সহকারী শিক্ষক
১৪ মে, ২০২৩ ০৮:০৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ভাববাদঃ
দর্শন ইতিহাসে ভাববাদ একটি প্রাচীনতম ও সুপ্রতিষ্ঠিত মতবাদ। এ মতবাদের মূল কথা হল জগতের মূলসত্তা এক পরমভাব বা চেতনা সত্তা। ভাববাদের নানা প্রকারভেদ থাকলেও মোটামুটি সকল ভাববাদী এই তত্ত্বে বিশ্বাসী যে জগতের মূলসত্তা ভাব। দৃশ্যমান জগতের জীব ওজড় পরম সত্তা বা পরম ভাবেরই প্রকাশ।
শিক্ষাক্ষেত্রে যারা ভাববাদ প্রয়োগ করেন তারা হলেন প্লেটো, ক্যান্ট, মহত্মা গান্ধী প্রমূখ। প্লেটো তার রিপাবলিক গ্রন্থে আদর্শ রাষ্ট্রের শিক্ষার যে রুপরেখা প্রনয়ন করেন তাতে ভাববাদী দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়। অনেক ভাববাদী দার্শনিক শিক্ষায় ভাববাদ প্রয়োগ করেন। ভাববাদী দার্শনিকরা মানুষ ও বিশ্ব ব্রহ্মান্ডকে এক ভাবমূলক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করেন। তারা মনে করেন মানুষ একটা আধ্যাত্মিক সত্তা নিয়ে জন্মায়। শিক্ষার মাধ্যমেই তার প্রকৃত আত্মোপলদ্ধি। যার ফলে সে পরম সত্তার পরম ভাবকে পাওয়ার পথে এগিয়ে যাবে। ভাববাদীরা শুধু শিক্ষার তাত্ত্বিক দিকের উপর বিস্তার করেনি, তারা শিক্ষার সমস্ত অঙ্গকেই নিজেদের চিন্তাধারার প্রেক্ষিতে ঢেলে সাজিয়েছেন। তাদের মতে শিক্ষার আদর্শ হওয়া উচিৎ পূর্ণতা লাভ। শিক্ষার কাজ হবে মানুষের সুপ্ত গুণগুলিকে বিকশিত করে তার পূর্ণ সত্তাকে বিকশিত করা। তাদের মতে শিক্ষা ব্যবস্থায় সকল রকম শিক্ষার সুষম সমন্বয় সাধিত হওয়া উচিৎ। বৈজ্ঞানিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাও শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থান পাবে। ব্যক্তিত্বের বিকাশে সহায়ক সকল শিক্ষাই শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকতে হবে।
ভাববাদের বিচারে শিক্ষার লক্ষ্যঃ
ভাববাদী দার্শনিকদের মতে শিক্ষার লক্ষ্যগুলো নিম্নরুপঃ
১) আত্মোপলদ্ধিঃ ভাববাদী শিক্ষা দার্শনিকদের মতে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হবে আত্মোপলদ্ধি। জগতের অনিত্যতা হৃদয়ঙ্গম করে সর্বব্যাপি, নিত্য, পরমসত্তার সাথে নিজের অভিন্নতার উপলদ্ধিই হল আত্মোপলদ্ধি। বিশুদ্ধ জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের মাধ্যেম এই উপলদ্ধি হয়ে থাকে।
২) সমৃদ্ধ ও উন্নত জীবন যাপনে শিক্ষার্থীকে সাহায্য করাঃ ভাববাদীদের মতে শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য শিক্ষার্থীকে উন্নত জীব যাপনে সহায়তা করা। এমন শিক্ষা দিতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা উন্নত ও সমৃদ্ধ জীবন যাপন করতে পারে।
৩) উন্নত ও বৈচিত্রপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করাঃ মানুষের জীবন দুর্লভ ও মূল্যবান। তাই ব্যক্তির আত্মবিকাশের মাধ্যমে উন্নত ও বৈচিত্রপূর্ণ সমন্বিত ব্যক্তিত্ব গড়তে শিক্ষার্থীকে সহায়তা করা শিক্ষার লক্ষ্য।
৪) সৃজনশীল শক্তির বিকাশঃ সৃজনশীল শক্তির বিকাশ ভাববাদী শিক্ষাদর্শনের অন্যতম লক্ষ্য। বিশ্ব-প্রকৃতিতে মানুষের স্থান অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে উপরে। তাই পরিবর্তিত পরিবেশকে অন্যান্য প্রাণির মত নিষ্ক্রীয়ভাবে গ্রহণ না করে নিজের সৃজনশীল শক্তি দিয়ে পরিবেশকে পরিবর্তন করে নিজের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারে।
৫) সার্জনীন শিক্ষাঃ আত্মোপলদ্ধি শুধু অল্প কিছু মানুষের জন্য নয়। পরমসত্তার অংশ হিসেবে প্রতিটি মানুষের জন্য চাই আত্মোপলদ্ধি। তাই তাদের মতে সবার জন্য শিক্ষা।
৬) সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করাঃ শুধু ব্যক্তি জীবন নয়, সমাজের অন্যরাও যাতে উন্নত জীবন যাপন করতে পারে তার জন্য শিক্ষার্থীকে সচতন করাও শিক্ষার লক্ষ্য।
৭) সংস্কৃতির উন্নতিঃ মানুষ উন্নত সংস্কৃতির স্রষ্ঠা। সংস্কৃতির উন্নতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে এর সঞ্চালন শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব। শিক্ষা তার কাজের দ্বারা আমাদের সংকৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌছে দেয়। তাই সংকৃতির উন্নতি সাধন ভাববাদীদের মতে শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য।
ভাববাদের মতে শিক্ষাক্রমঃ
ভাববাদী দার্শনিকরা শিক্ষার লক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে শিক্ষাক্রম নির্ধারণ করেছেন। তারা মানুষকে সবকিছুর কেন্দ্র বলে মনে করেন। তাদের মতে শিক্ষাক্রম নিম্নরুপ্ন হওয়া উচিৎ-
১) শিক্ষার্থীদের বৌদ্ধিক উন্নতি সাধনের জন্য পাঠ্যক্রমে সাহিত্য, বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
২) শিক্ষার্থির নৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে উন্নতির জন্য নীতিশাত্র এবং ধর্মশাত্র পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৩) শিক্ষার্থীর নান্দনিক বোধের উন্নতির জন্য চারুকলা, কারুকলা, সংগীত, চিত্রাঙ্কন ইত্যাদি বিষয় পাঠ্যক্রমে রাখতে হবে।
৪) শিক্ষার্থীর শারীরিক সুস্থ্যতার জন্য শরীরবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান,বায়াম। শরীর চর্চা ইত্যাদি পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ভাববাদী শিক্ষা পদ্ধতিঃ
প্রাচীন ভাববাদীদের শিক্ষণ পদ্ধতি ছিল নিম্নরুপঃ
১) প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি
২) আবৃত্তিকরণ পদ্ধতি
৩) বক্তৃতা পদ্ধতি
৪) অনুকরণ পদ্ধতি
৫) বিতর্ক পদ্ধতি
৬) দ্বান্দ্বিক পদ্ধতঃ প্রশ্ন ও আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষণ।
ভাববাদী শিক্ষাদর্শনে শিক্ষকের বৈশিষ্ট্যঃ
ভাববাদী শিক্ষাদর্শনে শিক্ষার প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা পালন করেন শিক্ষক। শিক্ষক শিশুর বিকাশ ও শিক্ষাদানের সুযোগ এবং উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেন। তাদের মতে শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য নিম্নরুপ হতে পারে যথা-
১) শিক্ষক হবেন আদর্শ পরায়ন ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। শিক্ষার্থী তার জীবনদর্শন অনুসরণ করবে।
২) শিক্ষকতার পূর্বশর্ত হল শিক্ষার্থীকে বোঝা। পাঠ্য বিষয় ভালভাবে না বুঝলে যেমন পাঠদান করা যায় না। তেমনি শিক্ষার্থীকে না বুঝলে শিক্ষাদান নিরর্থক। তাই শিক্ষক এমন হবেন যিনি শিক্ষার্থীকে বুঝবেন।
৩) শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর ভাল বন্ধু।
৪) শিক্ষক হবেন যিনি যার পরিপূর্ণ আত্মোপলদ্ধি হয়েছে।
৫) শিক্ষকের ভূমিকা হবে পরিচালকের মত। শিক্ষার্থী তার নির্দেশ ও পরামর্শ অনুসারে কাজ করবে।
৬) শিক্ষক এমন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হবেন যাতে শিক্ষার্থী তার গুণে তাকে সম্মান করবে।
৭) শিক্ষক এমন হবেন যিনি শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞান আহরণের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে।
8) শিক্ষার্থীর মধ্যে যে সুপ্ত পরমসত্তা আছে তাকে বিকশিত করাই তার কাজ।
৯) বিষয়বস্তুর উপর শিক্ষকের পূর্ণ দখল থাকতে হবে যাতে শিক্ষাদান কাজ সহজ ও ফলপ্রসু হয়।
১০) শিক্ষার্থীর আত্মোপলদ্ধিতে শিক্ষক সাহায্য করবেন পরামর্শ দিবেন।
১১) শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে এমনভাবে পাঠদান করবেন যাতে শিক্ষার্থীরা আকৃষ্ট হয়।
১২) শিক্ষক এমন হবেন যে, তার চারিত্রিক প্রভাবে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে।
১৩) শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সজামতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করবেন যাতে শিক্ষার্থীরা গণতন্ত্রের অনুশীলন করতে পারে।
১৪) শিক্ষক কৌশলী হবেন। শিক্ষকতার সমস্ত কৌশল তার আয়ত্বে থাকবে।
১৫) শিক্ষার্থীকে স্বাধীন, স্বনির্ভর ও চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে সচেষ্ট হবেন।
১৬) শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ অনুকূল রাখার চেষ্টা করবেন।
ভাববাদী শিক্ষাদর্শন অনুযায়ী শিক্ষার্থীর বৈশিষ্ট্যঃ
১) শিক্ষার্থী হবে আত্মসক্রিয়, যাতে সে আত্মোপলদ্ধি করতে পারে।
২) আত্মজ্ঞান লাভের জন্য শিক্ষার্থীরা কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলবে।
৩) শিক্ষার্থী হবে সংযত ও শ্রদ্ধাবান।
৪) শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে। অধ্যয়নই হবে তার একমাত্র তপস্যা।
৫) শিক্ষার্থীরা আদর্শবান শিক্ষকের জীবন অনুসরণ করবে।
৬) শিক্ষার্থীর মধ্যে পরমসত্তা অবিকশিত ভাবে রয়েছে।
৭) শিক্ষার্থীর মধ্যে নতুন আদর্শ সৃষ্টি করা যায় না, শিক্ষার্থীদের মধ্যে জন্ম থেকেই তা বিদ্যমান।
8) শিক্ষার্থীরা পরমসত্তারই অংশ।
৯) শিক্ষার্থীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধ থাকবে।
৭১
১৪৫ মন্তব্য