সহকারী শিক্ষক
২৬ মে, ২০২৩ ০১:২৯ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
আমাদের সবারই একটা কমন সমস্যা হল যা পড়ি বা শিখি তা খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যায়। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যে বলে এতো পরিশ্রম করি এতো পড়ি তারপর ও মনে থাকেনা। এই নিয়ে অনেকেই খুব টেনশনে থাকে। পড়া মনে না থাকলে দেখা যায় পড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। আর পড়তে ইচ্ছা হয়না। আসলে আমরা পড়া মুখস্থ করতে চাই কিন্তু সঠিক নিয়ম জানিনা। যার ফলে দেখা যায় পড়ার কিছুক্ষণ পরেই আবার তা ভুলে যায়। তাই আমাদের সঠিক কৌশল আগে জানতে হবে এবং ঐ ভাবে পড়া মুখস্থ করলে দ্রুত মুখস্থ করা যাবে এবং পড়া মনে ও থাকবে।
তাই আজকে আমরা পড়া মুখস্থ করা ও পড়া মনে রাখার সহজ উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো। যাতে আমরা সবাই এই আর্টিক্যাল পড়ে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারি।
আমাদের স্বৃতিশক্তি থাকে হলো আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরে। আমাদের মস্তিষ্কের দিক রয়েছে দুটি । একটি সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম, অন্যটি পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের মধ্যে আবার অনেক গুলো ভাগ রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে নানা রকম কাজ। তার একটি হলো মেমোরি বা স্মৃতিশক্তি। পৃথিবীতে যারা জন্মগ্রহন করেছে তাদের কেউই বেশি আইকিউ / স্মৃতিশক্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না।তবে কিছু ব্যাক্তি আছে যাদের কে আল্লাহ প্রদত্ত এমন জ্ঞান দিছেন যে একবার পড়লে সারাজীবন আর পড়তে হয়না।
এটা ব্যতিক্রম। তবে যাদের আইকিউ বেশি তাদের ব্যবহারিক দৈনন্দিন আচরণের ওপর নির্ভর করে তাদের বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ। যত শ্রম বা চর্চা করা যাবে, আইকিউ ততই বাড়বে। সাধারণত মানুষের আইকিউ ৯০ থেকে ১১০। তবে কারো কারো আইকিউ ১১০-এর ওপরে হতে পারে।চর্চা যত বেশি হবে তাদের আইকিউ ও তত বাড়বে।
পৃথিবীতে হাজার হাজার এমন ব্যক্তি রযেছে যাদের আইকিউ ১১০+ এর উপরে। এ আইকিউ বৃদ্ধির জন্য চর্চাই হল একমাত্র মাধ্যম । চর্চা আর পরিশ্রম এর মাধ্যমেই একজন দূর্বল স্মৃতিশক্তি ছাত্র সাধারন থেকে মেধাবী হয়ে উঠতে পারে। মনে রাখতে না পারার এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে।
আত্মবিশ্বাসই হল সফলতার প্রথম ধাপ।: যেকোনো কাজে সফল হওয়ার প্রধান ও প্রথম শর্ত হলো আত্মবিশ্বাস।
যে কোন কিছু শিখতে বা অর্জন করতে ওই বিষয়ের প্রতি আত্নবিশ্বাস থাকতে হবে যে আমিই পারবো। আমার ধারা ও সম্ভব। পড়াশোনা কে কঠিন মনে করা যাবেনা। নিজের মনকে বুঝাতে হবে যে সবাই পাড়ে আমাকে ও পাড়তে হবে। কঠিন পড়া গুলো কে সহজ করে পড়তে হবে নিজের মত করে। তাহলেই মনে থাকবে।
কোন বিষয় মুখস্থ করার জন্য আগে বিষয় টি ভাল করে বুঝতে হবে তারপর কয়েকবার দেখেদেখে পড়তে হবে। নিজের মাথায় ঢুকাতে হবে যে মূল বিষয়টি কি। তাহলে খুব সহজেই পড়া মনে থাকবে।
লেখাপড়ার জন্য কোন সময় সেট করতে হবে। যে, কোন সময় পড়লে তার মনে থাকে বেশি। একেকজনের কাছে একেক রকম। কেউ সারাদিন না পড়ে রাত জেগে পড়াশোনা করে,আবার সকালে পড়লে মনে থাকে। আপনাকে বেচে নিতে হবে যে কোন সময় আপনার পড়তে ভাল লাগে পড়া মনে থাকে।
তবে পড়া মনে রাখার জন্য সব থেকে উত্তম সময় হচ্ছে সকাল বেলা। ঘুমের পর সকাল বেলা মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সচল থাকে তখন আজে বাজে চিন্তা মাথায় থাকেনা। মন এবং মস্তিষ্ক একদম ফ্রেশ থাকে। তাই ওই সময় অল্প পড়েই মনা রাখা যায়।
মনে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল যে কোন কিছু পড়ার সময় বিষয়টি মন দিয়ে দেখে খেয়াল করে পড়তে হবে। আমাদের মস্তিষ্ক সবথেকে সহজে মনে রাখতে পারে চোখে দেখা বিষয় গুলো। কেননা যে কোন কিছু জিজ্ঞাস করা হলে সর্ব প্রথম ওই জিনিসের প্রতিচ্ছবি আমাদের চোখে ভাসে, ফলে সহজে বলা যায়।
যে কোন কিছু মনে রাখতে হলে ওই বিষয় টা কয়েকটি অংশে ভাগ করে ছোট করে নিবো এভাবে পড়া বেশ উপকারী। যেমন ৭৮৬৯৩০-কে এভাবে একসাথে মনে রাখা যতটা সহজ মনে হবে তার চাইতে ৭৮৬ও ৯৩০ এই দুই ভাগে ভাগ করে সংখ্যাটা মনে রাখা বেশি সহজ।
আমরা বইয়ের অনেক বড় বড় সংজ্ঞা রয়েছে যা আমাদের পড়তে ভয় হয়, সহজে মনে থাকে না । কিন্তু বড় সংজ্ঞাকে যদি নিজের মত করে কয়েকভাগে ভাগ করে নেই তাহলে দেখবেন পড়লেই তা সহজেই মনে থাকছে।
পড়ার সময় যখন নতুন কোন বিষয় আসবে তখন এই বিষয়ের সাথে সাদৃশ্য এমন বিষয় আগে পড়ে থাকলে, তার সাথে তুলনা করে পড়তে হবে। আমাদের মস্তিষ্ক কোন একটা বিষয় নতুন পেলে সে তা পুরনো কোন বিষয়ের সাথে তুলনা করা শুরু করে। পুরনো বিষয় এর সাথে মিলে গেলে তা খুব দ্রুত পূর্বের বিষয়ের সাথে মিলিয়ে নেয়। যা সহজে বিষয় টা মনে থাকে।
পড়া গুলো দ্রুত শিখার এবং মনে রাখার সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো পড়ার পাশাপাশি লিখা। অর্থাৎ পড়া সময় লিখে লিখে পড়া। পড়বেন আর লিখবেন। লিখে লিখে পড়লে আমাদের মস্তিষ্ক ওই বিষয় কে স্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করে।তা ছাড়া মানুষ যে কোন কিছু লিখার সময় তার মনযোগ বেশি থাকে। এটা দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি তৈরীতে সাহায্য করে।
পড়ালেখার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে।সারাদিন কাজ কাম, পড়াশুনার কারনে আমাদের মস্তিষ্ক দূর্বল হয়ে যায়। তাই ঘুমালে আমাদের মস্তিষ্কের দূর্বলতা কাটে। আমাদের মস্তিষ্ক দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি তৈরীর কাজটা করে ঘুমের মধ্যে । গবেষণায় দেখা গেছে, সারা দিনের কাজ ও ঘটনাগুলো ঘুমের সময়েই আমাদের মস্তিষ্কে রূপান্তরিত হয়।
আমাদের মস্তিষ্কে পড়া গুলো চিরস্থায়ী করে রাখার জন্য পড়া গুলো বার বার পড়তে হবে। পড়া গুলো যত বেশি রিপিট হবে ততবেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে।একটা বিষয় দুদিন পর পর রিভিশন দিতে হবে।তাহলে একসময় দেখা যাবে তা না পড়লে ও মনে থাকবে।
পড়ার সময় একটু আওয়াজে পড়ুন। এতটুকু জোরে পড়ুন যে আপনার পড়া আপনার কান যেন শুনতে পায়। জোরে পড়লে মাথায় ওই বিষয়টা দ্রুত ঢুকে যায়।
পড়ার সময় এটা টার্গেট নিয়ে পড়তে বসুন। যে কোন বই পড়ার পূর্বে একটা টার্গেট সেট করতে হবে। যে বইয়ের কত পাতা বা পৃষ্ঠা পর্যন্ত বা কোন টপিক কত সময়ের মধ্যে শেষ করবেন তা ঠিক করে নিন।
কখনো শুধু সময়ের টর্গেট করে পড়বেন না। তখন দেখা যাবে সময় শেষ হয়ে যাবে কিন্তু পড়া শিখা বাকি থাকবে। তাই বইয়ের পাতা বা টপিক টার্গেট নিয়ে পড়ুন। যে আমাকে বই এই টপিক টা শেষ করতে হবে যতক্ষণ লাগোক টপিক শেষ না করে পড়া থেকে উঠবোনা। তাহলে দেখবেন পড়া গুলো তাড়াতাড়ি শেষ হবে।
আপনি যখন একটি পড়া শেষ করেন তখন সেই পড়াটা আপনি নিজেই ধরুন। যে আপনার শিখা পড়াটা কত টুকু হয়েছে, কি কি পড়লেন আর কি শিখলেন, কি মুখস্থ করলেন তা নিজে নিজে যাচাই করুন। নিজের পরিক্ষা নিজে নিন এবং নিজে যাচাই করুন।
যে কোন পড়া মনে রাখার জন্য একটা ভালো কৌশল হলো ‘কনসেপ্ট চার্ট । যে কোন একটা অধ্যায় পড়ার আগে পড়ার মেইন বিষয়/টপিক গুলোর একটা চার্ট তৈরি করুন। প্রতিদিন একবার করে চোখ বোলালেই এই অধ্যায়টি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যাবে। পড়া মনে রাখার এটি একটি পরীক্ষিত বৈজ্ঞানিক ধারণা।
বিষয়টি ভালভাবে বুঝার জন্য একট গল্প বলছি।
অনেকদিন আগে আমাদের দেশে কোনো এক গ্রামে মফিজ নামে এক লোক ছিল। তার স্ত্রীর নাম — আসুবিনি আর ছেলের নাম — আব্দুল কদানুন। একদিন আসুবিনি অঘারামের সাথে ঝগরা করে তার বাপের বাড়ি চলে যায় । এদিকে মায়ের শোকে ছেলে দিন দিন অসহায় হয়ে পড়ছে । তাই অঘারাম আসুবিনিকে ফিরিয়ে আনার জন্য চিটি লিখল । তবে সে খুব একটা শিক্ষিত ছিলনা বলে তার চিঠির ভাষা ছিল এই রকম—
প্রিয় আসুবিনি,
অজ কুপাতি ভরসা অনা আড় আবঃ কদ-আন-ঊন অসহা ।
ইতি,
মফিজ।
মানে হল— আজ কুপতি (খারাপ পতি/স্বামী) ভরসাহীন (মা ছাড়া ছেলেকে নিয়ে কোনো ভরসা খুঁজে পাচ্আছেনা) আর/এবং আব্দুল কদানুন অসহায় ।
চিঠিটা মনযোগ দিয়ে কয়েকবার রিভিশন দেন তো । তারপর দেখুন কত সহজে গড়গড় করে ২১ টি খাটিঁ বাংলা উপসর্গ — আ, সু, বি, নি, অজ, কু, পাতি, ভর, সা, অনা, আড়, আব, কদ, আন, ঊন, অ, স, হা, ইতি, অঘা, রাম চোখ বন্ধ করে বলে ফেলা যায় । ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ্রম ঘাম দিয়ে যে পাঠ মস্তিষ্ককে আটকাতে পারলেননা; তা অল্প সময়েই শিখে গেলেন কত সহজে।
এমনিভাবে ত্রিকোণমিতির সূত্র মনে রাখতে ‘সাগরে লবণ আছে, কবরে ভূত আছে, ট্যারা লম্বা ভূত’ ছড়াটি মনে রাখা যেতে পারে। এর অর্থ দাঁড়ায়, সাইন=লম্ব/অতিভুজ (সাগরে লবণ আছে), কস=ভূমি/অতিভুজ (কবরে ভূত আছে), ট্যান=লম্ব/ভূমি (ট্যারা লম্বা ভূত)।
ঠিক এটাই বুঝাতে চেয়েছিলাম এতক্ষণে ।পড়া গুলো মনে রাখার জন্য কোন ছন্দ বা টেকনিক অবলম্বন করুন। পড়া গুলো কে কোন ছন্দ বা গল্প আকারে পড়ুন। দেখবেন খুব সহজেই মনে থাকবে।
যে বিষয় টা পড়বেন সেই সম্পর্কিত কোন ছবি থাকলে সেটা কল্পনায় আঁকুন। এটা বেশি কাজে লাগে জীববিজ্ঞান বইয়ের জন্য ।
একটা প্রানী কোন পর্বের কোন শ্রেনীর ওই সম্পর্কিত একটা ছবি আপনি মনে রাখলে দেখা যাবে ওই ছবি অনুযায়ী আপনি ওই পর্বের সকল প্রানীর বর্ণনা দিতে পারবেন। তা ছাড়া আপনি যে গল্প বা টপিক পড়বেন তা আশেপাশের মানুষ, বস্তু এবং পরিবেশের সাথে মিলিয়ে নিবেন। যখনি এই টপিক পড়বেন তখনি আশে পাশের মানুষ বা বস্তুর ছবি কল্পনায় চলে আসবে তখন খুব সহজেই মনে থাকবে।
যে কোন টপিক পড়ার সময় সেটা বিনোদন বা আনন্দের সহিত পড়ুন। পড়া গুলো কে কখনো নিজের উপর চাপ মনে করবেন না বা বুঝা ভাব বেন না। তাহলে যতই পড়ুন মনে থাকবেনা। তাই পড়া কে আনন্দের সহিত পড়ুন দেখবেন খুব দ্রুত পড়া শিখতে পারবেন।
আমাদের একটা মারাত্মক সমস্যা হলো আমরা কোন বিষয় না বুঝেই সেটা মুখস্থ করার চেষ্টা করি। যার ফলে দুদিন পরে ভুলে গেলে সেই বিষয়ে আমাদের আর কোন ধারণাই থাকে না।
মুখস্থ বিদ্যা চিন্তাশক্তিকে অকেজো করে দেয়, সৃজনশীলতা তৈরিতে বাধা দেয় এমনকি পড়াশোনার আনন্দও মাটি করে দেয়। যে কোনো কিছু মুখস্থ করতে হলে ঐ বিষয় টা আগে ভালভাবে বুঝতে হবে। না বুঝে মুখস্থ করলে সেটা বেশিদিন মনে থাকে না। ভাল করে বুঝে পড়লে মুখস্থ করতে হয়না, এমনিতেই মনে থাকে।
মনে করুন, পরিক্ষার হলে লিখার সময় যদি মুখস্থ করা বিষয় ভুলে যায় তখন মনে করতে সময় চলে যায়। মুখস্থের বিষয়টি না বুঝার কারনে ভুলে গেলে ও নিজের থেকে বানিয়ে লিখা যায়না। বুঝে পড়লে ভুলে গেলে ও নিজের থেকে বানিয়ে লিখা যায়। এতে দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বৃদ্ধি ঘটে।
তাই কোন টপিক পড়ার সময় আগে বুঝতে হবে বিষয়টি তারপর মুখস্থ করুন।
পড়াশোনা দৈনন্দিন জীবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জীবনকে সুন্দর ভাবে পরিচালিত করার জন্য পড়াশোনা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু আমরা পড়াশোনা ভালভাবে করতে পারি না। অনেকেই হতাশ হয়ে যায় কারণ, মুখস্থ করতে পারিনা এবং যা কিছুই পড়ি দ্রুত ভুলে যায়।
তাই সবার জন্য পরিক্ষিত কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছি যা মেনে চললে দ্রুত পড়া মুখস্থ করা যায় এবং পড়া মনে থাকবে।
৭১
১৪৫ মন্তব্য