Loading..

ব্লগ

রিসেট

০১ জুলাই, ২০২৩ ১০:২৭ অপরাহ্ণ

জীবনানন্দের কবিতায় প্রেম ও পরাবাস্তবতা।

জীবনানন্দের কবিতায় প্রেম ও পরাবাস্তবতা

১৯২৪ সালে ফরাসি কবি আঁদ্রে ব্রেতোঁর ‘মেনিফেস্টো অন সুররিয়েলিজম’ নামক দলিলটি প্রকাশিত হওয়ার পর ‘পরাবাস্তবতা’ শব্দটি এসেছে। এই আন্দোলনটি মূলত ফ্রান্সে শুরু হয়েছিল। ডাডাবাদ থেকেই এই ধারার শুরু। ডাডাবাদের মূল কথা হলো- কোনো বিধি নিয়ম এবং যুক্তি না মেনে অবচেতন মনকে শিল্প-সাহিত্যে রূপায়িত করা। ডাডাবাদীদের মতে, স্বপ্নই বাস্তবের প্রতিরূপ। এককথায় বিধিনিয়ম ও যুক্তিতর্কের গণ্ডির বাইরে অবচেতন মনকে রূপায়িত করাই হলো পরাবাস্তবতা।

বিশ শতকের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, জীবনের নানা জটিল সমীকরণ, অবসাদ, নৈরাশ্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা কবি জীবনানন্দের ব্যক্তি জীবন যেমন আলোড়িত হয়েছে, তেমনি তাঁর কবিতাও সমৃদ্ধ করেছেন এসব উপাদানে।

রবীন্দ্রযুগে জন্মগ্রহণ করেও রবীন্দ্র সাহিত্যের ভাবধারার বাইরে গিয়ে যে কজন কবি (১. অমিয় চক্রবর্তী, ২. বুদ্ধদেব বসু, ৩. জীবনানন্দ দাশ, ৪. বিষ্ণু দে, ৫. সুধীন্দ্রনাথ দত্ত) আধুনিক সাহিত্য ধারার সৃষ্টি করেছিলেন, তাদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ অন্যতম। এই পাঁচজন কবিকে পঞ্চপাণ্ডব বলা হয়। এই পঞ্চপাণ্ডবেরা প্রত্যেকেই আলাদা ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন।

জীবনানন্দের সাহিত্যেও পাই আলাদা স্বাদ, আলাদা গন্ধ। তিনি জীবনকে রূপায়িত করতে মিশে গেছেন প্রকৃতিতে, ডুব দিয়েছেন ইতিহাসে, তুলে এনেছেন ঐতিহ্যকে। আর এভাবেই তিনি বাস্তব জীবনের নৈরাশ্য থেকে মুক্তি পেতে আশ্রয় নিয়েছেন পরাবাস্তবতায়। প্রেম-প্রীতি আর স্নেহ-ভালোবাসায় জীবন বাঁচে, বাস্তব জীবনে যখন এর সঠিক সমীকরণ হয় না, তখন তিনি আশ্রয় খুঁজেছেন পরাবাস্তব জগতে। যেখানে দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, নেই হতাশা। আর এভাবেই জীবনানন্দের কবিতায় প্রেম আর পরাবাস্তবতা হয়েছে একাকার।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে উত্থিত গীতিকবিদের (দেবেন্দ্রনাথ সেন, গোবিন্দচন্দ্র দাস, কায়কোবাদ, অক্ষয়কুমার বড়াল প্রমুখ) সমবয়সী রবীন্দ্রনাথ সমবয়সীদের মতো অজস্র প্রেমের কবিতা লিখলেও ওদের মতো গার্হস্থ্য প্রেমের কবি ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুতে কর্তব্যবোধের তাগিদে ‘স্মরণ’ নামক কবিতা লিখেছিলেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কোনো কোনো প্রেমিকার কথা জানা যায়। কিন্তু জীবনানন্দের ওরকম কোনো নারীসংস্পর্শ ঘটেছে, এমনটা জানা যায় না। একমাত্র যে রমণীর সংস্পর্শে এসেছিলেন, তিনি হলেন তাঁর স্ত্রী লাবণ্য দাশ। মিনু সরকার লিখেছেন, “লাবণ্য দাশ, জীবনানন্দের স্ত্রীও আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। তাঁর মুখে জীবনানন্দ সম্বন্ধে অনেক অভিযোগ শুনেছি। ...লাবণ্য দাশের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে আমার অসুবিধে হয়নি যে জীবনানন্দের বিবাহিত জীবন যেমন সুখের ছিল না, তেমনি সুখের ছিল না লাবন্য দাশের দাম্পত্য জীবনও।” (‘ঘরোয়া জীবনানন্দ’, ‘কোরক’, জীবনানন্দ-সংখ্যা, শারদীয় ১৯৯৪)। বিনয় মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘একদিন হঠাৎ (জীবনানন্দ) আমায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যদি স্ত্রী আপনার আমন্ত্রণে ঘনিষ্ঠ হবার প্রস্তাবে সায় না দেয় কি করবেন? কি করা উচিত? দাম্পত্য সম্পর্কের যে অস্বাভাবিকতার বীজ এই প্রশ্নটির মধ্যে রয়েছে সেই অস্বাভাবিকতা কবির পারিবারিক জীবনে লক্ষ্য করেছিলাম। আমি নির্মন্তব্যে শুনে যেতাম। (‘অগ্রজ কবি জীবনানন্দ’ঐ)

জীবনানন্দের ব্যক্তি জীবনের অস্বাভাবিকতা ও বিরূপ, দুর্বোধ্য পরিণতি থেকে উৎসারিত পরাবাস্তবতা ও প্রেমের কবিতা। যদিও এগুলোতে নেই কোনো শরীরী সংরাগ। অদ্ভুদ এক বোধের জগৎ রয়েছে তার কবিতায়।

প্রেম, মৃত্যু এবং পরাবাস্তবতা একসঙ্গে খেলা করেছে  ‘তরুণীর দুধ-ধবধবে বুকে সাপিনীর দাঁত উঠেছে রেঙে’ (চাঁদনীতে-ঝরা পালক)। আবার,

‘অশ্রুর অঙ্গারে তার নিটোল ননীর গাল,-হারায়েছে রুলি

এলোমেলো চুল খ’সে গেছে খোঁপাতার-বেণী গেছে খুলি!

সাপিনী মত বাঁকা আঙুলে ফুটেছে তার কঙ্কালের রূপ,

ভেঙেছে নাকের ডাঁশা,-হিম স্তন,-হিম রোমকূপ।’(ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল-ঝরা পালক)

‘বনলতা সেন’ এ আমরা দেখতে পাই ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ তিনি বর্তমান ও বাস্তব ছেড়ে হেঁটেছেন ইতিহাসের পথেসেখানে খূঁজে পেয়েছেন বনলতা সেনকে।তার প্রেম, তার আনন্দ, তার বেদনা স্থান কাল ছাপিয়ে মহাকালকে স্পর্শ করেছে।

তিনি ধূসর প্রিয় মৃতমুখগুলোকে দেখেছেন নক্ষত্রের মাঝে। আবার এশিরিয়ায়, মিশরে, বিদিশায় প্রসঙ্গ এনে মরে যাওয়া রূপসীদের কথা এনে জীবনের জয়গান করেছেন। যারা কাতারে দাঁড়িয়ে আছে। এই যে পরাবাস্তবতার এক অদ্ভুত জগৎ সৃষ্টি হয়েছে কবির অবচেতন মনে।
বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতায় পাওয়া যায় পরাবাস্তবতার প্রকাশ। কবি প্রথম লাইনেই বলেছেন,
হাজার পথ ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।”
এ পথ যেন বাস্তবতার পথ নয়, অতিবাস্তবের এক পথের কথা নির্দেশ করেছেন কবি। আবার বলেছেন,
অনেক ঘুরেছি আমি, বিম্বিসার আশোকের ধূসর জগতে।
তিনি প্রেয়সীর চুলকে তুলনা করেছেন অন্ধকার বিদিশার নিশার সাথে। মুখের সৌর্ন্দয হয়েছে শ্রাবস্তীর কারুকার্য। কবি যেন একেক লাইনে সৃষ্টি করেছেন পরাবাস্তবতার জগৎ। যেখানে প্রেয়সী পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে বলে, “এত দিন কোথায় ছিলে?”
কবি ‘বনলতা সেন’ কাব্যে ‘নক্ষত্র’ শব্দটিকে পরাবাস্তবতার একটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এভাবে এই কাব্যের কবিতাগুলিতে কবি যে চিত্রকল্প তৈরি করেছেন তা যুক্তিগ্রাহ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু কী সুশৃঙ্খল। মনকে দুর্নিবার আকর্ষণ করে। সার্থক পরাবাস্তবতার এক জ্বলজ্বলে উদাহারণ। তিনি সার্থক পরাবাস্তবতার মাধ্যমে এমন এক চরিত্র অংকনে সামর্থ্য হয়েছেন যা আমাদের চেতনার মধ্যে প্রবেশ করে আমাদের আত্মাকে নাড়া দেয়।
রোমাণ্টিক কবিদের মতো অধরা সৌন্দর্যের পিয়াসী তিনি নন। তাই তিনি বাস্তবের সীমা অতিক্রম করে মগ্ন চৈতন্যে পরাবাস্তবকে খুঁজছেন। গাণিতিক মাপকাঠিতে যেমন কাব্যের রস পরিমাপ করা যায় না, তেমনি বাস্তবের দিনপঞ্জী দিয়ে পরাবাস্তবকে ছোঁয়া যায় না। বাস্তবকে অতিক্রম করে গিয়েই পরাবাস্তবতার সূচনা।

প্রেম, মৃত্যু ও পরাবাস্তবতা ‘বনলতা সেন’ এর মতো আর কোনো কবিতায় ওতোপ্রোত হয়ে নেই। কবির সাথে বনলতা সেনের মিলন হয় ‘ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন’; ‘হায় চিল’ কবিতায় ভিজে মেঘের দুপুরে নিঃসঙ্গ চিলের মতো কবিও একাকী নিঃসঙ্গ তার দয়িতার জন্য, যে ‘রাঙা রাজকন্যাদের মতো রূপ নিয়ে দূরে চলে গেছে’। ‘শঙ্খমালা’ কবিতায় চরম পরাবাস্তবতার পরাকাষ্ঠা। তার আকাঙ্ক্ষিতা শঙ্খমালা প্রেতিনী: ‘কড়ির মতন সাদা শাদা মুখ তার,/দুইখানা হাত তার হিম;/ চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম চিতা জ্বলে’।

‘ধান কাটা হয়ে গেছে’, ‘সুদর্শনা’, ‘তুমি’ এই কবিতাগুলোতে তার নায়িকারা স্পষ্টতই মৃত। আর মৃত্যুত্তর মিলনের কবিতা ‘দুজন’ ও ‘অঘ্রান প্রান্তরে’।

‘এখানে মরণশীল হংস নেই আর;

আর পাখপাখালির নীড় নেই গাছে;

এখানে পৃথিবী নেই, সৃষ্টি নেই, তুমি

আমি আর অনন্ত বৃক্ষ আছে!’                [অমৃতযোগ, সুদর্শনা]

প্রকৃতি জীবনানন্দের কবিতায় প্রেম ও পরারবাস্তবতার পটভূমি। ব্যক্তি-প্রেম যেন প্রকৃতির প্রবাহমানতায় লীন হয়েছে।

‘মনে হয় তুমি যেন ঐ পাখি- তুমি ছাড়া সময়ের উদ্ভাবনে

আমার এমন কাছে – আশ্বিনের এত বড় অকূল আকাশে

আর কাকে পাব এই সহজ গভীর অনায়াসে-

......................................................

প্রকৃতিস্থ প্রকৃতির মতো শব্দে- প্রেম অপ্রেম থেকে দূরে’।       [তুমি]

আবার

আমি যদি হতাম’ কবিতায়, কবি মানব জন্ম ছেড়ে প্রকৃতিতে লীন হতে চেয়েছেন, সমকালের দাহ , যন্ত্রনা, জীবনের টুকরো টুকরো মৃত্যুর কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন প্রকৃতির মধ্যে প্রেমের পরাবাস্তবতায় এভাবেই-

‘আমি যদি হতাম বনহংস,/বনহংসী হতে যদি তুমি;

কোন এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারে/ধানক্ষেতের কাছে

..........................................................................

তোমার পাখনায় আমার পালক, আমার পাখনায়তোমার রক্তের স্পন্দন-

.......................................

হয়তো গুলির শব্দ আবার/ আমাদের স্তব্ধতা/ আমাদের শান্তি

আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো মৃত্যু আর থাকত না;

থাকত না আজকের জীবনের টুকরো টুকরো সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার’।

জীবনানন্দ দাশ হৃদয়বাদী ও মননশীল কবি। তার প্রেমে না আছে শারীরিকতা ,না আছে আধ্যাতিকতা- সব কিছুর উর্ধ্বে মানবিকবোধ ও এর থেকে সমকালের যে বিচ্ছিন্নতা তাই মিশে কবি হয়ে উঠেছে পরাবাস্তববাদী এক মানবিক প্রেমিক কবি; যিনি প্রকৃতি ,প্রেম, ও বাস্তবোত্তর জগতের বোধ নির্মিত এক শ্রেষ্ঠ কবি হয়ে উঠেছেন।  

                                              

কিছু তথ্যঋণ: আব্দুল মান্নান সৈয়দ

                                                জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্র।

মন্তব্য করুন

ব্লগ