Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ মে, ২০২৩ ০৯:২৪ পূর্বাহ্ণ

লক্ষ্মীপুরে ৭০০ কোটি টাকার সয়াবিন উৎপাদন

সয়াল্যান্ড খ্যাত লক্ষ্মীপুরে সয়াবিনের বাম্পার ফলন হয়েছে এবার। সেই সাথে কৃষকের মুখে ফিরেছে হাসির ঝলক। তারা আশা করছেন এবার সয়াবিনের ন্যায্য দামই পাবেন। ইতোমধ্যে মাঠ থেকে সয়াবিন কাটার ধুম পড়েছে। ক্ষেত থেকে সয়াবিন গাছ কেটে সেগুলো মাড়াই করে ঘরে তোলার ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
বিগত দুই-তিন বছর আগাম বৃষ্টির কারণে কাক্সিক্ষত ফল না পেলেও এবার সয়াবিনের ভালো ফলন হয়েছে বলে জানান কৃষকরা। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে সময়মতো শষ্য ঘরে তুলতে পারবেন বলে তারা আশাবাদী। কৃষি বিভাগ বলছে, এ মৌসুমে লক্ষ্মীপুর জেলায় যে পরিমাণ সয়াবিন উৎপাদিত হয়েছে তার বাজারমূল্য প্রায় সাত শ’ কোটি টাকার মতো হবে। কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, সারা দেশে যে পরিমাণ সয়াবিন উৎপাদিত হয় তার ৭০-৮০ শতাংশই উৎপাদিত হয় লক্ষ্মীপুরে। লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর উপকূলীয় এলাকার মাটি ‘সয়াল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিত। জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চল এবং রায়পুর, রামগতি ও কমল নগর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সয়াবিন চাষ হয়। নদীমাতৃক হওয়ার মেঘনার বিভিন্ন চরেও এখন ফলানো হচ্ছে সয়াবিন।

কৃষকরা জানায়, ধান বা অন্য কোনো ফসলের চেয়ে সয়াবিনে লাভ বেশি। গত কয়েক বছর ধরে ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে সয়াবিন। তবে সয়াবিনের বীজ, সার, ওষুধ ও শ্রমিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। এ অঞ্চলের জমি উর্বর থাকায় সয়াবিন তোলার পর পরই সেই জমিতে ধান চাষ করা যায়। এতে ধানের ফলনও বেশ ভালো হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, জেলায় এবার ৪১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সয়াবিনের আবাদ হয়েছে। গত মৌসুমে আবাদ হয়েছিল ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে। জেলার রামগতি উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সয়াবিনের আবাদ করা হয়। এবার এ উপজেলাতে সয়াবিনের চাষ হয়েছে সাড়ে ১৬ হাজার হেক্টর জামিতে। এর পরের অবস্থান কমলনগর উপজেলা। এ উপজেলাতে চাষ হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে। সদর উপজেলায় ছয় হাজার ৩০০ হেক্টর, রায়পুরে ছয় হাজার ২০০ হেক্টর এবং রামগঞ্জে ১০০ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ হয়েছে। লক্ষ্মীপুরে এ বছর ৮৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন সয়াবিন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। ইতোমধ্যে আবাদকৃত সয়াবিনের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি মাঠ থেকে কেটে ঘরে তোলা হয়ে গেছে। সরেজমিন সদর উপজেলার চররমনী মোহন, ভবানীগঞ্জ, কমলনগরের তোরাবগঞ্জ, চরলরেঞ্চ ও চর কালকিনি, রামগতির আলেকজান্ডার ও চর বাদাম এবং রায়পুরের দক্ষিণ চরবংশী এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা ক্ষেত থেকে দলবদ্ধভাবে সয়াবিন কাটছেন। গাছসহ সয়াবিন রোদে শুকিয়ে কেউ কেউ মাড়াই করছেন। কেউ আবার ক্ষেত থেকে সরাসরি সয়াবিন মাড়াই করে ঘরে তুলছেন। সয়াবিন কেনার জন্য খুচরা ব্যবসায়ীরা মাঠে গিয়ে সয়াবিন সংগ্রহ করে আড়তে নিয়ে যাচ্ছেন।

চররমনী মোহন এলাকার কৃষক আলা উদ্দিন বলেন, মৌসুমের শুরুতে সয়াবিনের দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। মাঠেই প্রতি মণ সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়। ওই এলাকার কৃষক আবদুল কাদের জানান, মেঘনা নদী সংলগ্ন একটি চরে প্রায় চার একর জমিতে আমি সয়াবিন চাষাবাদ করেছিলাম। সবগুলো সয়াবিন কেটে ঘরে তুলতে পেরেছি।

প্রতি একরে ফলন হয়েছে ৫০-৫৫ মণের মতো। সদর উপজেলার চররমনী মোহনের এক কৃষক বলেন, অন্যান্য ফসলের চেয়ে সয়াবিন চাষে খরচ কম হয়। তাই কৃষকরা রবি মৌসুমে সয়াবিন চাষাবাদে বেশি আগ্রহী হন। আমন ধান কাটার পরপরই জমি চাষ দিয়ে সয়াবিনের বীজ লাগানো যায়। সয়াবিন চাষাবাদে অন্যান্য ফসলের চেয়ে সার ও ওষুধ কম লাগে। রায়পুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার সয়াবিনের বাম্পার ফলন হয়েছে। এতে কৃষকদের প্রত্যাশা পূরণ হবে। প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা ও বাজারজাতের নিশ্চয়তা পেলে কৃষকরা সয়াবিন চাষে আরো আগ্রহী হয়ে উঠবেন। আশার কথা হলো, সয়াবিন চাষ করলে ওই জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। এ কারণে কৃষকরা সয়াবিন চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক ড. জাকির হোসেন বলেন, সয়াবিনের উৎপাদন বাড়াতে আমরা কৃষকদের সঠিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এবার ফলন ভালো হয়েছে। বর্তমানে কেজি-প্রতি সয়াবিনের দাম ৫৫-৬০ টাকা। সে হিসাবে এ জেলায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকার সয়াবিন উৎপাদিত হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত সয়াবিন দিয়ে পশু ও মাছের খাদ্য তৈরি হয়। ফলে বিভিন্ন ফিড কোম্পানির কাছে সয়াবিনের ভালো চাহিদা রয়েছে।
তারা কৃষকদের কাছ থেকে সয়াবিন কিনে নিচ্ছেন। জেলার এ কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সয়াবিনের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদেরকে উচ্চ ফলনশীল (হাইব্রিড) জাতের বীজ সারিবদ্ধভাবে বপন করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। হাইব্রিডের মধ্যে বিইউ-১, বিইউ-২, বারি-৬, বীনা-৫ ও বীনা-৬ জাতের সয়াবিন রয়েছে। এগুলোতে ফলন ভালো হয় এবং সময়কালও কম থাকে। বিইউ-১ জাতের সয়াবিন রোপণের পর ফলন আসতে মাত্র ৮০ দিন সময় লাগে। যেসব সয়াবিনে সময়কাল কম, সেগুলো সাধারণত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে না।



মন্তব্য করুন

ব্লগ