সহকারী শিক্ষক
১৪ জুন, ২০২৩ ০৮:০৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
চালকুমরা বা চালকুমড়া বা জালিকুমড়া বা জালি (বৈজ্ঞানিক নাম: Benincasa hispida) কিউকারবিটাসি পরিবারের বেনিনকাসা গণের একটি লতানো প্রজাতি।চালকুমড়া বা জালিকুমড়া বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফল জাতীয় সবজি। সংস্কৃত ভাষায় একে ‘কুষ্মাণ্ড’ বলা হয়। বাজারে আমরা দুরকমের কুমড়া দেখতে পাই— লাল বা হলুদ কুমড়া ((বৈজ্ঞানিক নাম Cucurbita moschata) আর সাদা চাল কুমড়া। দামে অপেক্ষাকৃত কম হলেও দু ধরনের কুমড়াই গুণের আধার।
অন্যান্য তরকারি বা শাক-সবজির তুলনায় সস্তা বলে সকলেই অনায়াসে কুমড়া খেতে পারেন। চালকুমড়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন:
মূল নিবন্ধ: চালকুমরা এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় সবজি
যদিও বলা হয় ‘কুষ্মান্ডম কোমলম্ বিষম’ অর্থাৎ কাঁচা কচি কুমড়া বিষের সমান এবং পুরনো পাকা কুমড়াই ভালো তবুও কাঁচা কুমড়ারও গুণ কিছু কম নেই। আজকাল ডাক্তারি মতে হলুদ রঙের ফল, হলুদ রঙের তরকারি বেশি করে খেতে বলা হয় কারণ এগুলাতেই আছে বেশি মাত্রায় স্বাস্থ্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় ভিটামিন।
চালকুমড়া রান্নার বিভিন্ন ধরন: বাঙালি বাড়িতে কুমড়ার ছক্কার জনপ্রিয়তার কথা কে না জানেন। কুমড়ার ঘ্যাঁট তো প্রায় প্রতিদিনেরই হেলাফেলার খাদ্য: চাল কুমড়ার শুক্তো শিউলি পাতা বা উচ্ছে দিয়ে একটু তেতো স্বাদের করে রান্না করলে তা মুখের রুচি ফিরিয়ে দেয় অর্থাৎ অরুচি দূর করে। তাতে যদি একটু সজনে ডাঁটা দেওয়া যায় তাহলে স্বাদ যেমন বাড়বে—উপকারিতাও বাড়বে। চাল কুমড়ার মোরব্বা হিন্দিতে যাকে পেঠা বলা হয় অবাঙালি মহলে তা খুবই প্রচলিত, স্বাস্থ্যের পক্ষেও উত্তম।
চালকুমড়ার ভেষজ ও ঔষধি গুনাগুণ:
আয়ুর্বেদের মতে, চাল কুমড়া পুষ্টিকারক বীর্যবর্ধক ও গরিষ্ঠ। রক্তের দোষ অর্থাৎ রক্তবিকার দূর করে, বায়ুর প্রকোপ কমিয়ে দেয়। কচি কুমড়া শীতল ও পিত্তনাশক। তবে মাঝারি মাপের কাঁচা কুমড়াকে কফকারক বলা হয়েছে। বড় পাকা কুমড়া শীতল নয়, তবে যদি একটু সোডা বা নুন মিশিয়ে সেদ্ধ করে খাওয়া যায় তাহলে খিদে বাড়িয়ে তোলে অর্থাৎ জঠরাগ্নি প্রদীপ্ত করে, হজম করা যায় তাড়াতাড়ি, মূত্রাশয় পরিষ্কার করে, মানসিক ব্যাধি সারায় এবং শরীরের আরও অনেক দোষ দূর করে। পাকা চাল কুমড়ার বীজ জোলাপের কাজ করে।
পাকা লাল কুমড়ার তুলনায় চাল কুমড়ার অনেক বেশি ভেষজ গুণ আছে। চাল কুমড়া তাড়াতাড়ি হজম হয় অর্থাৎ লঘুপাক, মল ও মূত্র নিঃসরণে সাহায্য করে। কচি চাল কুমড়া পিত্ত নাশ করে। মাঝারি চাল কুমড়া অর্থাৎ যা বেশি কচি বা পাকা নয় খেলে কফ দূর হয়। পাকা চাল কুমড়া খিদে বাড়িয়ে তোলে, কোষ্ঠ পরিষ্কার করে, বীর্যবর্ধক, হার্টের পক্ষে ভাল, মনোবিকার দূর করে, তৃষ্ণা দূর করে, অরুচি নাশ করে, বাত, পিত্ত, কফ দূর করে। চালকুমড়া বহুমূত্র রোগ বা ডায়বেটিসের এবং অশ্মরী অর্থাৎ পাথরি রোগের মহৌষধ। চাল কুমড়ার বীজ থেকে যে তেল বের করা হয় সেই তেলও পিত্তনাশক, শীতল, চুলের বৃদ্ধির পক্ষে ভাল তবে গুরুপাক ও শ্লেষ্মকারক। চাল কুমড়ার লতাপাতারও শর্করা ও পাথরি নাশক গুণ আছে। চালকুমডার শাকও রুচি বাড়িয়ে তোলে। চালকুমড়ার ঔষধি ব্যবহার নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. রক্তপিত্ত: রক্ত উঠলেই টি বি হয়েছে যেমন ধরে নেওয়া উচিত নয়, সেই রকম রক্ত পড়লেই অর্শ হয়েছে একথা ভাবাও সমীচীন নয়; বৈদ্যকের ভাষায় এটিও রক্তপিত্ত রোগের অন্তর্গত। এরকম ক্ষেত্রে পাকা চালকুমড়ার রস ৩ থেকে ৪ চা চামচ একটু, চিনি মিশিয়ে খাবেন। রক্ত ওঠা বা পড়া যেটাই হোক না কেনো, বন্ধ হবে। আরও ভালো হয় একটু, বাসক পাতার রস ঐ সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া।
২. শরীর পুষ্ট করতে: শরীরের ক্ষয়-ক্ষতিতে মাথা হালকা বোধ, মনে কিছু থাকে না, এক্ষেত্রে এর শুকনো শাঁস চূর্ণ (জল নিংড়ে শুকিয়ে নিতে হয়) ২ থেকে ৩ গ্রাম একটু মধু মিশিয়ে খেতে হবে; এটাতে ঐ দোষটা চলে যায়।[৩] কুমড়া বা চাল কুমড়া খেলে পরিশ্রম করবার ক্ষমতা বেড়ে যায়, শরীর পুষ্ট হয়। কুমড়ার পাকা বীজের শাঁস পিষে নিয়ে ঘিয়ে ভেজে চিনিতে পাক করে লাড্ডু তৈরি করে প্রতিদিন নিয়মিত খেলে এনার্জি বাড়ে এবং অত্যধিক পরিশ্রম করবার জন্যে যে দুর্বলতা আসে তাও দূর হয়।
৩. প্লুরিসি: (আয়ুর্বেদ মতে এটি বাতশ্লেষ্মজ ব্যাধি) হয়েছে, এক্ষেত্রে এই কুমড়ার রস একটু চিনি মিশিয়ে খেতে হয়।
৪. হৃদ্গত রোগ: হৃদযন্ত্রের বৃদ্ধি হলে বা ঝুলে গেলে কি অসুবিধে হয় সব চিকিৎসকই জানেন। এক্ষেত্রে রোগীকে পাকা চালকুমড়ার হালুয়া খাওয়ানোর অভ্যাস করলে ভালো হবে; তবে হালুয়াতে গরুর থেকে ছাগলের দুধ দিলে ভাল হয়। এই সবজি বলকারক, পুষ্টিকর, ফুসফুসও ভাল রাখে।
৫. কোষ্ঠকাঠিন্যে: বালক বা বৃদ্ধ এই দুজনের একই জ্বালা অর্থাৎ সব রকম দাস্ত পরিষ্কারের ওষুধ খাইয়েও ফল হয় না, এ সময় চিকিৎসক বিভ্রান্ত হন। এক্ষেত্রে বৃহদন্ত্রের শুষ্কতা সৃষ্টি আয়ুর্বেদের নিদান। একে স্বাভাবিক করতে গেলে চালকুমড়ার রস ৪ থেকে ৫ চা-চামচ গরম দুখের সঙ্গে খাওয়াতে হয়। এটাতে প্রস্রাব ও দাস্ত দুটোই পরিষ্কার হয়।
৬. যক্ষ্মা সন্দেহে: প্রাথমিক লক্ষণ সব মিলে যাচ্ছে তখন প্রারম্ভিক চিকিৎসা হিসাবে এই চালকুমড়োর রস ৪ থেকে ৫ চা-চামচ একটু চিনি ও দুধ মিশিয়ে দু’বেলা খেতে দিয়ে তার উপকারিতা প্রত্যক্ষ করুন। কোনো কোনো চিকিৎসকের মতে যক্ষ্মা, অর্শ, গ্রহণী (একটানা পেটের অসুখ) প্রভৃতি অসুখেও চালকুমড়া খেলে উপকার হয়।
৭. শুল ব্যাথায়: এ ব্যথা পেটের যে কোনো জায়গায় হোক না কেনও, এই কুমড়ার শাসকে শুকিয়ে পুড়িয়ে (অন্তর্ধুম) তার চূর্ণ (আধ গ্রাম মাত্রায়) গরম জল খেলে উপশম হবেই।
৮. ধী শক্তি রক্ষায়: দুধ আর তামাক যেমন একসঙ্গে খাওয়ার বয়স এককালে থাকাটা হাস্যকর, সেই রকম মাথার কাজ করতে হয় অথচ শুক্রকে ধরে না রাখার মনোবৃত্তি; এক্ষেত্রে তার পরিপূরক হিসেবে কুমড়ার শাঁস বাটা (জল সমেত) মধুর সঙ্গে সরবত করে খেতে হয়; তবে সংযম করে দ্বিতীয়টি সহজ বেগ খেতে হয়।
৯. কামজ উন্মাদ: সব রকম উন্মাদ এক ধারার চিকিৎসায় সারে, এ কথা আয়ুর্বেদ বলেনি। একটি সাধারণ ক্ষেত্র হিসাবে এর বীজের শাঁস বেটে মধু সঙ্গে খেতে দিতে হয়। যেহেতু উন্মাদের ক্ষেত্র শরীরের অন্যান্য স্থানে হয় না।
১০. ক্রিমিতে: এর বীজের শাস ২ গ্রাম আন্দাজ বেটে জলসহ খেতে হয়। চাল কুমড়ার বীজ কৃমি নাশ করে।
১১. পেট ফাপা ও প্রস্রাব ভালো হচ্ছে না: এ ক্ষেত্রে কুমড়োর রস পেটে মালিশ করলে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে দুটোই সহজ হয়।[৩] আবার দু-চার চা চামচ চাল কুমড়ার রস বের করে নিয়ে তাতে চিনি মিশিয়ে খেলে অম্বল বা অজীর্ণ রোগ সারে।[২]
১২. জন্ডিসে: চাল কুমড়া হলো পাণ্ডু রোগ বা জনডিসের সবচেয়ে সস্তা ও সুলভ ওষুধ। চাল কুমড়ার টুকরো রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে খেলে বা টাটকা চাল কুমড়ার তরকারি রান্না করে খেলে জনডিস তাড়াতাড়ি সেরে যায়। এ ছাড়া চালকুমড়ার মোরব্বা বা পেঠা এবং কবিরাজি মতে তৈরি অবলেহ খেলেও উপকার পাওয়া যায়।[২]
১৩. উন্মাদনায়: মৃগী ও উন্মাদ রোগের পক্ষেও এটি উপকারী। চালকুমড়ার মোরব্বা নিয়মিত খেলে মাথা গরম হওয়া কমে, মাথা ঘোরা সেরে যায়, উন্মাদ রোগ সারে এবং খুব ভাল ঘুম হয়।
১৪. বিভিন্ন অসুখে: চাল কুমড়ার রস একটু চিনি ও জাফরানের সঙ্গে পিষে খেলে অজীর্ণ ভালো হয়, পুষ্টি বাড়ে, ফুসফুস ভালো থাকে এবং বিভিন্ন রোগে উপকার পাওয়া যায়।
১৫. ডায়াবেটিসে: ডায়বেটিসে চালকুমড়ার রস খাওয়া অতি হিতকর। চাল কুমড়ার মোরব্বা, হালুয়া, অবলেহ ও চাল কুমড়ার বীজের লাড্ডু অনেক রোগ সারিয়ে তোলে।
৫৩
৯২ মন্তব্য