সহকারী প্রধান শিক্ষক
২২ জুন, ২০২৩ ০২:৪২ পূর্বাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
কবি সুফিয়া কামাল | নামটির সাথে মিশে আছে অসংখ্য আবেগ, অনুভূতি | তিনি শুধুমাত্র কবিই নন, তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, দার্শনিক, সমাজ সেবক, শিক্ষক ও সংগ্রামী নেত্রী । তাঁর কবিতার স্তবকে মিশে আছে প্রেম, প্রকৃতি, ব্যক্তিগত অনুভূতি, বেদনাময় স্মৃতি, স্বদেশের প্রতি মমতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। সব মিলিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০টিরও বেশি। সেসবের মধ্যে কেয়ার কাঁটা, মায়া কাজল, মন ও জীবন, উদাত্ত পৃথিবী, অভিযাত্রিক, ভ্রমণ কাহিনী ‘সোভিয়েত দিনগুলি’, স্মৃতিকথা ‘একাত্তরের ডায়েরি’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বরিশালের আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে শায়স্তাবাদে জন্ম এই মহিয়সী নারীর। দিনটা ছিল ১৯১১ সালের ২০ জুন। পিতা সৈয়দ আবদুল বারী ছিলেন সেই সময়কার একজন খুব নামকরা উকিল। কিন্তু পিতার স্নেহ খুব বেশি বছর দীর্ঘায়িত হয়নি সুফিয়া কামালের জীবনে। সুফিয়ার সাত বছর বয়সেই বাবা গৃহত্যাগী হন। যে পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন সেখানে নারীশিক্ষা ছিল অপ্রয়োজনীয়, অবাঞ্ছিত। স্কুল কলেজে পড়ার কোনো সুযোগ তাদের ছিল না। পরিবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ এক রকম নিষিদ্ধ ছিল। ঐ বিরুদ্ধ পরিবেশে সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। তিনি পারিবারিক নানা উত্থান পতনের মধ্যে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। তিনি তাঁর মা সাবেরা বেগমের কাছে বাংলা পড়তে শেখেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সুফিয়া কামাল তাঁর প্রথম গ্রন্থ 'কেয়ার কাঁটা' উৎসর্গ করেছেন তাঁর মাকে। সুফিয়া কামালের জীবনের দিক পরিবর্তনের সূচনা হয় আরেক মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে। ১৯১৮ সালে মায়ের সাথে যখন প্রথম কলকাতায় যান তিনি, তখন তার পরিচয় হয় বেগম রোকেয়ার সাথে। বেগম রোকেয়ার দর্শন, নারী জাগরণের মনোভাব এবং সাহিত্যানুরাগ ভীষণভাবে নাড়া দেয় শৈশবের সুফিয়াকে।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে সুফিয়ার বিয়ে হয়। স্বামী নেহাল হোসেন যেন সুফিয়ার জীবনে এক অপ্রত্যাশিত আশীর্বাদ হয়ে এসেছিলেন। নেহাল হোসেন নিজে লেখক, সাহিত্যিক ও সমাজসেবী ছিলেন। স্ত্রীর এসব বিষয়ে আগ্রহ দেখে নেহাল হোসেন বিভিন্নভাবে সুফিয়াকে উৎসাহ দিতে লাগলেন। সাধারণ এক গৃহিণী থেকে সাহিত্যের আলোয় নিজেকে মেলে ধরার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ১৯২৩ সালে তিনি রচনা করেন তার প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’, যা বরিশালের সেসময়কার জনপ্রিয় ‘তরুণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৫ সালের দিকে মহাত্মা গান্ধী যখন বরিশাল আসেন তখন সুফিয়ার সাথে দেখা হয়ে যায়। মহাত্মা গান্ধীর জীবনদর্শন এবং অহিংসা আন্দোলন অল্প বয়সী সুফিয়াকে এতোটাই নাড়া দিয়ে যায় যে তিনি কিছুদিন চরকায় সুতা কাটতে শুরু করেন। এর পাশাপাশি তিনি নারী কল্যাণমূলক সংগঠন ‘মাতৃমঙ্গল’-এ যোগ দেন।
স্বামীর প্রেরণায় সুফিয়া কামাল ধীরে ধীরে কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করেন। কলকাতায় তার আরেকজন বিশেষ ব্যক্তির সাথে পরিচিতি ঘটে যিনি সুফিয়া কামালের কবি জীবন পরবর্তীকালে অনেকটাই পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। তিনি হলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সুফিয়া কামালের কবিতা পড়ে বিশেষভাবে মুগ্ধ হন। ১৯২৬ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায় ‘বাসন্তী’ কবিতাটি প্রকাশের মাধ্যমে বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে সুফিয়া কামাল কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ।
১৯৩৭ সালে সুফিয়া কামালের গল্পের সংকলন ‘কেয়ার কাঁটা’ প্রকাশিত হয়। এর ঠিক পরের বছর তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’ প্রকাশিত হয়, যার প্রস্তাবনা লেখেন স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম। বইটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুফিয়া কামালের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এর পর থেকেই মূলত সুফিয়া কামালের কবি হিসেবে সুখ্যাতি চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি কবির জীবনে আসে ১৯৩২ সালে, যখন তার স্বামী আকস্মিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্বামীকে হারিয়ে একেবারে একা হয়ে পড়েন কবি। আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করতে কলকাতা কর্পোরেশন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার পেশা বেছে নেন সুফিয়া কামাল । ১৯৪১ সালের শেষ পর্যন্ত তিনি এই পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। এই স্কুলেই সৌভাগ্যবশত তার পরিচয় হয় খ্যাতনামা প্রাবন্ধিক আবদুল কাদির এবং পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের সাথে।
১৯৩৯ সালের দিকে কবি চট্টগ্রামের লেখক ও অনুবাদক কামালউদ্দীন আহমদকে বিয়ে করেন। কবির সংগ্রামী জীবনের পথে স্বামী কামালউদ্দীনকেও নিরন্তর কাছে পেয়েছেন।
সুফিয়া কামালের সারাটি জীবন কেটেছে নারীদের স্বাধীনতা এবং নারীদের শোষণ বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টায়। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় যখন ধর্মীয় দাঙ্গা বাধে তখন তিনি কলকাতার সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ এলাকাই লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে একটি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করেন। ১৯৪৮ সালে সমাজসেবা ও রাজনীতি হয়ে ওঠে সুফিয়া কামালের ধ্যান-জ্ঞান। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গঠিত শান্তি কমিটিতে যোগ দেন তিনি। ঐ একই বছরই তাঁকে সভানেত্রী করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’ গঠিত হয়।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে সুফিয়া কামালের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসনের কারণে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কবি সুফিয়া কামাল এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে তিনি ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন’ নামে একটি আন্দোলন পরিচালনা করেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা, ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
সুফিয়া কামাল ৫০টিরও অধিক পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক উল্লেখযোগ্য। সুফিয়া কামালের কবিতা চীনা, ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান, পোলিশ, রুশ, ভিয়েতনামিজ, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ৮৯ বছর বয়সে ঢাকায় কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
“আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা।
আমরা যখন আকাশের তলে ওড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি
তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।”
(‘আজিকার শিশু’ কবিতার অংশবিশেষ)
জন্মদিনে প্রণাম |
তথ্য : উইকিপিডিয়া, রোর বাংলা
৫৩
৯১ মন্তব্য