Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ জুলাই, ২০২৩ ০৭:৫০ অপরাহ্ণ

টাইফয়েড জ্বরের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

জ্বরেরও আছে নানান প্রকারভেদ! যেহেতু জ্বর কোনো রোগ নয়, রোগের উপসর্গ, তাই প্রাথমিক অবস্থায় সব ধরনের জ্বরেই এক রকম লক্ষণ দেখা যায়। কোন জ্বরের লক্ষণ কী রকম, সেটা জানা থাকলে সংক্রমণের প্রথম থেকেই সতর্ক থাকা যায়।

একটু গরম পড়লেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় টাইফয়েড জ্বরের প্রকোপ বাড়ে। টাইফয়েডের জীবাণু ছড়ায় সাধারণত অনিরাপদ পানি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে। সচেতন থাকলে এর সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব।

এই আর্টিকেলে আমরা চেষ্টা করেছি টাইফয়েড জ্বরের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা বা প্রতিকারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে। এতে সঠিক সময়ে আপনি টাইফয়েড শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন।

টাইফয়েড জ্বর হবার কারণ কী?

টাইফয়েড মূলত একটি পানিবাহিত মারাত্মক রোগ। দুই ধরনের জীবাণুর সংক্রমণে এই জ্বর হয়ে থাকে। ১) সালমোনেলা টাইফি এবং ২) সালমোনেলা প্যারাটাইফি। সালমোনেলা টাইফির সংক্রমণে টাইফয়েড জ্বর বা এন্টেরিক ফিভার হয়। সালমোনেলা প্যারাটাইফি জীবাণুর কারণে হয় প্যারাটাইফয়েড জ্বর।প্রধানত দূষিত পানি ও খাবার গ্রহণের মাধ্যমেই এই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীনতার কারণেও এটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির মলের মাধ্যমে এইসব জীবাণু পরিবেশে ছড়ায়। অপরিষ্কার-অস্বাস্থ্যকর খাবার কিংবা হাতের মাধ্যমেও এটি ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। অধিকাংশ রেস্টুরেন্টেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার প্রস্তুত করা হয় না, ফলে সেসব খাবারের মাধ্যমেও মানুষ আক্রান্ত হয়। এছাড়াও টাইফয়েড জ্বর থেকে সুস্থ হয়ে উঠার পরও কেউ কেউ এই ব্যাকটেরিয়া বহন করেন।

টাইফয়েড জ্বর অত্যন্ত সংক্রামক। একজন সংক্রামিত ব্যক্তির মল ও প্রস্রাবের মাধ্যমে তাদের শরীর থেকে ব্যাকটেরিয়া আশেপাশের পরিবেশে ছড়াতে পারে। ( source )

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো কী কী?

সাধারণত রোগ-জীবাণু শরীরে প্রবেশের ১০ থেকে ১৪ দিন পর টাইফয়েডের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। ১ থেকে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত এই লক্ষণগুলো বাড়তে থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ এর স্থায়ীত্ব থাকে। জ্বর, এ রোগের প্রধান লক্ষণ। প্রথম চার-পাঁচ দিন জ্বর কখনো বাড়ে; কখনো বা কমে, তবে কোনো সময় সম্পূর্ণ ছেড়ে যায় না। সতর্ক থাকার জন্য টাইফয়েডের লক্ষণ বা উপসর্গগুলো সম্পর্কে সবারই ভালোভাবে জেনে রাখা উচিত। আসুন জেনে নিই, টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ কী-

  • টানা জ্বর। জ্বর ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে
  • মাথাব্যথা শরীর ব্যথা
  • শারীরিক দুর্বলতা
  • ক্ষুধামন্দা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া
  • বমি
  • কফ বা কাশি প্রচণ্ড
  • পেটে ব্যথা পিঠে ও পেটে দানা দেখা দিতে পারে
  • তাপমাত্রার সাথে হৃদস্পন্দন কমতে পারে

কীভাবে টাইফয়েড জ্বর শনাক্ত করা হয়

কেবল চিকিৎসকই বলতে পারবেন, আপনি টাইফয়েডে আক্রান্ত কিনা। টাইফয়েডের লক্ষণ দেখা দিলে বা টাইফয়েড হয়েছে সন্দেহ হলে, দ্রুতই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ঘরে বসেই ভিডিও কলে টেলিমেডিসিন স্বাস্থ্যসেবা  পরামর্শ নিতে পারেন ডকটাইম অ্যাপে । যেকোনো সময়, যেকোনো মুহূর্তে ভিডিও কলের মাধ্যমে ডাক্তারকে জানাতে পারেন আপনার সমস্যার কথা। প্রাথমিক অবস্থাতেই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চললে, জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

পরীক্ষা নিরীক্ষার পরই শুধু টাইফয়েড শনাক্ত করা যায়। এজন্য ব্লাড কালচার নামক রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। রক্তের নমুনায় স্যালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেলে টাইফয়েড হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। এছাড়া জ্বর হওয়ার ২য় সপ্তাহে ‘উইডাল টেস্ট’ নামে একটি ননস্পেসিফিক ব্লাড টেস্ট করার মাধ্যমে টাইটার দেখে টাইফয়েড নির্ধারণ করা হয়।

টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা বা প্রতিকার

পরীক্ষা করে টাইফয়েডের জীবাণু পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল এবং ১০ থেকে ১৪ দিনের অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে সাধারণত পাঁচ দিনের মধ্যেই রোগী সেরে উঠেন। প্রথমত মনে রাখতে হবে, চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া ঔষধ খাওয়া যাবে না এবং যতদিন তিনি অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের পরামর্শ দেবেন, ঠিক ততদিন পর্যন্তই অবশ্যই ঔষধ চালিয়ে যেতে হবে।

এ সময় শরীরে পানিস্বল্পতা দেখা দেয়, ফলে রোগীর শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং পানির চাহিদা পূরণ করতে প্রচুর তরল ও ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। জ্বর যদি বেশি থাকে, তবে শরীর বারবার মুছে দেওয়া ভালো।

কখন একজন ডাক্তারকে দেখাতে হবে?

জ্বর দীর্ঘদিন যাবত স্থায়ী হলে কিংবা টাইফয়েড হয়েছে সন্দেহ হলে দ্রুতই একজন চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করুন । রোগ নির্ণয়ের পর কী করতে হবে বা কী করা উচিত হবে না, তা একমাত্র চিকিৎসকই ভালো বলতে পারবেন। হালকা বা গুরুতর লক্ষণগুলি অনুভব করলে জটিলতা এড়াতে ঘরে বসেই ডকটাইম অ্যাপে ভিডিও কলের মাধ্যমে একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে করণীয়

টাইফয়েড থেকে বাঁচার মূলমন্ত্রই হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। তাছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টাইফয়েড জ্বরের জন্য নির্ধারিত টিকা বা ভ্যাক্সিন নিলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। দুই ধরনের ভ্যাক্সিনই বাজারে পাওয়া যায়- ইনজেকশন এবং মুখে খাওয়ার । ভ্যাক্সিন নেওয়ার ব্যাপারে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। সব সময় ভ্যাক্সিন ১০০% কার্যকর হয় না, তাই ভ্যাক্সিনের পাশাপাশি কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জেনে নিলে সুস্থ থাকা যাবে-

  • টয়লেট ব্যবহারের পর, খাবার রান্না বা পরিবেশন করার আগে এবং খাওয়ার আগে অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে ফুটানো পানি বা পরিশোধিত পানি সংরক্ষণ করুন।
  • পানি যাতে দূষিত না হয়, সে জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই সংরক্ষণকৃত পানি পান করবেন।
  • রাস্তার পাশের কোনো দোকানের খাবার খাওয়া অথবা পানি পান করা থেকে বিরত থাকুন।
  • শাকসবজি, ফলমূল এবং রান্নার বাসনপত্র সবসময় পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিন।
  • খাবার ভালোভাবে রান্না অথবা সেদ্ধ করে খাবেন।

টাইফয়েড জ্বর সম্পর্কে সচরাচর প্রশ্ন

কোন বয়সে এবং কারা বেশি টাইফয়েড রোগের ঝুঁকিতে থাকেন?

টাইফয়েড যেকোনো বয়সেই হতে পারে। তবে অন্যান্যদের তুলনায় শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। শরীরে জীবাণু প্রবেশ করলেই টাইফয়েড হয় না, দেহে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে অনেক সময়ই জীবাণু দেহে সংক্রমণ করতে পারে না। কিন্তু কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের, যেমন- যারা এইচআইভি পজিটিভ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এছাড়া যেসব এলাকায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি, সেসব এলাকা ঘুরতে গেলেও এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

টাইফয়েড কি ছোঁয়াচে রোগ?

টাইফয়েড ছোঁয়াচে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে, এমনকি পানির মাধ্যমেও এ রোগের জীবাণু ছড়ায়। এর জটিলতা মারাত্মক। এতে সংক্রমিত হলে রক্তক্ষরণ, মেরুদণ্ডে সংক্রমণ, অগ্নাশয়ে প্রদাহ, এমনকি কিডনিতেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্যারাটাইফয়েড এবং টাইফয়েড জ্বরের মধ্যে পার্থক্য কী?

টাইফয়েড সম্পর্কে মোটামোটি সবারই কম-বেশি ধারণা থাকলেও প্যারাটাইফয়েড সম্পর্কে খুব একটা মানুষ জানে না। এটি টাইফয়েড ধরনের জ্বর হলেও এই রোগের সঙ্গে মূল টাইফয়েডের কিছুটা পার্থক্য আছে। এ কারণেই অনেকে প্রথমে রোগ নির্ণয় করতে পারে না বলে ভুল চিকিৎসার আশঙ্কা বেশি থাকে। প্যারাটাইফয়েডের উপসর্গ বা লক্ষণগুলো অনেকটা টাইফয়েডের মতোই, তবে তীব্রতায় কিছুটা কম। অসুস্থতার মেয়াদও কম। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও ম্যাজম্যাজ, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, পেট ব্যথা, অরুচি, হালকা কাশির মতো উপসর্গগুলো প্যারাটাইফয়েডের লক্ষণ।

টাইফয়েড কতদিন স্থায়ী হয়?

টাইফয়েড জ্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকলেও এক-দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হতে পারে।

টাইফয়েড হলে কি গোসল করা যাবে?

টাইফয়েড হলে গোসল করা যাবে, তবে আবশ্যকীয় না। জ্বর কমানোর জন্য ঘাড় এবং কপালের পেছনের অংশে জলপট্টি দেওয়া যাবে। কুসুম গরম পানিতে ভেজানো কাপড় দিয়ে শরীর মুছলে জ্বর কমতে সাহায্য করে। এ সময় চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া ঠান্ডা পানিতে গোসল করা যাবে না। ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করার ফলে শরীরে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আরো বেড়ে যেতে পারে।

টাইফয়েড হলে কি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন আছে?

সব ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে না। ঘরে বসেও চিকিৎসা নেওয়া যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ঔষধ খেলেই রোগ ভালো হয়। তবে যেহেতু টাইফয়েডের কারণে অন্ত্রনালিতে প্রদাহ হতে পারে, তাই অ্যান্টিবায়োটিক (সিরাপ বা ট্যাবলেট) অনেক সময় ঠিকমতো কাজ করে না। এজন্য কিছু ক্ষেত্রে, ঔষধগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হতে পারে। এক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শে অনেক সময় শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দিতে হয়। চিকিৎসকরা এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন।

DocTime

16/A/2, Ring Road, Mohammadpur, Dhaka-1207, Bangladesh.


মন্তব্য করুন