সহকারী শিক্ষক
২৫ মে, ২০২৩ ০৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
'রত্নগর্ভা মা' - অত্যন্ত আপত্তিকর ও বৈষম্যমূলক শব্দবন্ধ। 'রত্নগর্ভা' বলতে? যে সব মায়ের সন্তানেরা জীবনে উচ্চমেধায়, উচ্চপেশায়, উচ্চবিত্তে, উচ্চ সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত তারা রত্নগর্ভা মা। আমাদের রামকৃষ্ণ মিশনে দেখতাম ফার্সটবয়ের মা'কে রত্নগর্ভা বলতেন শিক্ষকরা। পরে দেখলাম মেধা ও উপার্জনের দিক থেকে এগিয়ে যারা, বা স্বীয় প্রতিভার স্বাক্ষরে প্রথিতযশা ও খ্যাতিমান যারা, তাদের মায়েরা রত্নগর্ভা। পুরস্কার মঞ্চে কতবার দেখেছি সঞ্চালক মহাশয় পুরস্কার প্রাপকের মা'কে রত্নগর্ভা বলে সম্বোধিত করছেন।
তাহলে আমাদের মত কোটি কোটি গড়পরতা সাধারণ মানুষ, যারা রোজ ভীড় ট্রেনে বাসে চড়ে কর্মক্ষেত্রে যাই, রোদে পুড়ে ঘামে ভিজে রাস্তাঘাটে কাজ করি, যারা ছোটখাটো পেশায় নিযুক্ত, কেউ ইস্কুলে পড়ায়, কেউ মাঠে ফসল ফলায়, কেউ অটো রিক্সা চালায়, কেউ দোকানদারি করে, কেউ ফুটপাতে পসরা নিয়ে বসে, কেউ সংসার চালাতে উদয়াস্ত হকারি করে, কেউ ওকালতি করে, কেউ গৃহশিক্ষকতা করে, কেউ সেলসম্যান, কেউ দশ পাঁচটা অফিস করে... মুচি মেথর মুটে মজুর শ্রমিক কৃষক সকার বেকার ইত্যাদিদের মায়েরা কি আবর্জনা গর্ভে ধরেছেন? না কয়লা গর্ভে ধরেছেন?
'রত্নগর্ভা' কথাটা আমিও মুখ ফসকে বলে ফেলি কারুর প্রশংসা করতে গিয়ে। উচিৎ নয়। সন্তানের তথাকথিত সামাজিক সাফল্য বিচার করে তার মায়ের জরায়ুকে রত্নের ভান্ডার ঘোষণা করে প্রকারান্তরে অন্য মায়েদের জরায়ুকে খাটো করা মানে 'মাতৃত্ব' বিষয়টিকেই অপমান করা।
'সাফল্য'র সংজ্ঞা ও অর্থ একেকজনের কাছে একেকরকম। সাফল্যের পেছনে কাজ করে অসংখ্য ফ্যাক্টর। সবাই সমান মেধা, প্রতিভা, বিত্ত, বংশমর্যাদা নিয়ে জন্মায় না। সবাই সমান সুযোগ পায় না। সবার জীবনের চলার রাস্তাও সমান না। আর সবচেয়ে বড় কথা জীবনের সবকিছুই তো আনপ্রেডিক্টেবল্। আজ উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত যে ছেলেটির মা রত্নগর্ভা বলে সমাজে স্বীকৃতা, কাল সেই ছেলেটিই যখন কোনো প্রতারণা বা জালিয়াতি করে ধরা পড়ে যাবে, তার মা'ও রত্নগর্ভা পদমর্যাদা থেকে ডিমোশন পেয়ে 'চোরের মায়ের বড় গলা' হয়ে যাবেন। সমাজই তার মাতৃত্বে কলঙ্ক লাগিয়ে দেবে।
মা' আসলে মা'। মহাপুরুষ সন্ন্যাসীর মা'ও মা, চোরের মা'ও মা, ক্রিমিনালের মা'ও মা। প্রতিবন্ধী বা বিশেষভাবে সক্ষম মানুষগুলোকে জন্ম দেওয়া মায়েরাও তো মা। মা হওয়ার ভীষণ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে সন্তানের জন্ম দিতে না পারা নারীরাও মা।
আমার মাল্টিট্যালেন্টেড ব্রিলিয়ান্ট উচ্চোপার্জনশীল এক সহপাঠী তার অসুস্থ বিধবা মা'কে মফস্বলের হানাবাড়িতে একা ফেলে রেখে সস্ত্রীক প্রবাস জীবন যাপন করেন। তার মা' রত্নগর্ভা বলেই পরিচিতা। ভাগ্যিস এমন 'রত্ন' হওয়ার প্রতিভা বা যোগ্যতা পরম করুণাময় ঈশ্বর আমাকে দেননি! পরজন্মেও যেন না দেন এই প্রার্থনাই করি আন্তরিকভাবে।
আমাদের মত গড়পরতা প্রতিটি অতি সাধারণ সন্তানের জীবনেও মায়ের যে কতখানি ত্যাগ, কি তিতিক্ষা, কি অনিঃশেষ যাতনা, কি অমানুষিক পরিশ্রম আর অপরিসীম অবদান থাকে তা কখনোই লিখে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়!! সমাজের চোখে রত্ন না হলেও, মায়ের কাছে তো তার সন্তানই শ্রেষ্ঠ রত্ন! মহামূল্যবান রত্নটিকে তিনি তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত জীবনের সবটুকু দিয়ে পরম যত্নে আগলে রাখতে চান। সব জরায়ুই রত্নগর্ভ, সকল মা-ই রত্নগর্ভা!
লিখেছেন: সায়ন্তন মিত্র, নিউ ব্যারাকপুর!
৫৩
৯১ মন্তব্য