সহকারী শিক্ষক
১১ জুলাই, ২০২৩ ০৯:২৯ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
যেদিন আমি হারিয়ে যাব বুঝবে সেদিন বুঝবে -
কবি নজরুলের
বাকরূদ্ধ হবার দিন আজ
মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম আকস্মিকভাবে বাকরুদ্ধ হন ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই আজকের দিনে।
সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীন তাঁর আত্মকথায় নজরুলের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, "নজরুলের শেষ লেখাটিও ছাপা হয়েছিল সওগাতেই। এ সময় একে ফজলুল হক একটা পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নেন।
সম্পাদক হিসেবে সবাই নজরুলের নাম প্রস্তাব করেন। তিনি রাজিও হয়ে যান। কিন্তু এ সময়ে তাঁর অসুখ শুরু হয়ে যায়।
ফজলুল হককে তাঁর শাশুড়ি গিরিবালা দেবী জানালেন ‘জামাই’কে (নজরুল) তো এখন আর বাইরে যেতে দিই না। কারণ রাতে ও ঘুমায় না। শুধু গুনগুন করে গান গায়। ভালো লক্ষণ মনে হচ্ছে না। আপনি যখন এসেছেন নিয়ে যান।
হক সাহেবের ওখানে আর কাগজ চালাতে পারেননি নজরুল। এভাবেই উচ্ছ্বল নজরুল নীরব হয়ে যান। সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে যান।
এভাবেই সুদীর্ঘ ৩৪টি বছর ধরে ১৯৪২-১৯৭৬ সাল পর্যন্ত আয়তনয়নে কবি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছেন। কোনো কথা বলতে পারেননি। ফুলের জলসায় চিরকালের মতোই কবি একেবারে নীরব হয়ে গেলেন।"
ড. বাগচী অসুস্থ নজরুল সম্পর্কে বলেন, ‘‘নজরুলের অসুস্থতার লক্ষণ যখন প্রথম প্রকাশ পায় তখন বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয় নি। বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী প্রমীলা নজরুল যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর দেখা যায় নজরুল হঠাৎ ‘কালী সাধনা’ শুরু করেছেন।
অনেকেই এটাকে ধরে নেন তাঁর ‘মানসিক বৈকল্য’ হিসেবে। গেরুয়া পোশাক আর মাথায় গেরুয়া টুপি ছিল তাঁর তখনকার পরিধেয় বস্ত্র। সেই সময় তিনি মাঝে মাঝে গ্রামোফোন কোম্পানীতে গান গাওয়ার সময় একটু-আধটু বেসুরো হতে থাকেন। অবশ্য ধরিয়ে দিলে ভুল বোঝেন এবং সংশোধনের চেষ্টাও করেন।
কিন্তু পুরোপুরি অসুস্থ হবার পর ১৯৪২ সালে তিনি সব কিছুর বাইরে চলে যান। কোনো কিছুই আর ঠিকমতো ধরে রাখতে পারেন না। এরূপ লক্ষণ তাঁর সে সময় প্রকাশ পায়।
ড. বাগচী আরও বলেছেন, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম অসুস্থ ও বাকশক্তি রুদ্ধ হবার পর হতে কোনো চশমাধারী লোককে কখনই সহ্য করতে পারতেন না। চশমাধারী লোক তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হলে তৎক্ষণাৎ উত্তেজিত হতেন ও অস্বস্তি বোধ করতেন।
ড. অশোক বাগচীর ধারণা নিশ্চই কোনো চশমাধারী লোকই সে সময় তাঁর বড় ধরনের ক্ষতি করে দিয়েছিলো যা তাঁর মস্তিষ্কের মধ্যে স্থায়ীভাবে দাগ কেটে দেয়’’।
ড. বাগচী নজরুলের অসুস্থতার অন্য সমস্ত কারণকে অস্বীকার করে একথা বলেছেন যে, কবির ‘স্নায়বিক বৈকল্য’ সম্পর্কে ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের চিকিৎসার মতামতটাই যথার্থ ছিলো বলে তিনি মনে করেন।
তখন তাঁকে ভারতের রাঁচি ও বিহারের মধুপুরে পাঠানো এবং অন্যান্য মানসিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োগ তাঁর অসুস্থতাকে বরং বাড়তেই সাহায্য করেছে বলে তিনি মনে করেন।
নজরুলের মস্তিষ্কের প্রথম আধুনিক পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে তাঁর উদ্যোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।
সেই ১৯৫৩ সালে ভিয়েনার যে বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসকবৃন্দ যৌথভাবে নজরুলের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন ভিয়েনার বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট স্যার রাসেল ব্রেইন, নিউরো সার্জন ড. ওয়েলি ম্যাকিসক এবং বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. উইলিয়াম সার্জেন্ট।
ড. অশোক বাগচীও ছিলেন যৌথভাবে তাদের সঙ্গে। ঐ পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে নজরুলের ব্যাধি মানসিক বৈকল্য নয়।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই নজরুল প্রথম বাকশক্তি হারান। এরপর থেকে তাঁর যত রকমের চিকিৎসা করা হয়েছে সব চিকিৎসাই ছিলো ভুল ও ব্যর্থ।
একমাত্র ডা. বিধান চন্দ্র আশঙ্কা করেছিলেন নজরুল ‘স্নায়ু বৈকল্যে‘ আক্রান্ত হয়েছেন যার অনিবার্য পরিণতি আলঝেইমার্স ডিজিজ।
কিন্তু নজরুলের জন্য সে সময় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড ডা. বিধান চন্দ্রের সুপারিশ কোনক্রমেই গ্রহণ করে নি।
ড. অশোক বাগচীর মতে ১৯৩৯ সালে নজরুলের মধ্যে যখন প্রাথমিকভাবে এই রোগের লক্ষণ ধরা পড়ে এবং সেই সময়ে যদি তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার সুব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো তবে নজরুলের সম্ভবত এই করুণ পরিণতি হতো না।
ভিয়েনার ডাক্তার যৌথভাবে মত প্রকাশ করেন, নজরুলের চিকিৎসার আর সময় নেই। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
তথ্যসূত্রঃ 'শিক্ষাবার্তা'
১০ জুলাই ২০১১
কৃতজ্ঞতা : মেসবা খান।
৭
৭ মন্তব্য