প্রভাষক
২০ জুলাই, ২০২৩ ১২:৩১ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
বয়ঃসন্ধিকালীন প্রজনন স্বাস্থ্যসচেতনতা
০-৫ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে বলা হয় শৈশব কাল। ৬-১০ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে বলা হয় বাল্যকাল । ১০-১৯ বছর বয়সে বলা হয় থাকে বয়ঃসন্ধি কাল । এই বয়ঃসন্ধিকালে প্রতিটি ছেলে মেয়ের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে থাকে । যে পরিবর্তনগুলো প্রজনন স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। একটি শিশু ছেলে বা মেয়ে যাই হোক না কেন শিশুটি জন্মের পর থেকে শৈশব-কৈশোর-যৌবন- পৌঢ়ত্ব প্রতিটি স্তরে তার সাথে প্রজনন স্বাস্থ্যের ব্যাপার জড়িত । বয়ঃসন্ধিকাল ও প্রজনন স্বাস্থ্য নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের সবাইকে বয়ঃসন্ধিকাল ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে হবে।
প্রজনন স্বাস্থ্য কী?
নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সু্স্থভাবে বেড়ে উঠা, বয়োঃসন্ধিকালের যত্ন, সন্তান জন্মদানের জন্য গর্ভধারণ, পরিবার পরিকল্পনা ও পদ্ধতি নির্বাচন, স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে জানা, আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত নেয়াই প্রজনন স্বাস্থ্য।
প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা:
বয়ঃসন্ধি কালের পরিবর্তনসমূহের মধ্যে দুইটি পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ,শারীরিক ও মানসিক। প্রতিটি ছেলে শরীরের টেস্টোস্টেরন হরমোনের জন্য এই পরিবর্তন ঘটে । যখন ছেলেদের শরীরে হরমোনের বিক্রিয়া শুরু হয় তখন থেকে তাদের শরীরে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে অন্য দুটি হরমোন কাজ করে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন । যাই হোক বয়ঃসন্ধি কালে মূলত তিন ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়-শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রজনন স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা হিসেবে বলেছে, প্রজনন স্বাস্থ্য শুধু প্রজননতন্ত্রের কার্য এবং প্রজনন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত রোগ বা অসুস্থতার অনুপস্থিতিকেই বোঝায় না। এটা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক কল্যাণকর এক পরিপূর্ণ সুস্থ্য অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পাদনের একটি অবস্থাকে বোঝায়।
২০২১ সালে প্রকাশিত বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শিক্ষা বিভাগ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব স্কুলকে বয়ঃসন্ধিকালীন যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকেই কার্যকর করার কথা। এখনো অনেক স্কুলেই শিক্ষকরা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াতে সংকোচ বোধ করেন। খুবই সাধারণ একটি ধারণা ছাড়া এর বেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে চান না। কিশোর-কিশোরীরা প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান যে খুব বেশি রাখে না, তা বলাই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানার পেছনে বাধা থাকা উচিত নয়। স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে চলার অর্থ নিজেদের জন্যই বিপদ ডেকে আনা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ১০-১৯ বছর পর্যন্ত কৈশোরকাল এবং এটাই বয়ঃসন্ধিকাল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ১৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ২ কোটি ৭৭ লাখ কিশোর-কিশোরী। এ সময়টাতে মানুষের দেহ, মন ও বুদ্ধিবৃত্তিক যে পরিবর্তন ঘটে, তা একেবারেই অচেনা তাদের কাছে। এসব সমস্যা নিয়ে কারো সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। অনেক প্রশ্ন তৈরি হয় শরীর ও মন নিয়ে, কিন্তু উত্তর পাওয়া যায় না। আইসিডিডিআরবি’র ২০০৫ সালের তথ্যানুযায়ী, বয়ঃসন্ধিকালের শিশুরা বাবা-মা অথবা তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে নিরাপদ যৌন জীবন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে তেমন কোনো কথাই বলে না।
অন্যদিকে অভিভাবকরাও বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের সচেতন করেন না। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এই ঝুঁকিপূর্ণ বয়সে থাকা শিশুরা এমন একটা সমাজ বা গোষ্ঠীর মধ্যে বাস করে, যারা সনাতনি ধ্যানধারণা বিশ্বাস করে ও চর্চা করে। এরা কোনোভাবেই কিশোরদের সঙ্গে যৌন জীবন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আলোচনাকে গ্রহণ করে না। বরং এই বিষয়ক আলোচনাকে ঘরে-বাইরে, এলাকায়, স্কুলে এখনো ভয়াবহভাবে ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়। প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কতগুলো জরুরি বিষয় জানা দরকার। যেমন— প্রজনন স্বাস্থ্যতত্ত্ব, যৌনতা, পরিবার পরিকল্পনা এবং যৌনবাহিত রোগ। এসব নিয়ে আলোচনা করাটা বাংলাদেশে প্রায় সবধরনের পরিবারে গর্হিত কাজ মনে করা হয় এটা একটা সামাজিক ট্যাবু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রজনন স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, সকল নারী ও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ক সব ধরনের তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। নিরাপদ, কার্যকরি ও ইচ্ছানুযায়ী সহজলভ্য পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের অধিকার রয়েছে। উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অধিকার এবং একজন নারীর স্বেচ্ছায় গর্ভধারণ, গর্ভকালীন সেবা এবং সুস্থ শিশু জন্মদানের অধিকার রয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে-মেয়েদের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত করতে প্রচারণা, সরকারি নীতিতে এ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা, উন্নততর সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা এবং কমিউনিটির ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের পাশে থাকতে কিছু সংগঠন কাজ করছে। যৌবনে পদার্পণকারীদের জন্য সহায়ক স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশেষ কিছু জেলায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্যও কাজ করা হচ্ছে।
পরিবার-পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মতে, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহের মধ্যে রয়েছে পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি, আরটিআই/এসটিআই ও এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য পরিচর্যা, গর্ভপাত প্রতিরোধ ও গর্ভপাতজনিত জটিলতার ব্যবস্থাপনা, যৌন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা ও সচেতনতা, পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্য ও তাদের অংশগ্রহণ, স্তন ও প্রজননতন্ত্রের ক্যান্সারসহ অন্যান্য স্ত্রীরোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং বন্ধ্যাত্ব ও অন্যান্য যৌন সমস্যা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় কৈশোর স্বাস্থ্য কৌশলপত্র, ২০১৭-২০৩০-তে চারটি কৌশলগত নির্দেশনা রয়েছে যেমন— কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, কৈশোরকালীন পুষ্টি, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সমস্যা ও মাদকাসক্তি, কৈশোরকালে সহিংসতা ও নির্যাতনের দিকে দৃষ্টি প্রদান। বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০১২-তে কিশোর-কিশোরীদের পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্য, প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ ও এইচআইভি, পুষ্টি সম্পর্কিত সচেতনতা, তথ্য প্রদান, কাউন্সিলিং জোরদারকরণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপারেশন প্ল্যান ২০১৭-২০২২-তে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা উন্নতকরণের কথা বলা হয়েছে।
ইউনিসেফ এই বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে দুইভাবে সহায়তা করে। প্রথমত, সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় যেমন, নীতি সংশোধন, কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং কর্মসূচি তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে সরকারকে সহায়তা করা হয়। দ্বিতীয়ত, যেসব জেলায় শিশু বিয়ের হার অনেক বেশি, সেসব জেলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেশের মধ্যে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারের পাশাপাশি কাজ করে ইউনিসেফ। কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য, উন্নয়ন, সুরক্ষা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার আছেন, তাদের দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। এ গুরুত্ব অনুধাবন করে ইউনিসেফ সেবাদাতা ও সামনের কাতারের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে সরকারের সাথে। এছাড়া স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ, হাত ধোয়ার জায়গায় সাবান রাখা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রচারপত্র ইত্যাদির বিষয়গুলো যাতে ঠিকঠাকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা থাকে, সে জন্য সরকার ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে ইউনিসেফ।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারা দেশে ৮ হাজার কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্লাবের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতন করে হচ্ছে।
প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবার থেকে শেখানো হবে, নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিখবে, সেটা নিয়ে যেমন বিতর্ক এবং অস্বস্তি রয়েছে, তেমনি প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে শেখার ফলে ছেলে- মেয়েদের লাভ হবে, নাকি উল্টো ক্ষতি হবে সেটা নিয়েও বিতর্ক আছে।
শুধু সরকারই নয়, একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমোদেরও এই ইস্যুতে কথা বলতে হবে। সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবং এসডিজি বাস্তবায়নে প্রজনন স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাসহ সকল ক্ষেত্রেই তা বিশাল ভূমিকা রাখবে সন্দেহ নেই। প্রয়োজন শুধু আমাদের সচেতনতা, আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং এগিয়ে আসা।
তথসূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে
সেলিনা আক্তার
৫
৫ মন্তব্য