Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ আগস্ট, ২০২৩ ০৩:২৫ অপরাহ্ণ

এডিস মশা সম্পর্কিত অজানা কিছু তথ্য
অন্ গবেষক বলছেন, নারীদের মধ্যে সন্তানসম্ভবা নারীদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয় মশারা। কারণ হিসেবে পুরুষদের ক্ষেত্রে বলা কারণগুলো অর্থাৎ নিঃশ্বাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের আধিক্য ও দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কথা বলছেন গবেষকরা। সন্তানসম্ভবা নারীদের অন্যান্য নারীদের তুলনায় নিঃশ্বাসের সাথে ২১ শতাংশ বেশি হারে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। এডিস মশা চেনার উপায়:
সাধারণত এই মশা অন্য মশার চেয়ে বেশি কালো হয়। এর পায়ে ও শরীরের পাশে সাদা ডোরাকাটা দাগ থাকে। এডিস মশার মাথার পেছনে ওপরের দিকে কাস্তের মতো সাদা দাগ থাকে। অন্য মশার ক্ষেত্রে মাঝ বরাবর সাদা দাগ থাকে। এই দুটো শারীরিক গঠন চিহ্নিত করা যায় এডিস মশা।
এডিস মশা কখন কামড়ায়? 
সবচেয়ে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, দিনের বেলায় এডিস মশা কামড়ায়। বলা হয় ভোর বা সূর্য ওঠার ৩-৪ ঘণ্টা পর এবং বিকেল থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে এই মশা। তবে এডিস মশা যে কেবল দিনে কামড়ায়, রাতে কামড়ায় না এমন ধারণা ভুল। এ মশা কখন সক্রিয় থাকে তা নিয়ে প্রাণীবিজ্ঞানী ও কীটতত্ত্ববিদদের মধ্যে সামান্য মতপার্থক্য আছে।
প্রাণীবিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কেবল দিনের বেলায় নয় এডিস মশা সক্রিয় থাকে উজ্জ্বল আলোতে। অর্থাৎ ঘর আলোকিত থাকলে রাতেও কামড়াতে পারে এই মশা।ভরদুপুরের চেয়ে আলো-আঁধারি এডিস মশার বেশি পছন্দ। তাই ভোর বা সূর্যোদয়ের সময় এবং গোধূলি বা সূর্যাস্তের সময় এসব মশার ক্ষেত্রে কামড়ানোর জন্য পছন্দসই সময়। রাতের বেলায়ও কৃত্রিম আলো-আঁধারিতে এডিস মশা কামড়াতে পারে।
এডিস মশা স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে করতে এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে এমন সম্ভাব্য স্থানগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে। বাড়ির আশপাশে, ফুলের টবে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে। 
বিজ্ঞানীদের মতে, মশা কামড়ানোর সময় মানুষ কিন্তু টের পায় না। মূলত মশার রক্ত খাওয়া যখন প্রায় শেষ, তখন আমরা টের পাই। কেন প্রথমদিকে আমরা কামড় অনুভব করি না? কারণ রক্ত খেতে গায়ে বসার সঙ্গে সঙ্গেই মশা তার মাউথ পার্টস দিয়ে মানুষের রক্তে মিশিয়ে দেয় তাদের লালারস। এ কারণে প্রথমদিকে বোঝাই যায় না যে মশা কামড়াচ্ছে।
চামড়া ভেদ করে রক্তবাহ পর্যন্ত পৌঁছনোর জন্য মশার মুখে রয়েছে বিশেষ অঙ্গ। এর মধ্যে একটি হলো ঠোঁটের মতো অংশ। একে লেবিয়াম বলে। মশা কামড়ানোর সময় এই লেবিয়াম থাকে ত্বকের বাইরে।
লেবিয়ামের সাহায্যে মানব শরীরের ত্বকের মধ্যে মশা ঢুকিয়ে দেয় ৬টি সূচের মতো অংশ। এগুলোকে স্টাইলেট বলে। ৬টি সূচের মধ্যে ২টি বিশেষ সূচকে বলে ম্যাক্সিলি।
ম্যাক্সিলিতে থাকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দাঁতের মতো অংশ। আমাদের ত্বক চিড়তে বা চামড়া ভেদ করতে এই অংশটিকে করাতের মতো ব্যবহার করে মশা।
দাঁতের মতো এই অংশগুলি এতই ধারাল হয় যে মানুষ বুঝতেই পারে না মশা কামড়াচ্ছে৷ অনেকটা ড্রিল মেশিন দিয়ে ফুটো করার মতো প্রক্রিয়া এটি। আরেকটি সূচের মতো অংশকে বলা হয় ম্যান্ডিবল। এটি ত্বকের চেরা অংশকে ধরে রাখে দু’পাশে। 
এরপরেই মশা তার প্রবোসিস নামক অংশ ঢুকিয়ে স্ট্র দিয়ে টানার মতো করে রক্ত খায়। এই অংশকে সাপোর্ট দেয় হাইপোফ্যারিংক্সের মতো অংশ। এর মাধ্যমেই আমাদের শরীরে নিজেদের লালারস ঢুকিয়ে দেয় মশা। ফলে মশা কামড়ালেও আমরা টের পাই না।
মশার এই লালারস মানুষের রক্তবাহকেও ডায়ালেট করে। মানুষের প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়াকে আটকে দেয় এবং প্রোবোসিসকে রক্ত শোষণ করাতেও সাহায্য করে। 
অতি অল্প সময়ে মশা কামড়ালেও কাজটি কিন্তু বেশ জটিল। তাই মশা থেকে সাবধানে থাকা জরুরি। 
এডিস মশার দুটি প্রজাতি রয়েছে 
এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস দুই প্রজাতি
১৯৯৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত করা গেলেও এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এর কারণ হচ্ছে, এ বছর বৃষ্টিপাত একটু আগেই শুরু হওয়ায় হঠাৎ করে ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার প্রজনন বেড়ে গেছে। আমরা সবাই জানি যে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ছড়ায়। এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস নামের মশার দুটি প্রজাতি ডেঙ্গু রোগের বাহক। এর মধ্যে এডিস ইজিপ্টি হলো প্রাইমারি ভেক্টর বা প্রধান বাহক।
অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিক্টাস হলো দ্বিতীয় প্রধান বাহক। এডিস ইজিপ্টিকে বলা হয়  গৃহপালিত মশা। এরা সাধারণত ঘরের ভেতর, বারান্দা বা ছাদে ফুলের টব, জমানো পানির পাত্র, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন বাড়ির পাশে রাখা চৌবাচ্চা বা ড্রাম, কনডেন্সড মিল্কের কৌটা, নারিকেলের খোল ইত্যাদি মানুষের তৈরি কৃত্রিম পানির পাত্রে বংশ বৃদ্ধি করে। এদের শহরের মশাও বলে। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিক্টাসকে গ্রাম মশা বা মফস্বলের মশা বলা হয়। কারণ এরা সাধারণত মফস্বল শহরে বা গ্রামে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বদ্ধ স্বচ্ছ পানির উৎস, যেমন—গাছের গর্ত, কাটা বাঁশের গুঁড়ি, ভাঙা রাস্তা, ডোবার স্বচ্ছ পানি ইত্যাদি স্থানে বংশ বৃদ্ধি করে। এদের Forest mosquito বা বন্য মশাও বলে। এডিস অ্যালবোপিক্টাসের আরেক নাম এশিয়ান টাইগার, কারণ এরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় মশা। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে এই দুই ধরনের মশাই একে অন্যের প্রজনন স্থানে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে।
নিয়ন্ত্রনঃ
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ও বিস্তার রোধ করতে হবে এবং মশা যেন কামড়াতে না পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এডিস মশা নিধনের জন্য সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে দুটি দিক অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে—এক. মশার প্রজনন স্থানগুলোকে ধ্বংস করতে হবে এবং দুই. পাশাপাশি বয়স্ক মশা নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মশার প্রজনন স্থানগুলোকে ধ্বংস করতে হলে বাড়িতে এবং আশপাশে বদ্ধ বা জমানো পানির পাত্র দুই-এক দিন পর পর পরিষ্কার করতে হবে। ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোল, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে লার্ভানাশক ব্যবহার করতে হবে।
মানুষের রক্তের নেশা কেন মশাদের? 
মশা কেন মানুষের রক্তের পেছনে ছোটে? গেল বছর (২০২০) যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী এই প্রশ্নের উত্তর পেতে এক গবেষণা করেছেন। তারা আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের প্রায় ২৭টি ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে এডিস এজিপ্টি জাতের মশার ডিম সংগ্রহ করেন। এরপর এগুলোকে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ল্যাব বক্সে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মশা কেন কানের কাছে গান গায়?  
মশা তার ছোট্ট দুই ডানা সেকেন্ডে প্রায় আড়াই শতাধিক বার ঝাপ্টায়। এই ডানা ঝাপ্টানোর শব্দই আমাদের কাছে মশার গান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মশা আকারে খুব ছোট বলে শুধু আমাদের কানের কাছে এলেই সেই শব্দ আমরা শুনতে পাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মশাদের কাছে কেন মানুষের কান এত প্রিয়? কেন তারা আমাদের কানের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে?
গবেষণা বলছে, এর প্রধান কারণ গন্ধ। আমাদের দেহের সবচেয়ে নোংরা জায়গা হিসেবে কানকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে, বিশেষত কানের ভেতরের জায়গা। কানের  ছিদ্র সবসময় খোলা থাকায় সহজেই এর ভেতরে ধূলো-ময়লা প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রতিদিন যদি এই ময়লা পরিষ্কার না করা হয় তাহলে সেটি ময়লা আকারে জমতে থাকে। এই ময়লাকে বলা হয় ওয়াক্স বা ‘খইল’।  
খইল থেকে একধরনের গন্ধ নির্গত হয়, যা মশার খুবই প্রিয়। এজন্যই মশাকে কানের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যায় বেশি।  
তবে এটিই কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আরেকটি কারণ হতে পারে আমাদের শরীর থেকে নিঃশ্বাসের সাথে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আমাদের শরীর থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড, আমাদের শরীরের উষ্ণতা এবং আর্দ্রতার মাধ্যমে মশা আমাদের চিহ্নিত করে থাকে। তখন মশাকে আমাদের নাক ও মুখের আশেপাশে বেশি ঘুরতে দেখা যায়।  
মানুষ ভেদে মশার আকর্ষণ ভিন্নতা
মশা যে সব মানুষকেই কামড়ায় এমন কিন্তু না। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা বলছে, মানুষের মধ্যে নারীদের চেয়ে পুরুষের রক্তের প্রতিই বেশি আগ্রহী মশারা। গবেষকরা বলছেন, পুরুষের বিশালাকার শারীরিক গড়নের জন্যই মশাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন তারা। কারণ, স্থূলকায় পুরুষের শরীরে তাপমাত্রা বেশি থাকে এবং তাদের নিঃশ্বাসের সাথে কার্বন ডাইঅক্সাইডও বেশি নির্গত হয়।  
নিউ ইয়র্কের অ্যালার্জি ও অ্যাজমা কেয়ার বিষয়ক চিকিৎসক ক্লিফোর্ড ডব্লিউ ব্যাসেট বলছেন, কার্বন ডাইঅক্সাইডের পাশাপাশি মানুষের শরীরে থাকা ল্যাকটিক এসিডেও আকৃষ্ট হয় মশা। এই ধরনের কেমিকেলগুলো প্রায় ৩০ মিটার দূরে থেকেই চিহ্নিত করতে পারে প্রাণীগুলো।   
যেসব মানুষ ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম করে থাকেন তাদের প্রতিও বিশেষ আকর্ষণ বোধ করে মশা। কারণ সেই ল্যাকটিক এসিডই। শারীরিক পরিশ্রমের পর স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে ল্যাকটিক এসিড নির্গত করে আমাদের শরীরের মাংসপেশিগুলো। আর এই উপাদানের ঘ্রাণ পেয়েই ছুটে আসে মশার দল।  
মশাদের আকর্ষণের গিনিপিগ হওয়ার আরেকটি কারণ রক্তের গ্রুপ। আপনার রক্তের গ্রুপ যদি ‘ও পজিটিভ’ হয়ে থাকে, তাহলে আপনি মশাদের অত্যন্ত প্রিয় খাবার! গবেষকরা বলছেন, মশার কামড় খাওয়ার হার এই গ্রুপের ক্ষেত্রে প্রায় ৮৩ শতাংশ।  
একটি মশা কতদিন বাঁচে?
  যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এর দেওয়া তথ্য বলছে, প্রাপ্তবয়স্ক একটি মশা প্রজাতি, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং অন্যান্য কারণের উপর নির্ভর করে দুই-চার সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারে যদি না সে তার আগেই আপনার হাতে মারা পড়ে। 
মজার ব্যাপার হচ্ছে, স্ত্রী মশা সাধারণত পুরুষ মশার চেয়ে বেশি দিন বাঁচে। স্ত্রী মশারাই কিন্তু রক্তের জন্য আমার আপনার আশেপাশে ঘুরঘুর করে। তাই তাদের মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি। কিন্তু তারাই বেশিদিন বাঁচে!
মন্তব্য করুন