরের কাহিনী আরো বিস্তারিত জানতে নিচের দুইটি লিঙ্কে প্রবেশ করুন।
প্রথমেই আমি বলেছিলাম যে বঙ্গবন্ধু ইচ্ছাকৃত কারাবরণ করেছিল, এমনকি তিনি যে গ্রেফতার হবেন এর পুরো ঘটনাটাই তিনি জানতেন। অ্যান্থনী মাসকারেনহাস লিখেছেন,
৩ থেকে ২৫ মার্চে বাঙালি সেনারা তিনবার পৃথকভাবে শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করে নির্দেশ চেয়েছেন, কেননা যা ঘটবে সে সম্বন্ধে তাদের কোনো সংশয় ছিল না। প্রতিবারই শেখ মুজিব বাঙালি সেনাদের সঙ্গে সময়োপযোগী ব্যবহার করেছেন বা মামুলি ধরনের কথাবার্তা বলেছেন।
এর পরবর্তী বার্তা শেখ সাহেব ২৫ শে মার্চেও পেয়েছিলেন যেদিন তিনি নামমাত্র গ্রেফতার হবেন কিন্তু তিনি অন্যদের মতো চলে লুকিয়ে পড়েন নি।
১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ। রাত আটটা ধানমন্ডিস্থ ৩২ নং সড়কের প্রবেশমুখে একটি গলিতে একটি পরিচিত রিক্সা দ্রুতগতিতে এসে থামলো। যে ভবনের বাইরে এসে থেমেছে সে ভবনটি হলো শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন। রিকশা চালক কাশছিলো এবং হাপাচ্ছিল। সে বললো, 'বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি জরুরী চিরকুট নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে রিকশা চালিয়ে এসেছি। বাংলায় লেখা স্বাক্ষরবিহীন চিরকুট বার্তাটি ছিল সংক্ষিপ্ত: "আপনার বাসভবন আজ রাতে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে"।
সে সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অঘোষিত প্রস্থান আওয়ামীলীগ মহলে বেশ নাড়া দিয়েছিল। তারপরই যখন সেনাবাহিনীর অশুভ গতিবিধির লক্ষণ দেখা দিল তখন শেখ মুজিব তার সহকর্মীদের সতর্ক করে গা ঢাকা দেয়ার প্রস্তুতি নিতে বললেন। বঙ্গবন্ধু নিজে কোনো সতর্কতা অবলম্বন করতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন,"আমার জায়গায়" অর্থাৎ নিজ বাড়িতেই থাকব। ?-১
সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের মেয়ে শারমিন আহমদ তার নিজের লেখা বইতে বলেছেন,
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ মার্চের ভয়াল কালো রাতে আব্বু গেলেন মুজিব কাকুকে নিতে। মুজিব কাকু আব্বুর সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবেন সে ব্যাপারে আব্বু মুজিব কাকুর সাথে আলোচনা করেছিলেন। মুজিব কাকু সে ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছিল। সেই অনুযায়ী আত্মগোপনের জন্য পুরান ঢাকায় একটি বাসাও ঠিক করে রাখা হয়েছিল। বড় কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আব্বুর উপদেশ গ্রহণে মুজিব কাকু এর আগে দ্বিধা করেন নি। আব্বুর সে কারণে বিশ্বাস ছিল যে ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে মুজিব কাকু কথা রাখবেন। মুজিব কাকু আব্বুর সাথেই যাবেন।
অথচ শেষ মুহূর্তে মুজিব কাকু অনড় রয়ে গেলেন। তিনি আব্বুকে বললেন,"বাড়ি গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো, পরশুদিন (২৭ মার্চ) হরতাল ডেকেছি"। মুজিব কাকুর তাৎক্ষণিক এই উক্তিতে আব্বু বিষ্ময় ও বেদনায় বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এদিকে বেগম মুজিব ঐ শোবার ঘরেই সুটকেসে মুজিব কাকুর জামাকাপড় ভাজ করে রাখতে শুরু করলেন। ঢোলা পায়জামায় ফিতা ভরলেন। পাকিস্তানি সেনার হাতে মুজিব কাকুর স্বেচ্ছাবন্দি হওয়ার এইসব প্রস্তুতি দেখার পরও আব্বু হাল না ছেড়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে মুজিব কাকুকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন।
তিনি কিংবদন্তি সমতূল্য বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের উদাহরণ তুলে ধরলেন, যারা আত্মগোপন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু মুজিব কাকু তার এই সিদ্ধান্তে অনড় হয়ে রইলেন। আব্বু বললেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য হলো পূর্ব বাংলাকে সম্পূর্ণ রূপেই নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়া। এই অবস্থায় মুজিব কাকুর ধরা দেওয়ার অর্থ হলো আত্মহত্যার শামিল।
তিনি বললেন, মুজিব ভাই, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হলেন আপনি। আপনার নেতৃত্বের উপরেই তারা সকলে ভরসা করে রয়েছে। মুজিব কাকু বললেন, ''তোমরা যা করবার কর। আমি কোথাও যাব না''।
শুধু তাই নয়, শেখ মুজিব সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তাজউদ্দীন সাহেব যদি টেপ রেকর্ডার এবং ছোট্ট একটি খসড়া সঙ্গে নিয়ে শেখ সাহেবের বাড়িতে না নিয়ে যেতেন তাহলে হয়তো স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের কথাও কেউ জানতে পারতো না।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্বু স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে নিয়ে এসেছিলেন এবং টেপ রেকর্ডারও নিয়ে এসেছিলেন। কথা ছিল মুজিব কাকুর স্বাক্ষরকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থিত বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে পৌছে দেওয়া হবে এবং আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। ?-৫
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মঈনুল হাসান সহ উপপ্রধান সেনাপতি এ.কে খন্দকার এবং যুব শিবিরের পরিচালক এস.আর মির্জার জবানবন্দিতে লিখিত গ্রন্থে মঈনুল হাসান বলেছেন,
২৫ মার্চ সন্ধ্যাবেলা, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যখন চলে যান এ দেশ থেকে, তখন একটা চরম সংকটপূর্ণ অবস্থার মতো হয়। সবাই ভাবতে থাকেন, তাহলে এখন কি করণীয়। এইসময় তাজউদ্দীন আহমদসহ আরো কিছু নেতা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে, অর্থাৎ শেখ মুজিবের বাড়িতে সমবেত ছিলেন। সেখানে এক ফাকে তাজউদ্দীন আহমদ একটি টেপ রেকর্ডার এবং ছোট্ট একটা খসড়া ঘোষণা শেখ সাহেবকে দিয়ে সেটা তাকে পড়তে বলেন।
এ ঘটনা তাজউদ্দীন আহমেদের কাছ থেকে আমার নিজের শোনা। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই আমি যখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম তখন তাজউদ্দীন আহমেদকে এ ব্যাপারে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ঘোষনাটা তাজউদ্দীন আহমেদের নিজের লেখা। লেখাটা ছিল এমন_
"পাকিস্তানি সেনারা আমাদের আক্রমণ করেছে অতর্কিতভাবে। তারা সর্বত্র দমননীতি শুরু করেছে। এই অবস্থায় আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম নির্বাচিত রাষ্ট্র হিসেবে"।
এই খসড়া ঘোষণাটা শেখ মুজিবুর রহমানকে দেওয়ার পর সেটা তিনি পড়লেন। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কিছুই বললেন না, নিরুত্তর রইলেন। অনেকটা এড়িয়ে গেলেন। তাজউদ্দীন আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যখন তাকে বললেন, "মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে, কেননা কালকে কি হবে, আমাদের সবাইকে যদি গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়, তাহলে কেউ জানবেনা, কি তাদের করতে হবে।
এই ঘোষণা কোনো না কোনো জায়গা থেকে কপি করে আমরা জানাব। যদি বেতার মারফত কিছু করা যায়, তাহলে সেটাই করা হবে। শেখ সাহেব তখন উত্তর দিয়েছিল, ''এটা আমার বিরুদ্ধে একটা দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানীরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারবে''। এ কথার পিঠে তাজউদ্দীন অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হয়ে সঙ্গে সঙ্গে রাত সম্ভবত নয়টার পরপরই ৩২ নম্বর ছেড়ে চলে যান।
সেক্ষেত্রে যদি তাজউদ্দীন সাহেব খসড়া তৈরি করে না আনতেন, তাহলে অচেতন জাতি হয়তো তাদের পরিচালনার জন্য কোনো দিক নির্দেশনাই পেত না। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট বিতর্ক। তাজউদ্দীন আহমেদের লেখা খসড়া হয়তো অন্য কারো মাধ্যমে পরবর্তীতে মিডিয়ায় পৌছায় যেটা বঙ্গবন্ধুর নামে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। মঈনুল হাসান লিখেছেন,
স্বাধীনতার ঘোষণার ওইযে ছোট্ট খসড়াটি তাজউদ্দীন আহমদ তৈরি করেছিলেন, ২৬ মার্চ সেটার প্রায় একই রকমের ঘোষণা দেখি, একই সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য কাগজে প্রচারিত হতে, ভারতের কাগজেও হয়েছে। সুতরাং, আমি ধরে নিতে পারি, সেই সময় তাজউদ্দীন আহমদ যে খসড়া তৈরি করেছিলেন, সেটা অন্য কাউকে তিনি হয়তো দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে তখন তরুণ কর্মীর কোনো অভাব ছিল না। বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব তক্ষুণি স্বাধীনতার ঘোষণা চাইছিলো। এদের মাধ্যমে যদি এটা প্রচারিত হয়ে থাকে, তাহলে আমি বিষ্মিত হবো না।
পরবর্তীকালে, ঘটনার প্রায় এক বছর পর বলা হয়, ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার ঠিক আগে শেখ সাহেব নিজে ইপিআরের সিগন্যালসের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন যায়গায় খবর পাঠান। আমি যতটুকু জানি, সিগন্যালস সবসময় অত্যন্ত বিশ্বাসী লোকদের দ্বারা গঠন করা হয়। সিগন্যালসই কোনো বাহিনীর আত্মরক্ষার ও আক্রমণের মূল যোগাযোগ মাধ্যম। আর ইপিআর ছিল মিশ্র বাহিনীর, এই বাহিনীতে অনেক অবাঙালিও ছিল।
সেখানে তো তাদের বাদ দিয়ে সন্দেহের পাত্র বাঙালিদের হাতে সিগন্যালস থাকতে পারেনা। কাজেই ইপিআর সিগন্যালস এর মাধ্যমে শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন— এটা বোধহয় অবাস্তব কথা।
পরবর্তীকালে আরেকটা কথা বলা হয় যে, শেখ সাহেব চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের নেতারা স্বীকৃতিদানের প্রশ্নে ভারত সরকারকে খুব বেশি পীড়াপীড়ি শুরু করেন, তখন স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে ভারত সরকার গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করে।
তারা বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণার কোনো প্রমাণ, কোনো দলিল, কোনো জীবিত সাক্ষ্য আপনাদের আছে কি? ভারত সরকার বাংলাদেশ মন্ত্রীপরিষদের সদস্য ও অন্য প্রধান নেতাদের জিজ্ঞাসা করেছে যে, কাউকে কিছু বলে গেছেন কিনা শেখ মুজিবুর রহমান। এর মধ্যে জহুর আহমদ চৌধুরীও ছিলেন। প্রত্যেকেই বলেছেন, কাউকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বলে যান নি। জহুর আহমদ চৌধুরী নিজে তাজউদ্দীনকে বলেছেন, তাকে কিছু বলা হয় নি।
মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি এ.কে খন্দকারের ভাষ্যমতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে তেমন কিছুই পাওয়া যায় না।
২৫ মার্চ রাতে শেখ সাহেবকে গ্রেফতার করা হয়। তাহলে কথা হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষণাটা কিভাবে এলো? ২৬ মার্চ তারিখে সারা দেশে সান্ধ্য আইন ছিল। চট্টগ্রামে সেই সান্ধ্য আইনের মধ্যেও সেখানকার বেতারকেন্দ্রে কিছু বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে কয়েকজনের নাম আমার মনে আছে—তখন তাদের ঠিক কার কী পদ ছিল এখন আমার মনে নেই।
তারা মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন যে কিছু না কিছু বেতারে বলা দরকার। তখন তারা সবাই মিলে একটা স্বাধীনতার ঘোষণার খসড়া তৈরি করলেন এবং সেই খসড়াটি তারা ২৬ মার্চ দুপুর দুইটার সময় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে গিয়ে নিজেরা তা চালু করে প্রচার করেন। সেই ঘোষণা চট্টগ্রামে আওয়ামীদের সাধারণ সম্পাদক এম.এ হান্নান পাঠ করেন। ধারনা করা হয় ভাষণ সেদিন পুনরায় সাড়ে চারটা-পাঁচটার দিকে প্রচার করা হয়। তাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছে— এমন কথাগুলো ছিল।
এই কথাগুলো বলার পর আবার কিছুক্ষণ পর এ.কে খন্দকার আরো কিছু তথ্য দেন। স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে যখন তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয় যে বঙ্গবন্ধুর কোনো ডকুমেন্ট জহুর আহমেদের মাধ্যমে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছিল কি না তখন তিনি বলেন,
আমি যতটুকু জানি, আমার স্মরণশক্তিতে যতটুকু মনে আছে, সেটুকু বলব। এই ঘোষণা-সংক্রান্ত ব্যাপারে একটু আগে যা বললাম, তার বাইরে কোনো কিছু কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আর শোনা যায় নি। কেউ চট্টগ্রামে এ সংক্রান্ত সংবাদ পাঠিয়েছিল বা জহুহর আহমেদ চৌধুরীর কাছে পাঠিয়েছিল, এমন কোনো সংবাদ সে সময় আমরা শুনিনি। ?-৬
এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছাকৃত গ্রেফতার বরণ এবং তার যে মারাত্মক পরিকল্পনা, সেটা নিয়ে নিচের লিঙ্কে অনেক আগেই আমি লিখেছিলাম। একটু কষ্ট করে পড়ে দেখবেন।
ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম : গাছ কিনে আনলেন আপনি, গাছ লাগালেন আপনি, পরিচর্যা করলেন আপনি, দায়িত্ব নিলেন আপনি আর গাছের ফল খেলাম আমি। তেমনিভাবে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান ছিল এদেশের জনগণের, স্বাধীনতা চাইলো এদেশের জনগণ, যুদ্ধ করলো দেশের জনগণ, জীবনও দিলো দেশের জনগণ আর সকল ক্রেডিট দেওয়া হচ্ছে শেখ সাহেবকে। আর এসব কিছুই ক্ষমতার জোরে দেয়া হচ্ছে।
আর এসব ক্রেডিট তাকেই দেওয়া হচ্ছে যিনি একটা সময় দেশের স্বাধীনতাই চান নি।
তথ্যসূত্র :
৩
৩ মন্তব্য