সহকারী অধ্যাপক
২৭ জুন, ২০২৩ ০৮:৪৮ অপরাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
মুসলিম উম্মাহর স্মৃতি ও অনুভবে আরকানুল হজ্জ
ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস
সালাত, সাওম ও যাকাতের ন্যায় হজ্জ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরয ইবাদত। হজ্জ বলতে সামর্থ্যবান জ্ঞানবান বুদ্ধিমান মুসলমানদের উপর জীবনে অন্তত একবার এহরাম অবস্থায় নয়-ই জিলহজ্জ আরফার ময়দানে অবস্থান ও পবিত্র কা’বা ঘরের যিয়ারত সহ অন্যান্য বিধি বিধান পালনকে বুঝায়। যে কোন সামর্থ্যবান মু‘মিনের জন্য এ ইবাদত পালন করা ফরয। যেমনটি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: ‘সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরয। আর যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয়ই সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।’ [আলে-ইমরান: ৯৭] ইসলামের মৌলিক ইবাদতসমূহ দু‘ধরণের। এক-দৈহিক ইবাদত, যেমন নামায, রোযা। দুই-মালের ইবাদত, যেমন সদকা, যাকাত দান-খয়রাত প্রভৃতি। কিন্তু হজ্জ এমন একটি মৌলিক ইবাদত যাতে উভয় বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। অর্থাৎ এটি মালেরও ইবাদত এবং দেহেরও ইবাদত। হজ্জ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুয়তী জীবনের শেষের দিকে ফরয ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু মাক্কী সূরা সমূহেই এ প্রসঙ্গে পূর্ব থেকেই আলোচনা শুরু করা হয়। যেমন- আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:‘যেন তারা নিজেদের কল্যাণের স্থানসমূহে হাযির হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যে রিয্ক দিয়েছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ-দরিদ্রকে খেতে দাও।’ [আল-হাজ্জ: ২৮]
আমাদের জীবন এবং এই জীবনকে যে বৈশ্বিক পরিবেশে বসবাস করে আমরা উপভোগ করি; সে জীবন ও সে বিশ্বসমূহের রূপকার, কারিগর এবং নিরংকুশ ও অদ্বিতীয় অধিপতি হচ্ছেন আল্লাহ তা‘য়ালা। মহান আল্লাহ তা‘য়ালার উপরোক্ত আদেশকে ঘিরেই আল্লাহর মেহমানরা হজ্জের পবিত্র ইবাদাত সম্পন্ন করেন। আল্লাহ তা‘য়ালা হজ্জের ইবাদাতে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতাকে আবশ্যকীয় করেছেন। হজ্জ পালনকারীদের জন্য এসব আনুষ্ঠানিকতায় মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য অনেক শিক্ষা রেখেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সা. বলেছেন: ‘হজ্জ ও ‘উমরাহ উভয়টি মানুষের দারিদ্র এবং পাপরাশিকে এমনভাবে বিদূরিত করে যেভাবে হাপর স্বর্ণ, রৌপ্য ও লৌহ পুড়িয়ে খাঁটি করে। আর মাবরূর হজ্জের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত।’ [তিরমিযী-নাসাঈ] হজ্জের অস্বীকারকারীকে কাফির বলা হয়েছে, আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আলে-ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে কারীমার শেষাংশে বলেন:‘যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয়ই সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।’ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন এ আয়াতে কুফুরী বলতে বুঝানো হয়েছে এমন এক ব্যক্তির কাজকে যে হজ্জ করাকে নেক কাজ হিসাবে নিল না, আর হজ্জ না করাকে গোনাহের কাজ হিসাবে নিল না, [তাবারী] হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা মধ্যে হযরত ইবরাহিম (আঃ) ও তাঁর পরিবারের যেসকল স্মৃতিই আমাদেরকে স্মরণ করে দেয় সেগুলো হলো:
তালবিয়া পাঠ: সকল ধরনের সার্বভৌমত্ব শুধু আল্ল¬াহরই। তালবিয়াতেই প্রকাশ হয়েছে আল্লাহর সার্বভৌমত, একত্ব ও বড়ত্ব। এটাই তাওহীদের নিরংকুশ স্বীকৃতি। ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।’ হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত হয়েছি। ‘লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইক।’আমি হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনার কোন শরীক নেই। ‘ইন্নাল’হামদা, ওয়ান্- নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক্।’-নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা এবং সমস্ত নিয়ামত শুধু আপনার নিকট হতেই আর সার্বভৌমত্ব আপনারই। ‘লা-শারীকা লাক্।’আপনার কোন শরীক নেই। এই কথাগুলোই আমরা তালবিয়াতে বলে থাকি। নিজের বড়ত্ব নয়, প্রশংসা ও বড়ত্ব শুধু আল্লাহরই, অহংকার ও বড়ত্বের প্রকৃত দাবীদার একমাত্র আল্লাহ তা‘য়ালা। সার্বভৌমত্বের অধিকারীও একমাত্র তিনিই। তাই একজন হাজীর জন্য এটাই প্রথম শিক্ষা যে তিনি সকল ধরনের সার্বভৌমত্বের ধারণা পরিত্যাগ করে হযরত ইবরাহিম (আঃ) এর ন্যায় আসমান-জমিনে শুধুমাত্র আল্ল¬াহর একত্ব ও বড়ত্ব বা সার্বভৌমত্বকেই হৃদয়ে ধারণ করবেন অর্থাৎ তাওহীদকে হৃদয়ে ধারণ করবেন এবং সকল ধরনের অহংকার ও বড়ত্বের ভাব ও অনুভূতি পরিত্যাগ করে সূর্য-চন্দ্র, আকাশমন্ডলী ও সমগ্র প্রকৃতিসহ সকল জগতসমূহের এবং গোটা মানবজাতির কারিগর ও রূপকার এবং পৃথিবীর সকল নি‘য়ামত বর্ষণশারী আল্লাহর বড়ত্বকে উপলব্ধি করবেন।
কাবাঘর তাওয়াফ করা: তাওয়াফ প্রকারান্তরে আল্লাহর-কেন্দ্রিক জীবনের নিরন্তর সাধনাকে বোঝায়। অর্থাৎ একজন মু‘মিনের জীবন আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে কেন্দ্র করে ঘোরে। এক আল্লাহকে সকল কাজের কেন্দ্র বানিয়ে যাপিত হয় মু‘মিনের সমগ্র জীবন। বাইতুল্ল¬¬াহর চারপাশে প্রদক্ষীণ করা আল্লাহর মহান নিদর্শন ও নির্দেশনার চারপাশে প্রদক্ষীণই নামান্তর। এ যেন তাওহীদের কেন্দ্রের চারপাশেই প্রদক্ষীণ। তাওহীদ নির্ভর জীবনযাপনের গভীর অঙ্গীকার ব্যক্ত করা। যা সাত চক্কর চূড়ান্ত পর্যায়কে বুঝায়। অর্থাৎ মু’মিন তার জীবনের একাংশ তাওহীদের চারপাশে ঘূর্ণায়মান রাখবে আর বাকি অংশ ঘোরাবে অন্য মেরুকে কেন্দ্র করে, এরূপ নয়। মু‘মিনের শরীর ও আত্মা, অন্তর-বাহির সমগ্রটাই প্রদক্ষীণ করে একমাত্র আল্লাহকে কেন্দ্র করে যা পবিত্র কুরআনে ‘পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো’ বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশ্বের সর্বপ্রথম নির্মিত গৃহ খানায়ে কা‘বার বৈশিষ্ট, শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন:‘নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, তা মক্কায়। যা বরকতময় ও হিদায়াত বিশ্ববাসীর জন্য।’ [আলে-ইমরান: ৯৬]
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদে বলা হয়েছে, আলোচ্য আয়াতে কারীমার মাধ্যমে ইয়াহুদীদের অভিযোগের উত্তর দেওয়া হয়েছে, ইয়াহুদীরা বলত পৃথিবীর প্রথম মসজিদ ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মুসলিমরা ১৬-১৭ মাস এদিকে মুখ করে সালাত আদায় করত, পরে আবার তারা কেন তাদের কিবলাকে পরিবর্তন করে নিয়েছে? এর উত্তরে আল্লাহ তা‘য়ালার পক্ষ থেকে আয়াত নাযিল করা হয় এবং বলা হয় ‘নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, তা মক্কায়, যা বরকতময় ও হিদায়াত বিশ্ববাসীর জন্য।’ [তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ] এ আয়াতে কারীমায় পৃথিবীর সর্বপ্রথম নির্মিত ঘর খানায়ে কা‘বার মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, এটি বাক্কা শহরে স্থাপন করা হয়েছে। ‘বাক্কা’ হলো মক্কার প্রসিদ্ধ নাম। বড় বড় সন্মানিত লোকের মাথা এখানে নুয়ে পড়ত বলে একে মাক্কা বলা হয়েছে। মাক্কা বলার আরেকটি কারণ হলো এখানে মানুষের ভিড় জমে থাকে। এর আরো বহু নাম রয়েছে যেমন-বাইতুল হারাম, বাইতুল আতিক, বালাদিল আমিন, আল-বাইয়্যেনা, আল-কা‘বা ইত্যাদী। আলোচ্য আয়াতে কারীমায় কা‘বা গৃহের অনেক শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার মধ্যে তিনটি শ্রেষ্ঠত্ব্যের কথা বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমতঃ সারা বিশ্বের ইবাদতের স্থান, দ্বিতীয়তঃ এ গৃহ বরকত ও কল্যাণের আধার, তৃতীয়তঃ এ গৃহ সারা সৃষ্টির জন্য হিদায়াত বা পথপ্রদর্শক।
ইসলামে হজ্জ সম্পাদনের অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে কা‘বার তাওয়াফ করা। প্রাচীনত্বের বিবেচনায় কা‘বা বিশ্বের সর্বপ্রথম গৃহ। আর মর্যাদার বিবেচনায়ও কা‘বা অতুলনীয়। কারণ কা‘বা ব্যতিত বিশ্বের আর কোন স্থাপত্য, ইমারত কিংবা গৃহ নেই যার তাওয়াফ করা হয়। হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইবরাহীম, যমযম, মুলতাযিম, হাতীম, মীযাবে রাহমাত এমন অসংখ্য নিদর্শন কা‘বাকে করেছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এই মর্যাদাপূর্ণ ঘরের তাওয়াফ করার উদ্দেশ্য এটাই যে তাওয়াফের সময় তাঁর ঘরকে কেন্দ্র করে যেমন হজ্জের শুরু এবং বিদায়ী তাওয়াফ দিয়ে শেষ হয়, তেমনি মু‘মিন-মু‘মিনাদের জীবনও পরিচালিত হবে, আল্লাহ তা’য়ালার আহকামকে কেন্দ্র করে, তাঁর সন্তোষ-অসন্তোষকে কেন্দ্র করে এবং এভাবে জীবন পরিচালিত করতে করতেই মু‘মিন-মু‘মিনার জীবনাবসানও ঘটবে আল্লাহর সন্তোষ-অসন্তোষকে কেন্দ্র করেই। আর এভাবেই ‘আমরা শুধু তোমারই ‘ইবাদাত করি; শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।’ এই কথার সাথে বাস্তব জীবনে কাজের মিল প্রমাণিত হবে। ইবরাহীম আলাইহিস্সালাম আল্লাহ তা‘য়ালার আদেশক্রমে বাইতুল্লাহ নির্মাণ করে হজ্জ সম্পাদন করার ঘোষণা দানের পর থেকে তাঁর পরে যত নবীর আগমন হয়েছে সকল নবীর উপরই ফরয ছির বলে প্রতিয়মান হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন: ‘আর স্মরণ কর, যখন আমি ইবরাহীমকে সে ঘরের স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, ‘আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পাক সাফ রাখবে তাওয়াফকারী, রুকূ-সিজদা ও দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারীর জন্য।’ [সূরা আল-হজ্জ: ২৬]
ইবরাহীম আলাইহিস্সালাম মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষণা দানের পর থেকে মক্কা ও তার আশে-পাশের লোকেরা হজ্জ করা আরম্ভ করেন। আর এই ধারা পরবর্তী যুগেও অব্যাহত ছিল। ইবরাহীম আলাইহিস্সালাম এর পর যত নবীর আগমন হয়েছে তারা প্রত্যেকেই হজ্জ করেছেন বলেই প্রতিয়মান হয়। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী হিসেবে প্রেরিত হবার পূর্বেও মক্কার লোকেরা যুগ যুগ থেকে হজ্জ করত। এ কারণে স্বয়ং মহানবী নিজেই নবুয়াত লাভের পূর্বে কয়েকবার হজ্জ আদায় করেছেন বলে সীরাত থেকে জানা যায়। আল্লাহকে কেন্দ্র করেই হবে বিশ্বাসীদের জীবন। বিশ্বের সর্বপ্রথম নির্মিত গৃহ খানায়ে কা‘বার বৈশিষ্ট, শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা পরবর্তী আয়াতে কারীমায় বলেন: ‘তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহীম। ‘আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে।’ [সূরা আলে-ইমরান: ৯৭]
খানায়ে কা‘বায় রয়েছে অনেক স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, যেমন মাকামে ইবরাহীম। আলোচ্য আয়াতে কারীমায় কা‘বা গৃহের অনেক শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার মধ্যে এ গৃহ যে বরকত ও কল্যাণের আধার, সে কথা বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই খানায়ে কা‘বায় যে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘য়ালা অন্য আয়াতে আরো বলেন: ‘তারা কি দেখে না যে, আমি ‘হারাম’ কে নিরাপদ বানিয়েছি, অথচ তাদের আশ পাশ থেকে মানুষদেরকে ছিনিয়ে নেয়া হয়? তাহলে কি তারা অসত্যেই বিশ্বাস করবে এবং আল্লাহর নি‘য়ামতকে অস্বীকার করবে?’ [সূরা আল-আনকাবুত: ৬৬] কা‘বা-কে আল্লাহ তা’য়ালা ‘আমার ঘর’ বলে উল্লে¬খ করেছেন। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন: ‘আর স্মরণ কর, যখন আমি ইবরাহীমকে সে ঘরের স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, ‘আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখবে তাওয়াফকারী, রুকূ-সিজদা ও দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারীর জন্য।’ [সূরা আল-হাজ্জ: ২৬] আল্ল¬াহ তা‘য়ালা আরো বলেন:‘অতএব তারা যেন এ গৃহের রবের ‘ইবাদাত করে, যিনি ক্ষুধায় তাদেরকে আহার দিয়েছেন আর ভয় থেকে তাদেরকে নিরাপদ করেছেন।’ [সূরা আল-কুরাইশ: ৩-৪] রাসূল সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হজ্জ করল, অশালীন কথা ও কাজে লিপ্ত হলনা কিংবা কোনো গুনাহের কাজে নিজেকে জড়াল না, সে যেন নবজাতক শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এলো।” [বুখারী ও মুসলিম]।
সাফা-মারওয়ায় সা‘ঈ করা: মা হাজেরা কে প্রিয় সন্তান ইসমাঈলসহ যখন পিতা ইবরাহীম (আঃ)আল্লাহর আদেশে মক্কার জনমানবহীন নির্জন মরুভূমি প্রান্তরে খাদ্য-পানীয়ের দুস্প্রাপ্যতার ভেতর রেখে এসেছিলেন তখন ইবরাহীম (আঃ)আল্লাহর আদেশের কথাই মা হাজেরাকে শুনিয়েছিলেন। হে আল্লাহ! তোমার সন্তোষ অর্জনের জন্য জীবনের সব দুঃখ-কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করি। আর মা হাজেরা আল্লাহর ওপর গভীর বিশ্বাস ও আস্থার কারণে নিঃশংক হৃদয়ে তা মেনে নিয়েছিলেন। আর আল্লাহর ওপর গভীর বিশ্বাস ও আস্থার অর্থই হলো জীবনের শেষ স্পন্দনটি পর্যন্ত তাঁর পথে অটল অবিচল থাকা। তাঁর পথে ক্লান্তিহীন সর্বাত্মক প্রচেষ্টায়রত থাকা। মা হাজেরা তাই করেছিলেন। শিশু পুত্র ইসমাঈলের তৃষ্ণা নিবারণের প্রচেষ্টায় দূরে কোথাও কোনো কাফেলার সন্ধান মিলে কিনা তা দেখার জন্য ক্লান্তিহীন সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের চুড়ায় উঠেছেন আবার নেমেছেন। এভাবে সাতবার। কিন্তু কোনো কাফেলার দেখা মিলেনি। আল্লাহ মা হাজেরার এই প্রচেষ্টাকে সফলতা দিলেন তার কুদরতের ফোয়ারা যম্যম্ দান করে। মা হাজেরা আমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ) -কে এ প্রশ্ন করেননি যে, কেন আপনি আমাকে নির্জন মরুপ্রান্তরে দুগ্ধপোষ্য এক শিশু সহ একাকী ফেলে যাচ্ছেন? বরং আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের জন্য জীবনের সব দুঃখ-কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করেছিলেন। আল্ল¬াহর সন্তোষ অর্জনের প্রত্যাশায় এভাবে সব দুঃখ-কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করার দৃষ্টান্তকে আল্ল¬াহ কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য এক অনুসরণীয় শিক্ষার স্মারক করে রাখলেন হজ্জের আনুষ্ঠানিকতায় ‘সা‘ঈর বিধানকে অনিবার্য করার মাধ্যমে। তাই আল্লাহর সন্তোষের জন্য তাঁর পথে সব দুঃখ-কষ্টকে যেন আমরা হাসিমুখে বরণ করি। তাহলে অবশ্যই আমাদের জীবন হবে আল্লাহর অনুগ্রহ ধন্য এক সফল জীবন। অর্জিত হবে দুনিয়া ও আখিরাতের কাংখিত সফলতা।
মিনায় অবস্থান করা: রক্ত-বর্ণ-দেশ-ভাষা-গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের মযার্দা সমান। মিনার ময়দানে সকল হাজীদের অবস্থান দিয়ে শুরু হয় হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা। আর মিনার ময়দানে রক্ত-বর্ণ-দেশ-ভাষা-গোত্র নির্বিশেষে মানুষের সম্মিলন আল্লাহর সৃষ্টি বৈচিত্র্যের নিদর্শন। ‘এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।’ [সূরা রূম; ৩০-২২] ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনিই তাকে মনের ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন।’ [সূরা আর রাহমান: ৩-৪] পৃথিবীতে মানুষের এই বৈচিত্র্য কোনোদিনই লুপ্ত হবে না। এ বৈচিত্র্যই মানুষের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয়ের আগ্রহ আর অন্যকে জানার কৌতুহলের কারণ। এ বৈচিত্র্য মানুষের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন নয়, বরং আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ। মানুষের মর্যাদা হলো তাকওয়ার গুণে গুনান্বিত হওয়ায়। আল্লাহকে ভয় করে চলায়। আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তিই অধিক মযার্দসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী। ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে। যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী।’ [সূরা হুজুরাত: ১৩] মিনার ময়দানে শুধুমাত্র এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর জন্য রক্ত-বর্ণ-দেশ-ভাষা-গোত্র নির্বিশেষে মানুষের একসাথে অবস্থান এই শিক্ষাই তুলে ধরে যে মানুষকে শুধুমাত্র আল্লাহর ‘ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে ‘আমি মানুষ ও জিন্ন সৃষ্টি করেছি এজন্যে যে তারা আমারই ইবাদাত করবে।’ [সূরা যারিয়াত: ৫৬] এবং রক্ত-বর্ণ-দেশ-ভাষা ও গোত্র ভিত্তিক মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কোনো ধারণা ইসলামে নেই।
আরাফার ময়দানে হাজির হওয়া: ইহরামের দু’টুকরো সাদা কাপড়ে আরাফাহ্-র ময়দানে হাজির হওয়া এবং উকুফ করা বা অবস্থান করার মাধ্যমে হজ্জে রত নারী-পুরু¬ষরা কার্যতঃ এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যে, ‘হে আল্লাহ! আপনার সন্তোষ অর্জনের জন্য জীবনের সব আড়ম্বর বিসর্জন দিতে পারি। জীবনের সব ক্ষেত্রে সাদা ও শুভ্রতার রং ধারণ করতে পারি।’ আল্ল¬াহর মেহমানরা আরাফাহর উকুফ থেকে এ শিক্ষাই অর্জন করেন, যেমন আল্লাহ তাঁর পবিত্র কিতাবের সূরা বাকারায় উল্লে¬খ করেছেন: ‘আমরা গ্রহণ করলাম আল্ল¬াহর রং; রঙে আল্লাহ অপেক্ষা কে অধিকতর সুন্দর? এবং আমরা তাঁরই ‘ইবাদাতকারী।’ [সূরা বাকারা: ১৩৮]
মুজদালিফায় রাত্রি যাপন করা: শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সামর্থ্যের অধিকারী বিশ্বাসী নর-নারীর জন্য আল্লাহ তা‘য়ালা হজ্জ ফরয করেছেন। আল্ল¬াহ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাবার সামর্থ আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ্জ সম্পন্ন করা তার একান্ত কর্তব্য। ’ [সূরা আলে-ইমরান: ৯৭] এসব সামর্থ্যবান মানুষেরা ব্যক্তিগত জীবনে শখ করেও কখনও রাস্তায় কিংবা মাঠে-ঘাটে, খোলা আকাশের নীচে রাত্রিযাপন করেননি। কিন্তু শুধু আল্লাহর জন্য এসব সামর্থ্যবান মানুষেরা মুযদালিফায় খোলা আকাশের নীচে মাঠে-ঘাটে, রাস্তায়, পাহাড়ের ঢালে পরম আনন্দে রাত্রি যাপন করেন। মুযদালিফায় আল্লাহর মেহমানদের রাত্রি যাপন থেকে এ শিক্ষাই হৃদয়ে অংকিত হয়, যেমন আল্লাহ তাঁর পবিত্র কিতাবের উল্লেখ করেছেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মু‘মিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে যে,) তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। অতএব তারা মারে ও মরে। (সূরা আত-তওবা: ১১১)
জামারায় কংকর নিক্ষেপ করা: হে আল্লাহ! আপনার আদেশই শিরোধার্য। আপনার খুশীর জন্যই অবাধ্যতার প্ররোচনার ও উৎসের বিরুদ্ধে জীবনের বিনিময়ে হলেও প্রতিরোধ গড়ি। ইবলিস বা শাইতান বা খান্নাস হলো মানুষের অন্তরে অন্তরে প্ররোচনা দানকারী শক্তির নাম। আল্লাহর আদেশের অবাধ্যতার জন্য যার পতন হয়েছিল। এখন স্থান-কাল-পাত্র ও ধর্ম-বর্ণ-গোত্র তথা হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, ইহুদী, মুসলিম নির্বিশেষে মানুষের অন্তরে সুচতুরতার সাথে প্ররোচনা দানকারীর ভূমিকায় সে নিয়োজিত। আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার জন্য শাইতানের এই প্রচারণার ভূমিকায় রয়েছে কিছু মানুষও। যেমন আল্লাহ সূরা নাস-এ বলেছেন: ‘বল, আমি আশ্রয় চাই আত্মগোপনকারী কু-প্ররোচনাদাতার অনিষ্ট হতে। যে কু-প্ররোচনা দেয় মানুষের অন্তরে। জিনের মধ্য হতে কিংবা মানুষের মধ্য হতে।’ [সূরা আন-নাস: ৪-৫]
ইবরাহীম (আঃ) এর ওপর আল্লাহর স্বপ্নাদেশ ছিল পুত্র ইসমাঈল-কে আল্লাহর জন্য কুরবানী করার। আল্লাহর আদেশকে বাস্তবায়ন করতে পিতা-পুত্র উভয়ই যখন সম্মত, তখন আল্ল¬াহর সে আদেশের অবাধ্যতার জন্য প্ররোচনাকারীর ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করলো আত্মগোপনকারী খান্নাস বা শাইতান। ইসমাঈল (আঃ) শাইতানের প্ররোচনাকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে শাইতানের দিকে কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন এবং আল্লাহর আদেশকে জীবনের বিনিময়ে হলেও বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত করলেন। আল্লাহর আদেশের অবাধ্যতার প্ররোচনাদানকারী শাইতানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার ইসমাঈল (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত এ শিক্ষাই মানবজাতির জন্য স্মারক হয়ে আছে যে, বাস্তব জীবনে আল্লাহর সকল ধরণের আদেশ-নিষেধের অবাধ্যতার প্ররোচনা ও প্রচারণার বিরুদ্ধে সাধ্যমত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং জীবন ও সময়ের কুরবানীর মাধ্যমে নিজের প্রবৃত্তিকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের একান্ত অনুগত করা প্রত্যেক বিশ্বাসী মু‘মিন-মু‘মিনার কর্তব্য। আল্লাহর এ সব মু‘মিন-মু‘মিনাদের ভালবাসেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ইআল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন যারা তাঁর পথে সীসাঢালা প্রাচীরের মত ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করে।’ [সূরা আস-সফ: ৪]
মাথা মুন্ডন করা: মাথা মুন্ডন করা হজ্জ সম্পন্নের নিদর্শন। সামাজিক বা প্রকাশ্য ‘ইবাদাতগুলোতে নিদর্শন রাখা বা থাকা ইসলামে বৈধ। যেমন, বিয়ে; মেহেদীর রং কিংবা ওয়ালিমা করা, বিয়ে করার পর নারী কিংবা পুরুষের তেমনি একটি নিদর্শন। হজ্জ এমন একটি ‘ইবাদাত যা দৈহিক, মানসিক, আর্থিক এবং সামাজিকও। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, ‘তোমাদের কেউ কেউ মাথা মুন্ডন করবে ও কেউ কেউ চুল ছোট করবে। আল্লাহ তা‘য়ালার নিদের্শ অনুসারে হাদী বা কুরবানীর প্রাণী যবেহ্ করার [সূরা আল-ফাতাহ: ২৭] পর হাজ্জ সম্পন্নের নিদর্শন হিসেবে রাসূল সা. নিজে মাথা মুন্ডিয়েছিলেন। [সহীহ মুসলিম] নারীদের ক্ষেত্রে মাথা মুন্ডন করতে হবে না। [সুনানে আবু দাউদ] বরং নারীদের ক্ষেত্রে হাতের এক আঙ্গুলের এক কড়া পরিমাণ চুল কেটে ফেললেই যথেষ্ট হবে।
সমাপনী: হজ্জের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতাকে পর্যালোচনা করলে আল্লাহর সন্তোষকেন্দ্রিক জীবনকে ঢেলে সাজানোর শিক্ষাই আমরা তাতে খুঁজে পাই। আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ ও উমরা পূর্ণকারীকে আল্লাহ তা‘য়ালা তাঁর মেহমান হিসেবে অভিহিত করেছেন। হজ্জের ফজিলত পেতে হলে হজ্জের জন্য আল্লাহর দেয়া শর্তসমূহ পূরণ করার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আল্লাহর জন্য হজ্জ ও ‘উমরাহ সম্পন্নকারী ব্যক্তিকে নিবিড় মনোযোগী হতে হবে। যাতে করে হজ্জের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জিত হয়। আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জের মহাসম্মেলনে অংগ্রহনের তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ
৫৩
৯২ মন্তব্য