সহকারী শিক্ষক
২৬ মে, ২০২৩ ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
জাতীয় ফুল : শাপলা
গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে, অসংখ্য খাল-বিল ও হাওড়-বাঁওড়ে ; বর্ষা ও শরতে আপনা-আপনি ফুটে থাকা, আলোকবিচ্ছুরিত নক্ষত্রের মতো অনুপম সৌন্দর্যময়- শাপলা ফুলের দৃষ্টিনন্দন উপস্থিতি আমাদের বিমোহিত করে নিঃসন্দেহে।
শাপলাকে ইংরেজিতে Water Lily, White Water Lily, White Lotus বলা হয় আর বাংলায় নীল শাপলা ফুলকে শালুক, শুঁধি বা নীলকমল এবং লাল শাপলা ফুলকে রক্তকমল বলা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea nouchali. প্রাচীনকালে গ্রীকরা এই ফুল জলদেবীকে উৎসর্গ করতো। সেই দেবীর নাম ছিলো Nymph. সেখান থেকেই শাপলার বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea হয়েছে।
শাপলা ফুল অনেক জাতের এবং অনেক রঙের হয়। যেমন : সাদা শাপলা ফুলের অনেকগুলো জাত আছে। সাদা শাপলা ফুল বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। এই ফুল সাধারণত ভারত উপমহাদেশে দেখা যায়। এই উদ্ভিদ প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সাদা শাপলা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ইয়েমেন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার, পাপুয়া নিউগিনি এবং অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের পুকুর ও হ্রদে দেখা যায়। বিশ্বে এই উদ্ভিদের প্রায় ৩৫টি প্রজাতি পাওয়া গেছে।
শাপলা ফুল সরাসরি কাণ্ড ও মূলের সাথে যুক্ত থাকে। শাপলার পাতা আর ফুলের কাণ্ড বা পুষ্পদণ্ড পানির নিচে মূলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। আর এই মূল যুক্ত থাকে মাটির সঙ্গে এবং পাতা পানির ওপর ভেসে থাকে। মূল থেকেই নতুন পাতার জন্ম নেয়। পাতাগুলো গোল এবং সবুজ রঙের হয়। কিন্তু নিচের দিকে কালো রঙ। ভাসমান পাতাগুলোর চারদিক ধারালো হয়। পাতার সাইজ ২০ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার এবং এদের ব্যাপ্তি প্রায় ০.৯ থেকে ১.৮ মিটার। এই ফুলে ৪ থেকে ৫টি বৃতি ও ১৩ থেকে ১৫টি পাপড়ি থাকে। যদিও বছরের প্রায় সব সময় ফুল ফুটতে দেখা যায়; বর্ষা ও শরৎ এই ফুল ফোঁটার শ্রেষ্ঠ সময়। ফুল ফোটে রাতের স্নিগ্ধতায় আর দিনের আলোতে আস্তে আস্তে বুঁজে যায়। ফুলগুলো দেখতে তারার মতো মনে হয়। ফুলের স্থায়িত্ব এক নাগাড়ে সাতদিন পর্যন্ত। শ্রীলংকার জাতীয় ফুলও শাপলা, তবে তা নীল শাপলার প্রজাতি (বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea stellata). প্রাচীন শ্রীলংকান ভাষার সাহিত্যে ‘কুভালয়া’, ‘ইন্ধিয়ারা’, নীলুপ্পালা, নীলথপালা, নীলুফুল নামে এর উল্লেখ পাওয়া গেছে যা শ্রেষ্ঠত্ব, শৃঙ্খলা ও পবিত্রতার প্রতীক। শ্রীলংকান বুদ্ধদের দৃঢ়বিশ্বাস গৌতম বুদ্ধের পায়ের ছাপে পাওয়া ১০৮টি শুভ চিহ্নের মাঝে একটি ছিল এই শাপলা ফুল। কথিত আছে ভারতে হিন্দুদের সর্প দেবী মণসার পূজায় শাপলা ফুল দেয়া হয়।
খ্রীষ্টপূর্ব ২৫০০ বছর আগের মিশরের এক ধ্বংসাবশেষে শাপলা ফুলের একটি আঁকা ছবি পাওয়া গেছে। প্রাচীন যুগে মিশরে শাপলা ফুল চাষ হতো।প্রাচীন মিশরীয়রা শাপলা ফুলের প্রতি অনুরাগী ছিল। মানুষ এই ফুল খেত, আঁকত এবং শ্রদ্ধা করত।
শাপলার কাণ্ড বা ডাঁটা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। শাপলা ভাজি করে, নিরামিশের মতো ঝোল করে, সরিষা বাটা দিয়ে রান্না করে খেতে বেশ সুস্বাদু। পূর্ণ বিকশিত শাপলা ফুলের গর্ভাশয়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বীজ থাকে। আঠালো এ বীজ গ্রামীণ কিশোর-কিশোরীদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য স্মৃতি। এই বীজ ভেজে একধরনের খাবার খৈ তৈরি হয় যার নাম ‘ঢ্যাপের খৈ’। উদ্ভিদটির গোড়ায় থাকে আলুর মতো এক ধরনের কন্দ যার নাম শালুক, অনেকে এটি সবজি হিসেবে খেয়ে থাকে। ভারতে আম্বাল নামের আয়ুর্বেদিক ওষুধ বানাতে শাপলাকে ওষধি গাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ঔষধ অপরিপাকজনিত রোগের পথ্য হিসেবে কাজ করে। তাছাড়া গ্রাম-গজ্ঞে এটা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের কয়েন, টাকা, দলিলপত্র ইত্যাদিতে জাতীয় ফুল শাপলার ছবি বা জলছাপ থাকে। নগরায়ন ও অতি আহরণের কারনে শাপলার বিস্তৃতি ক্রমশঃ সীমিত হয়ে আসছে।
৫৩
৯১ মন্তব্য