সহকারী শিক্ষক
০১ জুলাই, ২০২৩ ০৪:২৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
৬৭৬ জন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হলেন টাঙ্গাইলের শহীদুল ইসলাম লালু। তিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে মহান স্বাধনীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছিলেন।
তার বাবার নাম মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, মাতা আমিনা বেগম। তিনি চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন।
ছোট বেলা থেকেই অত্যন্ত সাহসী ও দুরন্ত ছিলেন শহীদুল। নিজ এলাকা গোপালপুরে পাক-হানাদার বাহিনী আসলে স্থানীয়রা প্রাণভয়ে এলাকা ছাড়া শুরু করলে কিশোর শহীদুল ইসলামও স্বজনদের সঙ্গে পালিয়ে বর্তমান ধনবাড়ী উপজেলার কেরামজানী নামক স্থানে আশ্রয় নেন।
দুরন্ত লালুর সঙ্গে স্থানীয় বাজার ও স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পরিচয় হয়।
মুক্তিযোদ্ধাকালীন কমান্ডার কাজী হুমায়ুন আশরাফ বাঙাল ও আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী তাঁকে সঙ্গে নেন। তারপর থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ফুট-ফরমায়েশের কাজে লেগে যান।
মুক্তিযোদ্ধাদের চা-পানি খাওয়ানোর পাশাপাশি মাঝে মধ্যে অস্ত্র পরিষ্কারের কাজও করতেন।
এভাবেই অস্ত্র ধরা শেখেন কিশোর শহীদুল। সপ্তাহ খানেক পর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ট্রেনিং করার জন্য ভারত চলে যান। ভারতে গিয়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করে অস্ত্র হিসেবে স্টেনগান ও গ্রেনেড পান।
ট্রেনিংয়ের সময় ভারতের তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণকালে ভারতীয় বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সমজিত সিং শহীদুল ইসলামেকে আদর করে লালু ডাকতেন।
সেই থেকে শহিদুল ইসলামের নাম হয়ে যায় শহিদুল ইসলাম লালু। যুদ্ধের পরবর্তীতে তিনি লালু নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে ছিলেন।
এই লালু ভারতের তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় হুইসেল বাজিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে জাতীয় সংগীত গেয়ে পতাকা উঠাতেন ও নামাতেন।
যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে যখন ভারতীয় বাহিনী ঢুকে তখন জগতজিৎ সিং অরোরাকে স্বাগত জানানো মুক্তিযোদ্ধাদের দলে লালুও ছিলেন।
যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যখন টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কাদেরিয়া বাহিনীর সকল যোদ্ধা অস্ত্র জমা দিচ্ছিল, তখন শহীদুল ইসলাম লালুও তার ব্যবহৃত স্টেনগানটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধু অবাক হয়ে শহীদুল ইসলাম লালুর পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন ‘সাব্বাস বাংলার দামাল ছেলে।’ তারপর যখন সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে লালুর বাংকার ধ্বংসের কাহিনী শুনলেন তখন বঙ্গবন্ধু তাকে আদর করে কোলে তুলে নিয়ে ‘বীর বিচ্ছু’ আখ্যা দেন।
তারপর বঙ্গবন্ধু তাকে মঞ্চে শেখ রাসেলের পাশে নিয়ে বসান। অতঃপর আরো অনেকের মত বিস্মৃত হন বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম লালু। যদিও ৭৩ সালের গেজেটে লালুকে বীরপ্রতীক উপাধি দেয়া হয় কিন্তু জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়া লালু তার বীরপ্রতীক খেতাব প্রাপ্তির খবর জানতে পারেন ২৫ বছর পর ১৯৯৮ সালে বিজয়ের রজত জয়ন্তিতে।
তাকে যখন এই খবর জানানো হয় জীবনযুদ্ধে পড়াজিত তিনি তখন মিরপুরের কোন এক ছাপড়া হোটেলে ডালপুরি ভাজছিলেন।
তারপরও তার ভাগ্য বদলায় নি, মানবেতর জীবনযাপন করে চার সন্তানের জনক বঙ্গবন্ধুর বীরবিচ্ছু ও দেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক শহীদুল ইসলাম লালু ২০০৯ সালের ২৫ মে দু’টি কিডনি নষ্ট হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এ বীরমুক্তিযোদ্ধার মরদেহ মিরপুরেই সমাহিত করা হয়।
তথ্যঃ সংগৃহীত।
০
০ মন্তব্য