Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ জুলাই, ২০২৩ ১০:০৪ অপরাহ্ণ

সামপ্রতিক সময়ে ডেঙ্গু জ্বর মোকাবেলায় আমাদের সচেতনতা

ডেঙ্গু জ্বর ও আমাদের সচেতনতা

বর্তমানে যে রোগটি জাতীয় জীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে তা হলো ডেঙ্গু জ্বর। এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত ক্লাসিক্যাল বা হেমোরেজিক ধরনের তীব্র জ্বরকেই ডেঙ্গু জ্বর বলে। এটি রোগীর জন্যে তীব্র কষ্টদায়ক এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে। ২০০০ সালে এ জ্বরটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে মহামারি আকার ধরাণ করে। এডিস নামক এক প্রকার মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় (১৩.০৭.২০২৩) দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আরও ১ হাজার ২৩৯ জন ভর্তি হয়েছেন। এ সময় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন আরও ৫ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই হিসাব গতকাল বুধবার (১২.০৭.২০২৩) সকাল আটটা থেকে আজ বৃহস্পতিবার (১৩.০৭.২০২৩) সকাল আটটা পর্যন্ত। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৯৩ জন। এর মধ্যে জুলাই মাসেই এখন পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। (সুত্র: স্বাস্থ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট)

ডেঙ্গুজ্বর কি?

ডেঙ্গুজ্বর (Dengue) প্রধানত এশিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় এলাকার একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক ব্যাধি। ডেঙ্গু ভাইরাস Flaviviridae গোত্রভুক্ত, যার প্রায় ৭০ ধরনের ভাইরাসের মধ্যে আছে ইয়োলো ফিভার (yellow fever) ও কয়েক প্রকার এনসেফালাইটিসের ভাইরাস।

ডেঙ্গু জ্বরের কেন হয়?

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ডেঙ্গু ভাইরাস। ডেঙ্গু জ্বর চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের যে কোনো একটির কারণে হয়ে থাকে যা মশার কামড়ের মাধ্যমে রোগীর শরীরে ছড়ায়। স্ত্রী এডিস মশা ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে এবং সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তিতে বহন করে।

যদি কারও পূর্বে ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়ে থাকে, তবে দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হলে তাদের গুরুতর জটিলতা এবং ডিএসএস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বেশিবার সংক্রমিত হলে গুরুতর জটিলতার সম্ভাবনাও বেশি।

কখন ও কোথায় হয়?

গরম এবং বর্ষার সময়ই আমাদের দেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ বাড়ে। মূলত মে থেকে সেপ্টেম্বর এই পাঁচ মাস ডেঙ্গুজ্বরের মৌসুম বলা চলে। তবে শীতকালে সাধারণত ডেঙ্গুজ্বর হয় না। গ্রামাঞ্চলে যারা বসবাস করেন তাদের মাঝে তুলনামূলক ডেঙ্গুজ্বর কমই হয়। ডেঙ্গুজ্বরে বেশি আক্রান্ত হন শহর অঞ্চলের মানুষেরা। সাধারণত বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় যেখানে বড় বড় দালানকোঠা আছে সেসব জায়গার মানুষই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই ডেঙ্গুজ্বরে বেশি আক্রান্ত হন।

ডেঙ্গুর উপসর্গ

লক্ষণগুলি সাধারণত মশার কামড়ের 4-7 দিন পরে দেখা যায় এবং 10 দিন স্থায়ী হতে পারে। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে, লক্ষণ এবং উপসর্গগুলি সবসময় দেখা যায় না, বিশেষ করে হালকা সংক্রমণের ক্ষেত্রে। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত শতকরা ৮০ ভাগ রোগী থাকেন উপসর্গবিহীন। সামান্য জ্বরের মতো উপসর্গ থাকে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে (৫%) তা জটিল হতে পারে।

Ø ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর উপসর্গগুলো মারাত্মকভাবে প্রকাশ পায়।

Ø জ্বর আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ১০৫° ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠে।

Ø খাদ্যে অরুচি ও বমি বমি ভাব দেখা দেয়। বমিও হতে পারে।

Ø সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা দেখা দেয়। বিশেষ করে মেরুদণ্ড, হাড় ও মাথায় অসহ্য ব্যথা হয়।

Ø চামড়ার নিচে ও চোখের সাদা অংশে রক্ত জমাট বাঁধে। ঠোট, জিহ্বসহ মুখমণ্ডল রক্তিমাভ হয়ে ওঠে। শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যায়।

Ø রক্তচাপ নেমে আসে এবং পিপাসা বৃদ্ধি পায়।

Ø শরীরের অভ্যন্তরে, নাক, মুখ ও মলদ্বারে রক্তক্ষরণ হয়।

Ø প্রচণ্ড জ্বর ও রক্তক্ষরণে রোগী মারা পর্যন্ত যেতে পারে।

শিশু এবং অল্প বয়স্কদের মধ্যে, সংক্রমণ বেশিরভাগই হালকা থাকে এবং লক্ষণ এবং উপসর্গগুলি প্রায়শই ভাইরাল ফ্লাসের সাথে বিভ্রান্ত হয়। এটি নিজে থেকেই অদৃশ্য হয়ে যায়। যখন ব্যক্তি জীবনে প্রথমবার সংক্রমিত হয় তখন এটি হালকা হয়।

 

আমরা কিভাবে এটা প্রতিরোধ করতে পারি?

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধী টিকা কয়েকটি দেশে অনুমোদিত হয়েছে। তবে এই টিকা শুধু একবার সংক্রমিত হয়েছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কার্যকর। এডিস মশার কামড় এড়িয়ে চলাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায়। ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রথম ও প্রধান উপায় হলো এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধ করা। এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বৃষ্টির পানি ও পরিষ্কার পানি, ৪/৫ দিন জমে থাকা পানি হল এডিস মশার বংশ বিস্তারের স্থান। লার্ভা বেশির ভাগই পরিত্যক্ত টায়ার, বালতি, ফেলে দেওয়া নারিকেলের খোল, ফুলদানি, ফুলের টবের নিচের থালায় জমে থাকা পানিতে, এমনকি জমে থাকা গাছের গর্তে এবং এ ধরনের অন্যান্য প্রাকৃতিক স্থানে বড় হয়। পূর্ণবয়স্ক মশা সাধারণত ঘরের ভিতর অন্ধকার জায়গায়– আলমারি, বিছানা বা খাটের তলায় থাকতে পারে। এডিস মশা দিনের বেলা সক্রিয় থাকে তাই এরা সকালে এবং বিকালের শেষ দিকে বেশি কামরায়। তাই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দিনের বেলায় মশারি ব্যবহার করতে হবে। হাত পা যেন ঢাকা থাকে খেয়াল রাখতে হবে। ঘরের চারদিক পরিষ্কার পরিছন্ন রাখতে হবে। কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

মশার কামড় থেকে বাঁচাতে এই কয়েকটি সাধারণ টিপস:

দিনের বেলা পরিপূর্ণ পোশাক পরুন। আপনার ত্বক যতটা সম্ভব ঢেকে রাখুন, বিশেষ করে যদি আপনি বাইরে যাচ্ছেন। এছাড়াও, সুতি, লিনেন বা ডেনিমের মতো মোটা কাপড় পরার চেষ্টা করুন। এতে মশার কামড়ের ঝুঁকি কমে যাবে।

নিশ্চিত করুন যে জানালায় মশারি ব্যবহার করা হয়েছে। ডেঙ্গু মশা খুব ভোরে বা গভীর সন্ধ্যায় সক্রিয় থাকে। যাইহোক, তারা আপনাকে রাতেও কামড় দিতে পারে। তাই মশারি দিয়ে ঘরের জানালা পাহারা দিতে পারেন।

মশা নিরোধক। পারমেথ্রিন মশা তাড়ায়। তাই এটি জামাকাপড়, ক্যাম্পিং তাঁবু ইত্যাদিতে প্রয়োগ করা হয়। ত্বকে প্রয়োগ করতে, 10% DEET ব্যবহার করুন।

মশার বংশবৃদ্ধি হ্রাস করুন। এডিস মশা কৃত্রিম পাত্র যেমন বালতি, নারকেলের খোসা ইত্যাদি পানিতে ডিম পাড়ে। মশার বংশবৃদ্ধি এড়াতে, আপনার যে কোনও পাত্রকে ঢেকে রাখা উচিত, নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত এবং আপনার ড্রেনগুলিকে ঢেকে রাখা উচিত।

  •  ডেঙ্গুজ্বর হলে করণীয়

যেহেতু ডেঙ্গুজ্বরের কোনো প্রতিষেধক নেই সুতরাং নিজ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় পারে এই ভাইরাসকে মারতে। ডেঙ্গু জ্বর হলে পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে এবং বেশি করে তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে। ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খেতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এমন খাবার খেতে হবে। জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। প্রায়শ রোগীর শিরায় স্যালাইন দিতে হতে পারে। মারাত্মক রূপ ধারণ করলে রোগীকে রক্ত দিতে হতে পারে।ডেঙ্গু জ্বরে হলে কোন ধরনের এন্টিবায়োটিক ও ননস্টেরয়েডাল প্রদাহ প্রশমী ওষুধ সেবন করা যাবে না  এতে রক্তপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা (WHO) দুই থেকে সাত দিনের মাঝে সাধারণত ডেঙ্গু রোগী আরোগ্য লাভ করে।

ডেঙ্গুর চিকিৎসা: (চিকিৎসকের পরামর্শানুযায়ী)

ü অন্য জ্বরের মতো প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর নামিয়ে রাখতে হবে। প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ওষুধ ব্যবহার করা উচিত না। অন্য ঔষধ যেমন-এনএসআইডি (ডাইক্লোফেনাক, ইন্ডোমেথাসিন) দ্রুত জ্বর নামিয়ে, ঘাম ঝরিয়ে শকে নিতে পারে, কিডনির ক্ষতি করতে পারে। খাদ্যনালিতে রক্তক্ষরণ ত্বরান্বিত করে জীবনের ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। সাপোজিটরি নিলে শুধু প্যারাসিটামল, অন্য কিছু নয়। চার ডোজে ভাগ করে প্রতিবারে পাঁচশ মিলিগ্রাম প্যারাসিটামল খাওয়া উচিত তার পরেও ১০২-এর বেশি থাকলে একবারে তৎক্ষণাৎ এক হাজার মিলিগ্রাম প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে।

ü কয়েকদিন তিন লিটার পানি পান করতে হবে। প্রয়োজনে স্যালাইন নিতে পারলে ভালো।

ü জ্বরের সময় ক্ষুধামন্দা হয়, বমি লাগে। ফলের রস উপকারী পানি এবং অল্পতে বেশি ক্যালরি পাওয়া সম্ভব। স্বাভাবিক খাবার খেতে হবে।

ü ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু এবং গ্রেড-১ হিমোরেজিকে এর চেয়ে বেশি কিছু লাগে না এবং বাসায়ই চিকিৎসা করা উচিত। গ্রেড-২-তে বাড়তি সমস্যা হল প্রথমদিকেই ধরতে না পারলে চিকিৎসা না দিলে গ্রেড-৩ বা গ্রেড-৪ অর্থাৎ শকে চলে যেতে পারে। ব্লাডপ্রেসার মনিটর করতে হবে যাতে পালস প্রেসার ২০-এর বেশি থাকে। সিস্টলিক প্রেসার ৯০-এর বেশি রাখতে হবে। এটা করতে হলে পানি দিতে হবে এবং স্যালাইন দিতে হবে। ব্লাড প্রেসার ও প্রস্রাবের পরিমাণ দেখে মনিটর করতে হবে। গ্রেড-২-তে যদি পেটের ব্যথা না কমে এবং বমি হচ্ছে অথবা প্রেসার ঠিক থাকছে না তাহলে হাসপাতালে নিতে হবে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়। ইন্ডোমেথাসিন, ডাইক্লোফেনাক সাপোজিটরি নিলেও এটা হয়।

ঘরে চিকিৎসা নিতে করণীয়-

ü পর্যাপ্ত বিশ্রাম (জ্বর চলাকালীন এবং জ্বরের পর এক সপ্তাহ) নিতে হবে।

ü স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল খাবার খাবেন। যেমন- খাবার স্যালাইন, টাটকা ফলের রস ইত্যাদি।

ü এ ছাড়াও গ্লুকোজ, ভাতের মাড়, বার্লি, ডাবের পানি, দুধ/হরলিকস, বাসায় তৈরি স্যুপ ইত্যাদি খাবার খাবেন।

উপসংহার:

ইংরেজিতে একটা কথা আছে “prevention is better than cure” ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে আমাদের করণীয় হলো এডিস মশার বংশ-বিস্তার রোধ করা। ডেঙ্গু মশা এবং তার বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ- দুটোই আমাদের চারপাশে বিদ্যমান। তাই ডেঙ্গুজ্বরকে ঠেকিয়ে রাখা কঠিন। ডেঙ্গু আগেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই ডেঙ্গু জ্বরকে ভয় না পেয়ে এর সঙ্গে যুদ্ধ করেই এবং একই সঙ্গে প্রতিরোধ করেই আমাদেরকে চলতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বরে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, সুস্থ থাকুন।

 

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ