সহকারী প্রধান শিক্ষক
১৯ জুলাই, ২০২৩ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
কবি বিষ্ণু দে - এক ব্যতিক্রমী শিল্প চেতনা।
কফি হাউজের আড্ডায় নিখিলেশ-সুজাতারা নিয়মিত তর্কে মেতে উঠতেন বিষ্ণু দে’কে নিয়ে। এই গানের সুবাদে হয়তো অনেকের কাছেই বিষ্ণু দে খুব পরিচিত একটি নাম। তবে শুধু নামটিই তার পরিচয় পেয়েছে, তিনি কিংবা তার কবিতাগুলো দূরেই রয়ে গেছে। খুব বেশি পরিচিত কবির তালিকায়ও তার নাম পাওয়া যাবে না।
তবু কফি হাউজের গানটি শুনতে গিয়ে কখনো না কখনো আপনার মনেও নিশ্চয়ই প্রশ্ন জেগেছিলো - “কে এই বিষ্ণু দে?”
রবীন্দ্র পরবর্তী যুগের যে কবিরা রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত হয়ে কবিতা লেখার কলম ধরেছিলেন, তাদেরই একজন বিষ্ণু দে। কল্লোল যুগের পঞ্চপান্ডব কবি রবীন্দ্রবেষ্টনীর মধ্যেই সীমিত থাকলেও বিষ্ণু দে নিজেকে সেই সীমায় আটকাননি। তিনিই প্রথম খোলাখুলিভাবে বলতে পেরেছিলেন।
বাংলা কবিতা তিরিশের দশকে চেয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সর্বাগ্রাসী প্রভাব থেকে মুক্ত হতে। তিরিশের কাব্যধারায় প্রথম যে কবি রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, তিনি বিষ্ণু দে। রবীন্দ্রনাথও তরুণ সেই কবির মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন নতুন পথের সম্ভাবনা।
তিরিশের কাব্য ধারায় বিষ্ণু দের মধ্যেই প্রথম রাবিন্দ্রীক কাব্যবলয় অতিক্রমণের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। মার্কসীয় তত্ত্বকে জীবনাবেগ ও শিল্প সম্মত করে উপস্হাপনার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য অপরিসীম। বিষ্ণু দে একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, শিল্পানুরাগী এবং চিত্র সমালোচক।
১৯০৯ সালের ১৮ জুলাই কোলকাতার পটলডাঙ্গায় তাঁর জন্ম। পিতা অবিনাশচন্দ্র দে ছিলেন অ্যাটর্নি এবং মা মনোহারিণী দেবী ছিলেন গৃহিণী। হাওড়া জেলার পাঁতিহাল গ্রাম থেকে আগত তার পূর্বপুরুষ উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতায় বসবাস করতে আসেন। উনিশ শতকীয় বঙ্গীয় জাগরণের সঙ্গে তাঁর পরিবারের সম্পর্ক ছিল বলে স্বদেশ আন্দোলনের একটা ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল।
কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউট ও সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলে বিষ্ণু দে অধ্যয়ন করেন। ১৯২৭ সালে তিনি এ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইএ (১৯৩০), সেন্ট পলস কলেজ থেকে ইংরেজিতে বি. এ. অনার্স (১৯৩২) এবং থেকে ইংরেজিতে এম. এ. (১৯৩৪) ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষা সমাপনান্তে তিনি অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ১৯৩৫ সালে কলকাতার রিপন কলেজে যোগদান করেন। পরে ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত মৌলানা আজাদ কলেজ এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত কৃষ্ণনগর কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেন।
আধুনিক বাঙ্গালি কবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব বিষ্ণু দে তাঁর কাব্য রচনার মূল গঠনে যেমন ইউরোপীয় আধুনিক কবিদের চিহ্ন রেখেছেন, তেমনই কবি টি এস এলিয়টের রচনাশৈলী এবং ভাবনা দ্বারাও তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। এর পাশাপাশি বামপন্থী দর্শনে উদ্বুদ্ধ বিষ্ণু দে-র রচনায় প্রভাব ফেলেছিল মার্কশীয় দর্শন। তিরিশের কাব্যধারায় বিষ্ণু দে-র মধ্যেই প্রথম রাবীন্দ্রিক কাব্যবলয় অতিক্রমণের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। মার্কসীয় তত্ত্বকে জীবনাবেগ ও শিল্পসম্মত করে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য অপরিসীম।
১৯২৩ সালে 'কল্লোল পত্রিকা' প্রকাশের ফলে যে নতুন সাহিত্য উদ্যম ও ব্যতিক্রমী শিল্প চেতনার সৃষ্টি হয়, বিষ্ণু দে ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা। ১৯৩০ সালে 'কল্লোল পত্রিকা' বন্ধ হয়ে গেলে তিনি ১৯৩১ শে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের 'পরিচয় পত্রিকা'র দায়িত্ব পালন করেন ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত।
কবি বিষ্ণু দের মধ্যে নতুন এক পথ দেখতে পেয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বেছে নিয়েছিলেন নগর জীবনের নাগরিক শব্দমালাকে, যে শব্দমালা তাঁর কবিতায় আমরা পাই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। তিনি নিজে 'নিরুক্ত' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। শুধুমাত্র সাহিত্যে নয় - শিল্প, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির বিবিধ বিষয়ে তাঁর একাধিক বুদ্ধিদীপ্ত রচনা অভিনন্দিত হয়েছে।
বাংলা কবিতায় আধুনিকতার আনয়নে তার অনেকটাই ভূমিকা ছিলো। প্রচন্ড প্রগতিশীল ভাবধারার এই কবি কবিতা ছাড়া গদ্যেও বেশ স্বচ্ছন্দ ছিলেন, কিন্তু কবিসত্ত্বাটিই তার সমস্ত কিছু ছাড়িয়ে প্রবল হয়ে ওঠে। এজন্য বিষ্ণু দে’কে জানতে হলে তার কবিতাকে জানাই যথেষ্ট। তার মতাদর্শ, জীবনবোধ, তাড়না, বাস্তববাদিতা সবকিছুরই দেখা মেলে তার কবিতায়। যা কখনো বিশ্বাস করেননি তা তার কবিতায় তিনি লেখেননি, কোনো মিথ্যে বিশ্বাস কবিতায় রেখেও যাননি।
তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে 'উর্বশী ও আর্টেমিস' (১৯৩৩), 'চোরাবালি' (১৯৩৭), 'সাত ভাই চম্পা' (১৯৪৪), 'রুচি ও প্রগতি' (১৯৪৬), 'সাহিত্যের ভবিষ্যৎ' (১৯৫২), 'নাম রেখেছি কোমল গান্ধার' (১৯৫৩), 'তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ' (১৯৫৮), 'স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত' (১৯৬৩), 'রবীন্দ্রনাথ ও শিল্পসাহিত্যে আধুনিকতার সমস্যা' (১৯৬৬), 'মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জিজ্ঞাসা' (১৯৬৭), 'In the Sun and the Rain' (১৯৭২), 'উত্তরে থাকো মৌন' (১৯৭৭), 'সেকাল থেকে একাল' (১৯৮০), 'আমার হূদয়ে বাঁচো' (১৯৮১) ইত্যাদি। 'In the Sun and the Rain' নামে রচনা সংকলনের প্রাপ্য রয়্যালটি তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে দান করেছিলেন। ছড়ানো 'এই জীবন' নামে তাঁর একটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ আছে। এছাড়াও রয়েছে ১০টি কাব্য সংকলন, ৭টি অনুবাদগ্রন্থ এবং ২টি সম্পাদিত গ্রন্থ। তাঁর একটি সম্পাদিত গ্রন্থ হচ্ছে 'এ কালের কবিতা'।
বিষ্ণু দে’র রচিত অনুবাদ কাব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে - ‘এলিয়েটের কবিতা’ (১৯৫৩), ‘হে বিদেশী ফুল’ (১৯৫৬), ‘মাও সে তুং-এর কবিতা’ (১৯৫৮) ইত্যাদি। লেখালেখির মাঝে বিষ্ণু দে কবিতার বই ছাড়াও অনেক গদ্য রচনা করেছন। তিনি একজন মননশীল প্রাবন্ধিক ও সমালোচকও। তার লেখা বেশ কয়েকটি ইংরেজি বইও রয়েছে।
বিষ্ণু দে’র প্রবন্ধের বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রুচি ও প্রগতি’ (১৯৪৬), ‘সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’ (১৯৫২), ‘এলোমেলো জীবন ও শিল্পসাহিত্য’ (১৯৫৮), ‘রবীন্দ্রনাথ ও শিল্পসাহিত্যে আধুনিকতার সমস্যা’ (১৯৬৫), ‘মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জিজ্ঞাসা’ (১৯৬৭), ‘জনসাধারণের রুচি’ (১৯৭৫), ‘যামিনী রায়’সহ (১৯৭৭) প্রভৃতি।
বিষ্ণু দে কবি, দীক্ষিত পাঠকের। সাধারণ্যে কম পঠিত, তার শব্দ নির্বাচন, গঠন এবং বাক্যবিন্যাসে জটিলতার কারণে। আবিলতাপূর্ণ কবিতা পাঠে অভ্যস্ত পাঠকের কাছে বিষ্ণুদের কবিতা দুর্বোধ্য ও জটিল। অদীক্ষিত পাঠক তারল্য ভরা এবং ভাবালুতা সর্বস্ব পদ্য পড়ে যতটা ভাবালুতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন, ততটা কবিতা পড়ে তৃপ্ত হন না। ফলে বিষ্ণু দে কম পঠিতই থেকে যান; কিন্তু মনোযোগী পাঠক সব ধরনের কবিতাই পড়েন, স্বাদ গ্রহণ করেন সব ধরনের কবিতা থেকেই। বিষ্ণু দে কবিতায় যেমন হৃদয়ের ছোঁয়া মেলে তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিরও।
তার কবিতাগুলো কখনো ফ্যান্টাসিতে হারিয়ে যাওয়ার মতো কিছু নয়, যা আমরা কবিতা বললেই ভাবতে শুরু করে দিই- অবাস্তব, কল্পনার ভাষা! তিনি বাস্তব জগতকে যেমনি দেখেছেন তেমনি লিখেছেন, হয়তো কোথাও অনেক উপমাও দিয়েছেন। কিন্তু দিনশেষে বিষ্ণু দে’র কবিতা বাস্তব সমস্যাগুলো কিংবা যা আছে যা হচ্ছে-হয়েছে, তাকেই নির্দেশ করে। তার কবিতাগুলো একই সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সমন্বয়কারী। তিনি বস্তুনিষ্ঠভাবে চোখে রঙিন চশমা না লাগিয়ে কবিতায় তুলে এনেছেন তখনকার বাস্তবতাকে এবং পরক্ষণেই বিষয়নিষ্ঠ হয়ে বাস্তববাদিতার মধ্য দিয়েই যে একটা বিপ্লব দরকার, মুক্তির জোয়ার আসা দরকার - তা তিনি খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
তার একদিকে প্রবল রোমান্টিক ‘সম্মুখে পথরুধি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ অন্যদিকে অবক্ষয়ী আধুনিকতার সমন্বয় করেছেন। ফলে তার কবিতায় শিল্পগুণের সমান্তরালে এগিয়েছে দর্শনও। সচেতনভাবে কবিতায় দর্শন, বিজ্ঞান এবং পুরানের প্রয়োগ করেছেন। ফলে কবিতা হয়ে উঠেছে যুগযন্ত্রণাক্লিষ্ট নাগরিকের আর্তদীর্ণ স্বর; কিন্তু সে আর্তস্বর কখনো স্লোগানে পর্যবসিত হয়নি। আধুনিক যুগরুচির একটি বৈশিষ্ট অন্তর্বেদনা প্রকাশের লক্ষ্যে সমষ্টিকে নৈর্ব্যক্তিক সত্তায় বিবেচনা করা। বিষ্ণু দের কবিতায় তার সফল প্রয়োগ রয়েছে। শিল্পের প্রতি তার অঙ্গীকার ও প্রত্যাশা সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে শব্দের প্রয়োগ এবং বাক্যের সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসে। বিষয়-আশয়ে মার্কসীয় দর্শনই আরাধ্য
সময় ও সংকটবোধ তার কবিতায় আধুনিক পথে যাত্রা করেছে। কবি-চেতনার প্রবল তাড়না দেখি কবিতাগুলোয়। তার কবিতাগুলোকে এককথায় প্রকাশ করলে বলা যায় ‘অ্যান্টিরোমান্টিক’। তার ব্যক্তিমনের প্রেমভাব বা অনুভূতির ওপরে উঠে তিনি স্থান দিয়েছেন প্রবল আত্মসচেতনতার। তার লেখা তাই ভাবালুতার খাদমুক্ত।
মার্কসবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি বিষ্ণু দে ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার নব্যধারার আন্দোলনের প্রধান পাঁচজন কবির অন্যতম ছিলেন। 'ওফেলিয়া জিজীবিষা', 'ঘোড়সওয়ার' ইত্যাদি তাঁর লেখা অন্যতম কবিতা । তিনি একাধারে ছিলেন সঙ্গীত শিল্পী ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সতীর্থ এবং চিত্র শিল্পী যামিনী রায়ের বন্ধু।
বিষ্ণু দে’র কবিতার উপজীব্য কী? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, ‘জীবন’। সত্যিকারের জীবন যাতে মিশ্রণ আছে দুঃখ-সুখ, বন্ধন-মুক্তি, প্রেম-অপ্রেম, সুন্দর-কুৎসিত এর। তিনি এজন্যই দ্বান্দ্বিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন, যেকোনো এক পক্ষে যাওয়াকে তিনি বস্তুনিষ্ঠতার অভাব বলে মানতেন। যখন তার ‘তিনটি কান্না’ কবিতায় কান্নাগুলো তিনি বর্ণনা করেন, তখন আমরা কিন্তু খুব পরিচিত কিছু মুখ দেখি। এতে উপোসীর ক্ষমাহীন কান্না, বিধবার অভিশাপ কিংবা পথের ধারের ঐ ভিখারীটির “গান করে নাকি কান্না?” শুনতে পাই!
অন্যের প্রভাব এমন একটি জিনিস যা নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে জানা-অজানায়ই চলে আসে। অন্য সব কবি অথবা মানুষের মতো বিষ্ণু দে এর বাইরে যেতে পারেননি। রবীন্দ্র প্রভাবমুক্তি তার উদ্দেশ্য হলেও তিনি একেবারে প্রভাবমুক্ত ছিলেন না। নানা দেশের প্রায় ৫০ জন কবির প্রভাব পড়েছে বিষ্ণু দে’র ওপর। এর মধ্যে টি. এস. এলিয়ট এর প্রভাব সবচাইতে প্রবল। এছাড়া তার কবিতায় অতীত ও বর্তমানের বিখ্যাত যে সকল কবির ছাপ পাওয়া গেছে তারা হলেন :- শেক্সপিয়ার, দান্তে, গ্যেটে, শেলী, ব্লেক, লেরমন্ট, হুইটম্যান, রিমবড, ব্যডেলেয়ার, মালার্ম, ইয়েটস, পাউন্ড, প্যাস্টেরনাক, লোরকা, এলুয়ার্ড, আরাগন, ব্রেটচ, নেরুদা প্রমুখ।
বিষ্ণু দে ছিলেন ইংরেজি ভাষা সাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও কল্লোল যুগের অগ্রণী কবি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদা আরেক অগ্রণী কবি টমাস স্টার্নস এলিয়টের বিখ্যাত কবিতা 'জার্নি অফ দি ম্যাজাই' অনুবাদ করেছিলেন। সেকথা মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে গেল।
'Journey of the Magi' নামে তেতাল্লিশ লাইনের একটি কবিতা লিখেছিলেন ব্রিটিশ কবি টমাস স্টার্নস এলিয়ট (১৮৮৮ - ১৯৬৫)। সেই কবিতা ১৯২৭ সালে প্রকাশ পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'পুনশ্চ' কাব্যগ্রন্থে এই কবিতাটির একটি অনুবাদ সংকলন করেন। এই অনুবাদ সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুজ বাংলা আধুনিক কবিরা একটু যুক্ত রয়েছেন।
ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক বিষ্ণু দে ছিলেন কল্লোল যুগের অগ্রণী কবি। বাংলাভাষার আধুনিক কবিদের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বন্দ্ব-মধুর সম্পর্ক ছিল। কবিতা কী, কেন, কবিতায় আধুনিকতা ঠিক কী, তা নিয়ে অনেক আলাপ ও বিতর্ক হত। কিন্তু অনুজদের তরফে সম্পর্কের মূল সুরটা ছিল গভীর শ্রদ্ধার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'হারিয়ে যাওয়া' কবিতাটি মনে আছে? সেখানের কেন্দ্রীয় চরিত্র 'বামী'-কে মনে আছে? আমার বেশ মনে আছে! কবিতাটি আমার খুব প্রিয়। আমি জানি আপনাদেরও প্রিয়। বিষ্ণু দে এই 'বামী' কে নিয়েই আস্ত এক কবিতা লিখে দিলেন। কবিতার ভাষা, ও শৈলী সুন্দর এবং সাবলীল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'পুনশ্চ' ও 'লিপিকা' আর তার গদ্যবুনোট দেখে বিষ্ণু দে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি 'পুনশ্চ' গ্রন্থের কবিতার গদ্য ধাঁচটা আয়ত্ত করতে চেয়ে এলিয়টের 'Journey of the Magi' কবিতাটির স্বকৃত অনুবাদ কবির কাছে পাঠিয়ে দেন। ওঁর প্রার্থনা ছিল ওঁর অনুবাদের সাথে 'পুনশ্চে'র গদ্যবুনোটের একটা মেলবন্ধন করে দেখিয়ে দিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথ বিষ্ণু দে কৃত সেই এলিয়টীয় কবিতার অনুবাদ আত্মস্থ করে 'তীর্থযাত্রী' শীর্ষক একটি কবিতা লেখেন। বিষ্ণু দে তাঁর স্বকৃত অনুবাদের নাম দিয়েছিলেন 'রাজর্ষিদের যাত্রা'।
বিষ্ণু দে ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার নব্যধারার আন্দোলনের প্রধান পাঁচজন কবির অন্যতম ছিলেন। তিনি মার্কসবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। কাব্যভাবনা ও প্রকাশরীতিতে বুদ্ধিবৃত্তি ও মননশীলতাকে অঙ্গীকার করেই তিনি কবিতা লেখেন। তাঁর কবিতায় টি. এস. এলিয়টের কবিতার প্রভাব রয়েছে। দেশের অতীত ও বর্তমানের নানা বিষয় এবং বিদেশের বিশেষত ইউরোপের শিল্প-সাহিত্যের বিচিত্র প্রসঙ্গ তাঁর কাব্যের শরীর ও চিত্রকল্প নির্মাণ করেছে। এসব কারণে তাঁর কাব্য দুর্বোধ্যতার অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়।
টি. এস. এলিয়ট যে মর্মযাতনা থেকে যুগযন্ত্রণাকে কবিতায় রূপান্তর করেছেন, সে উত্তেজনা ও অন্তর্দ্বন্দ্বই বিষ্ণু দে তার কবিতায় চিত্রায়িত করেছেন। নৈরাশ্য ও নৈঃসঙ্গপীড়িত ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং যুগযন্ত্রণা একই সূত্রে গ্রথিত করেছেন বিষ্ণু দে। ফলে আধুনিক যুগমানস তার কবিতায় প্রতিফলিত, সহজে অনুমেয়। মাঝে-মধ্যে মনে হয়, বিষ্ণু দে অনেকটা সমন্বয়বাদী, কিছুটা বিচ্ছিন্নতাবাদী। সমন্বয় প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের, ব্যক্তির চিত্তের দার্ঢ্যের সঙ্গে পলায়নপরতার তথা আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সমন্বয়ও তার কবিতার একটি বিশেষ অধ্যায়। মার্কসীয় দর্শন তার কবিতা প্রচ্ছন্ন হলেও শেষপর্যন্ত তিনি দ্বান্দ্বিক। কোনো চূড়ান্ত মতবাদ তার কবিতার মর্মমূলকে আচ্ছন্ন করে না।
যামিনী রায়ের অনুপ্রেরণায়ই তিনি শিল্প-সমালোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বেশ কয়েকখানি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। 'Art of Jamini Ray' (১৯৪৪), 'The paintings of Rabindranath Tagore' (১৯৫৮), 'India and Modern Art' (১৯৫৯) প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর এ উদ্যোগের ফল।
১৯৫৮ সালে বিষ্ণু দে-কে কবি সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৬৬ তে 'সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার', ১৯৬৭ তে 'নেহেরু স্মৃতি পুরস্কার', ১৯৭১ রে তিনি তাঁর 'স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত' বইটির জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার 'রাষ্ট্রীয় জ্ঞানপীঠ পুরস্কার' লাভ করেছিলেন। তিনি 'রুশতি পঞ্চশতী'র জন্য 'সোভিয়েত ল্যান্ড পুরস্কার' পেয়েছিলেন। 'ভারতীয় গননাট্য সংঘ', 'প্রগতি লেখক সংঘ', 'সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি' প্রভৃতি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৯৩০-এর দশকে যে পাঁচজন কবির নেতৃত্বে আধুনিক বাংলা কবিতার নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল, তাদের মধ্যে বিষ্ণু দে অন্যতম। রবীন্দ্র কাব্য বলয়ের বাইরেও এক সফল আধুনিক কবিতার ধারা সৃজন করেন এই লেখক। ১৯৮২ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায় কবি বিষ্ণু দে প্রয়াত হন।
বিষ্ণু দে কাব্য সুচনায় “হেথা নয় রুপদক্ষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর” এই প্রত্যয়ে নিয়ে শুরু করলেও তিনি রবীন্দ্র বিরোধী ছিলেন না। আসলে তিনি রবীন্দ্রনাথের অক্ষম অনুকরণ ও পুনরাবৃত্তির সংক্রমণ ঠেকাতেই এবং বাংলা কবিতাকে মুক্তি দিতেই ভিন্ন পথের সন্ধান করেছেন। তিনি ছিলেন নাগরিক কবি, প্রেমের তীব্র আবেগ ও তার ছন্দোবদ্ধ শব্দবন্ধে আসাধারন কাব্যরুপ পেয়েছে। তিনি যুগযন্ত্রনাকে অস্বীকার না করেও অস্তিবাদী এবং সেই অস্তিবাদের উৎস মার্ক্সবাদী চেতনা। তাই তিনি মানুষের সংগ্রামী ভুমিকার মধ্য দিয়ে যুগান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
বাংলার কাব্যজগতে বিষ্ণু দে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেননি কখনও। এমনকি তাঁর সমকালীন কবিদের তুলনাতেও তিনি স্বল্পপঠিত। তা সত্ত্বেও বিষ্ণু দে’র কবিতায় রয়েছে এমন মননরস যা পাঠককে বাধ্য করে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে। সেই ভাবনা শুধু মস্তিস্কের অবসর বিলাস নয়, তাতে পরিশ্রম লাগে, মেধা লাগে, অধ্যাবসায় লাগে।
আজ কবির জন্মদিবসে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য।
★ তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার :- বঙ্গদর্শন, রোর মিডিয়া, দেশ পত্রিকা, ইরাবতী ডট কম, বাংলাপিডিয়া, একুশে টিভি ডট কম, পিউপিলস রিপোর্টার ডট ইন, টার্গেট বাংলা, টেক টাচ টক ডট ইন।
২
৪ মন্তব্য