সিনিয়র শিক্ষক
১২ মে, ২০২৩ ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
কবি আল মাহমুদ একবার রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমাদের আস্তিকদের রবীন্দ্রনাথকে বেশি প্রয়োজন। নাস্তিকদের ততখানি নয়। কেননা রবীন্দ্রনাথ আস্তিক ছিলেন।” তার এই কথায় ডান-বাম মহলে বেশ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। এখানে আল মাহমুদ নিজে আস্তিক হিসেবে তার দলে রবীন্দ্রনাথকে টানতে চেয়েছেন। আবার আস্তিকদের একটি গ্রুপ রবীন্দ্র্রনাথকে বাম পন্থী বা অন্য ধর্মীদের স্থায়ী সম্পদ একথা স্বীকার করে নিয়ে তাকে বাদই দিয়ে দিয়েছে। এর সমালোচনায় বলা যায়, বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গন বিভিন্ন দেশের কালজয়ী লেখকদের লেখা সাহিত্য নিয়ে টিকে আছে। শেকসপীয়ার, রুমি, শেখ সাদী, জর্জ অরওয়েল , পার্ল এস বাক, ম্যাক্সিম গোর্কি, টলস্টয়, আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসীন, এডওয়ার্ড সাঈদ, মুহম্দ ইকবাল, সাদত হাসান মান্টো, ফয়েজ আহমদ, নগীব মাহফুজ, খালেদ হোসাইনি, ওরহান পামুক, হারুকি মুরাকামি, জে কে রাউলিং প্রমুখ যেমন প্রাসঙ্গিক সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথও প্রাসঙ্গিক। সকল নাম আনা ক্ষুদ্র পরিসরে অসম্ভব, এর বাইরেও অনেক মহৎ সাহিত্য রচয়িতা অবশ্যই আছেন। এসব কথায় তর্ক করার অনেক সুযোগ আছে। আর এসবের মধ্য দিয়েই তো মহৎ সাহিত্য পথ করে নেয়। চিরায়ত সাহিত্য হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা, ছোট গল্প ও উপন্যাস বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্ব সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ একথা তো অস্বীকারের উপায় নেই। নোবেল বিজয় সেটা আরো বড় করে সামনে এনেছে। আবার নোবেল বিজয় না করেও নজরুল, মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশংকর, জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যে সমান প্রাসঙ্গিক। আল মাহমুদ রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্ম চেতনা বা ধর্মচিন্তার কথা ভেবেই বলেছিলেন কথাটা। কেননা ততদিনে তিনি বামপন্থার আদর্শ ত্যাগ করে ধর্মীয় ভাবাদর্শ নিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করেছেন। ফলে তার শত্রুর অভাব ছিল না। তার এক সময়ের বামপন্থী বন্ধুরা এই মুক্তিযোদ্ধা কবির বিরুদ্ধে লাগে। ফলে তিনি দীর্ঘ দিন বাংলা একাডেমির বই মেলায় যেতে পারেননি। কথা হচ্ছে অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? তার অনুপস্থিতিতেও মেলায় কবি আল মাহমুদের বইয়ের বিক্রি ছিল শীর্ষ পর্যায়ে, ঈর্ষণীয়।
শেরে বাংলা ও রবীন্দ্রনাথ। শেরে বাংলা তখন অভিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী
রবীন্দ্রনাথ আস্তিক্যবাদী ছিলেন। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন, ধর্ম পালনেও তার অনীহা ছিল না। তবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান তিনি সজ্ঞানে পরিহার করতেন, ধর্মের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নানা প্রসঙ্গে বিভিন্ন যুক্তির অবতারণা করেছেন। তার ধর্ম-বিশ্বাস সম্পর্কে অনেকের অনেক ধরনের ধারণা রয়েছে। তারা পীরালী ব্রাম্মণ ছিলেন। পরে ব্রাম্ম ধর্ম অনুসরণ করেন। এই ধর্ম একেশ্বরবাদী। হিন্দু ধর্মের দেব দেবীরা এখানে পূজিত হতেন না। তবে কারচারাল লেভেলটা সনাতন ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের মতোই ছিল বলে নানা ধারণার সংযোগ ঘটেছে। যে যেভাবে পারেন ব্যাখ্যা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫) অতিশয় বিষয়-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ধর্ম পালনে নিষ্ঠাবান ছিলেন। জমিদারি দেখাশুনার পাশাপাশি তিনি ধর্ম ও সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতেন। ব্রাহ্মধর্মের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭২-১৮৩৩) সংস্পর্শে এসে হিন্দুধর্ম সম্পর্কে তার ধারণা অনেকটা বদলে যায় এবং পরবর্তীকালে তিনি ব্রাহ্মধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী হন। মূর্তিপূজা নেই। জ্ঞান-ভিত্তিক, যুক্তি-ভিত্তিক আধুনিক বিজ্ঞানমনষ্ক চিন্তাধারার ভিত্তিতে ব্রাহ্মমতের ভিত্তি স্থাপিত। সেকালে অনেক শিক্ষিত জ্ঞানী-গুণী হিন্দুগণ এ মতের অনুসারী হন।
সাহিত্যিক গবেষক মুহম্মদ মতিউর রহমান লিখেছেন : ‘ রামমোহন কোন ধর্ম মন্দির প্রতিষ্ঠা করেননি। তবে ধর্মীয় উপাসনার ক্ষেত্রে তিনি একটি দলিল সম্পাদন করেন। একেশ্বরের উপাসনা এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সে উপাসনায় যোগ দিতে পারবেন এবং কোনরূপ চিত্রকর্ম, প্রতিমূর্তি, প্রতিমা বা খোদিত মূর্তি এ উপাসনায় স্থান পাবে না বলে এতে উল্লেখ আছে। রামমোহন কোন ধর্ম মন্দির স্থাপন না করলেও দেবেন্দ্রনাথ স্বগৃহে ব্রাহ্মমন্দির স্থাপন করেন এবং সেখানে নিয়মিত উপাসনা ও ব্রহ্মসঙ্গীত গাওয়া হতো। রবীন্দ্রনাথের খুড়তুত ভাই গুণেন্দ্রনাথ ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করতেন এবং সকলেই তা ভক্তিভরে গাইতেন ও শুনতেন। রবীন্দ্রনাথের মানস গঠিত হয় পিতা দেবেন্দ্রনাথের আদর্শে।
রবীন্দ্রনাথ সুফিবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ার কারণে মরমী কবি লালন ফকিরের ভক্ত হয়ে পড়েন। লালনকে অনেকে বাউল সম্রাট লিখে থাকেন। প্রকৃত পক্ষে বাউল আর লালনের মরমীবাদ বা ফকিরী এক জিনিস নয়। লালন খুব সচেতন ছিলেন এ ব্যাপরে। তার গানে নামের সাথে কখনো বাউল ব্যবহার করেননি, করেছেন ফকির লালন। যাই হোক এটা একটা দীর্ঘ আলোচনার বিয়য়। এখানে সে সুযোগ নেই। লালনকে বাউল বলা ঠিক নয় এটার জন্যই কথাটির উল্লেখ। জানা যায়, ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রথম জমিদারি কার্যোপলক্ষে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে আগমন করে সেখানে লালন ফকিরের (১৭৭২-১৮৯০) সাক্ষাৎ লাভ করেন। এটা তার মতে তার জীবনের এক আনন্দময় অভিজ্ঞতা। গ্রামীণ জনপদের অশিক্ষিত প্রতিভাবান কবির রচিত গানে প্রতিফলিত দর্শন ও জীবনচর্যা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত হন। সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মচেতনা ও গভীর জীবন-জিজ্ঞাসামূলক লালনের মরমী গানে প্রতিফলিত জীবনদর্শন কবির প্রাজ্ঞ-অধীত জীবন-চৈতন্যকে গভীরভাবে আলোড়িত করে।
গবেষক বিজয় পাল লিখেছেন - ‘‘প্রথম যৌবনের অপরিণত বয়স থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধর্ম নিয়ে চিন্তা করেছেন। বলাবাহুল্য রবীন্দ্রনাথের মতো ভাবুক, চিন্তক, সৃজনশীল মানুষের ধর্মের মতো সূক্ষ্ম বিষয়ের চিন্তা কোনো স্থানু বিষয় হয়ে থাকেনি। তাতে ভাবের বদল এসেছে নানা পর্যায়ে। —-আমরা লক্ষ্য করি, একেবারে কাঁচা বয়সের ‘বিদ্রোহী’ ভাব কাটিয়ে আদি ব্রাহ্ম সমাজের (১৮৮৪) সম্পাদক হওয়ার পর থেকে ধর্মচিন্তা নিয়ে তিনি দোলাচলমানতায় ভুগেছেন। কখনও তিনি হিন্দুধর্মের নীতিকে আক্রমণ করছেন। রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তার প্রায় সমগ্রপর্বে ‘ঈশ্বর’ আছেন। সে ঈশ্বরকে তিনি নানা সময়ে নানা নামে ডেকেছেন। কিন্তু প্রচলিতভাবে ঈশ্বর বলতে যা বোঝায় তার ঈশ্বর তেমন নন। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে ঈশ্বরসাধনার উদ্দেশ্য স্বর্গলাভ, মোক্ষলাভ বা নির্বাণলাভ। তার ঈশ্বরসাধনা পার্থিব জগৎকেই বেশি করে ব্যাখ্যা করে। তাই তার ঈশ্বরসাধনা সাধন পূজনরীতির চর্চা নয়। এক অর্থে তা ক্ষুদ্র আমি’র সংকীর্ণতার গ-ি পেরিয়ে বৃহৎ আমি’র সন্ধান। মানুষের মধ্যে ‘চিরকালের’ মানুষের সন্ধান। মানবের মধ্যে ‘মহামানবের’ সন্ধান। তার ঈশ্বরসাধনা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধর্মমতের ভিত্তিতে যৌথ আচারবিধি পালন নয়। তা একান্তই আত্মগত।আত্মগতের মধ্যেই তিনি সর্বগতের সন্ধান করেছেন। তার ঈশ্বরসাধনা একান্তই স্বানুভূতির মাধ্যমে সত্য, সুন্দর ও চিরকল্যাণকরের সাধনা। মানুষের যা শ্রেষ্ঠ তাই নিয়ে ব্যক্তি মানুষের উত্তরণ খুঁজেছেন ‘সর্বকালের মানুষের’ মধ্যে। ’’ উদ্ধৃতি দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। তাই শেষ করতে হলো।
সমালোচকরা আরো লিখেছেন- রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় গণসচেতনতার সূচনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তার সার্থক উত্তরণ ঘটে। মাঝে নানা বিচিত্রমুখী টানাপোড়েন দেখা যায়। ১৯২৭-এ ধর্মতন্ত্রের কদর্যতায় বিরক্ত হয়ে রঁমা রঁলা’কে তিনি লিখলেন, এ দেশে এখন flood of atheism দরকার।
গবেষক তারকনাথ ঘোষ বলেছেন : ‘‘ ধর্মের সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক আছে আবার ধর্মের সঙ্গে সাহিত্যেরও সংযোগ আছে। — রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তার মধ্যে একটা সজীবতা ছিল, যার প্রেরণায় তার ধর্মবোধও ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। ক্ষেত্র, বীজ, অঙ্কুর, বিকাশ, ফুল, ফল- এই ছয়টি বিভাগে বিষয়গুলি সাজানো হয়েছে, বৃক্ষের উদ্ভব আর পরিণতির কল্পনাই এই বিভাগের মূল। রবীন্দ্রনাথের বিকাশধর্মী জীবন মহীরূহের সঙ্গেই তুলনীয়।’’
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন : “রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষের ধর্ম’ নামক বইটির ইতিহাস আমাদের অনেকেরই জানা নেই। এটা লিখিত হয় রবীন্দ্রনাথ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৩০ সালে যে ‘হিবার্ট লেকচার’ দেন, তার ভিত্তিতে। বইটি ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয় ইংরেজি ভাষায় লন্ডন থেকে। রবীন্দ্রনাথ এতে বলেন, বাংলার বাউলদের ধর্ম হলো মানবধর্ম। কেননা তারা কোনো প্রথাগত ধর্মে বিশ্বাস করে না। সবাই বাউল হতে পারে। বাউল হতে কারো বাধা নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই কথা যথেষ্ট বস্তুনিষ্ঠ নয়। কেননা, বাউলরা হলেন খুবই গুরুবাদী। তারা মনে করেন, কেবল গুরুর কাছ থেকেই শেখা সম্ভব প্রকৃত আরাধনা পদ্ধতি। যার মাধ্যমে আসতে পারে মানবাত্মার মুক্তি। বাউলদের মধ্যে আছে বিভিন্ন গুরুর শিষ্য। আছে চিন্তার ভেদ। তাই তাদের বলা চলে না, অসাম্প্রদায়িক। বাউলরা খুবই গঞ্জিকাসেবী। এরা যাপন করে শিথিল যৌন-জীবন। পালন করতে চান না গার্হস্থ্য-ধর্ম। চান না সন্তান-সন্ততির দায়িত্ব নিতে। রবীন্দ্রনাথ এর আগে অনেক লেখায় বৈরাগ্যের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু মানুষের ধর্ম বইতে প্রশংসা করেছেন বাউলদের; যারা হলেন বৈরাগ্যবাদী। তিনি মানুষের ধর্মে এটা কেন করেছেন, সেটার ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে ক্ষিতিমোহন সেন (১৮৮০-১৯৬০) দাবি করেছেন, মানুষের ধর্ম বইতে বাউল সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন, সেই অংশটি লিখেছিলেন তিনি, রবীন্দ্রনাথ নন। ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বভারতীর একজন খ্যাতিমান অধ্যাপক। তার খ্যাতির একটি কারণ হলো, ভারতীয় মরমীবাদী চিন্তার ওপর গবেষণা। অর্থাৎ যাকে এখন রবীন্দ্রচিন্তা বলে প্রচার করা হচ্ছে, তা আসলে হলো ক্ষিতিমোহন সেনের চিন্তা। রবীন্দ্র-চিন্তার ফসল তা নয়। অবশ্য এক দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউলদের মিল খুঁজে পাওয়া যায়, বাউলরা খুবই গুরুবাদী। আর রবীন্দ্রনাথও চেয়েছেন কবিগুরু হতে। বিশ্বে আর কোনো কবি সম্ভবত এ রকম কবিগুরু হতে চাননি। তারা কেবলই চেয়েছেন কবি হতে।” ( রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাভাষী মুসলমান সমাজ, দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৩ মে ২০১৭)।’
এখানে যে মরমীবাদের কথা বলা হয়েছে লালন ছিলেন তারই অনুসারী। তিনি ফকির দাবি করে একই স্থানে বসে সঙ্গীত সাধনা করে গেছেন, বাউলদের মতো ঘুরে ঘুরে গান করেননি। যৌন জীবনেও তিনি বাউলদের মতো ছিলেন না।
১৩৪১ সালের আশ্বিন সংখ্যা ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তিনি লেখেন Ñ “আমি বলছি, যা কিছু মানুষের শ্রেষ্ঠ আদর্শের সঙ্গে মেলে তাই হিন্দুধর্ম। কেননা, হিন্দুধর্মে জ্ঞান, ভক্তি, কর্ম তিন পন্থাকেই ঈশ্বরের সঙ্গে যোগের পন্থা বলেছেন। খ্রিষ্টান ধর্মের চেয়ে হিন্দুধর্মের একটা জায়গায় শ্রেষ্ঠত্ব এই দেখি, হিন্দুধর্ম সন্ন্যাসবাদ ধর্ম নয়। ...হিন্দুধর্মকে বাইরের দিকে যে সব স্থূল আবরণে আবৃত করেছে, তাকে বাদ দিয়ে যে জিনিসটাকে পাই সেতো কোনো ধর্মের চেয়ে কোনো অংশে নিকৃষ্ট নয়। কেননা, এতে মানুষের হৃদয়, মন, আত্মা এবং কর্মচেষ্টা সমস্তকেই ভূমার দিকে আহ্বান করেছে। আমি এই জন্যেই হিন্দু নাম ছাড়তে পারিনেÑব্রাহ্মধর্মকে হিন্দুধর্ম থেকে পৃথক করতে পারিনে।”
দেখা যাচ্ছে আত্ম পরিচয় নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নানা সময় নানা কথা বলেছেন। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পান। এটা পান গীতাঞ্জলী কাব্যের জন্য। এর কবিতা বা গানগুলো ঠিক হিন্দু ধর্মের বাণীর সঙ্গে যায় না। এখানে তিনি অধ্যাত্ম চেতনার যে প্রকাশ ঘটিয়েছেন তার সাথে সুফিবাদের মিল আছে। আছে ফারসী সাহিত্যের প্রভাব। নোবেল পাবার পর তিনি বোলপুরে শান্তি নিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ছিল ও এখনো আছে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেছেন : “আমি ভারতীয় ব্রহ্মচর্য্যরে প্রাচীন আদর্শে আমার ছাত্রদিগকে নির্জনে নিরুদ্বেগে পবিত্র নির্মলভাবে মানুষ করিয়া তুলিতে চাই। বিদেশী মেøচ্ছতাকে বরণ করা অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়, ইহা হৃদয়ে গাঁথিয়া রাখিও।”
রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসে পরেশবাবুর উক্তি : “ভারতবর্ষে হিন্দু কমছে, আর মুসলমান বাড়ছে। এইরকম ভাবে চললে এদেশ মুসলমান প্রধান হয়ে উঠবে, তখন একে হিন্দুস্তান বলাই অন্যায় হবে।”
উপরোক্ত উক্তির দ্বারা রবীন্দ্রনাথ মূলত ইতিহাসের কিছুটা অপব্যাখ্যা করেছেন বলে গবেষক মুহম্মদ মতিউর রহমানের অভিমত। এখনকার পরিস্থিতি হলো ভারতে মুসলমান বাড়ছে কথা ঠিক, কিন্তু তারা চরমভাবে নির্যাতিত, খৃস্টান, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও নির্যাতিত। কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রসার ঘটতে দেখা যাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় মুছে যেতে বসেছে। এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেই অধিকাংশ ভারতীয়র মত। সেটা হলেই ভাল।
৫৩
৯২ মন্তব্য