সুপার
১৭ জুন, ২০২৩ ০৮:১৩ পূর্বাহ্ণ
সুপার
কুরবানীর ইতিহাস ও শিক্ষা
কুরবানি হলো মুসলিমদের একটি ইবাদত যা প্রতি বছর বিত্তবানদের উপর আরোপিত হয় নির্দিষ্ট সময়ে। এবং এ ইবাদাতের মাধ্যমে মুসলমানগণ মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ করে থাকে। গুরত্বপূর্ণ এই ইবাদতটি করতে হবে মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ি তবেই তা আল্লাহ তায়ালার নিকটে গ্রহনযোগ্য হবে।
আরবিতে করব বা কুরবান (قرب বা قربان) শব্দটি উর্দূ ও ফার্সীতে (قربانى) কুরবানি নামে রূপান্তরিত। এর অর্থ হলো-নৈকট্য বা সান্নিধ্য।
মানব ইতিহাসের প্রথম কুরবানিদাতা হলেন আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিল ও কাবিল।দুনিয়ার প্রাথমিক অবস্থায় আদম ও হাওয়া (আঃ)-এর একটি ছেলে ও একটি মেয়ে একসাথে জন্মগ্রহণ করত। পরবর্তী গর্ভে অনুরূপ একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করত। তখন পূর্ব গর্ভের ছেলে মেয়ের সাথে পরবর্তী গর্ভের ছেলে-মেয়ের বিবাহ দেয়া হত। হাবীলের যমজ বোন সুন্দরী ছিল না। কিন্তু কাবীলের যমজ বোন সুন্দরী ছিল। তৎকালীন শরীয়ত অনুপাতে হাবীলের বিবাহ কাবীলের যমজ বোনের সাথে আর কাবীলের বিবাহ হাবীলের যমজ বোনের সাথে হবার কথা। কিন্তু কাবীল তা মানতে অস্বীকৃতি জানাল।
আদম (আঃ) কাবীলকে বুঝালেন। কিন্তু সে বুঝতে চেষ্টা করল না। অবশেষে আদম (আঃ) উভয়কে আল্লাহ তা‘আলার নামে কুরবানী পেশ করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন: যার কুরবানী কবূল হবে কাবীলের যমজ বোন তার সাথে বিবাহ দেয়া হবে।
হাবীল ছিল মেষওয়ালা, ফলে হাবীল একটি মোটা তাজা মেষ কুরবানীর জন্য পেশ করল। আর কাবীল ছিল কৃষক, সে কিছু গমের শীষ কুরবানীর জন্য পেশ করল।
আসমান থেকে আগুন এসে হাবীলের কুরবানী জ্বালিয়ে দিল, যা কবূল হবার নিদর্শন। কাবীলের কুরবানী গ্রহণ করা হল না। ফলে হিংসায় সে হাবীলকে হত্যা করার মনস্থ করল।
এতে প্রতীয়মান হয়, কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য তাকওয়া, অর্থাৎ খোদাভীতির প্রয়োজন। লোকদেখানো কোনো ইবাদত আল্লাহ তাআলা কবুল করেন না।
তারপর থেকে প্রত্যেক যুগেই ধারাবাহিকভাবে কুরবানির এ বিধান সব শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল। মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে যুগে যুগে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষ কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করতেন। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে প্রিয়বস্তু উৎসর্গই আজকের কুরবানি।
মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর ১০ জিলহজ যে কুরবানি দিয়ে থাকেন, এর প্রচলন আসছে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম থেকে। আল্লাহ তাআলা প্রাণপ্রিয় সন্তানকে কুরবানির নির্দেশ দিয়েছিলেন। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সে হুকুম পালন করে সফল হয়েছিলেন। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কুরবানির পর থেকে উম্মতে মুসলিমাহ আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে তাঁর এ নির্দেশ কুরবানির বিধান পালন করে আসছেন।কোরবানির ইতিহাস পবিত্র কোরআনে এভাবে এসেছে: ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এক নেক সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাকে এক সহিষ্ণু পুত্রের সুসংবাদ দিলাম ‘অতঃপর যখন সে তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন সে বলল, ‘হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব বল তোমার কী অভিমত?; সে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা সাফফাত : আয়াত ১০২)
আজকের মুসলিম সমাজে কুরবানির যে প্রথা চলমান আছে, এ সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম প্রিয় নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কুরবানি কী? এটা কোথা থেকে এসেছে? প্রিয় নবী (সা.) উত্তরে বললেন, ‘এটা হলো তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত বা আদর্শ। এই আদর্শকে অনুসরণের জন্যই আল্লাহ পাক তোমাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করেছেন।’ সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে? উত্তরে মহানবী (সা.) বললেন: ‘কুরবানি জন্তুর প্রতিটি পশমে তোমরা একটি করে নেকি পাবে।’
আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত কোরবানিকে পরবর্তী মানুষের জন্য অনুসরণীয় করে দেন। যাতে মানুষ বুঝতে পারে এবং শিখতে পারে যে, অর্থ-সম্পদ, টাকাপয়সা, আল্লাহর রাস্তায় কীভাবে ব্যয় করতে হয়।এমনকি প্রয়োজনে আল্লাহর জন্য জীবন দিতেও যেন মানুষের কোনো দ্বিধা, সংশয় না থাকে।
১. কোরবানি শিরক থেকে মুক্ত থাকার একটি কার্যকরী মাধ্যম। ইসলাম মুসলিমদের কোরবানির বিধান দিয়ে তাওহীদ তথা একত্ববাদের বিশ্বাসকে উজ্জ্বল ও দৃঢ় করণের পাশাপাশি এই শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে যে এসব সৃষ্টি করা হয়েছে কোরবানি করে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য। এর দ্বারা একদিকে যেমন তাওহীদের বিশ্বাস শাণিত হয়। তেমনি মানুষকে ইসলামের মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব। কোরবানির মাধ্যমে নিজেদের বিবেককে জাগিয়ে তোলা প্রয়োজন।
২. কুরবানি করার মাধ্যমে সবাই আল্লাহ তা’আলার ক্ষমতা ও আধিপত্য দৃঢ়চিত্তে মেনে নেওয়ার অনুপ্রেরণা পায়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার তাওহীদের স্বীকৃতি ঘোষিত হয়।
৩. কুরবানি করার দ্বারা দুনিয়ার সম্পদ ও পার্থিব জীবনের ভালোবাসা ইত্যাদি থেকে পরিশুদ্ধি অর্জন করা হয়। কুরবানির পশু জবেহ করার মাধ্যমে বাহ্যত কোরবানি দাতার মালের ক্ষতি হয়। আর এ লোকসান বা ক্ষতি আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্যই হয়ে থাকে। তাই জাকাতের মতো এর দ্বারাও সম্পদের ভালোবাসার মধ্যে কিছুটা ঘাটতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে কোরবানি দাতার মনে এই অনুভূতি জাগ্রত হয় যে একটি পশু কোরবানি যখন আল্লাহ তা’আলার দরবারে তাঁর সন্তুষ্টি এবং নৈকট্য অর্জনের কারণ হয়- তাহলে স্বয়ং নিজের জান-মাল সবকিছু আল্লাহর রাহে কোরবানি করে দেওয়া আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য লাভের কতো বড়ো মাধ্যম হতে পারে। এই অনুভূতি তার নিজের প্রতি ভালোবাসা কমিয়ে দিয়ে নিজেকে আল্লাহ তা’আলার রাহে কুরবানি করার চেতনাকে উজ্জীবিত করে।
৫৩
৯২ মন্তব্য