সিনিয়র শিক্ষক
৩০ জুন, ২০২৩ ১২:২৪ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
কেয়ার গিভিং
মানবসেবা মহৎ ধর্ম। আমাদের পরিবারে শিশু, বয়স্ক সদস্য বা শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম (স্থায়ী বা অস্থায়ী) কেউ যখন স্বাভাবিক রুটিন কাজগুলো করতে অক্ষম হয় তখন তাদের প্রিয়জনদের সেবার ওপর নির্ভর করতে হয়। তাদের পরিচর্যা বা যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমনকি হাসপাতাল বা নার্সিং হোমে চিকিৎসা গ্রহণ করার পরেও প্রিয়জনদের দ্বারা তাদের যত্ন প্রদান অব্যাহত রাখতে হয়। এই যত্ন বা সেবা প্রদান কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদিও হতে পারে।
কেয়ার গিভিং হলো একটি সেবামূলক কার্যক্রম। বৃহত্তর অর্থে কোনো ব্যক্তি বা প্রাণির সঠিক ও কার্যকর উপায়ে যত্ন বা সেবা প্রদান করার যে কৌশল বা কার্যক্রম তাই হলো- কেয়ার গিভিং। আর যিনি সেবা প্রদান করেন বা এই দায়িত্বপালন করেন তাকে কেয়ার গিভার বলা হয়। এই দায়িত্ব যে কেউ নিতে পারেন; যেমন- পিতামাতা, শিক্ষক, প্রাথমিক যত্নের শিক্ষাবিদ, শিশু যত্ন প্রদানকারী, আয়া, ঠাকুরমা, পারিবারিক বন্ধু, কোচ কিংবা আমরাও।
আমাদের দেশের সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের গড় আয়ুষ্কাল ছিল ৪৫ বছর অর্থাৎ গড়ে মানুষ ৪৫ বছর বেঁচে থাকতো। বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭৩ বছর হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আমাদের দেশে বয়স্ক ব্যক্তির সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। বয়স্ক ব্যক্তিদের দেখাশোনার জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেখানে গড় আয়ুষ্কাল অনেক বেশি, সেসব দেশে অনেক কেয়ার গিভারের প্রয়োজন হয় এবং কেয়ার গিভার সেখানে একটি সম্মানজনক পেশা। আমাদের দেশেও অদুর ভবিষ্যতে অনেক কেয়ার গিভার প্রয়োজন হবে। আবার প্রতিটি পরিবারে বয়স্ক ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে নিজেদেরও কেয়ার গিভারের কাজ শিখে নিতে হবে, পরিবারের প্রিয় মানুষদের সেবাযত্ন করার জন্য।
কেয়ার গিভিং-এর তিনটি ক্ষেত্র। এগুলো হলো-
ক. ব্যক্তিগত পরিচর্যা
খ. স্বাস্থ্য পরিচর্যা
গ. সামাজিক পরিচর্যা
ক. ব্যক্তিগত পরিচর্যা
ব্যক্তিগত পরিচর্যার মধ্যে রয়েছে -বিছানা প্রস্তুত করা, বিছানা থেকে তোলা বা উঠানো, দাঁত মাজানো, বাথরুমে নিয়ে যাওয়া, হাত ধোঁয়ানো, তেল-লোশন/ঔষধ মাখানো/মালিশ করা, শরীর ম্যাসাজ করা ও চুল আঁচড়ানো, হাত ও পায়ের নখ কাঁটা ইত্যাদি।
খ. স্বাস্থ্য পরিচর্যা
সাধারণ স্বাস্থ্য পরিচর্যার মধ্যে রয়েছে- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষুধ সেবন, জ্বর পরিমাপ (সাধারণ থার্মোমিটার ও ডিজিটাল থার্মোমিটার), ডায়াবেটিস ও প্রেসার মাপা ইত্যাদি।
গ.সামাজিক পরিচর্যা
“একজন ব্যক্তির জন্য শুধুমাত্র শারীরিক পরিচর্যাই সব নয়, তাকে সুস্থ রাখার জন্য অনেক ধরনের মানসিক সহায়তাও প্রয়োজন হয়। সামাজিক বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিতে হয়। যেমন- ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক পরিবেশে, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, তাদের সাথে খেলাধুলা করা, খবরের কাগজ ও বই পড়ে শোনানো, টেলিভিশন দেখা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অন্যান্য আপনজনদের সাথে যোগাযোগ করতে সহায়তা করা, পার্কে বা কোনো খোলা মাঠে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া, কেনা কাটায় সাহায্য করা ইত্যাদি'।
আজকের এই বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে কেয়ার গিভারের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন রোবট আমাদের অনেক কাজ করে দিলেও কেয়ার গিভিং এর জন্য যে মমতা, সহমর্মিতা ও আবেগের প্রয়োজন হয়, রোবটের তা নেই । অর্থাৎ মানবিক ভালোবাসা চাই মানুষের জন্য। তাই কেয়ার গিভিং এর চাহিদা সব দেশেই দ্রুত বেড়ে চলেছে।
আমাদের প্রতিদিনের চলার পথেও অনেক শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ কেউ সামনে পড়তে পারে, তাৎক্ষণিকভাবে যার সাহায্য প্রয়োজন। এমন কোনো মুহূর্ত সামনে এলে আমরা অবশ্যই এগিয়ে যাব এবং সাহায্যের হাতটি বাড়িয়ে দিব। এক মুহূর্তের সাহায্য হয়ত তাকে অনেক বড় কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারে। আমরা সর সময় মনে রাখব, এই পৃথিবীতে কেউই চিরস্থায়ী সুস্থতা নিয়ে জন্মায় না। যেকোনো সময় যে কারও শারীরিক বা মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমরা একে অন্যের জন্য মমতা নিয়ে পাশে দাঁড়ালে একদিন অন্যরাও হয়তো আমাদের দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়াবে। তাই চলো, আমরা সবাই মিলে একটি মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলি; মমতা ও ভালোবাসা নিয়ে পরিবার ও সমাজের পাশে দাঁড়াই ।
৫৩
৯১ মন্তব্য