সহকারী শিক্ষক
২৫ আগস্ট, ২০২৩ ১২:৪১ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘আদি ও আদিমধ্য যুগের স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা’
(৬৫০-১২০০ খৃষ্টাব্দ)
আদি ও আদি মধ্যযুগের ভারতে মন্দির, প্রাসাদ, দুর্গ, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি নির্মাণে একটি বিশিষ্ট শৈলী অনুসরণ করা হয়েছিল। সমকালীন ভারতের শিল্পশাস্ত্রে তিনটি রীতির কথা পাওয়া যায় - নাগর, দ্রাবিড় ও বেসরা। আলোচ্য সময়ে হিমালয় থেকে বিন্ধ্য পর্যন্ত অঞ্চলে নাগর রীতি, কৃষ্ণা থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত অঞ্চলে দ্রাবিড় রীতি, এবং বিন্ধ্য থেকে কৃষ্ণা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলিতে বেসরা রীতি প্রচলিত ছিল। শেষোক্ত অঞ্চলে রীতিটি চালুক্য রীতি নামেও ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করেছিল। ক্রুশের মতো চতুষ্কোণ বিশিষ্ট পরিকল্পনা এবং শিখর (Cruciform plan and the curvilinear sikhar) নাগর রীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল। উত্তরপ্রদেশের দেওগড়ের দশাবতার মন্দির এবং ভিতরগাঁও মন্দিরে সেই শিল্পশৈলীর ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। খৃষ্টীয় অষ্টম শতক নাগাদ নাগর শৈলী তার পূর্ণ পরিণত রূপ লাভ করেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে গুপ্তযুগের শেষের দিকে সেই রীতির সূচনা হয়েছিল। মন্দিরের পিরামিডাকৃতি গঠন এবং সূক্ষ্ম চূড়া তৎকালীন দক্ষিণ ভারতের শিল্পরীতি ছিল। সেখানকার মন্দিরগুলির মধ্যে অবশ্যই গর্ভগৃহ, প্রদক্ষিণ চত্বর, বিমান ও স্তুপি থাকা বাঞ্চনীয় ছিল। এই দুই রীতির মিশ্ররূপ ছিল বেসরা। আলোচ্য সময়ের ভারতের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে নাগর শৈলী ব্যবহৃত হয়েছিল। উত্তরে হিমালয় থেকে শুরু করে দক্ষিণে বিজাপুর, এবং পশ্চিমে পাঞ্জাব থেকে শুরু করে পূর্বে বাংলা পর্যন্ত এই রীতিতে বিভিন্ন স্থাপত্য শিল্প গড়ে উঠেছিল।
মন্দিরময় উড়িষ্যাকে সেই সময়কার ভারতের মন্দির স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত করা হয়ে থাকে (There are perhaps more temples now in Orissa than in all the rest of Hindustan put together)। সেখানে আজও নাগর রীতির বিশুদ্ধ রূপের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। আলোচ্য সময়ে তৈরি উড়িষ্যার মন্দিরগুলি চারটি অংশে - পিষ্ট, বাড়, গণ্ডি ও মস্তক, গর্ভগৃহ ও জগমোহন - এইভাবে বিভক্ত। এছাড়া সেখানকার অনেক মন্দির রথের আকৃতি বিশিষ্ট। ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ মন্দিরকে উড়িষ্যা রীতির পরিণত রূপ বলা যেতে পারে। লিঙ্গরাজ মন্দিরের আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল সেটির সুউচ্চ দেউল। সুবিখ্যাত পুরীর জগন্নাথ মন্দির আয়তনে বিশাল এবং লিঙ্গরাজের শিল্পরীতিতে নির্মিত। উড়িষ্যা রীতির চারটি বৈশিষ্ট্য তাতে দেখতে পাওয়া যায়। কোনারকের সূর্য মন্দির একটি সাত ঘোড়ায় টানা রথের মডেল অনুসারে তৈরি করা হয়েছিল। সেখানকার মন্দির গাত্র অসংখ্য ভাস্কর্য দিয়ে অলংকৃত করা হয়েছিল; জীবজন্তু, গাছপালা ইত্যাদির সঙ্গে নরনারীর প্রেমও সেখানকার ভাস্কর্য থেকে বাদ পড়েনি। গবেষকদের মতে সবকিছুই সেখানে স্বাভাবিকভাবে স্থান পেয়েছিল, কোথাও কিছু আরোপ করা হয়নি। তৎকালীন মধ্যে ভারতে নাগর রীতির সম্প্রসারণ ঘটেছিল; সিরপুরের লক্ষ্মণ মন্দির, গোয়ালিয়রের মন্দির এবং মহাদেব মন্দিরে সেই রীতির নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। মধ্যে ভারতে - গর্ভগৃহ, মণ্ডপ ও অন্তরাল - এই তিনটি অংশ নিয়ে মন্দির স্থাপত্য গড়ে উঠেছিল। নর্মদা, শোন ও মহানদীর উৎপত্তিস্থলে অবস্থিত অমরকণ্টকে সেই সময়কার অনেকগুলি সুন্দর সুন্দর মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে সোহাগপুরের বিরাটেশ্বর শিব মন্দির অমরকণ্টক মন্দিরের সমগোত্রীয়।
খৃষ্টীয় দশম শতকে চান্দেল্ল রাজাদের সুবিখ্যাত খাজুরাহো মন্দিরগুলি নির্মিত হয়েছিল। সেখানে আজও অন্ততঃ তিরিশটি প্রাচীন মন্দির রয়েছে; সেগুলো শৈব, জৈন ও বৈষ্ণব মন্দির। মহাদেব, রাম ও পার্শ্বনাথের নামে সেই মন্দিরগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল। পার্শ্বনাথের পাশে অতিসুন্দর আদিনাথ মন্দির রয়েছে। তবে খাজুরাহোর মন্দির স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হল সেখানকার মহাদেব মন্দিরটি। মন্দিরটির নির্মাণকৌশল, ধারণা ও সূক্ষ্মকাজ আজও বিস্ময়ের উদ্রেক করে। আলোচ্য সময়ে যোধপুরের কাছে ওসিয়াতে অনেকগুলি সুন্দর মন্দির নির্মিত হয়েছিল, সেগুলোরও শৈলী ছিল নাগর। ডঃ ক্রামরিশ সেই মন্দিরগুলির গঠনসৌন্দর্যের প্রশংসা করেছিলেন (It is a model of clarity in the disposition and proportion of its architectural theme)। আজও রাজস্থানে সেই সময়ে তৈরি অনেকগুলি জৈন মন্দির রয়েছে, সেগুলির মধ্যে নেমিনাথ সবচেয়ে বিখ্যাত। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে সেই মন্দিরটি স্থাপিত। রাজস্থানের মন্দির শৈলীর সঙ্গে গুজরাটের শৈলীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। কাথিয়াবাড়ের গোপ মন্দিরগুলিতে গান্ধার শিল্পের প্রভাব পড়েছিল বলে স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ সাঙ্কালিয়া মতপ্রকাশ করেছিলেন। সেখানকার মন্দিরগুলিতে আগেকার চতুষ্কোণ রীতি ত্যাগ করে আয়তক্ষেত্রের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল (rectangular design of the sanctum)। গুজরাটের সোলাঙ্কি রাজারা মোধেরাতে সূর্য মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, আজও সেই মন্দিরের বিশালতা ও গাম্ভীর্য দর্শকদের আকৃষ্ট করে। তৎকালীন সময়ে দক্ষিণে কৃষ্ণা-তুঙ্গভদ্রা উপত্যকা পর্যন্ত নাগর শিল্পশৈলীর প্রসার ঘটেছিল। আইহোল, পত্তদকল, মহামুক্তেশ্বর ও আলমপুরে ঐতিহাসিকেরা নাগর রীতির মন্দির স্থাপত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন। গবেষকদের মতে নাগর ও দ্রাবিড় রীতির মিশ্রণেই চালুক্য শৈলী তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ে সিন্ধু-গঙ্গা অঞ্চলে পাথর কেটে মন্দির নির্মিত হয়েছিল। কাংড়ার বৈজনাথে আজও সেই ধরণের পাথরের মন্দিরের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তৎকালীন উত্তর, পূর্ববঙ্গ, বিহার অঞ্চলেও নাগর রীতিতে মন্দির নির্মিত হয়েছিল। বর্ধমানের সংদেওলিয়াতে নাগর রীতির ইঁট দিয়ে তৈরি একটি মন্দির রয়েছে, বাঁকুড়ার সিদ্ধেশ্বর সেই রীতির আরেকটি নিদর্শন।
পল্লব রাজারা শিল্প ও সাহিত্যের উৎসাহী সমর্থক ছিলেন। প্রথম নরসিংহ বর্মন মামল্লপুরমে (মহাবলীপুরম, চেন্নাই থেকে ৪৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত) রথের আকৃতি বিশিষ্ট আটটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, সেখানে দ্রাবিড় রীতি ব্যবহৃত হয়েছিল। কাঞ্চীর কৈলাসনাথ মন্দির পল্লব স্থাপত্যের আরেকটি উজ্জ্বল ঐতিহাসিক নিদর্শন। কাঞ্চীর বৈষ্ণব মন্দিরও সম্ভবতঃ পল্লব রাজারা নির্মাণ করেছিলেন। চোল রাজাদের আমলে দ্রাবিড় রীতি পরিণত সুষমামণ্ডিত রূপ লাভ করেছিল। বিজয়ালয়ের চোলেশ্বর মন্দির, তাঞ্জোরের রাজরাজেশ্বর এবং রাজেন্দ্র চোলের গঙ্গাইকোণ্ডচোলপুরম মন্দির চোল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে রয়েছে। নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী শেষোক্ত মন্দিরটিকে ‘দুঃসাহসী প্রযুক্তি কৌশলের নিদর্শন’ (modern predatory engineering) বলেছিলেন। চালুক্য শাসিত গুজরাট অঞ্চলে তখন বেসরা রীতির চলন ছিল। সেখানে নাগর ও দ্রাবিড় রীতির পাশাপাশি বেসরা রীতি ব্যবহৃত হয়েছিল, বিমান ও মণ্ডপ এই রীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। আইহোল ও পত্তদকলে আজও এই রীতির নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে; লাকুণ্ডির জৈন মন্দির এই রীতিতেই নির্মিত হয়েছিল। খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতকে চালুক্য শৈলী নিজের পরিণতির সর্বশেষ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হৈসল রাজারা সেই শৈলীতে মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সমকালে কাশ্মীরের রাজারা অনেকগুলি স্তূপ ও চৈত্য নির্মাণ করেছিলেন। ললিতাদিত্যের মন্দিরগুলিতে বৈদেশিক প্রভাব পড়েছিল। বাংলাদেশের রাজশাহীর পাহাড়পুরে সমকালীন একটি বিশাল মন্দিরের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল। আদি ও আদি মধ্যযুগের ভারতের মন্দির স্থাপত্য যেমনি বিচিত্র তেমনি অসাধারণ সুষমামণ্ডিত।
ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে খৃষ্টীয় অষ্টম ও নবম শতকে আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল, তবে ধ্রুপদী ধারাও তখন পাশাপাশি প্রবহমান ছিল। তৎকালীন ভারতের ভাস্কর্য নিদর্শনগুলি অবশ্যই ত্রিমাত্রিক (three dimensional) ছিল, আর চিত্রকলা ছিল দ্বিমাত্রিক। তখন কোনো কোনো শিল্পে ভাস্কর্য ও চিত্রকলা মিশে গিয়েছিল, অজন্তা ও ইলোরার গুহাগুলির ক্ষেত্রে এর ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। সেই যুগের ভাস্কর্যের ওপর ধর্মের প্রভাব খুব বেশি ছিল; আলোচ্য সময়ের প্রথমদিকের ভাস্কর্য ছিল দেবদেবীর মূর্তি, সেগুলোর মধ্যে ধর্মীয় আবেগ ও সৃজনশীলতা মিশে গিয়েছিল। আলোচ্য কালের ভারতে বিষ্ণু, সূর্য, উমা-মহেশ্বর, বুদ্ধমূর্তি নির্মিত হয়েছিল, মন্দিরগুলিতে বহু মূর্তি স্থাপিত করা হয়েছিল। তবে তখনকার ভাস্কর্যের উন্নতি সর্বত্র একই সময়ে হয়নি। কোনো কোনো জায়গায় ভাস্কর্যের চেয়ে চিত্রকলা ও কারিগরি শিল্প প্রাধান্য পেয়েছিল। তখন জীবনের প্রয়োজনে শিল্পসুষমামণ্ডিত পণ্য তৈরি হয়েছিল। পোড়ামাটির মূর্তি, চিত্র নির্মাণ করে শিল্পী-কারিগরেরা তাঁদের জীবিকানির্বাহ করেছিলেন। দেবদেবীর পাশাপাশি জীবজন্তু, গাছপালা, নরনারীর মূর্তিও তখন তৈরি করা হয়েছিল। ভারতবর্ষে চিরকালই অলংকার শিল্পের চলন ছিল, কারিগর ও শিল্পীরা চাহিদা অনুযায়ী সেগুলি নির্মাণ করেছিলেন। সোনা, রুপো, পাথর, ব্রোঞ্জ ও পিতলের সব সুন্দর মূর্তি ও অলংকার নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরগাত্রে, পর্বত গুহায়, প্রাসাদে নানাধরনের মূর্তি, বাদ্যযন্ত্র, ও মানব জীবনের নানাদিক প্রতিফলিত হয়েছিল। শিল্প কখনোই জীবনবিমুখ হতে পারে না, তখনকার ভাস্কর্যগুলিতে পার্থিব জীবনের নানাদিকের প্রতিফলন ঘটেছিল।
ভারতের বিভিন্ন জায়গায় তখন অষ্টধাতুর মূর্তি নির্মিত হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে নালন্দার মূর্তিগুলি উল্লেখের দাবি রাখে। সমকালীন ভাস্কর্যে পূর্ব ভারতের বাংলা ও বিহারে পার্থিব জীবনের প্রতিফলন ঘটেছিল, বাংলার সেনরাজারা সেই ভাস্কর্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। উড়িষ্যার ললিতগিরি, উদয়গিরি ও রত্নগিরিতে ভাস্কর্য উৎসাহিত হয়েছিল। পাথর দিয়ে বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করা হয়েছিল; ভুবনেশ্বর, পুরী ও কোনারকে আজও সেই সময়কার অসংখ্য মূর্তি রয়েছে। তখন মানুষের পাশে কার্তিকেয়, গণেশ ও মহিষাসুরমর্দিনী স্থান পেয়েছিল। সাঁচী, মথুরা ও অমরাবতী ছিল সেকালের ভাস্কর্যের পীঠস্থান। খাজুরাহোর মন্দিরগুলিতে থাকা অপূর্ব সব ভাস্কর্য মূর্তি সেগুলোর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছিল, কোনারকের মন্দিরের হাতির মূর্তিগুলিও কম সুন্দর নয়। রাজপুতনা, গুজরাট ও বাংলার সর্বত্রই ভাস্কর্য উৎসাহ পেয়েছিল। হিমালয়ের সন্নিহিত চম্বা, কাংড়া, কুলু ও কুমায়ুন অঞ্চলে আজও সমকালীন অসংখ্য দেবদেবী ও নারী-পুরুষের মূর্তি, পশুপাখির মূর্তি ছড়িয়ে রয়েছে। কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য সোনা ও রুপোর দেবমূর্তি বানিয়েছিলেন। চোল আমলে অপূর্ব সুন্দর নটরাজের মূর্তিগুলি নির্মিত হয়েছিল। সেযুগের শৈব ও বৈষ্ণব সন্তদেরও অনেক মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। তবে তৎকালীন ভারতের ভাস্কর্য যতটা উন্নত ছিল, চিত্রকলা ততটা উন্নত ছিল না। অজন্তা, বাগ ও বাদামীতে আজও সেকালের চিত্রকলার নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। অজন্তার অবলোকিতেশ্বর মূর্তি, বাগের হাতির শোভাযাত্রা এবং বাদামির শিব-পার্বতী চিত্র অবশ্যই সুষমামণ্ডিত এবং উন্নত মানের। কৈলাস মন্দির, ইলোরায় এবং তিরুমালাইপুরমেও সেকালের চিত্রাবলীর কোন অভাব নেই। তখনকার শিল্পীরা তুলির সূক্ষ্ম টানে মানুষের ভাব ও আবেগকে প্রকাশ করেছিলেন। ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে স্থানীয় পরিবেশকে মিশিয়ে তাঁরা অপূর্ব সব চিত্রমালা সৃষ্টি করেছিলেন। সমকালীন বঙ্গদেশে তথা পূর্ব ভারতে চিত্রশিল্পের রূপটি ছিল মিনিয়েচার, বিভিন্ন গ্রন্থাবলীতে নানাদৃশ্য এঁকে সেটাকে সুশোভিত করা হয়েছিল। সরসীকুমার সরস্বতী তাঁর পালযুগের চিত্রকলা গ্রন্থে সেই সব মিনিয়েচারের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন। তখন দক্ষিণের ইলোরা মন্দিরের ছাদগুলিতে চিত্রাবলী স্থান পেয়েছিল। উত্তরপ্রদেশের দশাবতার মন্দিরের ছাদেও সমকালীন চিত্রকলার নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। ইলোরার চিত্ররীতিতে শুধু দেবদেবীর নয়; নর ও নারী, মেঘ ও অদ্ভুত সব প্রাণীর চিত্রও দেখতে পাওয়া যায়। মামল্লপুরমের মন্দিরগুলিতে বা পত্তদকলের মন্দিরে আজও সেই সময়কার অসংখ্য চিত্র টিকে রয়েছে। সেগুলিতে মনুষ্য দেহের নির্মাণে কোন অবাস্তবতা নেই, সৌষ্ঠব আছে। তবে একথা অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই যে, আদি মধ্যযুগের চিত্রশিল্পে বাগ, অজন্তা ও বাদামীর মতো শিল্পসুষমা নেই; সেগুলিতে বুদ্ধির দীপ্তি দেখতে পাওয়া যায় না। নান্দনিক সুষমা ও রস সৃষ্টিতে সেগুলি যে অনেক পিছিয়ে ছিল তাতে গবেষকদের কোন সন্দেহ নেই। তাঞ্জোর, তিরুমালাই ও কাঞ্চীর মন্দিরের চিত্র সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। চালুক্য আমলে সমৃদ্ধ গুজরাট অঞ্চলে চিত্রকলার উন্নতি ঘটেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই অঞ্চলের পরমার ও চহমান শাসকেরা আগেকার মত উন্নত মান বজায় রাখতে পারেননি। গুজরাটের চিত্রশিল্প অবশ্যই পাণ্ডুলিপিতে বিধৃত মিনিয়েচার। তবে অস্বীকার করা সম্ভব নয় যে, সেই সব চিত্রে বৈচিত্র্য ছিল। গবেষকদের মতে বাংলার মিনিয়েচারগুলিও এর সমগোত্রীয়। তৎকালীন তিব্বত ও নেপালের ওপরে পূর্ব ভারতের স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার প্রভাব পড়েছিল। ধর্ম, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীবনচর্যার বিচিত্র রূপ অবশ্যই তখন সেই স্বাতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও তৎকালীন ভারতের শিল্পে সবসময় একটি মূল সূত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তাই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সুরটিকে খুঁজে পেতে কোন অসুবিধা হয় না। ধ্রুপদী ধ্যানধারণার সঙ্গে আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য মিলেই আদি মধ্যযুগে শক্তিশালী জীবনকেন্দ্রিক শিল্পধারার সৃষ্টি করেছিল। রাজস্থান রীতি, দ্রাবিড় রীতি, পূর্ব ভারতের রীতি - কোনটাই সেই মূলসূত্রটিকে কখনো বিসর্জন দেয়নি। একথা অস্বীকার করা যায় না যে, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ওপরে তখন বিদেশী প্রভাব ছিল, সমকালীন কাশ্মীরের শিল্পরীতি সম্ভবতঃ বিদেশী শৈলী দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:
১- পালযুগের চিত্রকলা, সরসীকুমার সরস্বতী।
২- ভারতের চিত্রকলা, অশোক মিত্র।
৩- বাংলার চিত্রকলা, অশোক ভট্টাচার্য।
৪- ভারতীয় প্রাচীন চিত্রকলা, সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত।
৫- বাংলার মন্দির স্থাপত্য ও ভাস্কর্য, প্রণব রায়।
৬- Life and culture of the Indian people: a historical survey, K.A. Nilakanta Sastri & G. Srinivasachari.
৭- History of Indian and Eastern Architecture, James Fergusson.
৮- Indian Architecture, Percy Brown.
৯- The History of Architecture in India, Christopher Tadgell.
৭০
১৪৪ মন্তব্য