Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ জুন, ২০২৩ ১১:১০ পূর্বাহ্ণ

কোনো কিছু দ্রুত শিখলে এবং তা কাজে লাগাতে পারলে সেই শিক্ষার ফলাফল দ্রুত দৃশ্যমান হয়।

দ্রুত শেখার ৬টি কৌশল

নতুন কোনো প্রযুক্তি, ভাষা কিংবা কাজে দক্ষ হয়ে ওঠার অর্থই হচ্ছে প্রতিযোগিতায় নিজেকে এগিয়ে রাখা। পেশাজীবনে এগিয়ে যাওয়া কিংবা ব্যক্তিগত উন্নতির জন্যে নতুন কিছু শেখার বিকল্প নেই।

নতুন কিছু শেখার সময় কত দ্রুত তা শেখা যাচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছু দ্রুত শিখলে এবং তা কাজে লাগাতে পারলে সেই শিক্ষার ফলাফল দ্রুত দৃশ্যমান হয়। এতে যেমন নিজের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া যায়, তেমনি শেখার আগ্রহ বজায় থাকে।

আমাদের মস্তিষ্ক কীভাবে দ্রুত শিখতে পারে, সে বিষয়ে গবেষণা করেছেন অনেকে। অনেকে অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করে উদ্ভাবন করেছেন সহজ কিছু কৌশল।

নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য দ্রুত কিছু শিখতে চাইলে অনুসরণ করা যায় এসব কৌশল। একই সঙ্গে এসব কৌশলে নতুন কিছু শিখলে সেই শিক্ষা মনেও রাখা যায় সহজে। জেনে নেয়া যাক এমনই সহজ আর অসাধারণ ৬টি কৌশল।

.

১. অন্যদের শেখান (অথবা শেখানোর ভান করুন)

ভেবে নিন যা শেখার চেষ্টা করছেন, সেটা আপনি অন্যদের শেখাচ্ছেন। এভাবে কল্পনা করতে পারলে আপনার শেখা ও মনে রাখার সামর্থ্য বেড়ে যাবে। অন্তত গবেষণায় এমনটাই প্রমাণিত হয়েছে।

সেইন্ট লুইস-এ অবস্থিত ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণার ফলাফলে এমনটা দেখা গেছে। যখন কাউকে শেখানোর উদ্দেশ্য নিয়ে পড়াশোনা করেন, তখন আপনার মাইন্ডসেট বা মানসিকতায় কিছু পরিবর্তন চলে আসে। তখন আপনি যা পড়ছেন তা নিয়ে আরও কার্যকর উপায়ে চিন্তা করা শুরু করেন।

পরীক্ষায় পাস করার জন্য যারা পড়ে, তাদের চেয়ে তখন আপনার শেখার পদ্ধতি আরো সার্থক হয়, এমনটাই মনে করেন এই গবেষণার সহ-লেখক জন নেস্টয়কো।

নেস্টয়কোর মতে, শিক্ষকরা যখন শেখানোর প্রস্ততি নেয়, তারা একটা সামাঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামোতে তাদের পাঠ-এর মূল বিষয় ও তথ্যগুলি গুছিয়ে রাখে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যখন ছাত্রদের বলা হয় কাউকে শেখাতে, তখন তারাও নিজেদের শেখানোর জন্য কার্যকর কৌশল গ্রহণ করে।

.

২. প্রতিবার অল্প অল্প করে শিখুন

লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর অ্যাকাডেমিক সাকসেস’-এর গবেষকরা পরামর্শ দেন নতুন কিছু শেখার সময় প্রতিবার ৩০-৫০ মিনিট করে সময় দিতে।

এলেন ডান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শেখার কৌশল’ বা ‘লার্নিং স্ট্র্যাটেজি’ বিষয়ক গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্টেন্ট। তিনি বিষয়টা ব্যাখ্যা করে বলেন, ৩০ মিনিটের কম সময় দেয়া হলে সেটা যথেষ্ট হয় না। আবার ৫০ মিনিটের বেশিক্ষণ ধরে শিখলে মস্তিষ্কের জন্য একবারে এত তথ্য নেয়া কঠিন হয়ে যায়।

তার মতে, একবার একটা সেশন শেষ করার পর আপনার উচিৎ ১০ মিনিটের একটা বিরতি দিয়ে আবার শুরু করা। অনেক দিন পর পর লম্বা সময় ধরে শেখার চেয়ে নিয়মিত ছোট ছোট সেশনে কোনো কিছু শেখা বেশি কার্যকর।

.

৩. হাতে লিখে নোট নিন

ল্যাপটপে যদিও অনেক দ্রুত নোট নেয়া যায়, তবে কাগজ-কলমের ব্যবহার আপনাকে শিখতে ও বুঝতে বেশি সাহায্য করবে।

প্রিন্সটন ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখেছেন যে, শিক্ষার্থীরা যখন হাতে লিখে নোট নেয়, তখন তারা আরো সক্রিয়ভাবে লেকচার শোনে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলি শনাক্ত করতে পারে।

অন্যদিকে ল্যাপটপে নোট নেয়া হলে কেবলই শুনে শুনে লেখার মত কিছু হয়, যাকে শুধুমাত্র শ্রুতিলিখন বলা যায়। আর ল্যাপটপে অন্যভাবেও মনোযোগ সরে যায়, যার বড় এক কারণ ই-মেইল বা সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন।

তিনটি গবেষণায় দেখা গেছে, হাতে লিখে নোট নেয়া শিক্ষার্থীরা ল্যাপটপে নোট নেয়া শিক্ষার্থীদের চেয়ে ধারণা-নির্ভর প্রশ্নের উত্তরে বেশি ভালো করেছে। এমনটা জানান গবেষণার সহ-লেখক এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের প্রফেসর প্যাম মুলার।

বেশি নোট নেয়া শিক্ষার্থীদের উপকারে আসতে পারে। তবে আমরা দেখিয়েছি ল্যাপটপে যারা নোট নেয়, তারা লেকচারের কথাগুলি কেবল শুনে শুনে লিখে ফেলে। তারা এই তথ্য নিয়ে চিন্তা করে না এবং নিজের ভাষায় লেখে না, যেটা শেখার জন্য অসুবিধাজনক”, বলেন তিনি।

.

৪. আগে শেখা তথ্য রিভাইস করুন

দীর্ঘ সময় সময় ধরে কোনো কিছু শিখতে থাকলে প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখা হয়। তাই সবসময় আগে শেখা তথ্য বা চর্চা রিভাইস দেয়া দরকার।

নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ‘হাউ উই লার্ন: দা সারপ্রাইজিং ট্রুথ অ্যাবাউট হোয়েন, হোয়্যার অ্যান্ড হোয়াই ইট হ্যাপেনস’ বইটির লেখক বেনেডিক্ট ক্যারি বলেন, শেখা হচ্ছে অনেকটা লন বা আঙিনার ঘাসে পানি দেয়ার মত ব্যাপার। আপনি প্রতি সপ্তাহে একবার ৯০ মিনিট ধরে পানি দিতে পারেন, অথবা সপ্তাহে তিন বার ৩০ মিনিট করে পানি দিতে পারেন।

তার মতে, আপনি সপ্তাহে যত দিন আঙিনায় পানি দেবেন, ততদিন ঘাস সতেজ থাকবে।

পড়া মনে রাখার ব্যাপারে ক্যারির পরামর্শ হল প্রথমবার পড়ার এক বা দুই দিন পর পড়াটা আবার রিভাইস করা।

প্রথম দিনের পর কিছু সময় বিরতি দিয়ে শিখলেও অনেক কিছু আপনি দ্রুত শিখতে পারবেন। এ বিষয়ে ক্যারি যেই তত্ত্বে গুরুত্ব দেন, সেটা হল, আমরা যখন কম বিরতি নিয়ে কোনো কিছু শিখি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক কম মনোযোগী হয়।

তাই টানা কয়েকদিন ধরে শেখার চেয়ে কয়েক দিন বা সপ্তাহ খানেকের মত লম্বা বিরতি নিয়ে বার বার শিখলে তাতে আমাদের মনে থাকে। কারণ তখন আমাদের মস্তিষ্কে একটা শক্তিশালী বার্তা চলে যায় যে, এই তথ্যগুলি গুরুত্বপূর্ণ, এগুলি মনে রাখা প্রয়োজন।

.

৫. পড়ার মাঝখানে ছোট ঘুম দিন

পড়াশোনা মনে রাখার ক্ষেত্রে কতক্ষণ বিশ্রাম নেয়া হচ্ছে সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স নামের এক জার্নালে এ বিষয়ের ওপর এক গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা গেছে, পড়াশোনার সময় দুটি সেশনের মাঝখানে হালকা ঘুমিয়ে নিলে তা পড়া মনে রাখতে সাহায্য করে। এভাবে পড়া যেকোনো তথ্য আগের তুলনায় এমনকি ৬ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ সময় মনে থাকে।

আবার ফ্রান্সে একটি পরীক্ষা চালানো হয়, যেখানে অংশ নেয়া মানুষদের দুটি আলাদা সেশনে ভাগ করে ১৬টি ফরাসি শব্দের সোয়াহিলি শব্দার্থ শেখানো হয়। উল্লেখ্য, আফ্রিকার সোয়াহিলি জাতির মানুষদের ভাষা হল সোয়াহিলি ভাষা।

পরীক্ষার সময় একটা গ্রুপের সবাইকে সকালে আর বিকালে, এই দুই সেশনে ক্লাস নেয়া হয়। অন্য গ্রুপকে বিকাল আর পরদিন সকালে, এই দুই সেশনে ক্লাস নেয়া হয়। ফলাফল দেখা যায়, যেসব প্রতিযোগী দুই দিন আলাদা সেশনে শিখেছে, অর্থাৎ যারা মাঝখানে ঘুমিয়েছিল, তারা ১৬টি শব্দের মধ্যে ১০টি মনে রাখতে পারে। অন্যদিকে যারা ঘুমায়নি তার গড়ে ৭.৫ টি শব্দ মনে রাখতে পারে।

.

৬. পরিবর্তন আনুন

নতুন কোনো কাজে দ্রুত দক্ষ হতে চাইলে আপনাকে প্র্যাকটিস করার ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে।

জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিন-এ এ নিয়ে এক গবেষণা করা হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের দুটি সেশনে কম্পিউটার ভিত্তিক নতুন একটা কাজ শিখতে দেয়া হয়। এদের মধ্যে একটা দল দুই সেশনে আলাদা টেকনিক ব্যবহার করে কাজ করতে শিখেছিল। আরেকটা দল শিখেছিল দুটি সেশনে একই টেকনিক ব্যবহার করে। ফলাফলে দেখা গেছে প্রথম দলই বেশি ভালো করেছে।

এর ফলাফল থেকে বোঝা যায়, বর্তমান স্মৃতির সঙ্গে নতুন জ্ঞান যোগ করে স্মৃতিতে পরিবর্তন আনাটা আমাদের মস্তিষ্কের জরুরি এক প্রক্রিয়া। একে ‘পুনর্গঠন’ বা ‘রিকনসলিডেশন’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়া নতুন কোনো বিষয়ে মস্তিষ্ককে দক্ষ করে তুলতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।

সৌঃ সি বি

 

মন্তব্য করুন