সহকারী শিক্ষক
১০ মে, ২০২৩ ০৭:১৯ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
যে কবির কবিতায় হৃদয়ে স্পন্দন জাগে, রক্তে তোলে শিহরণ তিনি আর কেউ না আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামই। তিনি আমাদের প্রিয় ব্যক্তিত্বও। তাঁর লেখা কবিতা, গল্প, উপন্যাসে লুকিয়ে ছিল সমগ্র ভারতবষের মনুষের মুক্তির সংগ্রামের বাণী। তাঁর কিছু লেখনীতে প্রকাশ পেয়েছে সাবলীল ভাব। যার জন্য তাঁকে কারাবরণ হয়েছিল। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিনি অবাধে বিচরণ করলেও মূলত বিদ্রোহী কবি হিসেবেই তিনি আমাদের কাছে এবং বিদেশেও পরিচিত। কাজী নজরুল ইসলামের লেখনীতে আমি আমার চিন্তা-চেতনার প্রকাশ দেখতে পাই, এঘনাই তিনি আমার প্রিয় লেখক। ছোটবেলায় তাঁর আমি হব সকাল বেলার পাখি” কবিতাটি মুখস্থ করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই কবির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। সেই আকর্ষণ কখনে মন হয় নি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহ করেছিলেন সকল অন্যায়, অতাচার, অসত্য, শোষণ-নির্যাতন আর দুঃখ-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে।
অনেক খ্যাতিমান কবির কবিতায় বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রম। তিনি বিদ্রোহী কবি, মানবতার কবি, প্রেমের কবি। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান কোনাে দিন ভুলবে না।
কবির জন্মপরিচয় : ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জৈষ্ঠ্য) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জায়েদা খাতুন। ছেলেবেলায় নজরুলের নাম ছিল দুঃখু মিয়া।
কবির শিক্ষাজীবন : ছােট থেকেই নজরুল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। গ্রামের মক্তব থেকে তিনি প্রাইমারি পাস করেন। এরপর তিনি ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর হাইস্কুলে কিছুকাল পড়ালেখা করেন। তারপর তিনি ভর্তি হন বর্ধমান জেলার রানীগঞ্জ সিয়ারসােল রাজ হাইস্কুলে। এখানে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টে সৈনিক হয়ে প্রথম মহাযুদ্ধে যােগদান করেন। নজরুলের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশােনার এখানেই ইতি ঘটে।
কবির কর্মজীবন : নজরুল বারাে বছর বয়সে লেটোর গানের দলে যােগ দেন। সেখান থেকে তিনি সামান্য কিছু রােজগার করতেন। এরপর তিনি আসানসােলের এক রুটির দোকানে মাসিক এক টাকা বেতনে চাকরি নেন। বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর কাব্যসাধনায় তিনি পুরােপুরি নিয়ােজিত হন। সাংবাদিক হিসেবেও তিনি যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় নবযুগ, লাঙল ও ধূমকেতু পত্রিকা। পত্রিকাগুলাে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল।
কবির কাব্যপ্রতিভা : ১৯২০ সাল থেকে নজরুল পুরােপুরি সাহিত্য রচনায় মনােনিবেশ করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম মুক্তি। কিন্তু যে কবিতা তাঁকে খ্যাতি এনে দেয় তার নাম ‘বিদ্রোহী’। পরবর্তীকালে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন। আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতাটি রচনা করে তিনি ব্রিটিশ শাসকদের ব্যঙ্গ করেছিলেন। এ কারণে তাকে কারাবরণও করতে হয়েছে।
সাহিত্যকীর্তি : কাজী নজরুল ইসলাম খুব অল্প সময় সাহিত্য সাধনার সুযােগ পেয়েছিলেন। তার মধ্যেই তিনি রচনা করেছিলেন অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, চক্রবাক, দোলনচাঁপা, ফণীমনসা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ এবং কুহেলিকা, মৃত্যুক্ষুধা প্রভৃতি উপন্যাস। তিনি প্রায় দুই হাজারের মতাে গান রচনা করেছেন। তাঁর গানের সুরের বৈচিত্র্য আমাদের মুগ্ধ করে। মানুষ এখনাে শ্রদ্ধা সহকারে তার গান শােনে।
সংবর্ধনা, সম্মাননা ও পুরস্কার : ১৯২৯ সালে কলকাতা অ্যালবার্ট হলে নজরুলকে জাতির পক্ষ থেকে সম্মাননা জানানাে হয়। ১৯৩৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে নজরুলকে সভাপতির পদে সমাসীন করে সম্মান দেখানাে হয়। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলকে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে। ১৯৬০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধি দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে তাঁকে ডি.লিট উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রেয় জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয় কাজী নজরুল ইসলামকে। বাংলাদেশর রণসঙ্গীত গৃহীত আছে নজরুলে রচিত “চল্ চল্ চল্ , ঊর্ধগগনে বাজে মাদল”। প্রতি বছর বাংলাদেশে নজরুলের জন্ম ও মৃত্যুবাষিকী পালন করা হয়। কাজী নজরুলের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ২০০৫ সালে ত্রিশালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্বাবদ্যালয় নাম প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭৪ সালে ৯ ডিসেম্বর বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সস্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। তাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানসূচক পদক একুশে পদকে ভূষিত করা হয় ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় কবির স্মৃতিতে নজরুল একাডেমি, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ও শিশু সংগঠন বাংলাদেশ নজরুল সেনা স্থাপিত হয়। এছাড়া সরকারিভাবে স্থাপিত হয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান নজরুল ইন্সটিটিউট- ঢাকা শহরের একটি প্রধান সড়কের নাম রাখা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।
২০১২ সালে চুরুলিয়ার কাছে আসানসোল মহানগরে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এবং পশ্চিমবঙ্গ চুরুলিয়ায় “ নজরুল অ্যাকাডেমি” নামে বেসরকারি নজরুল চর্চা কেন্দ্র আছে। কাজী নজরুলকে ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। ভারতের তৃতীয় সবোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ ভূূষিত করা হয় ১৯৬০ সালে। কলকাতায় কাজী নজরুলের নামে আন্তর্জাতিব বিমানবন্দরি, সড়করে নাম কাজী নজরুল ইসলাম সরণি, মেট্রো স্টেশনটি নাম কবি নজরুল মেট্রো স্টেশন রাখা হয়েছে।
বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে আহরিত জ্ঞান ও বাংলা ভাষার পাশাপাশি আরবি-ফারসি-হিন্দি-উর্দু-সংস্কৃতের শব্দাবলি নজরুলের সাহিত্যকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যে ভাষর করেছে। শিল্পের বা জনপ্রিয়তার বিচারে নজরুলের সাহিত্য কতখানি শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে, সে বিচার করবেন বিদগ্ধজনেরা। তবে আমার কাছে নজরুল সবচেয়ে প্রিয় কবি, লেখক ও ব্যক্তিত্ব।
চলচিত্রঃ
১৯৩১ সালে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’র ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘গৃহদাহ’ চলচ্চিত্রের সুরকার ছিলেন তিনি। নজরুল ‘ধূপছায়া’ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। ১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের কাহিনীকার ও সুরকার ছিলেন তিনি। ‘রজত জয়ন্তী’, ‘নন্দিনী’, ‘দিকশূল’, ‘অভিনয়’ চলচ্চিত্রের গীতিকার ছিলেন নজরুল। ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। চৌরঙ্গী হিন্দিতে নির্মিত হলেও সেটার জন্য ৭টি হিন্দি গান লেখেন তিনি।
কবির অসুস্থতা : ১৯৪২ সালে কবি মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত রােগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানাে হলেও সুস্থ হননি তিনি। এর পর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন নির্বাক।
কবির বাংলাদেশে আগমন : ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় অসুস্থ কবিকে ঢাকায় আনা হয়। তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় এবং জাতীয় কবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়। মৃত্যু : বাংলাদেশে অবস্থানকালে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবি মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়। প্রতিবছরই তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে সবাই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে।
বাঙালির গর্ব নজরুল। বাঙালির প্রিয় কবি নজরুল। তিনি তার সৃষ্টির দ্বারাই বাংলা সাহিত্যে অমরত্ব পেয়েছেন। বাঙালি জাতি চিরকাল তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তাঁর সাহিত্য যুগ যুগ ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে আমাদের প্রেরণা জোগাবে। নজরুল শুধু একটি সময়ের কবি নন। তিনি সব সময়ের সব মানুষের কবি।
৫
৫ মন্তব্য