Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ জুন, ২০২৩ ০৬:১৩ অপরাহ্ণ

পলাশী ট্র্যাজেডি: সুবে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হওয়ার এক কালো অধ্যায়

পলাশী ট্র্যাজেডি: সুবে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হওয়ার এক কালো অধ্যায়

ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস

২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। এই দিবসে দেশীয় বণিক, বিশ্বাসঘাতক ও ইংরেজ বেনীয়াদের চক্রান্তে পলাশীর আক্রমনে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য্য অস্তমিত হয়। তার পর প্রায় দুশো বছরের গোলামীর জিঞ্জীর। ইংরেজ বেনীয়াদের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করার জন্য সুদীর্য প্রায় দুশো বছর আন্দোলন করতে হয়েছে। কত হাজারো বীরের রক্ত ঝরেছে, কত হাজারো মায়ের কোল খালি হয়েছে, কালের গর্ভে ইতিহাস তার সাক্ষী। পলাশীর ২৩ জুনের ইতিহাস প্রকৃত সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করার ইতিহাস। ২৩ জুনের ইতিহাস, বিশ্বাসঘাতকার ইতিহাস। এদিনটি ছিল বাংলার বুক থেকে মুসলিম শাসন উচ্ছেদের এক কালো অধ্যায়

প্রাচীন বাংলার পরিচিতি: বাংলা বলতে বিশাল ও বিস্তৃত এক ভূখ-কে বুঝায়। মূলতঃ ১৮৪৭-এর পূর্বে বৃটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রদেশই বাংলা নামে পরিচিত। যা বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ। প্রায় ৮০ হাজার বর্গমাইল বিস্তৃত নদী বিধৌত পলি দ্বারা গঠিত এক বিশাল সমভূমি এ বাংলা এর পূর্বে ত্রিপুরা, গারো ও লুসাই পবর্তমালা ; উত্তরে শিলং মালভূমি ও নেপাল। পশ্চিমে রাজমহল ও ছোট নাগপুর পর্বতরাজির উচ্চভূমি এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। মুসলমানগণই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলা অঞ্চলকে বাঙ্গালাহ নামে অভিহিত করেন। বাঙ্গালার আদি নাম ছিল বঙ্গ। অতীতে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। যেমন: পুন্ড্র, বরেন্দ্র, গৌড়, কর্ণসুবর্ণ, রাঢ়, তাম্রলিপ্তি, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল ইত্যাদি। পশ্চিম বঙ্গের বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলকে বলা হত রাঢ়। বর্তমান বাংলাদেশের উত্তরাংশ ও পশ্চিম বঙ্গের উত্তর-পূর্বাংশ জুড়ে ছিল পুন্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্র ও লক্ষণাবর্তী। এর রাজধানী ছিল পু-ুনগর। বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়-ই সেই কালের পুন্ড্রনগর এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত নাই। বাংলাদেশের বৃহত্তর ঢাকা, বৃহত্তর ফরিদপুর ও বৃহত্তর যশোর জেলার নিয়ে গঠিত অঞ্চলের নাম ছিল বঙ্গ। বঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলের পরিচিতি ছিল বঙ্গাল নামে। বৃহত্তর কুমিল্লা ও বৃহত্তর চট্টগ্রামকে একত্রে বলা হত হরিকেল। উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গের কিয়দাংশ আবার গৌড় নামেও পরিচিত ছিল। গৌড়ের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্র্ণ যা বর্তমানে মুর্শিদাবাদের নিকট অবস্থিত। তবে সামগ্রিকভাবে গৌড় বলতে সমগ্র বাংলাদেশকে বুঝানো হত।

বাংলায় সারে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসন: ১২০৪ খ্রীষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী সতের জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে সেন রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ইংরেজদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় সারে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনামলে মুসলিম সুলতানরা তাদের উদার ধর্ম ও আদর্শ দিয়ে এ দেশবাসীকে আপন করে নেয়। ফলে এ দেশ মুসলিম সংখাগরিষ্ঠ জনপদে পরিণত হয়। সোনালী যুগের খিলাফতের আদলে না হলেও বাংলাদেশের মুসলিম শাসন দেশ ও জাতির কল্যাণে যেসব অবদান রেখেছেন তার মূল্য অপরিসীম। মুসলিম শাসনে এদেশে শত শত মুবাল্লিগ আগমণের পথ প্রশস্ত হয়। তারা গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্য তুলে ধরেন। তাদের সংস্পর্শে অসংখ্য লোক ইসলাম গ্রহণ করে। তারা মসজিদ- মাদরাসা ও উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে ইসলামের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। সে সময় ইসলামী বিচার ব্যবস্থা অনেকাংশে চালু থাকায় সমাজে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। জনগণ শান্তিতে বসবাস করতে পারত। কোন সম্প্রদায়িক সংঘাত ছিল না। ইসলামের উদার নীতি ও সাম্যের কারণে মুসলিম হিন্দু-বৌদ্ধ নির্বিশেষে সকলে পাশাপাশি বসবাস করত। আদর্শিক বিষয়ে কেউ কারো উপর হস্তক্ষেপ করত না।

তখন জান্নাতাবাদ নামে খ্যাত বাংলা একটি প্রাচুর্যময় দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত ছিল। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায়ও তার উল্লেখ দেখা যায়। জনগণের আর্থিক অবস্থা ছিল উন্নত। বিখ্যাত মসলিন কাপড়সহ বিপুল সংখ্যক দ্রব্য বিদেশে রপ্তানী করা হত। দেশব্যাপী ছিল বিভিন্ন ধরনের কুটির শিল্প ও বিভিন্ন ধরণের প্রতিষ্ঠান। তখন এ দেশ ছিল যেমন পণ্য উৎপাদন কেন্দ্র, তেমনি বিভিন্ন ধরণের শস্য ও পণ্য রপ্তানী কেন্দ্র। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে মুসলিম শাসকগণ ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। তাঁরা হিন্দু রাজন্যবর্গের দ্বারা উপেক্ষিত জনগণের ভাষা বাংলাকে রাজ-ভাষার মর্যাদা দেন এ সময় বাংলায় অনুদিত এবং রচিত হয় অনেক মৌলিক গ্রন্থ। অবহেলিত বাংলা ভাষা মাথা উঁচু করে উৎকর্ষের সোনালী মার্গে উন্নীত হয়।

জলপথে ভারতবর্ষ আবিস্কারের পর ইউরোপীয় বেনিয়াদের জন্য একটি লোভনীয় দেশ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে ধন-ধান্যে পুস্পে ভরা সমৃদ্ধ সুবে বাংলা বা বাংলা ভূখন্ড। তারা ব্যবসার সাথে সাথে এদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলাতে থাকে। এতে সহযোগী হিসেবে পায় এক শ্রেণীর হিন্দুদের, যারা মুসলিম শাসকদের নিকটও বিশ্বস্থ হিসেবে পরিচিত ছিল। এসব লোভী বেনিয়ারা হাত করতে থাকে ক্ষমতালোভী কিছু মুসলিম পদস্থ লোকদের। ফলে ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধ নামক প্রহসনে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতন ঘটে। ফলে বাংলায় সারে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনামলের অবসান ঘটে।

পলাশী ট্র্যাজেডি: ২৩ জুন পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস। এ দিনটি জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ আর মীর জাফররা ক্ষমতার লোভ ও ব্যক্তিস্বার্থে বাংলা বিহার ঊড়িষ্যা নিয়ে গঠিত সুবে বাংলাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়ে উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েমের সূচনার কালো দিন। আজ থেকে ২৬৬ বছর আগে ১৭৫৭ সালের এ দিনে পলাশীর আমবাগানে এক যুদ্ধ নাটক মঞ্চস্থ করার মধ্য দিয়ে অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য। সুবে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা তার প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পরাজিত ও বন্দি হন। পরে ১ জুলাই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে ইংরেজ বেনিয়াদের দোসর বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর ও অনুগতরা। উপমহাদেশের মানুষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদ হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, নবাবের সেনাবাহিনীর তুলনায় ইংরেজদের সেনা সংখ্যা ছিল অনেক কম। নবাবের বিজয় ছিল প্রায় সুনিশ্চিত। সেখানে বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজদের বিজয়ী করা হয়। মূলত ষোলো শতকের শেষের দিকে ওলন্দাজ, পর্তুগিজ ও ইংরেজদের প্রাচ্যে ব্যাপক বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। এক পর্যায়ে ইংরেজরা হয়ে যায় অগ্রগামী। বাংলার সুবেদার-দিওয়ানরাও ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৭১৯ সালে মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ওই বছরই সুজাউদ্দিন খাঁ বাংলা-বিহার-ঊড়িষ্যার সিংহাসন লাভ করেন। এই ধারাবাহিকতায় আলীবর্দী খাঁর পর ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজউদ্দৌলা বাংলা-বিহার-ঊড়িষ্যার সিংহাসনে আসীন হন। তখন নবাব সিরাজের বয়স মাত্র ২২ বছর। দেশপ্রেমিক তরুণ নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ সৃষ্টি হয়। এছাড়া রাজ সিংহাসনের জন্য লালায়িত ছিলেন সিরাজের পিতামহ আলীবর্দী খাঁর বিশ্বস্ত অনুচর মীর জাফর ও খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ স্থাপন করে ব্যক্তি সুবিধার স্বার্থে নবাবের বিরুদ্ধে নীলনকশা তৈরী করেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল ইংরেজরা নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এটা কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমিচাঁদকে এজেন্ট নিযুক্ত করেন। এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক ছিল মীর জাফর আলী খান। বিষয়টি বুঝতে পেরে নবাব তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করে আব্দুল হাদীকে ওই পদে অভিষিক্ত করেন। কুটচালে পারদর্শী বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর পবিত্র কুরআন শরীফ ছুঁয়ে মিথ্যা শপথ করায় নবাবের মন জয় করে এবং মীর জাফরকে প্রধান সেনাপতি পদে পুনর্বহাল করেন। সিরাজের এ ভুল সিদ্ধান্তই বাংলার আকাশে কালো মেঘের আবির্ভাব ঘটায়। ইংরেজদের পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকে সাহায্য করা, মীর জাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ও ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা, ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ, নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার, কৃষ্ণ বল্লভকে ফোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় দান ইত্যাদি কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ হয়। মীর মদন ও মোহন লালের বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইংরেজদের কোণঠাসা করলেও বিশ্বাসঘাতক জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, উর্মিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ কুচক্রী প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। সেই সাথে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য প্রায় দুইশ বছরের জন্য অস্তমিত হয়।

ঐতিহাসিক ড. রমেশ চন্দ্র বলেন, নবাব ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন ষড়যন্ত্রের কথা জানার পর যদি মীর জাফরকে বন্দি করতেন, তবে অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারী ভয় পেয়ে যেত এবং ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলে পলাশীর যুদ্ধ হতো না। ইতিহাসে জানা যায়, পলাশীর প্রান্তরে নবাবের পক্ষে ছিল ৫০ হাজার সৈন্য আর ইংরেজদের পক্ষে মাত্র ৩ হাজার সৈন্য। কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারী ও কুচক্রী মীর জাফর, রায়দুর্লভ ও খাদেম হোসেনের অধীনে নবাব বাহিনীর একটি বিরাট অংশ পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কার্যত কোনো অংশগ্রহণই করেনি। এই কুচক্রীদের চক্রান্তে যুদ্ধের প্রহসন হয়েছিল।

পলাশী যুদ্ধের ফলাফল: ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে তাঁর পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে ৫৫৪ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান  ঘটে। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের ফলে এ দেশের জনগণকে পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ হতে হয়। তাদের উপর নেমে আসে দুর্যোগের অমানিশা। ইংরেজগণ মুসলিম রাজ শক্তিকে তছনছ করে দেয়। তাদের অমানবিক, অর্থনৈতিক শোষণের যাতাকলে মুসলমানদের মেরুদ- ভেঙ্গে যায়। তারা এদেশে গোলাম বানানোর উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করে এবং অপসংস্কৃতি চালু করার সব ব্যবস্থা চুড়ান্ত করে।

ইউরোপীয় ইংরেজ বেনিয়ারা ইসলামের সুমহান শিক্ষাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। মুসমানদের ইসলাম থেকে দূরের সরিয়ে দেয়ার জন্য তারা এদেশে দুটি ভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে। আদর্শহীন ও অনুপযোগী এ শিক্ষা ব্যবস্থায় সহজ সরল মুসলমানদের আকৃষ্ট করতে তারা কিছু তোষামদী আলেম-ওলামাও তৈরী করে। মিলাদ শরীফ মাহফিল, ঈছালে সওয়াব, উরশ-শরীফ, খানকা-যিকির ইত্যাদি অনুষ্ঠান প্রচলন করে ইসলামকে অনুষ্ঠান সর্বস্ব ধর্মে পরিণত করা হয়। মুসলামনদের ঈমানী চেতনা নি¯প্রভ ও বিপর্যস্ত হয়ে যায়। জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাদের আকর্ষণ হারিয়ে যায়। যে মুসলমানগণ জ্ঞান-বিজ্ঞানে এক সময় সারা বিশ্বের পথ প্রদর্শক ছিল; ইংরেজদের ষড়যন্ত্রে সে মুসলমানরা শুধু বিবাহ-তালাক আর যায়েজ-নাযায়েজে, ফতোয়ার গোলক ধাঁধাঁয় আটকে যায়। ইসলামের অন্যান্য শিক্ষার সাথে তাদের দূরত্ব ক্রমান্ন^য়ে বাড়তে থাকে।

মুসলিম সমাজে পূনঃজাগরণ: ইসলামের এ দু:সময়ে এ উপমহাদেশের বিশ্ব বরেণ্য দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিক ও ইসলামী  চিন্তাবিদগণ জ্ঞানের মশাল প্রজ্বলিত করে এগিয়ে আসেন। মুসলিম জাতিকে অজ্ঞানতা ও অন্ধকার থেকে উদ্ধারের লক্ষ্যে উপমহাদেশে ইসলামের দাওয়াত ক্রমান্নয়ে এগিয়ে চলতে থাকে। তাঁদের প্রচেষ্ঠায় বাঙ্গালী মুসলিম সমাজে নবজাগরণ সূচিত হয়। অবিভক্ত বাংলায়  এর পথিকৎ ছিলেন নবাব আব্দুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩), তাঁর একানÍ প্রচেষ্টায় কলিকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে বাঙ্গালী মুসলমানদের আধুনিক উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ সহজতর হয়। নবাব আব্দুল লতিফের প্রচেষ্টার ফলে বাঙ্গালী মুসলিম তরুণরা সীমিত সংখ্যক হলেও ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে আসে। এর কিছু কালের মধ্যেই কলিকাতার শিক্ষিত সমাজে বাঙ্গালী মুসলিম তরুণদের আবির্ভাব ঘটতে থাকে। মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে সৈয়দ আমীর আলীর (১৮৪৯-১৯২৮) অবদানও অবিস্মরণীয়। অন্যদিকে ভারতীয় মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম ব্যক্তিত্ব স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের (১৮১৭-১৮৯৮) উদ্যোগে ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় যা মুসলমানদের প্রধান আধুনিক শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়।

আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি পত্র-পত্রিকা ও সাহিত্য রচনার মাধমেও বাঙ্গালী মুসলমানদের নবজাগরণের প্রচেষ্টা চলতে থাকে। বাঙ্গালী মুসলিম সমাজের নবজাগরণের এই প্রচেষ্ঠায় সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কবি মোজাম্মেল হক, কাজী নজরুল ইসলাম, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, শেখ আব্দুর রহীম প্রমুখ খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিক ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ এগিয়ে আসেন। ইংরেজ শাসন-শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়ন এবং মুসলমানদের পরাধীন অবস্থা তাঁদের ইংরেজ বিরোধী করে তোলে। তাঁরা মুসলমানদের পশ্চাদপদতার প্রেক্ষাপটে তাদের জাগিয়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁদের লিখনিতে ধ্বনিত হয়েছে মুসলমানদের জাগণের আহবান, স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্খা এবং ইসলামী শিক্ষা- সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে উদ্দীপ্ত করে তোলার প্রয়াস। তাঁদের বক্তৃতার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল বাংলার অনগ্রসর মুসলিম সমাজকে জাগরণের মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করা। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণে অসংখ্য মুসলিম কবি-সাহিত্যিক ও ইসলামী চিন্তাবীদগণ এদেশে ইসলামের দাওয়াত ও খেদমতে নিরলস প্রচেষ্টা অব্যহত রাখেন। 

সমাপনী: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি আমাদের দেশ। এদেশের অপরূপ প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে, প্রেম-প্রীতি, সাম্য-মানবতার আদর্শ। ইসলামের বীজ প্রথিত এদেশের অনেক গভীরে। ফলে একশত নব্বই বছরের ইংরেজ দু:শাসনে এদেশের মুসলিম সমাজ ভেঙ্গে পড়লেও, তাঁরা তাদের পরিচয় থেকে কোন দিন দূরে সরে যায়নি, সরে যায়নি তাদের নিজস্ব শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে। পলাশীর প্রান্তরে সেদিন ব্যক্তিস্বার্থে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে বেনিয়াদের হাতে দিতে নবাবকে হত্যায় যারা ভূমিকা রেখেছে, সেই বিশ্বাসঘাতকদের কারো স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। উপমহাদেশের মানুষের আন্দোলনের মুখে ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সাঁথিয়া, পাবনা।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ