সহকারী শিক্ষক
০৫ জুন, ২০২৩ ১০:১০ পূর্বাহ্ণ
লড়াই আর আগুনের আরেক নাম ইলা মিত্র
গ্রেফতার হয়েছিলেন পাকিস্থানের পুলিশের হাতে,এরপর অকথ্য নির্যাতন, বুটের আঘাত, নগ্ন করে প্রহার, খেতে না দেওয়া, কিছু বাদ রাখা হয়নি৷ যখন তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি হয় তখন তিনি ভবিষ্যৎ সন্তানের মা৷ একবার কলকাতার কাগজে বের হল পুলিশের অত্যাচারে পাকিস্থানর জেলে ইলা মিত্র মারা গিয়েছেন! অদম্য মনের জোর আর অসম সাহসিকতায় শারীরিক পঙ্গুত্ব কে হারিয়ে দিয়েছিলেন। স্নাতক হবার ১৪বছর পর প্রাইভেট ছাত্রী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ.পাশ করেছেন। তারপর কলকাতার সিটি কলেজে অধ্যাপনা ৷ লড়াই আর আগুনের আরেক নাম ইলা মিত্র..... পড়ুন বিস্তারিত.... ধ্রুবতারাদের খোঁজে ।
কলকাতার পত্র-পত্রিকাগুলি নিয়মিত খবর লিখছে
অলিম্পিক্সে খেলতে যাবে অ্যাথলিট ইলা সেন, বেথুনের মেধাবী ছাত্রীটি তখন বাংলার অ্যাথলেটিক্সের উজ্জ্বল নক্ষত্র৷ কাগজে-কাগজে তাঁর ছবি,ভুরিভুরি কাপ-মেডেলের মধ্যে কাগজের পাতায় বসে ইলা সেন হাসছেন। হিটলারের পৃথিবী দখল করার স্বপ্নে বাঙালি কন্যার স্বপ্ন ভেঙে গেল৷ বিশ্ব যুদ্ধের কারণে অনুষ্ঠিত হল না অলিম্পিক৷
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
বিয়ের পর ওই বীরাঙ্গনা সীমানা পেরোনোর আগে রোহনপুর রেল স্টেশনে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন পাকিস্থানের পুলিশের হাতে৷ নিয়ে আসা হয়েছিল নাচোল স্টেশনে। তারপর পাশবিক অত্যাচার৷
বেয়নেট,বন্দুক পেটা করেও কলকাতায় স্পোর্টস করা মেয়ে ইলা মিত্রকে আধমরা করেছে,কিন্তু একেবারে মেরে ফেলতে পারেনি৷ ইলা যশোরের মেয়ে,আদি বাড়ি ঝিনেদার বাঘুটে গ্রামে৷ নিজের পল্লীর সাথে বিশেষ পরিচয় ঘটেনি,কলকাতায় জন্ম৷ শিক্ষাদিক্ষা এখানে৷ বাবা নগেন সেন এজি বেঙ্গলের বড় আধিকারিক ছিলেন৷ তিনি নিজে বিশেষ খেলাধূলা না করলেও ছেলেমেয়েদের খেলাধূলায় পটু করতে তাদের নিয়ে যেতেন হেয়ার স্কুলের মাঠে দৌড় করাতে৷ সেখান থেকে কলেজ স্কোয়ারে সাঁতারের জন্য৷ ভাইবোনদের মধ্যে ইলা সবার বড়৷
বেথুনের ছাত্রী ইলা ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত জুনিয়র অ্যাথলিট হিসেবে দু'হাত ভরে পদক সংগ্রহ করছেন৷ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ইলা সেনের স্থান প্রথম অথবা দ্বিতীয়৷ ১৯৩৭সালে ভেঙে দিয়েছিলেন বারবারা এডওয়ার্ডের ৫০মিটার দৌড়ের রেকর্ড৷ চিরাচরিতের বাঁধ ভেঙে গেল ইলা সেন,বাংলার শ্বেতকায় মহিলা অ্যাথলিটদের মধ্যে তিনি তখন একমাত্র খাঁটি বাঙালি কন্যা। বেথুন থেকে প্রথম ডিভিশনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেছেন ,বাস্কেটবল,ব্যাডমিন্টনও খেলতেন৷ কলেজ জীবনে এল পূর্ণতা৷ ১৯৪০-৪১ আন্তঃকলেজ ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন৷ বেথুন কলেজ থেকে প্রথম ডিভিশনে আই.এ.পাশ করার পরে খেলাধূলায় ইতি পড়ে৷
কলকাতায় জাপানী বোমার বিভীষিকায় এক বছর যশোরে কাটিয়ে বাংলা অনার্স সহ বি.এ.পাশ করলেন৷ রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে পরিণয়সুত্রে আবদ্ধ হলেন৷ স্বামী-স্ত্রী এক পথের পথিক৷ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত,সমাজসেবা,রাজনৈতিক আন্দোলনে হেসে খেলে দিন কাটে৷ দেশভাগের পর ওপার বাংলার রাজশাহীতে থাকতেন৷ তখনকার পাক সরকারের পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে আন্ডারগ্রাউণ্ডে থেকেছেন,রাজনীতি করেছেন৷ পুলিশ চেষ্টা করছে তবে ইলাকে পাকড়াও করা যায় নি৷ তাঁর কথায় খেলাধুলা করতেন বলে এই ধকল সহ্য করতে পেরেছিলেন৷ যখন তাঁর বিরুদ্ধে পাকিস্থান সরকার গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করে তখন তিনি ভবিষ্যৎ সন্তানের মা৷ ওই অবস্থায় কলকাতায় এসেছেন৷ ছেলে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে শাশুড়ির কাছে সেই ছেলে কে রেখে আবার ফিরে গিয়েছেন আন্ডারগ্রাউণ্ডে৷ তারপরের ইতিহাস রক্তের অক্ষরে লেখা৷
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
সশস্ত্র পুলিশ ও জোতদার জমিদারের লেঠেলদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন ইলা মিত্র৷ রাজসাহীর নাচোলের মাঠে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মী খুন হলেন,পুলিশের অস্ত্র লুঠ হয়৷ কৃষকের রক্ত ঝরে৷
মাতলা মাঝি ও রমেন্দ্র মিত্র গা ঢাকা দিয়ে চলে আসেন ভারতে। এবার পাক সরকারের পয়লা নম্বরের শত্রু হলেন ইলা মিত্র৷ কিন্তু কতদিন গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব!পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হল,তারপর যা হল রাস্ট্ররক্ষকদের হাতে বন্দিনী রমণীর লাঞ্ছনা৷ সেই কাহিনী শুনে হয়ত আপনার চোখেও জল আসবে!
সাঁওতাল ও কৃষকদের কাছে ইলা মিত্র ছিলেন ‘রানী মা’।
তাঁর ওপর পাকিস্তান পুলিশ যে নির্যাতন চালিয়েছিল—ইতিহাসে তা নজিরবিহীন, ভাষায় বর্ণনা করা কষ্টকর।
পুলিশের নির্মম অত্যাচারে নিপীড়িতা ইলা ভাঙা শরীর নিয়ে স্ট্রেচারে শায়িত হয়ে কয়েদখানা থেকে কোর্টে আসেন৷ এক বছর কেস চলে,উকিলের অভাবে নিজে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন৷ পরে উকিল মেলে৷ প্রথমে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের আদেশ,পরে আপীলে হয় দশ বছরের কারাদণ্ড৷ অসুখে পড়েন 'প্যারোলে' মুক্তি পেয়ে কলকাতায় এলেন৷ ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে, দীর্ঘ আটমাসের চিকিৎসায় সেরে ওঠেন তিনি। তবে, আর ফেরেননি পূর্ব পাকিস্তানে৷
এবার তাহলে অন্ন সংস্থানের পথ কি হবে? এম.এ.পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করলেন ইলা৷ আর ওই সময়ের মধ্যে প্রকাশিত হল তাঁর অনুদিত 'জেলখানার চিঠি','হিরোসীমার মেয়ে' 'চাপায়েভ',ও 'মনে প্রাণে'৷ স্নাতক হবার ১৪বছর পর প্রাইভেট ছাত্রী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ.পাশ করলেন৷ এরপর শুরু সিটি কলেজে অধ্যাপনা ৷ কলকাতায় রাজনীতিতে জড়িয়েছেন,জনগনের ভোটে জিতে বিধায়ক হয়েছেন৷ তাই বোধহয় ইলা মিত্র লেখকের লেখার আলেখ্য,কবির বাস্তব উপাদান৷ যেখানে আছে একসাথে অনেক কিছুর সংমিশ্রন৷ খেলা,লেখাপড়া,সমাজসেবা, পাকিস্থানের পুলিশের বর্বরের মত অত্যাচার,অধ্যাপনা,গৃহস্থালী,রাজনীতি৷ আজ আমরা কতজন ইলা মিত্রের কথা মনে রেখেছি! তিনি আকাশের তারা হয়েছেন মাত্র কুড়ি বছর!
সংকলনে ✍? Arunava Sen
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
#ilamitra
#womenpower
#proffecor
#athlete
#politics
#dhrubotaraderkhonje
গ্রন্থঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার,খেলাধূলায় বাঙলার মেয়ে,মুকুল৷
৫৩
৯১ মন্তব্য