Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ মে, ২০২৩ ০২:০৩ অপরাহ্ণ

মাকামে ইবরাহীম- مَـقَـام إِبْـرَاهِـيْـم‎‎ অর্থ: ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দাঁড়ানোর স্থান। এটি একটি জান্নাতের অতি মূল্যবান পাথর।

মাকামে ইবরাহীম’ সম্পর্কে জরুরি ১০টি তথ্য


নিম্নে কা’বা ঘর সংলগ্ন অবস্থিত মাকামে ইবরাহীম সম্পর্কে সংক্ষেপে দলিল ভিত্তিক ১০টি জরুরি তথ্য তুলে ধরা হল:

১. মাকামে ইবরাহীম- مَـقَـام إِبْـرَاهِـيْـم‎‎ অর্থ: ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দাঁড়ানোর স্থান।

এটি একটি জান্নাতের অতি মূল্যবান ইয়াকুত পাথর। যেমন হাদিসে এসেছে:

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আমি বলতে শুনেছি: 

“হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম জান্নাতের দুটো ইয়াকুত পাথর। আল্লাহ তা'আলা এই দুটির আলোকপ্রভা নিষ্প্রভ করে দিয়েছেন। এ দুটির প্রভা যদি তিনি নিষ্প্রভ না করতেন তাহলে তা পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে যা কিছু আছে সব আলোকিত করে দিত।"

(তিরমিযী, অধ্যায়: হজ্জ, অনুচ্ছেদ: হাজরে আসওয়াদ, রোকন ও মাকামে ইবরাহীমের ফযিলত। শাইখ আলবানী বলেন: সহিহ তিরমিযী হা/৮৭৮। এ ছাড়াও এটি সহিহ ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান ও হাকিমে বর্ণিত হয়েছে। )


২. এ পাথরটি আল্লাহ তাআলার অন্যতম নিদর্শন:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

”সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সমগ্র জগতের মানুষের জন্য বরকতময় ও পথ নির্দেশ (হেদায়েত)। এতে রয়েছে মকামে ইব্রাহীমের মত প্রকৃষ্ট নিদর্শন।” (সূরা আলে ইমরান: ৯৬ ও ৯৭)

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন:

“মাকামে ইবরাহীম দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যে পাথরে তাঁর পদযুগলের চিহ্ন রয়েছে।”


৩. আল্লাহ তাআলা কুরআনে দু স্থানে মাকামে ইবরাহীম এর কথা উল্লেখ করেছেন। যথা: সূরা বাকারা ১২৫ ও সূরা আলে ইমরান এর ৯৭ নং আয়াত।


৪. ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এই পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কাবা ঘর নির্মাণ করেছেন। তার পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম পাথর সংগ্রহ করে এনে এগিয়ে দিতেন। আর তিনি এই পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কাবা ঘরের দেয়াল নির্মাণ করতেন। 

যেমন সহিহ বুখারীর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:

“অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন, হে ইসমাইল! আল্লাহ আমাকে একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। 

ইসমাইল (আঃ) বললেন: আপনার রব! আপনাকে যা আদেশ করেছেন, তা করুন। 

ইবরাহীম আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তুমি আমাকে সাহায্য করবে কি? 

ইসমাইল (আঃ) বললেন: আমি আপনাকে সাহায্য করব। 

ইবরাহীম (আঃ) বললেন: আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন। 

এই বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইশারা করলেন যে, এর চারপাশে ঘেরাও দিয়ে। তখনি তাঁরা উভয়ে কা‘বা ঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাইল (আঃ) পাথর আনতেন, আর ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করতেন। 

পরিশেষে যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাইল (আঃ) (মাকামে ইবরাহীম নামে খ্যাত) পাথরটি আনলেন এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্য তা যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম (আঃ) তার উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাইল (আঃ) তাঁকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তখন তারা উভয়ে এ দু‘আ করতে থাকলেন, হে আমাদের রব! আমাদের থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন।

তাঁরা উভয়ে আবার কা‘বা ঘর তৈরি করতে থাকেন এবং কা‘বা ঘরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে এ দু‘আ করতে থাকেন: ‘‘হে আমাদের রব! আমাদের থেকে কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন।’’ (আল-বাকারাহঃ ১২৭) 

[সহীহ বুখারী ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, আধুনিক প্রকাশনী: ৩১১৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন: ৩১২২]


 ৫. আল্লাহ তাআলা হজ্জ ও উমরাকারীদের কে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে সালাত আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেছেন:

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা এলেন সাতবার বায়তুল্লাহর তওয়াফ করলেন। তখন তাঁকে আমি পাঠ করতে শুনেছি: 

 “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ কর” (সূরা বাকারা: ১২৫)।

তারপর তিনি মাকামের পেছনে সালাত আদায় করলেন।”

(তিরমিযী, অধ্যায়ঃ ৫০/ কুরআন তাফসীর, অনুচ্ছেদ: সূরা বাকারা, হাদিস নং ২৯৬৭-হাসান সহীহ। এছাড়াও বর্ণিত হয়েছে: ইবনে মাজাহ ২৯৬০, বুখারি ও মুসলিম, তিরমিযী, হাদিস নম্বর/২৯৬৭ [আল মাদানী প্রকাশনী]


৬. এই পাথরের উপরে যে দুটি পদচিহ্নের মত গর্ত আছে, সেগুলো ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর পদচিহ্ন কি?

উক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ইবনে জারীর কাতাদা রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

“আল্লাহ তাআলা এ পাথরের নিকটে লোকদেরকে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন; হাত দ্বারা মাসেহ করতে বলেন নি। কিন্তু এই উম্মত নিজেদের উপর এমন কিছু কাজ চাপিয়ে নিয়েছে যা পূর্ববর্তী উম্মতগণ করেন নি। 

যাহোক, যারা উক্ত পাথরের উপর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর পায়ের গোড়ালি ও আঙ্গুলের চিহ্ন দেখেছে তারা আমাদের কাছে বিবরণ দিয়েছে। কিন্তু উম্মতের লোকেরা আলোক প্রভা তা হাত দ্বারা স্পর্শ করতে করতে শেষ অবধি সেই চিহ্ন মুছে গিয়েছে।” (তাফসিরে ইবনে কাসির, ১/১১৭)

আল্লামা উসমাইমীন রহ. বলেন, 

“মাকামে ইবরাহিম সু প্রমাণিত-এতে কোনও সন্দেহ নাই। এই যে কাঁচে ঘেরা স্থাপনাটি সেটি মাকামে ইবরাহীম। কিন্তু তার মধ্যে যে গর্তটি রয়েছে তা দেখে মনে হয় না যে, এটি ইবরাহীম আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পদযুগলের চিহ্ন। কেননা এটি ঐতিহাসিকভাবে স্বতঃসিদ্ধ যে, দীর্ঘ কালপরিক্রমায় পদচিহ্ন মুছে গেছে এবং এটি সেখানে গর্ত করা হয়েছে বা কেবল চিহ্নিত করার জন্য বসানো হয়েছে। নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে, এ গর্তটিই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর পা রাখার স্থান।


৭) এই পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে ইবরাহীম আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জের ঘোষণা দিয়েছিলেন: 

যেমন ফাকেহী ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন:

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কাবা গৃহ নির্মাণ কাজ শেষ করলে আল্লাহ তাকে হজ্জের ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিলেন। অত:পর তিনি মাকামে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন:

“হে লোকেরা, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য একটি ঘর নির্মান করেছেন। অত:এব তোমরা তাতে হজ্জ করো।

তখন পুরুষদের পৃষ্ঠদেশ ও নারীদের গর্ভাশয় থেকে মানুষ তার জবাব দিয়ে বলল, আমরা সাড়া দিলাম..আমরা সাড়া দিলাম। আল্লাহুম্মা লাব্বাইক-হে আল্লাহ তোমার দরবারে উপস্থিত।

তিনি বলেন:

সুতরাং বর্তমানে যত মানুষ হজ্জ করে তারা ঐ সকল লোক যারা সেদিন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর ডাকে সাড়া দিয়েছিলো।”

(ইবনে হাজার রাহ. এর সনদকে সহিহ বলেছেন।)


৮. পাথরটি ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর যুগ, তারপরে জাহেলী যুগ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ এবং সর্বশেষ আবু বকর রা. এর যুগে কা’ব ঘরের সাথে সাথে লাগানো অবস্থায় ছিলো। পরবর্তীতে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. একটিকে কাবা থেকে কিছুটা দূরে স্থাপন করেন। 

ইমাম বয়হাকী সহিহ সনদে আয়েশা রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: 

মাকামটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রা. এর যুগে কাবা ঘরের সাথে লাগানো ছিল। অত:পর উমর রা. সেটিকে পেছনে নিয়ে আসেন।”

এর উদ্দেশ্য ছিল, যেহেতু মাকামে ইবরাহীমের পেছনে সালাত আদায়ের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে সেহেতু সেটিকে এমন স্থানে স্থানান্তরিত করা প্রয়োজন যেন, লোকজন সুবিধাজনকভাবে সালাত আদায় করতে পারে এবং তওয়াফ কারীগণও বাধাগ্রস্ত না হয়।

ইবনে হাজার আসকালানী বহ. বলেন, উমর রা. এর কাজে কোনও সাহাবী প্রতিবাদ করেন নি। সুতরাং এটি সাহাবীদের ইজমা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে পরিগণিত হবে।


৯. বর্তমান অবস্থান: 

বায়তুল্লাহ থেকে ১০ বা ১১ মিটার পূর্ব দিকে সাফা-মারওয়া অভিমুখে অবস্থিত।


১০) পাথরটির ধরণ-প্রকৃতি: 

এটি নরম প্রকৃতির পাথর; কঠিন চকচকি শিলা খণ্ড নয়। এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা প্রায় পঞ্চাশ সেন্টিমিটার। প্রায় চৌকোণ বিশিষ্ট। পাথরটি পূর্বে উন্মুক্ত ছিল-যে কেউ হাত দ্বারা স্পর্শ করতে পারত কিন্তু পরবর্তীতে তা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত সুদর্শন ও মজবুত লোহা ও কাঁচের বেষ্টনীর ভেতর একটি ক্রিস্টালের বাক্সে রাখা হয়েছেে।

আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন। 



মন্তব্য করুন