Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ আগস্ট, ২০২৩ ০৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ

আদি ও আদিমধ্য যুগের মুদ্রা ব্যবস্থা, অন্তঃবাণিজ্য ও বহিঃবাণিজ্য।

‘আদি ও আদিমধ্য যুগের মুদ্রাব্যবস্থা, অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্য’

(৬৫০-১২০০ খৃষ্টাব্দ)

অতীতে অধ্যাপক রামশরণ শর্মা ও তাঁর অনুগামীরা প্রথমে অনুমান করেছিলেন যে, আলোচ্য পর্বে ভারতের অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্য কমে যাওয়ার জন্য মুদ্রার ব্যবহার কমে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁরা তাঁদের আগেকার মতের সংশোধন করে জানিয়েছিলেন যে, ১০০০ খৃষ্টাব্দের পর থেকে ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। তখন ব্যবসা-বাণিজ্য যে বেড়েছিল, সেটার প্রমাণ হল যে, দেশে মুদ্রার ব্যবহারও বেড়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিকেরা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের ময়নামতীতে উৎখনন করে বেশ কিছু রৌপ্যমুদ্রা পেয়েছিলেন। অধ্যাপক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন যে, খৃষ্টীয় সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে রূপার মুদ্রার চলন ছিল। সেই মুদ্রাগুলির গায়ে বৃষমূর্তি ও ত্রিশুলের ছাপ ছিল। সম্ভবতঃ আরাকানের ধাঁচে ওই মুদ্রাগুলি তৈরি হয়েছিল। তবে খৃষ্টীয় দশম শতকের পর থেকে মুদ্রাগুলির গঠনে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তখন মুদ্রাগুলি আকারে বড় হয়েছিল, সেগুলোর একপিঠে নকশা আঁকা হয়েছিল, ওজনও বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর আগে মুদ্রাগুলি ওজনে হালকা হলেও সেগুলোর ধাতুগত বিশুদ্ধতা বজায় ছিল। উক্ত সময়ে উত্তর ভারতে প্রচলিত মুদ্রাগুলি ছিল - ‘পুরাণ’, ‘ধরণ’, ‘কার্ষাপণ’ ও ‘দ্রম্ম’। সমকালীন লেখমালায় ৫৭.৪ গ্রেন ওজন বিশিষ্ট মুদ্রাগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রায় একই সময়ে বাংলার হরিকেল মুদ্রার আকৃতি ও ওজনে পরিবর্তনের কারণ ছিল যে, সেগুলিকে তখন উত্তর ভারতীয় মুদ্রার সমমানে উন্নীত করা হয়েছিল। সেই সময়ে পশ্চিম এশিয়ায় প্রচলিত রুপোর মুদ্রার নাম ছিল ‘দিরহাম’। বাংলার মুদ্রা সেগুলির সঙ্গে নিজের সমতা বজায় রেখেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে তখন বাংলার মুদ্রা সম্ভবতঃ ভারত ও ভারতের বাইরে বাণিজ্য বিনিময়ের কাজে ব্যবহার করা হত। ঐতিহাসিকেরা বাংলার পাহাড়পুর অঞ্চল থেকে সমকালীন খলিফা হারুন রসিদের রৌপ্যমুদ্রা এবং ময়নামতীতে খলিফা মুসতাসিম বিল্লার স্বর্ণমুদ্রা পেয়েছিলেন। তা থেকে অনুমান করা যায় যে, তখন সেই অঞ্চলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু ছিল। আওমকালীন আরবীয় লেখকেরা তাঁদের লেখায় চট্টগ্রাম (সমন্দর-সুদকাওয়ান) বন্দরের প্রশংসা করেছিলেন।

৬৫০-১০০০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে উত্তর ভারতে মুদ্রার ব্যবহার কমে গিয়েছিল, আগেকার এই ধারণাকে বর্তমানের ঐতিহাসিকেরা এখন আর সমর্থন করেন না। যেহেতু তখন বাণিজ্য চালু ছিল, সুতরাং দেশে মুদ্রার ব্যবহারও চালু ছিল। তবে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের মতো উত্তর-পশ্চিম বঙ্গে সেকালের কোন মুদ্রা পাওয়া যায়নি। ঐতিহাসিকেরা পাল ও সেন রাজাদের নামাঙ্কিত কোন মুদ্রার সন্ধান পাননি। যদিও তাঁদের তাম্রশাসনে পুরাণ ও কপর্দক ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। কপর্দক হলো কড়ি, উক্ত সময়ে বঙ্গদেশে কড়ির ব্যবহার চালু ছিল। তবে তখন বহির্বাণিজ্যে কড়ির ব্যবহার চালু ছিল না; সুতরাং, সেক্ষেত্রে বিনিময় বাণিজ্য ছিল বলে অনুমান করা হয়। চৈনিক পরিব্রাজক ‘মাহুয়ান’ জানিয়েছিলেন যে, সমকালে বাংলা থেকে মালদ্বীপে চাল পাঠানো হত, আর বিনিময়ে সেখান থেকে বাংলায় কড়ি আসত। অর্থাৎ, বঙ্গদেশে কড়ি তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটা মাধ্যম ছিল। তবে কড়ির উপস্থিতি দিয়ে একথা প্রমাণ করা যায় না যে, তখন বাণিজ্য কমে গিয়েছিল ও আবদ্ধ অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, তখন কড়ি ও পুরাণ জাতীয় মুদ্রার মধ্যে সহজ বিনিময় ব্যবস্থা ছিল। সেযুগে ১,২৮০টি কড়ির বিনিময়ে একটি রৌপ্যমুদ্রা; এবং ২০,৪৮০টি কড়ির বিনিময়ে একটি স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যেত। পাল-সেন যুগে মুদ্রা ছিল না বলে বাণিজ্যের ক্ষতি হয়নি; তখন পুরাণ, কপর্দক দিয়ে সহজেই হরিকেলের রৌপ্যমুদ্রার সঙ্গে বিনিময় করা হত। আসলে তখন বিপুল পরিমাণ কড়ি নিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনায় অসুবিধা ছিল। খৃষ্টীয় দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের লেখগুলিতে নতুন মুদ্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই মুদ্রা ছিল ‘চূর্ণী’। ঐতিহাসিকদের মতে পুরাণ ও চূর্ণী হলো সমার্থক ছিল। অন্ততঃ উড়িষ্যার লেখতে পুরাণ, কার্ষাপণ ও চূর্ণীকে সমার্থক বলে দেখানো হয়েছিল। গবেষকদের মতে চূর্ণী সম্ভবতঃ সোনা ও রুপোর গুঁড়ো ছিল। আরবীয় লেখকদের লেখা থেকে জানা যায় যে, প্রতিহারদের রাজ্যে ধাতব চূর্ণ দিয়ে ব্যবসা চালানো হত। তিব্বতী ঐতিহ্যে স্বর্ণ চূর্ণ ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। তাই চূর্ণী একটা সময়ে সোনা ও রুপোর মুদ্রার বিকল্প হিসেবে বিনিময় মাধ্যম হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকেরা অনুমান করে থাকেন। সোনা ও রুপোর চূর্ণী ব্যবহারের ফলে বণিকদের বহু কড়ি নিয়ে বিদেশে যেতে হত না, তাতে বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা করা সহজ হয়েছিল। সমকালীন উত্তর ভারতে যেসব ধাতব মুদ্রা চালু ছিল, সেগুলোর ওজন ও ধাতব বিশুদ্ধতা সব সময়ে নির্ভরযোগ্য হত না। সেজন্য ওই ধরনের মুদ্রা দিয়ে তখন দূরপাল্লার বাণিজ্য পরিচালনা করা সম্ভব হত না। ধাতু চূৰ্ণ সম্ভবতঃ সেই ধরনের মুদ্রার জায়গা নিয়েছিল। আদি মধ্যযুগে বাংলায় তিন ধরনের বিনিময় মাধ্যম ছিল। সবচেয়ে ওপরে ছিল রৌপ্যমুদ্রা দ্রম্ম, কার্যাপণ, পুরাণ; মাঝখানে ছিল সোনা বা রৌপ্য চূর্ণ; এবং সর্বনিম্নে ছিল কপর্দক বা কড়ি। সেগুলোর মধ্যে সহজ বিনিময়-যোগ্যতা ছিল। অধ্যাপক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় অনুমান করেছিলেন যে, তখন শুধু বাংলা নয়, উত্তর ভারতের সর্বত্রই ওই ধরনের ত্রিস্তর বিশিষ্ট (ধাতব মুদ্রা, চূর্ণী ও কপর্দক) মুদ্রাব্যবস্থা চালু ছিল। উক্ত পর্বে পাঞ্জাবেও বেশ কিছু মুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল। এসব পরিষ্কার বোঝা যায় যে, আলোচ্য সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষে মুদ্রানির্ভর অর্থনীতি বিনিময় প্রথার স্থান নিয়েছিল।

সমকালীন লেখমালায় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের কথা পাওয়া যায়। সেই সব ঐতিহাসিক উপাদানে ‘হট্ট’ ও ‘হট্টিকা’র উল্লেখ পাওয়া যায়; সেগুলি ছিল আধুনিক কালের হাট, যা তখন সপ্তাহে একবার বা দু’বার বসত। দক্ষিণ ভারতে ও দাক্ষিণাত্যেও ওই ধরণের হাট ছিল, যেগুলি ‘সন্থে’ নামে পরিচিত ছিল। নির্দিষ্ট দিনের সন্থে সেই দিনের নামানুসারে চিহ্নিত হত। সেই হাটগুলি অনেক সময়ে মেলার রূপ পরিগ্রহ করত, অনেক মেলায় গবাদি পশুর কেনাবেচা হত। খৃষ্টীয় নবম শতকের রাজস্থানের লেখতে ‘কম্বলী হট্ট’ ও ‘ঘোটক যাত্রা’র (ঘোড়ার মেলা) উল্লেখ পাওয়া যায়। একথা অনুমান করা হয়ত অসঙ্গত হবে না যে, সেই ধরনের জীবজন্তুর মেলা তখন বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে কয়েকদিন ধরে চলত। হাট বা মেলা ছাড়াও সেযুগে ‘মণ্ডপ’ ও ‘মণ্ডপিকা’ নামের বাজার ছিল, সেগুলো সম্ভবতঃ আচ্ছাদিত এলাকা ছিল। তৎকালীন উত্তর ভারতের বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল মণ্ডপিকা। আদি মধ্যযুগের ভারতে ওই ধরনের বাজারের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল। খৃষ্টীয় অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে কাংড়া, গোয়ালিয়র, ভরতপুর, জব্বলপুর, রাজস্থান ও গুজরাটের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন আয়তনের মণ্ডপিকা স্থাপিত হয়েছিল। রাজস্থান ও গুজরাটে ওই ধরনের মণ্ডপিকার সংখ্যা বেশি ছিল। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় রাজস্থানের অনেকগুলি লেখ বিশ্লেষণ করে বারোটি ‘কুণ্ডুপিকা’ ও সমসংখ্যক হাটের সন্ধান পেয়েছিলেন। এছাড়া তিনি সেখানকার চারটি বাণিজ্যকেন্দ্রের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। মণ্ডপিকাগুলি কোথাও কোথাও ‘শুল্ক মণ্ডপিকা’ বলেও উল্লিখিত হয়েছিল, সম্ভবতঃ সেইসব জায়গায় বাণিজ্যশুল্ক আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। রাজস্থানের মণ্ডপিকাগুলির বেশ কয়েকটি গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত ছিল। সিয়াডোনি, গোয়ালিয়র ও জব্বলপুর অঞ্চলের মণ্ডপিকা বড় শহরে (পত্তনমণ্ডপিকা) ছিল, সমকালীন লেখতে সেগুলোকে ‘মহামণ্ডপিকা’ বলা হয়েছিল। উত্তর ভারতে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে মণ্ডপিকার বিকাশ ঘটেছিল। সমকালীন দক্ষিণ ভারতে ছিল ‘নগরম’, দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন লেখতে নগরমের উল্লেখ পাওয়া যায়। গবেষক ‘কেনেথ হল’ চোল আমলের লেখমালায় তেত্রিশটি নগরমের সন্ধান পেয়েছিলেন। হল অনুমান করেছিলেন যে, দক্ষিণ ভারতে কয়েকটি গ্রাম নিয়ে আর্থ-সামাজিক-প্রশাসনিক কেন্দ্র নাড়ু গঠিত হত। প্রত্যেক নাড়ুতে একটি করে নগরম ছিল। গবেষক ‘বার্টন স্টেইন’ চোল আমলের কৃষি অর্থনীতি ও নগরমের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক লক্ষ্য করেছিলেন। হলের মতে, নগরমগুলি গ্রামের সঙ্গে লেনদেনের কাজ করত, আবার অন্য নাড়ুর সঙ্গে বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের কাজ চালাত। তিনি আরও জানিয়েছিলেন যে, দক্ষিণ ভারতের বণিক সংগঠন ‘নানাদেশী’র সঙ্গে নগরমগুলির বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। হল সমকালীন দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত স্থল বাণিজ্যকেন্দ্র ‘এরিবীরপট্টিনমের’ সন্ধান দিয়েছিলেন। তবে তখন প্রত্যেক নাড়ুতে একটি করে নগরম ছিল, ইতিহাসে এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।

সমকালীন লেখমালায় শ্রেষ্ঠী, সার্থবাহ ও বণিকদের উল্লেখ পাওয়া যায়। দক্ষিণ ভারতের কোলাপুর, মিরাজ ও বেলগাঁওয়ে প্রাপ্ত লেখতে বণিক সমাবেশের কথা রয়েছে। সেই বণিকেরা কোথা থেকে এসেছিলেন, তাঁদের পরিচয়, এবং নামের তালিকাও পাওয়া যায়। বিভিন্ন লেখতে গুজরাট (লাট), রাজস্থান ও কোঙ্কনের বণিকদের নামও পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু উত্তর ভারতে আদি মধ্যযুগে বণিকদের কোন সংগঠনের উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। সেই পর্বে দক্ষিণ ভারতে দুটি বণিক সংগঠনের নাম পাওয়া যায় - ‘মণিগ্রামম’ ও ‘নানাদেশী’। খৃষ্টীয় দশম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে বাণিজ্যে তাঁদের বিশিষ্ট ভূমিকার কথা জানা যায় ৷ সেই সংগঠনের বণিকেরা বহু দূর দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতেন, এবং রাজদরবারে ও অভিজাতদের কাছে সেগুলি বিক্রি করতেন। তাঁদের আমদানি পণ্যের তালিকায় মণিমুক্তো, বিলাসদ্রব্য, সুগন্ধি দ্রব্য, বস্ত্র ইত্যাদি ছিল। রাজারা তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন, এছাড়া সমকালীন লেখমালায় আরও বলা হয়েছে যে, সশস্ত্র প্রহরীরা সেই দুই সংগঠনের বণিকদের রক্ষা করতেন।

সেযুগে বণিকেরা তাঁদের পণ্যসম্ভার নিয়ে যখন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেতেন, তখন তাঁদের কাছ থেকে ‘স্কন্ধক’ নামের একটা কর আদায় করা হত। সম্ভবতঃ ওই সব বণিকেরা কাঁধে করে তাঁদের বিক্রয়যোগ্য পণ্য বহন করতেন। এছাড়া স্থলপথ বাণিজ্যের ওপরে ‘মার্গনক’ নামের একটি কর চালু ছিল। সেকালের যাতায়াত ব্যবস্থার পরিচয় সমকালীন লেখমালায় তেমনভাবে পাওয়া যায় না। তবে গুজরাটে প্রাপ্ত একটি লেখতে বলা হয়েছে যে, তখন পণ্য বহনের জন্য বলদ, গর্দভ ও উট ব্যবহার করা হত। রাজস্থানে ভ্রাম্যমাণ বানজারা বণিকদলের অস্তিত্ব ছিল। তাঁরা ষাঁড়ের পিঠে করে এক জায়গা থেকে পণ্য অন্য জায়গায় বহন করে নিয়ে গিয়ে বাণিজ্য করতেন। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় বৃষপৃষ্ঠে পণ্য বহনকারী সেইসব বণিকদের বর্ণনা দিয়েছিলেন। সেযুগে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত কিছু রাস্তাঘাটের বিবরণও পাওয়া যায়। কিয়াতানের চৈনিক বিবরণে উল্লিখিত হয়েছে যে, তখন কামরূপ থেকে উত্তরবঙ্গ হয়ে রাজমহল পাহাড়ের মধ্য দিয়ে (কাঁকজোল) মগধ পর্যন্ত পৌঁছানো যেত। খৃষ্টীয় অষ্টম শতকে অযোধ্যার তিনজন বণিকভ্রাতা স্থলপথে তাম্রলিপ্ত বন্দরে এসেছিলেন, তখন গঙ্গেয় উপত্যকার সঙ্গে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলের যোগাযোগ ছিল। খৃষ্টীয় একাদশ শতকে আলবেরুনি কনৌজ ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা লক্ষ্য করেছিলেন, তিনি তাঁর লেখায় তখনকার কয়েকটি পথঘাটের উল্লেখ করেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে একটি পথ কনৌজ থেকে বেরিয়ে অযোধ্যা, বারাণসী, পাটনা, মুঙ্গের হয়ে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত পৌঁছাত। আরেকটি পথ কনৌজ থেকে বেরিয়ে উড়িষ্যা হয়ে দক্ষিণ ভারতে গিয়েছিল। আলবেরুনি জানিয়েছিলেন যে, তখন কনৌজের সঙ্গে স্থলপথে কাশ্মীর, তিরহুত, কামরূপ ও নেপালের যোগাযোগ ছিল। গুজরাটের বিখ্যাত বন্দর ও মন্দির শহর সোমনাথের সঙ্গে মথুরার সংযোগরক্ষাকারী একটা রাস্তা ছিল; এই পথ মথুরা থেকে বেরিয়ে উজ্জয়িনী, ধর, জয়পুর হয়ে সোমনাথ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। রামশরণ শর্মা বলেছিলেন যে, একাদশ শতক থেকে ভারতের বাণিজ্য বেড়ে গিয়েছিল। অন্যান্য ঐতিহাসিকদের মতে ইতিহাসে খৃষ্টীয় সপ্তম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের গতিময়তার চিত্র পাওয়া যায়।

রামশরণ শর্মা ও তাঁর অনুগামীরা স্বীকার করেন নি যে, খৃষ্টীয় চতুর্থ থেকে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত ভারতের বহির্বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সপ্তম শতকে ইসলামের আবির্ভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। ইসলাম শুধু নতুন ধর্মমত প্রচার করেনি; নতুন জীবনদর্শন ও জীবনযাপন পদ্ধতিও নিয়ে এসেছিল। ইসলামের শাসনাধীন অঞ্চলে নগর ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছিল। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বাণিজ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, ফলে এশিয়ার সমুদ্র বাণিজ্যে আরবদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল। ভারত মহাসাগরে আরবদের আগমন ভারতের বহির্বাণিজ্যকে অবশ্যই প্রভাবিত করেছিল। আরব বণিকরা অষ্টম শতকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মালাক্কা হয়ে চীনে যেতেন। সমকালীন চীনের ইতিহাসে আরবীয় বণিকদের বাণিজ্যের কথা পাওয়া যায়। ভারতের উপকূলের বন্দরগুলিতেও আরবদের বাণিজ্যঘাঁটি ছিল। বাষ্পীয় সমুদ্রযান আবিষ্কারের আগে সমুদ্রবণিকেরা মৌসুমী বায়ুর ওপরে নির্ভর করতেন। তখন পশ্চিম এশিয়ার বন্দরগুলি থেকে রওনা হয়ে (হরমুজ, মোখা, এডেন) আরবীয় জাহাজগুলি ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দরে আসত; এরপরে সেখান থেকে মালাবার ও করমণ্ডল হয়ে সেগুলো চীনে যেত। ‘কীর্তিনারায়ণ চৌধুরী’ তাঁর লেখায় তখনকার আরবীয় বণিকদের বাণিজ্যের বর্ণনা দিয়েছিলেন। অষ্টম শতকের আগে সেই পথে একটি মাত্র আরবীয় জাহাজ যাতায়াত করত, কিন্তু অষ্টম শতক থেকে সেই পথে একাধিক জাহাজ পাড়ি দিয়েছিল। তখন মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে আরবীয় জাহাজগুলি ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলিতে এসে ভিড়ত। সেযুগে পারস্য উপসাগরীয় বন্দর মস্কট থেকে জাহাজে চড়ে একমাসের মধ্যে মালাবারের কুইলনে পৌঁছানো যেত। ইবন বতুতাও তাঁর লেখায় তখনকার সেই বাণিজ্যের উল্লেখ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, আরবীয় জাহাজগুলি (ধাও) কুইলন ও কালিকটে আসত। তবে চীনা জাহাজ (জাঙ্ক) তখন ভারতীয় বন্দর কালিকট ও কুইলনে বেশি আসত না, তারা আরবীয় জাহাজ থেকেই পণ্য সংগ্রহ করে নিত। সেযুগে ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলি পশ্চিম ও পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য বিনিময় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। তখনকার আন্তর্জাতিক সমুদ্র-বাণিজ্যে ভারত মধ্যস্থের ভূমিকা নিয়েছিল। এবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, তখন ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে আরব দেশ থেকে চীন পর্যন্ত পাড়ি দিয়ে তখন লাভ বেশি হত না, উল্টে ব্যয় বেশি হত। সেজন্য আরবীয় বণিকেরা ভারতকে তাঁদের অন্তর্বর্তী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতেন।

সমকালে গুজরাট, কোঙ্কন ও মালাবার উপকূল আন্তর্জাতিক এশীয় বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। সুলেমান, আল মাসুদি, আল ইদ্রিসি প্রভৃতি সমকালীন আরবীয় লেখকরা তাঁদের লেখায় ভারতের বন্দর ও বাণিজ্যের উল্লেখ করেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে গুজরাটের ক্যাম্বে (কানবায়া), কোঙ্কনের সিনদান (সনজন), সোপারা, চৌল, গোয়ার সিন্দাপুর এবং মালাবারের কুইলন তখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেযুগে আরবীয় বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল বসরা ও সিরাফ, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বও তখন বৃদ্ধি পেয়েছিল। পারস্য উপসাগর থেকে যাত্রা শুরু করে আরবীয় জাহাজগুলি গুজরাট ও কোঙ্কনে এসে হাজির হত। আরবীয় লেখকেরা তাঁদের লেখায় সেই দুই উপকূলের গুরুত্বের বর্ণনা দিয়েছিলেন। সমকালীন প্রায় সব আরবীয় লেখকই তাঁদের লেখায় কামকামের (মাকামকাম) কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেটি কোঙ্কন উপকূলের একটি অঞ্চল ছিল। সেখানে রাষ্ট্রকূট বংশীয় রাজারা (বালাহারা) রাজত্ব করতেন। আল মাসুদি (৯১৫) কোঙ্কনের চৌল বন্দরে দশ হাজার মুসলমান বণিকের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে সিরাফ, বসরা, ওমান ও বাগদাদের বণিকেরা প্রধান ছিলেন। সেকালের দু’জন আরবীয় বণিক - ‘মুসাবেন ইশাক আল সান্দালুনি’ ও ‘আবু সৈয়দ মারুফ বেন জাকারিয়া’ - সেখানেই প্রায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। রাষ্ট্রকূটদের লেখতে (তৃতীয় ইন্দ্রের চিনচানি লেখ, ৯২৬ খৃষ্টাব্দ) বলা হয়েছে যে, তখন আরবীয়রা (সুগতীপ মধুমতি - মহম্মদের অনুগামী) সনজন ও সন্নিহিত উপকূল অঞ্চলের ওপরে তাঁদের আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে আরবদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, এমনকি রাষ্ট্রকূটদের পরেও কোঙ্কন অঞ্চলের সঙ্গে আরবীয়রা তাঁদের বাণিজ্যিক লেনদেন বজায় রেখেছিলেন। শিলহার বংশীয় রাজাদের লেখতে (১০৩৪ খৃষ্টাব্দ) তিনজন আরবীয় বণিক - আলি, মহর ও মহম্মদের - নাম পাওয়া যায়।

মিশরে ফাতেমিদ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে (৯৬৯ খৃষ্টাব্দ) পারস্য উপসাগরীয় বাণিজ্যে অবনতি ঘটেছিল, তবে তখন লোহিত সাগরের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। লোহিত সাগরের দুই প্রান্তের দুই বন্দর - আলেকজান্দ্রিয়া ও এডেন - তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এর তাৎপর্য হল যে, সেই সূত্র ধরে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যের সঙ্গে ইউরোপের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল। এডেন থেকে ভারতে যাতায়াতের জন্য গুজরাট ও মালাবারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ইবন বতুতা ও মার্কোপোলো সমকালীন ভারতের বন্দরগুলির যে তালিকা দিয়েছিলেন, তাতে মালাবারের বন্দরের সংখ্যা বেশি বলে দেখা যায়। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলি হল - কুইলন, কালিকট, পাণ্ডারানি, ম্যাঙ্গালোর, বারকুর, হোনাবুর ও সিন্দাবুর (গোয়া)। সেই সব বন্দরের সঙ্গে এডেনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, এছাড়া এডেনের সঙ্গে থানা ও ক্যাম্বেরও যোগাযোগও ছিল। ‘গোটিন’ তাঁর লেখায় পারস্য উপসাগরের কিশ-এর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলিতে তখন মুসলমান বণিকদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ‘বেঞ্জামিন’ খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতকে মালাবারে ইহুদি বণিকদের উপস্থিতি ছিল বলে জানিয়েছিলেন। ইহুদি বণিকদের চিঠি থেকেও সেই বাণিজ্যের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই চিঠিগুলি থেকে এডেন ও আলেকজান্দ্রিয়ার পণ্যের চাহিদা, দাম, জাহাজী পরিবহন, বণিকদের মধ্যেকার সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে প্রচুর তথ্য পাওয়া গিয়েছে। আরবীয় বণিকরা শ্রীলঙ্কার (সেরেনদির) সঙ্গে তাঁদের বাণিজ্যের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। পশ্চিমদিকে মালদ্বীপ এবং পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গেও আরবদের বাণিজ্য ছিল। সেজন্যই তাঁরা বাণিজ্যে শ্রীলঙ্কার গুরুত্বকে যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

খৃষ্টীয় অষ্টম শতকের পরে পূর্ব ভারতের বড় বন্দর তাম্রলিপ্তের পতন ঘটেছিল। নবম ও দশম শতকের আরবীয় লেখকেরা জানিয়েছিলেন যে, তখন ‘সমন্দর’ (চট্টগ্রামের কাছে) বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ বন্দর ছিল। আল ইদ্রিসি লিখেছিলেন যে, সেই বন্দরে বাণিজ্য করে আরবীয় বণিকেরা লাভবান হয়েছিলেন। ইবন বতুতা চট্টগ্রামকে ‘সুদকাওয়ান’ বলেছিলেন। উক্ত বন্দরটি সমৃদ্ধ ছিল, সেখানে প্রভূত বাণিজ্যিক লেনদেন হত, এবং সেই পথেই কামরূপের সাথে বাণিজ্য পরিচালিত হত। আরবীয় লেখকরা আরও জানিয়েছিলেন যে, চট্টগ্রামের সঙ্গে উড়িষ্যা ও কাঞ্চীরও বাণিজ্য চলেছিল। শ্রীলঙ্কা থেকেও চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পাঠানো হত। সমন্দরের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে বাংলার বাণিজ্য চলেছিল, পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। দক্ষিণ ভারতের উপকূল বন্দরগুলির মাধ্যমে তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চলত। কাঞ্চীপুরম সেই বাণিজ্যের একটি বড় ঘাঁটি ছিল। চোল শাসনকালে করমণ্ডল উপকূল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনা করে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। রাজরাজ চোলের রাজত্বকালে ‘মামল্লাপুরম’ একটি বড় বন্দর ছিল। দক্ষিণ ভারতের একটি বণিক গোষ্ঠী সেই বন্দরের কাজকর্ম তদারকির ভার পেয়েছিল। কিন্তু পরে ওই অঞ্চলে ‘নেগাপত্তমের’ (নাগপট্টনম) উত্থান ঘটলে মামল্লপুরমের গুরুত্ব কমে গিয়েছিল। চীনের সু বংশের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, চোলরাজা রাজরাজ (লোৎসা-লোসা) চীনে তাঁর দূত পাঠিয়েছিলেন। দশম শতকের আগে এশিয়ার সমুদ্র-বাণিজ্যে চীনের উপস্থিতি তেমনভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, তবে এরপর থেকে সমুদ্র-বাণিজ্যে চীনের ভূমিকা অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছিল। তখন থেকে এশীয় বাণিজ্যের দুই প্রান্তে চীনা ও আরবীয়রা ছিলেন, আর ভারত তাঁদের মধ্যে অন্তর্বর্তী ঘাঁটি হিসেবে জায়গা পেয়েছিল।

রাজেন্দ্র চোলের আমলে (১০১২-৪৪) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। শ্রীবিজয়ের রাজা (জাভা, সুমাত্রা, মালয়) নাগপত্তমে চূড়ামণি বিহার নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতের একটি মন্দিরে শ্রীবিজয়ের প্রতিনিধি চীনের সোনা দান করেছিলেন। এ থেকে অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে, তখন শ্রীবিজয় করমণ্ডল ও চীনের মধ্যে অন্তর্বর্তী ঘাঁটি হয়ে উঠেছিল। শ্রীবিজয়ের রাজা চোলদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। কাম্বোডিয়া অঞ্চলের সঙ্গেও চোলদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। রাজেন্দ্র চোলের একটি লেখতে কম্বোজ রাজের পাঠানো উপঢৌকনের কথা পাওয়া যায়। গবেষক হল জানিয়েছিলেন যে, অর্থনৈতিক কারণে তাঁদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখবার দরকার হয়েছিল। পরবর্তী চোলরাজারাও বাণিজ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। প্রথম কুলোতুঙ্গ শুল্ক (সুঙ্গ) তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, এছাড়া বিদেশী বণিকদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য তিনি শুল্ক ছাড়ের কথাও বলেছিলেন। কুলোতুঙ্গ ব্রহ্মদেশের (পাগান) রাজার সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। চাওজুকুয়া জানিয়েছিলেন যে চীন থেকে ব্রহ্মদেশ হয়ে চোল রাজ্যে যাওয়া যেত। সম্ভবতঃ চোলরাজা ব্রহ্মদেশের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর সময়ে বেঙ্গি উপকূলে বিশাখাপত্তনমের উত্থান ঘটেছিল, সেই বন্দরটির অন্য নাম হল ‘কুলোতুঙ্গ- চোলপট্টনম’। এরপরে বিশাখাপত্তনম বন্দরের গুরুত্ব বেড়ে চলেছিল, কৃষ্ণা-গোদাবরী ব-দ্বীপ অঞ্চলের সেই বন্দর দিয়ে তখন সহজেই ব্রহ্মদেশে যাওয়া যেত। খৃষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে চোল নৌবহরের আধিপত্য বৃদ্ধি পেয়েছিল, রাজরাজ ও রাজেন্দ্র নৌবহরের সাহায্যে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও শ্রীবিজয় অধিকার করেছিলেন। তবে শ্রীলঙ্কা ছাড়া আর কোথাও চোলরাজারা তাঁদের নৌসাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটাননি। ‘জর্জ স্পেন্সার’ অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, শুধুমাত্র সম্পদ আহরণের জন্যই চোলরাজারা নৌঅভিযান পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু শুধু সম্পদের জন্য তাঁরা দীর্ঘকাল নৌঅভিযান চালিয়েছিলেন সেই অভিমত বর্তমান সময়ে অনেকেই মানতে চান না; তাঁদের মতে, সম্ভবতঃ বাণিজ্যিক স্বার্থে তাঁরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নৌঅভিযান পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা চীনের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপগুলির চীন বাণিজ্যে মধ্যবর্তীর ভূমিকা তাঁরা খর্ব করতে চেয়েছিলেন। তবে কিছু ঐতিহাসিকের মতে তাঁরা ভারত মহাসাগরে আরবীয় বণিকদের ভূমিকাকে সঙ্কুচিত করবার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাঁদের মতে আরবীয় বণিকদের আধিপত্য খর্ব করাই চোলদের নৌঅভিযানের একটি লক্ষ্য ছিল।

তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:

১- Perspectives in Social and Economic History of Early India, Ram Sharan Sharma.

২- Aspects of Rural Settlements and Rural Society in Early Medieval India, Brajadulal Chattopadhyaya.

৩- A History Of South India, K. A. Nilakanta Sastri.

৪- Ancient India, R. C. Majumdar.

৫- Socio-Economic History Northern India, Bhakat Prasad Mazumdar.

৬- The Economic Life of Northern India: c. A. D. 700-1200, Lallanji Gopal.

৭- Trade and Civilisation in the Indian Ocean: An Economic History from the Rise of Islam to 1750, Kirti Narayan Chaudhuri.

মন্তব্য করুন

ব্লগ