Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ আগস্ট, ২০২৩ ০২:২০ অপরাহ্ণ

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মানবধর্ম।

‘রবীন্দ্রনাথ ও মানবধর্ম’

“... শেষ স্পর্শ নিয়ে যাব যবে ধরণীর

বলে যাব, তোমার ধুলির

তিলক পরেছি ভালে;

দেখেছি নিত্যের জ্যোতি দুর্যোগের মায়ার আড়ালে।

সত্যের আনন্দরূপ এ ধূলিতে নিয়েছে মুরতি

এই জেনে এ ধূলায় রাখিনু প্রণতি।”

এই কবিতায় উপনিষদের সুপ্রাচীন বাণীকে অবলম্বন করে রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীকে প্রণাম জানিয়েছিলেন। সেই বাণীর মর্মার্থ অবলম্বন করে প্রথমেই বর্তমান আলোচনার সীমা ঈষৎ চিহ্নিত করে নেওয়া যাক। উদ্ধৃত কয়েকটি পংক্তি থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, জাগতিক বিবর্তনের যে কাহিনী বিজ্ঞান মানুষের গোচরে এনেছে, অথবা মানুষের আবির্ভাব, ক্রমবিকাশ ইত্যাদির পিছনে জৈবিক বিবর্তনের যে বিচিত্র ইতিহাস বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে, রবীন্দ্রনাথের মানবিক উপলব্ধি সেই সত্যিকে আশ্রয় করে গঠিত বা বিকশিত হয়নি। অথবা, আধুনিক কালের দর্শনচিন্তা মানুষকে তাঁর সমগ্র কর্মের কর্তা, তাঁর সমগ্র অস্তিত্বের নিয়ামকরূপে নির্ধারণ করে তাঁকে যে মর্যাদা দান করেছে, রবীন্দ্রমানস সেই ভাবনা দ্বারাও প্রভাবিত হয়নি। তাঁর উপলব্ধিতে মানবিক ঐশ্বর্যের স্বরূপ অন্যপ্রকার ছিল। তাঁর সুগভীর বিশ্বাস ছিল যে, “আমাদের অন্তরে এমন কে আছেন যিনি মানব অথচ যিনি ব্যক্তিগত মানবকে অতিক্রম করে ‘সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ’। তিনি সর্বজনীন সর্বকালীন মানব। তাঁরই আকর্ষণে মানুষের চিন্তায় ভাবে কর্মে সর্বজনীনতার আবির্ভাব।” এই সত্যের আলোকে মানুষের অস্তিত্বের বস্তুগত বোধ, বস্তু-পৃথিবীতে তাঁর সৃষ্টিশীল বিহার ইত্যাদি অন্য এক আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের সমাপ্তি মানুষের মধ্যে নয়, তাঁর পরিণতিও তাতে নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “উনি এর পরম গতি, উনি এর পরম সম্পদ, উনি এর পরম আশ্রয়, উনি এর পরম আনন্দ। অর্থাৎ, এর পরিপূর্ণতা তাঁর মধ্যে। উৎকর্ষের পথে এ চলেছে সেই বৃহতের দিকে, এর ঐশ্বর্য সেইখানেই, এর প্রতিষ্ঠা তাঁর মধ্যেই, এর শাশ্বত আনন্দের ধন যা কিছু তা তাতেই।” অন্যত্র তিনি আরও বলেছিলেন যে, মানুষের বাস যে দেশে, সে দেশ প্রকৃতপক্ষে ভৌগোলিক নয়, মানসিক। মানসিক বলেই পূর্বোক্ত পূর্ণ-পুরুষকে ‘ব্যক্ত করার প্রত্যাশা নিয়ত চলেছে ভবিষ্যতের পথে’ মানুষের কর্মকে আশ্রয় করে। সেই পূর্ণ পুরুষকে চিরন্তন মানবই বলা হোক, আর সর্বজনীন মানবই বলা হোক, তাঁকে প্রকাশ করতে হবে সকল কালের সকল মানুষের হয়ে। সেই মানবই চিরন্তন সত্য, সেই মানবই মৃত্যুর অতীত। এই যুক্তি পরম্পরাকে ভিত্তি করেই তিনি লিখেছিলেন, “সমস্ত মানুষকে নিয়ে আছে একটি বৃহৎ ও গভীর ঐক্য। সেই ইন্দ্রিয়বোধাতীত ঐক্য সাংখ্যিক সমষ্টিকে নিয়ে নয়, সমষ্টিকে অতিক্রম করে। সেই হচ্ছে সমস্তের এক গূঢ় আত্মা, একধৈবানুদ্রষ্টব্যঃ, কিন্তু বহুধাশক্তিযোগে তার প্রকাশ। সেই ঐক্য বা মানব্রহ্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হোক বা না হোক, তিনি অবিভাজ্য, তাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বতন্ত্র সত্তায় বিভক্ত করা যায় না। দেশ কালের সীমায় সীমিত যে খণ্ড খণ্ড মানব- সত্তা বা ব্যক্তি-সত্তা, বাইরের পরিচয়ে তাদের মধ্যে প্রভেদ যতই বিচিত্র বা গভীর হোক না কেন, আত্মিক সত্যতায় তারা এক ; কারণ, তারা ঐ পরম একে আশ্রিত।” এ থেকে এই সিদ্ধান্ত অপরিহার্য যে, “এক আত্মলোকে সকল আত্মার অভিমুখে আত্মার সত্য; এই ; সত্যের আদর্শেই বিচার করতে হবে মানুষের সভ্যতা, মানুষের সমস্ত অনুষ্ঠান, তার রাষ্ট্রতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র - এর থেকে যে পরিমাণে সে ভ্রষ্ট সেই পরিমাণে বর্বর।”

এ থেকে যে প্রশ্নটি অপরিহার্য হয়ে ওঠে তা হল যে, মানবব্রহ্ম যদি এক এবং অবিভাজ্য হয়ে থাকে, তা হলে একই ঐতিহাসিক কালে দেশে দেশে মানুষে মানুষে, অর্থাৎ সেই আত্মারই বিবিধ অভিব্যক্তির মধ্যে এই বিরোধ, এত বিচ্ছেদ হানাহানি এত আত্মা-বিধ্বংসী সংগ্রাম কেন? রবীন্দ্রনাথ এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “সেই মানুষের উপলব্ধি সর্বত্র সমান নয় ও অনেক স্থলে বিকৃত বলেই সব মানুষ আজও মানুষ হয়নি।” তাই, অতি সহজেই মনের মানুষকে সে হারিয়ে ফেলে, আর সেজন্যই মানুষের যত দুর্গতি, যত দীনতা। তখন, মানুষ আত্মিক সত্যতায় আপনকে উপলব্ধি করে না। “আপনাকে তখন টাকায় দেখি, খ্যাতিতে দেখি, ভোগের আয়োজনে দেখি। এই নিয়েই তো মানুষের যত বিবাদ, যত কান্না। মানুষের মানবসত্তা সম্পর্কে এ ধরনের বিকৃত বোধই জাতিতে জাতিতে শত্রুতা, শ্রেণীতে শ্রেণীতে সংঘাত, শোষণ অত্যাচার ইত্যাদি যাবতীয় জাগতিক সমস্যার মূলে।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানবধর্ম সংক্রান্ত রচনায় এই বিশ্বাসই ব্যক্ত করেছিলেন। এ থেকে আরও যে জিজ্ঞাসার সূত্রপাত ঘটে, সেটা হল যে, মানুষের আত্মিক পরিচয়ই যদি রবীন্দ্রচিন্তায় মুখ্য স্থান অধিকার করে থেকে থাকে, তাহলে বস্তু-সম্পর্কের মধ্যে মানবধর্মের স্বীকৃতি কতদূর কার্যকর বা মূল্যবান? এই সম্পর্কে সর্বদা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, ভাব অথবা আইডিয়ারও নিজস্ব একটি জীবন ও গতি আছে, সামাজিক ভাব-পরিমণ্ডলে সেটাও আবর্তের সৃষ্টি করে, এবং বস্তুর বস্তুগত এবং গুণগত রূপান্তরে সেটারও অনস্বীকার্য প্রভাব রয়েছে। সেজন্যই সমাজ-পরিবেশে উচ্চারিত কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাব কখনও সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয় না। রবীন্দ্রনাথের ভাববাদী তত্ত্ব মানুষকে তার স্বীয় পৃথিবীতে পার্থিব সম্পর্কের মধ্যে পূর্ণ মর্যাদায় স্বীকৃতি দান করেনি - একথা সত্যি, কিন্তু সমস্ত মানুষকে শুভবুদ্ধি দ্বারা সংযুক্ত করবার যে ব্যাকুল আগ্রহ ও আর্তি তাঁর কাব্যকে মহিমান্বিত করেছে, তা কখনও তাঁকে পরিত্যাগ করেনি; বরং বিশ্বমানবের কল্যাণচিন্তায় তাঁকে অনেক সময় উদ্ভ্রান্ত হতে দেখা গিয়েছিল। সেই কারণেই ‘মানুষের ধর্ম’ নামক গ্রন্থের এক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন, “মানুষকে বিলুপ্ত করে যদি মানুষের মুক্তি, তাহলে মানুষ হলুম কেন?” তিনি তাঁর সুবিশাল বোধ দিয়ে মানুষের ভৌগোলিক গণ্ডীর বন্ধনকে ছিন্ন করেছিলেন, এবং সেই পথে মানুষ বিশ্বাসী হয়েছে, ভাবের ঐশ্বর্য দিয়ে তিনি মানুষের চিত্তকে প্রসারিত করেছিলেন; বিশ্বগত পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মুক্তির চিন্তায় সকলকে উদ্‌বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর আদর্শের এই অবদান কোনো অর্থেই উপেক্ষণীয় নয়।

মানুষের যেসব চিন্তা-কর্ম-ভাবনা মানবিক মূল্যের প্রকাশে সরস, তাতেই রবীন্দ্রনাথের সহজ আনন্দ ছিল; তেমনি, যা এর অভাবে ক্ষুণ্ন ও বিরস, তাতে তাঁর স্বাভাবিক বীতশ্রদ্ধা ও ক্ষোভ ছিল। মনুষ্যত্বের বোধহীন দীনতাকে তিনি কখনও সহ্য করতে পারতেন না; সে জন্য তাঁর মর্মবেদনার অবধি ছিল না। কারণ, দীনতা সমগ্র মানবিক সত্তার দীনতা। তাই তিনি বলেছিলেন, “আপনাকে যে খর্ব করে সে যে কেবল নিজেকেই কমিয়ে রাখে তা নয়, মোটের উপর সমস্ত মানুষের মূল্য সে হ্রাস করে। কেন না, যেখানেই মানুষকে আমরা বড় দেখি সেখানেই আপনাকে বড় বলে চিনতে পারি - এই পরিচয় যত সত্য হয় নিজেকে বড় রাখবার চেষ্টা মানুষের পক্ষে তত সহজ হয়।” এই কথা উজ্জ্বল ঐশ্বর্যের কথা। এই প্রত্যয়ে আশ্রয়ী থেকে তিনি সারা জীবন ভারতবর্ষের ছোটো মানুষকে বড়ো মানুষ করার স্বপ্ন দেখে গিয়েছিলেন, তাঁদের আত্মশক্তিতে বলিষ্ঠ করবার প্রত্যক্ষ কর্মোদ্যম গ্রহণ করেছিলেন। যদিও তিনি স্বয়ং আক্ষেপ করে এটাও বলেছিলেন যে, তাঁর কবিতা বিচিত্রগামী হলেও সর্বত্রগামী হয়নি; কিন্তু তবুও সব মানুষের সমৃদ্ধ উজ্জ্বল জীবনের পরিচয়ে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ভারতবর্ষই যে তাঁর ধ্যানের, তাঁর ভালোবাসার ভারতবর্ষ ছিল - এ কথারও কোনো প্রতিবাদ করা চলে না।

শুধু ভারতবর্ষই বা বলা হবে কেন, তাঁর মানবিক বোধ ভূগোলের সীমারেখায় খণ্ডিত বা সীমিত ছিল না; সব ধরণের সীমা উত্তীর্ণ হয়ে সেটা বিশ্বের বিপুল বিস্তারে স্থিত হয়েছিল। সমগ্র বিশ্বের মুক, অত্যাচারিত, শোষিত, জাতিহীন, গোত্রহীন, পংক্তিহীন মানুষ যাঁরা তথাকথিত সভ্য সমাজের অনাদৃত এবং নিরাশ্রয়, সেইসব অপাঙক্তেয়দের সঙ্গে বারংবার রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মীয়তা ঘোষণা করেছিলেন। ‘পত্রপুট’-এর একটি কবিতায় অতি আকর্ষকভাবে তা বিধৃত রয়েছে -

“দলের উপেক্ষিত আমি,

মানুষের মিলন-ক্ষুধায় ফিরেছি,

যে মানুষের অতিথিশালায়

প্রাচীর নেই, পাহারা নেই।

লোকালয়ের বাইরে পেয়েছি আমার নির্জনের সঙ্গী

যাঁরা এসেছে ইতিহাসের মহাযুগে

আলো নিয়ে, অস্ত্র নিয়ে, মহাবাণী নিয়ে।

তারা বীর, তারা তপস্বী, তারা মৃত্যুঞ্জয়,

তারা আমার অন্তরঙ্গ, আমার স্ববর্ণ, আমার স্বগোত্র,

তাদের নিত্যশুচিতায় আমি শুচি। …

মানুষকে গণ্ডীর মধ্যে হারিয়েছি,

মিলেছে তার দেখা

দেশবিদেশের সকল সীমানা পেরিয়ে।

তাকে বলেছি হাত জোড় করে -

হে চিরকালের মানুষ, হে সকল মানুষের মানুষ,

পরিত্রাণ করো

ভেদচিহ্নের-তিলক-পরা

সংকীর্ণতার ঔদ্ধত্য থেকে।

হে মহান পুরুষ, ধন্য আমি, দেখেছি তোমাকে

তামসের পরপার হতে

আমি ব্রাত্য, আমি জাতিহারা।”

এই যে উপলব্ধি, সেটা মানব-ঐক্যের গভীর এক সত্যের স্বীকৃতিতে উদ্ভাসিত; ঘৃণা, অবজ্ঞা আর ভেদচিহ্নের অন্ধকার পার হয়ে আলোকের পথে অমৃতলোকে তার উত্তরণ। এই উত্তরণ ভাববাদী চিন্তা-ভাবনায় সমৃদ্ধ ও বিবৃত হলেও এই বস্তু-পৃথিবীতে তা সৃজন করা সম্ভব; অবশ্য বলা বাহুল্য, তার জন্য শোষণ-অত্যাচারভিত্তিক সমাজব্যবস্থার আমূল রূপান্তর অবশ্যই কাম্য। আর কাম্য, বিশ্বব্যাপী সর্ববিধ বন্ধন থেকে সমস্ত মানুষের মুক্তি। সেই মুক্ত সমাজে ভালোবাসার আলোক হৃদয় ভরে দেবে, প্রেমে ও ঐক্যে শক্তিশালী মানুষ পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হবে নানান সৃষ্টিশীল উদ্যমে, এবং মানব-অভিজ্ঞতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। রবীন্দ্রমানসের এই পরিচয়ই নিত্যকালের সত্যতায় ভাস্বর।

প্রসঙ্গতঃ, রবীন্দ্রনাথের একটি চমৎকার উক্তির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, একটা শব্দকে অত্যন্ত বাড়িয়ে ও চড়িয়ে দিয়ে যে জিনিসটা পাওয়া যায়, সেটা হল হুংকার; আর সেই শব্দকেই সুর দিয়ে লয় দিয়ে সংযত সম্পূর্ণতা দিলে যে বস্তু লাভ করা যায়, সেটা হল সংগীত। হুংকারটা হল শক্তি, আর সংগীতটা হল অমৃত; অমৃতকে অঙ্ক দিয়ে অথবা হাতে-বহরে কোনোভাবে মাপবার কোনো উপায় নেই। এই উক্তির প্রয়োগক্ষেত্রকে আরো প্রসারিত করে বলা যায় যে, মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রিক জীবনেও এর গুরুত্ব স্বীকার্য। মানুষ যেখানে ব্যক্তিগত বা প্রাদেশিক বা রাষ্ট্রিক বা দেশগত স্বার্থের সংকীর্ণতায় আবদ্ধ, যেখানে সে শক্তির অধীন - তখন জীবন পরস্পর কোলাহল, বিবাদ আর হানাহানিতে বিদীর্ণ। আর, যখন সে সকলের সঙ্গে ঐক্যের অনুভবে উদার, তখনই তাঁর জীবনে এবং অন্য সকলের জীবনে সংগীতের তথা অমৃতের আস্বাদন লাভ হয়। বস্তু-পৃথিবীর সীমার মধ্যে, প্রচলিত সামাজিক-রাষ্ট্রিক সংগঠনের বিধিনিষেধ ইত্যাদি রূপান্তরিত করে, মানুষের পক্ষে প্রত্যক্ষ বাস্তবের মধ্যে এই অমৃতলোকের সন্ধান ও প্রতিষ্ঠা একান্তই সম্ভবপর।

রবীন্দ্রনাথ এই পৃথিবী এবং মানবিক অস্তিত্বের অন্তরালে যে একটি অধ্যাত্মতত্ত্বের প্রকাশ প্রত্যক্ষ করতে অভ্যস্ত ছিলেন, সেজন্যই তিনি এ কথা স্বীকার করতে কখনও কুণ্ঠিত হননি। “প্রকৃতি তাহার রূপ রস বর্ণ গন্ধ লইয়া, মানুষ তাহার বুদ্ধি-মন, তাহার স্নেহপ্রেম লইয়া” - এক অতীন্দ্রিয় সত্তার প্রতি ধাবিত বলে তাঁর বিশ্বাস ছিল। কিন্তু, এই অধ্যাত্ম চেতনা সত্ত্বেও এক বিস্ময়কর বোধ তাঁকে বস্তু-পৃথিবীর আকর্ষণে রোমাঞ্চিত করেছিল। সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায় এই বোধকে ‘ইহলোকমুখীনতা’ বলে আখ্যাত করা যেতে পারে। সেজন্যই তিনি এ কথা স্বীকার করতে কখনও কুণ্ঠিত হননি, “সেই মোহকে আমি অবিশ্বাস করি না, সেই মোহকে আমি নিন্দা করি না। জগতের মধ্যে আমি মুগ্ধ, সেই মোহেই আমার মুক্তিরসের আস্বাদন।” পুনশ্চ, “এই জগৎ তাহার প্রত্যেক ধূলিকণায় আশ্চর্য।” পৃথিবীর প্রতি তাঁর এই যাত্রা, এই ভালোবাসা ইত্যাদি সব মিলিয়েই তিনি প্রাণের সম্মানে ধন্য হয়ে থাকবেন। রবীন্দ্র-সাহিত্য পাঠে এই পৃথিবীকে, এবং তার চিরকালের সংগ্রামরত সন্তান - মানুষকে - নতুনভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব।

তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:

১- কথাকোবিদ রবীন্দ্রনাথ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।

২- সাহিত্য জিজ্ঞাসায় রবীন্দ্রনাথ, অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায়।

৩- রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে, মৈত্রেয়ী দেবী।

মন্তব্য করুন

ব্লগ