Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

"গল্পকার সুকুমার রায়" ইতিহাস কী বলে।

‘গল্পকার সুকুমার রায়’

১৯৪০ সালের সুকুমার রায়ের প্রথম গল্পের বই ‘পাগলা দাশু’ যখন প্রথম মুদ্রিত হয়েছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেটির জন্য ভূমিকা লিখেছিলেন। ছ’বছর পরে, ১৯৪৬ সালে, সিগনেট প্রেস থেকে যখন বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল, তখন তাতে আগের সংস্করণের তিনটি গল্প, এবং রবীন্দ্রনাথের ভূমিকাটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেই বর্জনের পিছনে নানা কারণ থাকতে পারে, কিন্তু একটা কারণ খুবই স্পষ্ট এবং প্রত্যক্ষ ছিল। রবীন্দ্রনাথ পাগলা দাশুর ভূমিকায় লিখেছিলেন, “তাঁর (সুকুমারের) ভাবসমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা পদে পদে চমৎকৃতি আনে। তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিল সেইজন্য তিনি তার বৈপরীত্য এমন খেলাচ্ছলে দেখাতে পেরেছিলেন।” নতুন সংস্করণের পাগলা দাশুর অধিকাংশ রচনা সম্বন্ধেই রবীন্দ্রনাথের উপরোক্ত মন্তব্য আদৌ প্রাসঙ্গিক ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, নতুন সংস্করণে বর্জিত তিনটি গল্পের মধ্যে শুধু - ‘হেঁশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরী’-কে কবিকথিত উলট বিজ্ঞানের উদাহরণ বলা চলে। অবশিষ্ট বাইশটি গল্পের মধ্যে ঊনিশটিরই কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল এক বা একাধিক কিশোর; আর তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার, বিশেষতঃ স্কুলজীবনের টুকরো টুকরো ছবিই সেই গল্পগুলোর প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছিল। একটি গল্পে মন্দভাগ্য নন্দলাল সংস্কৃতে মেডেল পাওয়ার জন্য প্রাণপণে পড়াশোনা করেও তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খুদিরামের কাছে হেরে গিয়েছিল; পরীক্ষায় নম্বর কম পাওয়ার তাঁর সেই পরাজয় ঘটেনি, আসলে সেবছর সংস্কৃত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বরের জন্য কোনো মেডেলই ছিল না! অন্য একটি গল্পে ক্লাসের চালিয়াৎ ছেলে শ্যামচাঁদ নিজের ফাউন্টেন পেন আর হাতঘড়ি দেখিয়ে মাস্টার থেকে ছাত্র - সকলকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। আর তারপরে ম্যাজিক শোতে সে নিজেই যাদুকরের কাছে জব্দ ও অপদস্থ হয়েছিল। অন্য একটি গল্পে কবিযশপ্রার্থী শ্যামলালের অনুপ্রেরণায় স্কুলশুদ্ধ ছেলের ‘কবিতা রোগ’ দেখা দিয়েছিল, আর সেই রোগের প্রতিকারের জন্য পণ্ডিত মহাশয় ‘কবিতার টিকা’ বের করেছিলেন। আরেকটি গল্পে গোপালের ছোট ভাই তাঁর দাদার মত পড়াশোনা করতে চেয়েছিল; যেরকম পড়াশোনার জন্য খাতা, পেনসিল, বই ইত্যাদি কিছুরই দরকার ছিল না! যাতে কেবল - “পাতলা পাতলা রঙিন কাগজ থাকে আর কাঠি থাকে আর কাগজে আঠা মাখায় আর তার মধ্যে কাঠি লাগায়” - সেই ধরণের পড়াশোনা। পাগলা দাশুর এইসব কাহিনীতে বিপরীত ভাবের সহাবস্থান বা বিজ্ঞানের বিপর্যয় বলে কিছু দেখতে পাওয়া যায় না। বস্তুতঃ, রবীন্দ্রনাথের লেখা ভূমিকাটি পড়লে একথাই মনে হয় যে, ওই ভূমিকাটি লেখবার সময়ে কবি আসলে পাগলা দাশু নয়, ১৯২৩ সালে প্রকাশিত সুকুমারেরই অন্য একটি বই - ‘আবোল তাবোল’-এর কথা ভেবেছিলেন। কারণ, বিজ্ঞানের নিয়মকে অস্বীকাব আর যুক্তিগ্রাহ্য ভাবনার বিপর্যয় সৃষ্টি করেই ‘আবোল তাবোল’-এর কবিতাগুলির জগৎ গড়ে উঠেছিল। সেই গ্রন্থের প্রথম কবিতাতেই অসম্ভবের ছন্দে পূর্ণ ভুলের পৃথিবীর প্রসঙ্গ ছিল। তারপরে কুমড়োপটাশ, হুঁকোমুখো হ্যাংলা, রামগরুড় প্রভৃতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জান্তব জগাখিচুড়ি প্রাণী আর কাঠখেকো, ছায়াব্যবসায়ীর মত অসম্ভব বাতিকগ্রস্ত কয়েকটি বুড়োর কল্পনায়, রাজারানীর নেহাৎ উদ্ভট আবরণের বর্ণনায় প্রত্যাশিত নিয়মের ছককে ভেঙ্গে ফেলবার নানা চেষ্টা প্রকট হয়ে উঠেছিল। ‘আবোল তাবোল’-এর সম্পর্কেই রবীন্দ্রনাথের ভূমিকাটি প্রযোজ্য ছিল, আর তাই হয়ত সিগনেট প্রেস সেটাকে পাগলা দাশুর ভূমিকা হিসেবে ব্যবহার করতে চায় নি। সেই সঙ্গে আগেকার বিষম ভাবের গল্পগুলি বাদ দেওয়ার ফলে নতুন সংস্করণের পাগলা দাশু বিশিষ্ট চেহারা পেয়েছিল। যে জগৎ সেই গল্পগুলির মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছিল, সেগুলো কিশোরের ছোট সুখ, ছোট দুঃখ, ক্ষণেক হাসি, ক্ষণেক অশ্রু দিয়ে গড়া হয়েছিল। ‘আবোল তাবোল’-এর মত সেটির আকাশ উদ্ভটের কুয়াশায় আচ্ছন্ন ছিল না। সেটা গ্রাম বাংলার শরৎকালের আকাশের মত উজ্জ্বল আর প্রসন্ন ছিল।

সুকুমারের অধিকাংশ রচনার মত পাগলা দাশুর গল্পগুলিও ১৩২৩ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৩০ বঙ্গাব্দের মধ্যে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় প্রথমে প্রকাশিত হয়েছিল। বাঙালি পাঠক-পথিকসের কাছে সেগুলির আস্বাদ অভিনব ছিল। যদিও স্কুলের ছেলেদের নিয়ে বাংলা ভাষায় এর আগেও গল্প লেখা হয়েছিল। সেযুগের বাঙালি ঘরের ছেলেরা অক্ষর চিনতে শিখেই বর্ণ পরিচয়ের দ্বিতীয় ভাগে গোপাল আর রাখালের গল্প পড়তেন। আর তখনকার পাঠ্যপুস্তকের বাইরে, সুকুমারের গল্পগুলি প্রকাশিত হওয়ার অল্প কিছুদিন আগে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার স্কুল-পড়ুয়াদের নিয়ে ১৯১২ সালে তাঁর দু’খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস - ‘চারু ও হারু’ - লিখেছিলেন। কিন্তু তবুও পাগলা দাশুর মত গল্প যে বাঙালি পাঠক-পাঠিকারা আগে কখনো পড়েননি, সেকথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে। কিশোরদের জন্য লেখা গল্পে সুশিক্ষা বা নৈতিক উপদেশ মুখ্য হবে না - একথা তখনকার বাঙালি লেখক, এবং পাঠক-পাঠিকা - এই দু’য়ের কাছেই অচিন্তনীয় বিষয় ছিল। সেক্ষেত্রে সুকুমার কিন্তু সম্পূর্ণ অ-ভাবিত পথেই পা বাড়িয়েছিলেন। তার মানে এটা অবশ্যই নয় যে, তাঁর গল্পে কোনোই নীতি ছিল না, অথবা সেখানে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। সংসারের কোনো কঠিন দায়ের সঙ্গে যাঁরা পরিচিত নয়, সুকুমার তাঁদেরই একজন হয়ে, তাঁদের কথাই তাঁদেরই মত করে বলতে চেয়েছিলেন। গুরুমহাশয় বা নীতিশিক্ষকের উচ্চ আসনে বসে তিনি কিছু করতে চাননি। তাঁর গল্পে যদি কোনো নীতি থেকে থাকে, তাহলে সেটা হল জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম বা নীতি।

সুকুমারের পাগলা দাশুর গল্পগুলি যেন ক্ষুদ্রাকার একটি চিত্রশালা; আর সেটির কিশোর নায়কেরা যেন এক একটি ‘character portrait’। পাগলা দাশুতে সুকুমারের মনোযোগ চরিত্রসৃষ্টিতেই নিবদ্ধ হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়; যদিও তাঁর সৃষ্ট চরিত্রটি - অন্ততঃ প্রধান চরিত্রদের একজনও তথাকথিত সর্বগুণসম্পন্ন ভালো ছেলে ছিল না। বরং বলা যায় যে, তাঁরা প্রত্যেকেই এক একটি অবগুণের অধিকারী ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে, দুলিরাম ছিল সবজান্তা, শ্যামচাঁদ ছিল চালিয়াৎ, যজ্ঞিদাস ছিল মিথ্যাবাদী, আর সব বিষয়ে সর্দারি করাটা ভোলানাথের একটা বিশ্রী অভ্যাস ছিল। গল্পের পরিণতিতে তাঁরা সবাই কোনো না কোনো ভাবে শাস্তি পেয়েছিল। কিন্তু সুকুমার তাঁদের দোষ বা দোষের জন্য শাস্তি - এই দুটির কোনোটিকেই তাঁর লেখায় বড় করে দেখাননি। দোষীকে যেমন তিনি কেবল কৃষ্ণবর্ণে লিপ্ত করেননি, তেমনি গল্পের শেষে জব্দ হয়ে তাঁর যে পরিবর্তন ঘটেছিল, সেটা নেহাৎই সাময়িক ছিল - এমন ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। আর নিজের গল্পের কিশোর পাত্রগুলির মধ্যে যাঁরা সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল - তাঁদের ক্ষেত্রে তিনি সে নিয়মও মানেননি।

সুকুমারের পাগলা দাশু গ্রন্থের চারটি গল্পের নায়ক হল দাশরথী রায় ওরফে পাগলা দাশু। সে এক অসাধারণ চরিত্র। সর্বদাই সে নতুন নতুন দুষ্টুমি আর খ্যাপামি করে বেড়ায়। কখনো সে সহপাঠীদের নিছক জব্দ করবার জন্য একটা ভারী বাক্স বয়ে নিয়ে বেড়ায়, যে বাক্সে অনেক বাঁধাছাঁদা করে মাত্র এক টুকরো কাগজ রাখা ছিল; যেটার একপিঠে লেখা ছিল - ‘কাঁচকলা খাও’, আর অপরপিঠে লেখা ছিল - ‘অতিরিক্ত কৌতূহল ভালো নয়’। ক্লাসের ভালো ছেলে জগবন্ধু একবার দাশুকে পড়া বলে দেয়নি। তাই দাশু তাঁর ব্যাকরণের বইটি লোমহর্ষক ডিটেকটিভ উপন্যাসে বদলে দিয়েছিল। মাস্টারমশাইকে না জেনে সেই বই দিয়ে জগবন্ধু তাঁর কাছে বকুনি খেয়েছিল। আর দেমাকী নবীনচাঁদের লাঞ্ছনার তো কথাই নেই। দাশুর পরামর্শেই কেষ্টা আর জগাই নবীনের মাথায় ধুচি চাপিয়ে তাঁর নতুন কেনা শখের পিরাণে কাদাজলের ছিটে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেখানেই শেষ নয়। এরপরে বেচারী নবীন যখন বস্তা মাথায় কাদামাখা জামা গায়ে, কাঠ হয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল, দাশু তখন তাঁর দুর্গতিকে আরো বাড়িয়ে টুলবার জন্য নবীনের বড়মামাকে ডেকে নিয়ে এসেছিল। সবচেয়ে মজার কথা হল যে, কেষ্টা ও জগাই সেই কাজের জন্য পূর্ব প্ৰতিশ্ৰুতিমত দাশুর কাছে জিলিপি চাইতে এলে, দাশু তাঁদের সাফ জবাব দিয়েছিল - “আমার কাছে কেন? ময়রার দোকানে যা, পয়সা ফেলে দে, যত চাস জিলিপি পাবি।” এই রকমের অদ্ভুত আচার আচরণের জন্যই দাশুকে সবাই পাগলা বলে ডাকত। যদিও তাঁর কীর্তিকাহিনীর বিবরণ পড়ে লেখকের সঙ্গে সঙ্গে পাঠক-পাঠিকারও মনে হয় যে, দাশুর সবটাই কি পাগলামি? বাস্তবক্ষেত্রে, দাশুর মত একটা চরিত্রকে ভালো বা তাঁর স্বভাব অনুসরণযোগ্য - একথা কেউই বলবেন না। কিন্তু মজার কথা হল যে, গল্পগুলো পড়বার পরে, যে চরিত্রটি পাঠক-পাঠিকার মনের সবচেয়ে বেশি জায়গা জুড়ে থাকে, সেটা হল ঐ গোল গোল চোখ, অনাবশ্যক রকমের বড় কান, মাথায় বস্তার মত চুলওয়ালা, যশোহরের কই মাছ সদৃশ দাশু। অথচ, ভোলানাথ, নবীন বা শ্যামচাঁদের মত নিজের কৃতকর্মের জন্য দাশু কোনো ভাবে জব্দ হয়নি বা শাস্তি পায়নি বলে গল্পে দেখতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ক্লাসে চীনে পটকা ফাটিয়ে বা ছেলেদের নাটক ভন্ডুল করে দিয়ে, নবীনকে অকারণে জব্দ করেও তাঁর কোনো দুঃখ বা অনুশোচনা হতে দেখতে পাওয়া যায় না। তাহলে, নিজের কোন গুণের জন্য দাশু পাঠক-পাঠিকার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে? আসলে, সুকুমার কিশোব মনের রহস্য ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন যে, সাংসারিক অর্থে যে আদর্শবান, এমন চরিত্র যাঁর দিকে গুরুজনেরা সর্বদাই অঙ্গুলি নির্দেশ করেন, যাঁর আচরণকে তাঁরা অনুসরণ করতে বলেন, সেই ছেলে কখনোই সাধারণের বা সাধারণভাবে ঐ বয়সের অন্যান্য ছেলেদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে পারে না। তাই তিনি তাঁর লেখায় সেরকম কোন চরিত্র অঙ্কনের প্রবণতা দেখাননি। অল্পবয়সী ছেলেরা যাঁর সঙ্গে সত্যিকারের অন্তরঙ্গতা অনুভব করবে, তিনি সব রং উজাড় করে দিয়ে তেমনিই নিত্য নতুন দুষ্টুমির ফন্দী আবিষ্কর্তা একটি চরিত্র এঁকেছিলেন। তাই পাগলা দাশুর গল্পগুলি কিশোর-কিশোরীদের একান্ত নিজস্ব সম্পদ হয়ে উঠেছে বলে দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া আরো একটি কারণে সুকুমারের গল্পের চরিত্রগুলির সঙ্গে পাঠক-পাঠিকাদের নৈকট্যবোধ বৃদ্ধি হয়। তাঁর অধিকাংশ গল্পের অন্তরালে যেন একজন কিশোর কথককে দেখতে পাওয়া যায়। গল্পগুলো যেন - দাশু, কালাচাঁদ ও নবীনেরই এক সহপাঠী বলছে বলে মনে হয়। সে তাঁর অন্যান্য সাথীদের সঙ্গে পাগলা দাশুর রহস্যময় বাক্স খুলে দেখছে, অভিনয়ে অংশগ্রহণ করছে, ক্লাসে শব্দরূপ মুখস্থ না করে কাটাকুটি খেলছে, বা রামপদর জন্মদিনে মিহিদানা খাচ্ছে - এককথায় দাশুর সঙ্গে জড়িত প্রায় সবক’টি ঘটনার সঙ্গেই তাঁর প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে বলে মনে হয়। আবার কখনো তাঁর ভূমিকার বদলও দেখতে পাওয়া যায়। সে ঐ গল্পের পৃথিবী থেকে পাঠক-পাঠিকার জগতে - অর্থাৎ, বাস্তব জগতে উঠে আসছে বলে মনে হয়। মনে হয় সে যেন, পাঠক-পাঠিকার ঐ গল্পগুলি পড়বার যে অভিজ্ঞতা - সেটারও অংশীদার হচ্ছে। যেমন, দাশুর নবীনকে জব্দ করবার ঘটনার সঙ্গে সেও আদ্যোপান্ত যুক্ত ছিল। সে নবীনের আখ্যান শুনেছিল, দাশুর খ্যাপামি দেখেছিল, কেষ্টা আর জগাইয়ের কাছে জিলিপির ভাগ চেয়েছিল। আবার পড়তে পড়তে এটাও মনে হয় যে, সে যেন পাঠক-পাঠিকার পাশে বসে তাঁদের জিজ্ঞেস করছে - “আচ্ছা। দাশু কি সত্যি সত্যি পাগলা, না কেবল মিচকেমি করে?” এইভাবে, দাশুর গল্পের সেই কিশোর কথকটি যেন অনায়াসে দুই জগতে গল্পের জগৎ থেকে পাঠকের জগতে; যেন দুই তলের মধ্যে একটা সেতু তৈরি করে। আর তাঁর সেই অন্তরঙ্গ আখ্যানভঙ্গিতে কাহিনীর আকর্ষণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে যায়।

সুকুমার যখন বাংলা কিশোরসাহিত্যে স্কুল-পড়ুয়া ছেলেদের নিয়ে কাহিনীর সেই অভিনব ধারাটি সংযোজন করেছিলেন, সেটার অন্ততঃ অর্ধশতাব্দী আগেই স্কুলের ছেলেদের নিয়ে গল্প লেখবার সূত্রপাত ঘটেছিল। ১৮১৫ সালে টমাস হিউস তাঁর ‘টম ব্রাউনস স্কুল ডেজ’ নামক বইটি লিখেছিলেন। তারপর থেকেই ইংরেজি বাসায় লেখা ‘স্কুল স্টোরি’র একটি ধারা প্রবাহিত হয়ে আসছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। সুকুমার যে সেই ধারার সঙ্গে, অন্ততঃ সেই ধরণের কিছু কিছু গল্পের সঙ্গে যে পরিচিত ছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। লীলা মজুমদার জানিয়েছিলেন যে, সুকুমারের পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বাড়িতে নানাধরণের বিলিতি কাগজের সঙ্গে ‘বয়েজ ওন পেপার’ আসত। উল্লেখ্য যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকেই সেই পত্রিকায় ট্যালবট বেনস রীড লিখতেন। তাঁর লেখা ‘ফিফথ ফর্ম এ্যাট ডোমিনিক’ প্রায় একশো বছর ধরে ইংরেজ কিশোরদের মনোহরণ করে রেখেছিল। সুকুমার সেখান থেকে কোনো প্রেরণা পেয়েছিলেন কিনা সেকথা জানা যায় না, কিন্তু সেই প্রেরণাকে যে তিনি সম্পূর্ণ স্বীকরণ করতে পেরেছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অতীতের কোন কোন সাহিত্য সমালোচক তাঁর ‘হাঁসজারু’ এবং ‘বকচ্ছপ’ শব্দের মধ্যে লুইস ক্যারলের স্পষ্ট প্রভাব দেখতে পেয়েছিলেন; কিন্তু একথা সকলেই বিনা দ্বিধায় স্বীকার করবেন যে, সুকুমারের পাগলা দাশুর কোনো চরিত্রে বা ঘটনায় কোন ধরণের বিদেশী গন্ধ পাওয়া যায় না। ‘স্কুলস্টোরি’র জগৎ স্বভাবতঃই সংকীর্ণ হয়; সেটা খেলাধুলা, পরীক্ষা বা অন্যান্য প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমিত থাকে, সুকুমার সেটাকে যেন আরো গুটিয়ে এনেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। সেকালের ইংরেজি ‘স্কুলস্টোরি’তে ঘটনার যে জটিলতা এবং বৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায়, সেটা পাগলা দাশু-তে নেই এবং থাকা সম্ভবও ছিল না। কিন্তু বাংলা সাহিত্যেও সেই ব্যাপারে সুকুমার রায় অনন্য। অতীতে তাঁর উত্তরসূরী যেসব লেখক-লেখিকারা স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে গল্প লিখেছিলেন, তাঁদের রচনায় অনেক সময়েই ঘটনার ঘনঘটা ও চরিত্রগুলি কড়া রঙে আঁকা বলে দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে আজগুবী আর বাস্তব আলোছায়ার মত মিলে মিশে রয়েছে। কোনো গল্পে মাস্টারমশাইকে পানের সঙ্গে খাওয়াবে বলে তাঁর ছাত্র মানুষকে বাঁদর বানাবার বড়ি সংগ্রহ করে! কেউ আবার ভূতের সাহায্যে লেখাপড়া আর খেলাধূলা দুটোতেই সবার সেরা হযে ওঠে। আবার কখনো বা একজন ছাত্র টের পায় যে, তাঁর অঙ্কের শিক্ষক আসলে একজন রাক্ষস! কোন গল্পে দুর্বৃত্তেরা কাউকে স্কুল থেকে টাকার লোভে চুরি করে নিয়ে যায়। বলাই বাহুল্য যে, সেসব গল্পের স্বাদ আলাদা। সেগুলির তুলনায় সুকুমার রায়ের গল্পের প্লটকে অনেক বেশি সরল বলে মনে হয়; গল্পগুলি পড়লে বোঝা যায় যে, তিনি কত স্বল্প উপকরণ দিয়ে সেই কাহিনীগুলি গড়ে তুলেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে সুকুমারের ‘কালাচাঁদের ছবি’ গল্পটির কথা বলা যেতে পারে। গল্পটির আখ্যাংশ এরকম। কালাচাঁদ নিধিরামকে মেরেছিল। কারণ, কালাচাঁদ একটি ছবি এঁকেছিল, সেটা কেমন হয়েছে সেকথা নিধিরামকে জিজ্ঞাসা করায় নিধিরাম বন্ধুভাবে সেই ছবিতে দু’-একটি পরিবর্তন করবার কথা বলেছিল। তাতেই কালাচাঁদের সেই প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ‘কালাচাঁদেব ছবি’ গল্পটি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা সকলেই জানেন যে, ব্যাপারটি মোটেই অত নিরীহ ছিল না; তাঁরা এটাও জানেন যে, গল্পে নিধিরামের মন্তব্যগুলি কতটা মর্মান্তিক ছিল। তাঁর এক একটি বাক্যে ছবিটি খান্ডবদাহন থেকে সীতার অগ্নিপরীক্ষা, শিশুপালবধ এবং জন্মেজয়ের নাগযজ্ঞে পরিণত হয়েছিল! অর্জুনের পতাকাকে সে কখনো তালগাছ, কখনো সীতা, তো কখনো আবার বিভীষণ বলেছিল। ফলে, গল্পের শেষে প্রহৃত নিধিরাম অপেক্ষা প্রহারকর্তা কালাচাঁদের প্রতিই পাঠক-পাঠিকা বেশি সমবেদনা অনুভব করেন। এমনভাবে, আপাতদৃষ্টিতে কোনো ঘটনা না ঘটলেও, কাহিনীর মধ্যে একটি গতি দেখতে পাওয়া যায়, আর তাতেই নিধিরাম আর কালাচাঁদ - এই দুটি চরিত্র বিকশিত হয়ে উঠেছে বলে দেখা যায়। বস্তুতঃ, প্লটে জটিলতা ও কাহিনীতে পরিপাট্যের অভাব সুকুমারের পাগলা দাশুর রচনাগুলির আকর্ষনীশক্তি একটুও কমায়নি, বরং বাড়িয়ে তুলেছে বলে দেখতে পাওয়া যায়। এক শতাব্দীরও আগে সুকুমার সেই গল্পগুলি লিখেছিলেন, তারপরে বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রায় কত না পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক শহর তো দূরের কথা, গ্রামের কিশোরেরাও এখন আর ধুতি পিরাণ পরেন না। ফাউন্টেন পেন আর রিস্টওয়াচ যে কারো মনে বিস্ময় জাগাতে পারে - সেই ভাবনাই এখন হাস্যকর। কিন্তু তাও সুকুমারের গল্পগুলো যেন মলিন হয় না, আজও সুকুমারের গল্প নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর এই উক্তি - “গল্পগুলো যেন কালপ্রভাবে ঈষৎ মলিন, যেন সাল তারিখ পেরিয়ে আসা” - অনেকেই মানতে পারেন না। সেটার কারণ হল যে, সমসময়ের সামাজিক রীতিনীতির যে বর্ণনাবাহুল্য, কাহিনীগুলিতে সেগুলির অন্তর্গত চরিত্রদের বিশেষ কালে আবদ্ধ রাখতে পারত, সেসব বর্ণনা সুকুমার তাঁর লেখায় যথেষ্ট কম পরিমাণে করেছিলেন। এর ফলে তাঁর কাহিনীর স্বচ্ছ আবরণ ভেদ করে, ধুতি পিরাণের আড়ালে শ্যামচাঁদ, নন্দলাল, এবং সর্বোপরি পাগলা দাশুকে এখনকার পাঠক-পাঠিকারা খুব সহজেই চিনতে পারেন। আজও তাঁদের ভিন্ন নামে, ভিন্ন পোষাকে নিজেদের সহপাঠীদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। এই ভাবে অব্যবহিত পরিবেশ অতিক্রম করে, দাশু আর তাঁর সঙ্গীসাথীরা দেশকালাতীত এক ভাবজগতের অধিবাসী; চিরকালীন কিশোরের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে বলে দেখতে পাওয়া যায়।

কিন্তু স্কুলজীবনের এইসব কাহিনী পাঠক-পাঠিকাদের কাছে যতই উপভোগ্য হোক না কেন, এগুলি দিয়ে তাঁদের ক্রমবিকাশশীল মনের সব চাহিদা পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। কিশোর-কিশোরীরা নতুন নতুন বিষয় চান। একদা জর্জ ওরয়েল ‘স্কুল স্টোরি’র তীব্র নিন্দা করেছিলেন; কারণ, তাঁর মনে হয়েছিল যে, সেটার মধ্যে জীবনের একটি অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশকেই তুলে ধরা হয়। একথা অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে, সৃষ্টিশীল কোনো লেখক-লেখিকাই এই সংকীর্ণ বিষয়ের গন্ডীর মধ্যে সীমিত থাকতে চান না। অন্ততঃ, সুকুমাব রায় তো থাকেননি। তাই দাশু সিরিজের গল্পগুলির সমান্তরালেই সন্দেশ পত্রিকায় তাঁর অন্যান্য গল্প, কবিতা প্রবন্ধ ইত্যাদি সাহিত্যিক রচনাও নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল। কারণ, পত্রিকাটির আবির্ভাব কাল থেকেই সেটার সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত থাকলেও সেই সময়ে উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর ফলে সেটির সর্বাঙ্গীন দায়িত্ব সুকুমারের ওপরে গিয়ে পড়েছিল। ১৩২৩ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৩০ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত তিনিই সন্দেশ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। সেই আট বছর তাঁর জীবনের শেষ আট বছর ছিল, এবং সেই শেষ আট বছর সুকুমারের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে ফলবান সময় হয়ে উঠেছিল। শুধু যদি গল্পের কথাই যদি ধরা যায়, তাহলে ওই সময়কালের মধ্যে তিনি পঞ্চাশটিরও বেশি গল্প লিখেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ বৃহত্তর পাঠক-পাঠিকাগোষ্ঠীর সঙ্গে সেগুলোর ভালো করে পরিচয় ঘটেনি। লেখকের অকালমৃত্যুর পরে তাঁর অধিকাংশ লেখার মত সেগুলোও সন্দেশ-এর দুই মলাটের মধ্যে আবদ্ধ থেকে গিয়েছিল। পত্রিকার তৎকালীন রীতি অনুসারে সেগুলো অস্বাক্ষরিত অবস্থায় ছিল। পাগলা দাশুর চার বছর পরে, সুকুমারের লেখা আরো কয়েকটি গল্প নিয়ে ১৯৪৪ সালে তাঁর ‘বহুরূপী’ নামক গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু গল্পকার সুকুমার রায়কে সম্পূর্ণভাবে জানবার জন্য পাঠক-পাঠিকাকে আরো অনেকদিন, তাঁর মৃত্যুর পরে অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যাঁরা সেকালের সন্দেশ পড়বার সুযোগ পাননি, কিন্তু যাঁরা তাঁর পুর্বোক্ত গল্পের বই দুটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, সুকুমারের সমস্ত গল্পগুলি চিহ্নিত হওয়ার পরে সবিস্ময়ে দেখতে পেয়েছিলেন যে, সুকুমারের গল্পের জগৎ কত বিস্তৃত আর বিচিত্র ছিল। সেগুলোর মধ্যে মৌলিক আর অনুবাদ কাহিনী যেমন রয়েছে; তেমনি পুরাণ আর ইতিহাসের গল্প, লোককথার নবীকরণ, হাসির চুটকী, আর নক্সা জাতীয় রচনাও রয়েছে বলে দেখা যায়। কখনো তিনি গল্পের সন্ধানে  পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের সাহিত্যে ও কিংবদন্তীতে - নরওয়ে থেকে আরব দেশে, আবার সেখান থেকে চীনদেশে - চলে গিয়েছিলেন বলে দেখা যায়। আবার কখনো ঘরের একেবারে কোণে ছোট্ট মেয়ের পুতুল খেলার মাঝখানে ফিরে এসেছিলেন বলে দেখা যায়। বর্ণাঢ্য সেই জগতের যে বিশেষত্ব আজও সবার আগে চোখে পড়ে, সেটা হল যে, সেখানে চেনা পৃথিবীর - চিরকালীন পৃথিবীর এক সহজ রূপ প্রতিফলিত হয়েছে বলে দেখা যায়। বাংলাসাহিত্যে ননসেন্স রসের সাহিত্যিক বলেই সুকুমারের সমধিক খ্যাতি এবং প্রসিদ্ধি রয়েছে, ‘আবোল তাবোল’ এবং ‘হযবরল’র (১৯২৪) মত গ্রন্থের স্রষ্টাও তিনি। কিন্তু ‘দ্রিঘাংচু’র মত দু’-একটি গল্প বাদ দিলে তাঁর ছোটগল্প উদ্ভটরস বর্জিত। তাঁর গল্পে ঘটনা বা চরিত্র অবশ্য বাস্তবজীবনের চতুঃসীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। সেখানে দেড় বিঘৎ লম্বা মানুষ, ব্যাংছাতা নিতে আসা বহুরূপী, প্রেতগন্ধর্ব, অর্ধেক ঘোড়া অর্ধেক মানুষ সেন্টর ইত্যাদি আছে বলে দেখা যায়। কিন্তু সেসব থাকলেও, তাঁর গল্পে বিচিত্র মানুষ আর মনুষ্যেতর জীবদের পুরাণ বা রূপকথার পরিবেশে - বর্তমান থেকে অনেক দূরে উপস্থাপিত করা হয়েছে। যে জগতে স্থানকালের চিহ্ন হয় অস্পষ্ট, আর নয় তো যেখানে অদৃশ্য সম্ভব অসম্ভবের ভেদ রেখাও স্থানু থাকে না। ‘ছাতার মালিক’ গল্পের প্রথমেই যখন পড়া হয়, “তারা দেড় বিঘৎ মানুষ। তাদের আড্ডা ছিল গ্রাম ছাড়িয়ে, মাঠ ছাড়িয়ে বনের ধারে ব্যাং ছাতার তলায়।” - তখন পাঠক-পাঠিকার মনও সম্ভাব্য জগতের সীমা পেরিয়ে সেই দেড় বিঘতীদের দেশে চলে যায়। বাস্তবজীবনের নিয়ম সেখানে খাটে না, এই ধারণা নিয়েই পাঠক-পাঠিকার চেতন না হোক অচেতন মন তাঁর গল্প পাঠে অগ্রসর হয়। তাই বহুরূপীকে কথা বলতে দেখে পাঠক-পাঠিকার বিস্ময় বোধ হয় না, এবং গল্পের শেষে তাঁকে যখন ব্যাং-ছাতাটি বগলদাবা করে স্বস্থানে প্রস্থান করতে দেখা যায়, তখনো পাঠক-পাঠিকাও সেই ঘটনাকে বিশেষ জগতের পক্ষে স্বাভাবিক বলেই মেনে নেয়। আসলে, কেবল অসম্ভব আর অবাস্তব ঘটনা থাকলেই উদ্ভট রসের সৃষ্টি হয় না; সেটার জন্য সম্ভব-অসম্ভব, বাস্তব-অবাস্তবের মধ্যে একটা আঁতাত থাকাও দরকার। যেমন ধরা যাক, সুকুমারের ‘ট্যাঁশগরু’ কবিতাটি। কবিতার শুরুতেই বলা হয়েছে - “ট্যাঁশগরু গরু নয় আসলেতে পাখি সে/ যার খুশি দেখে এস হারুদের অফিসে/ চোখ দুটি ঢুলু ঢুলু মুখখানা মস্ত/ ফিটফাট কালো চুলে টেরিকাটা চোস্ত।” এই বর্ণনা এবং সঙ্গের ছবিটি দেখলেই বোঝা যায় যে, সেই বিশেষ জীবটি বিজ্ঞানের সমস্ত নিয়মকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। কিন্তু এরই সঙ্গে কবি যখন এই তথ্যও পরিবেশন করেন যে, সেই সৃষ্টিছাড়া জন্তুটিকে সম্পূর্ণ বাস্তব পরিবেশে হারুদের অফিসে গেলেই দেখতে পাওয়া যাবে, এমনকি সেটাকে সংগ্রহ করাও নেহাৎ কঠিন কিছু নয় - তখনই দুই বিপরীত তথ্যের আঁতাত উদ্ভট রসের সৃষ্টি করে। তুলনায় ‘হারকিউলিস’ গল্পে, যে অর্ধেক ঘোড়া অর্ধেক মানুষ সেন্টর, আকাশকে মাথায় করে দাঁড়িয়ে থাকা বিরাট দৈত্য এটলাস অথবা সবুজ রঙের জটা, গায়ে মাছের মত আঁশ এবং হাঁসের মত চ্যাটাল হাত পাওয়ালা সমুদ্রের বুড়োর প্রসঙ্গ সুকুমার নিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা সবাই কল্পলোকের জীব হলেও উদ্ভট ছিল না। কারণ, তাঁদের কাহিনীর সঙ্গে বাস্তবজগতের কোনো সম্বন্ধ নেই; সেই কাহিনী অনেক দূরের এবং অস্পষ্ট অতীতের। প্রকৃতপক্ষে বলা যায় যে, কবি সুকুমার এবং গল্পকার সুকুমার দুই পৃথক জগতের বাসিন্দা ছিলেন। এবং একমাত্র ‘দ্রিঘাংচু’তেই গল্পকার সুকুমার তাঁর অভ্যস্ত জগত থেকে বেরিয়ে আবোল তাবোল-এর জগতে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। ঐ বইয়ের একটি কবিতার সঙ্গে গল্পটির ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্যও অনুভব করা যায়। রূপকথার চিরাচরিত পদ্ধতিতে - ‘এক ছিল রাজা’ - বাক্যটি দিয়ে ‘দ্রিঘাংচু’র আরম্ভ হয়েছে বলে দেখা যায়। যদিও গল্পের ওপরে চিত্রিত ছবিটি দেখে বুঝতে পারা যায় যে, সেই রাজা মোটেই কোন রূপকথার রাজা নন। আবোল তাবোল-এর - ‘নেড়া বেলতলায় যায় ক’বার?’ - কবিতায় যে রাজা নেড়ার বেলতালায় গমনাগমনের জটিল সমস্যা নিয়ে গলদঘর্ম হয়েছিলেন, তাঁরই সঙ্গে দ্রিঘাংচুর রাজার বরং মিল খুঁজে পাওয়া যায়। চেককোট পাৎলুন পরা, শ্লেট এবং তলোয়ারের মতো প্রকান্ড পেন্সিল হাতে সেই বুড়ো রাজাকে অঙ্কে কাঁচা স্কুলের ছেলেদের মত দেখায়। সেই রাজারও মাথায় মুকুট, কোমরে তলোয়ার এবং পায়ে নাগরা থেকেও, পরনের ধুতি পাঞ্জাবী এবং চেহারাটি কিন্তু নিতান্ত গোবেচারী বাঙালি ভদ্রলোকের মত! দুটি লেখার মধ্যে আরো সাদৃশ্য রয়েছে। কবিতার মত গল্পের রাজাও ভয়ানক চিন্তিত। একটা দাঁড়কাক কেন সিংহাসনের ডানদিকের উঁচু থামের ওপরে বসে ঘাড় নিচু করে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় ‘কঃ’ বলে সভায় প্রচন্ড গোল বাধিয়ে গিয়েছিল, সেই সমস্যায় রাজা ব্যতিব্যস্ত বলে দেখতে পাওয়া যায়। পূর্বোক্ত কবিতায় যেমন একটি শীর্ণকায় ভিস্তিওয়ালা সমস্যার সমাধান করতে এসেছিলেন, দ্বিতীয়ক্ষেত্রে তেমনি রোগা সুঁটকোমত একজন লোক দাঁড়কাকের রহস্য উন্মোচন করেছিলেন বলে দেখা যায়। কিন্তু দুটি রচনার মধ্যে পার্থক্যও যথেষ্ট রয়েছে। কবিতায় সুকুমার প্রত্যাশিত নিয়মের শৃঙ্খলাকে ভেঙ্গে দেওয়ার একটা সচেতন চেষ্টা করেছিলেন। কবিতায় রাজা তাঁর সভা ছেড়ে রৌদ্রতপ্ত ইষ্টকপুঞ্জের ওপরে বসে ছিলেন, ভাজা বাদাম খেলেও সেগুলিকে গলাধঃকরণ করছিলেন না। কিন্তু গল্পে তেমন কিছু দেখতে পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ যেটাকে - “ভাবসমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা”- বলেছিলেন, সেটার কোনো চিহ্ন ‘দ্রিঘাংচু’তে দেখা যায় না। উপরন্ত আজগুবী রচনার মধ্যে অনেক সময়ে যে গঠনগত একটা শিথিলতা থাকে, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষবয়সের বহুরচনা বাংলাসাহিত্যে যেটার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, সেসবের কোন লক্ষণ কিন্তু এই গল্পে দেখতে পাওয়া যায় না। প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত একটি বাক্যকেও সেখানে পুনরুক্তি বা বাড়তি বলে মনে হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিন্তু দ্রিঘাংচুকে ননসেন্স সাহিত্যেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। সেটার কারণ হল যে, সমস্ত গল্পটির মধ্যে একটা বিশুদ্ধ অর্থহীনতা প্রকট হয়ে ওঠে। আখ্যান সেখানে দ্রুতগতিতে - জ্যামুক্ত তীরের মত এগিয়ে চলে, কিন্তু সেটা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে যায় না, সেটা লক্ষ্যহীনতা সৃষ্টির দিকে যায়। সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন যে, দ্রিঘাংচু গল্পে ব্যবহৃত চার লাইনের কবিতাটি সার্থক ননসেন্সের উদাহরণ; মনে হয় যে, তাঁর সেকথা সমগ্র গল্পটির সম্বন্ধেই প্রযুক্ত হতে পারে। দ্রিঘাংচু রাজসভায় এলে কেনই বা তাঁকে দাঁড়কাকের মত দেখায়, তখন তাঁকে চার লাইনের উদ্ভট কবিতাটি না শোনালে কি বিপর্যয় ঘটবে, সর্বোপরি সেই দ্রিঘাংচুটি আসলে কে, সুকুমার এসবের কোনো উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেননি। অথচ তাতে কাহিনীর পারম্পর্য কোথাও লঙ্ঘিত হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, বিষয়গত অর্থহীনতার সঙ্গে গঠনগত পিনদ্ধতার বিরল সমন্বয়েই দ্রিঘাংচু বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে বলে দেখা যায়। কিন্তু এর একটা বিপরীত দিকও রয়েছে। বর্তমানে সাহিত্যের সাথে জড়িত প্রায় সকলেই জানেন যে, শিল্পে ‘ননসেন্স’ মূলতঃ বিশেষ একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়; সেটা জীবনকে দেখবার একটা বিশিষ্ট ধরন। অনেক সময়ে সেটার মাধ্যমে শিল্পী সামাজিক অন্যায়, রাষ্ট্রের অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। আবার কখনো সেটার সাহায্যে তাঁরা মানুষের কাছে গভীরতর কোনো জীবন সত্য পৌঁছে দেন। ইউরোপের যন্ত্রযুগ যখন সব মানুষকে এক ছাঁচে ঢালাই করতে চাইছিল তখন এডওয়ার্ড লিয়র উদ্ভট কবিতার মধ্যে কতগুলি অবাস্তব চরিত্র সৃষ্টি করে সেটার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সুইফট গ্যালিভারের ভ্রমণের উদ্ভট কাহিনীগুলিতে প্রকৃতপক্ষে অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংল্যাণ্ডের কদাচার আর ভন্ডামিকে আক্রমণ করেছিল। পিকাসোর বিশ্ববিখ্যাত উদ্ভট ছবি গের্নিকা-তে যুদ্ধের বীভৎসতা আর তাণ্ডব রূপ পেয়েছিল। সেগুলোর সাথে শিল্পোৎকর্ষের দিক থেকে তুল্যমূল্য কিনা, সেই প্রশ্নের মধ্যে না গিয়েও বলা চলে যে, ঐ একই মানসিকতা আবোল তাবোল-এর অধিকাংশ কবিতার জন্ম দিয়েছিল। সুকুমারের ‘লড়াই ক্ষ্যাপা’র অনুপ্রেরণা যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, আর তাঁর ‘একুশে আইন’ বা ‘বাবুরাম সাপুড়ে’র মধ্যে যে, দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থার প্রতি কবির ব্যঙ্গ অন্তরীণ রয়েছে, সেকথা বুঝতে বয়স্ক পাঠক-পাঠিকার অন্ততঃ খুব বেশি দেরি হয় না। আবোল তাবোল তখন শুধুমাত্র বালক আর কিশোরদের মজার কবিতার বই থাকে না, সেটা বড়দের মনেও আলোড়ন তোলবার যোগ্য সাবালকত্ব অর্জন করে। কিন্তু সেই রাজনৈতিক বা সমাজ সমালোচনামূলক অতিরিক্ত মাত্রাটি দ্রিঘাংচুতে কোথাও সঞ্চারিত হয় না। সেটার অর্থহীনতা যে আক্ষরিক অর্থে ননসেন্স, সেকথাও বলা চলে না। কিন্তু গল্পটি শেষপর্যন্ত ছোটদেরই উপভোগ্য থেকে গিয়েছে, তাতে বয়স্কদের জটিল অভিজ্ঞতার ভাব নেই।

আগেই বলা হয়েছে যে, সুকুমার রায়ের গল্পের ধারায় দ্রিঘাংচু একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। অন্যান্য গল্পে তিনি যেসব উপাদান ব্যবহার করেছিলেন, সেগুলি বিশেষভাবেই কিশোর-কিশোরী মনের উপযোগী এবং বিচিত্র ও কৌতূহলোদ্দীপক সব উপাদান। কিন্তু বিষয়গত বিভিন্নতায় যতটা, শিল্পোৎকর্ষের দিক থেকে সেগুলো ততটা সমৃদ্ধ নয়। কথিত রয়েছে যে, সুকুমারের রেখে যাওয়া তালিকার সাহায্যেই তাঁর সমস্ত রচনা চিহ্নিত এবং শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেকসময়েই সেসব লেখাকে প্রকাশ্যকেরা গল্প বলে চিহ্নিত করেছেন, যে কোন সাহিত্য পাঠক-পাঠিকাই সেগুলোকে ঐ শ্রেণীর রচনা বলতে দ্বিধা করবেন। যেমন, ‘ইতিহাসের ছয় বীর’ লেখাটি যেন ইতিহাসের বইয়ের একটি অধ্যায়; ‘খুকির লড়াই দেখা’ যেন সংবাদপত্রের রিপোর্ট; ‘ডাকাত নাকি’ বা ‘বাজে গল্প’ আসলে নকসা বা গল্পের খসড়া; আবার ‘হারকিউলিস’ যেন কোন কাহিনী নয়, সেটা কাহিনীর সারাংশ মাত্র। এই সমস্ত ক্ষেত্রে সমস্ত লেখাটি একই সমতলে থেকে গিয়েছে, এমনকি চমকপ্রদ ঘটনাগুলিও নাটকীয় উত্থানপতনের মধ্যে দিয়ে উপস্থাপিত করা হয়নি। এই কথা মাথায় রাখতে হবে যে, আসলে সুকুমার রায় সন্দেশ পত্রিকার জন্যই তাঁর সমস্ত গল্প লিখেছিলেন। “ইহা পড়িয়া যদি সকলের ভাল লাগে আর কিছু উপকার হয়” - এই আশায় উপেন্দ্রকিশোর সন্দেশ পত্রিকার সূত্রপাত করেছিলেন। পিতার সেই সেই ঐতিহ্যকে বজায় রাখতে গিয়ে, এবং একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রদ ও মনোরঞ্জনী - এমন বিষয়ের অনুসন্ধান করতে গিয়ে, সুকুমার নিজেকে কত বিচিত্র দিকে প্রসারিত করে দিয়েছিলেন সেটা দেখতে পাওয়া যায়। আর অনেক সময়েই তাঁকে এমন বিষয় নিয়ে লিখতে হয়েছিল, যেটি তাঁর প্রতিভার স্বক্ষেত্র ছিল না। যেমন, এই প্রসঙ্গে তাঁর পৌরাণিক এবং অন্যান্য অনুবাদ গল্পগুলির কথা বলা যেতে পারে। সুকুমারের পরিচিত পাঠক-পাঠিকা মাত্রেই জানেন যে, সুকুমার সেপথে প্রথম ব্রতী ছিলেন না। তাঁর আগেও বিদেশী পুরাণের অনেক গল্প - বয়স্ক ও অল্পবয়স্ক - উভয় শ্রেণীর পাঠক-পাঠিকার জন্য পৃথক পৃথক ভাবে অনূদিত হয়েছিল। সুকুমারের অব্যবহিত দুই পূর্বপুরুষ - পিতা উপেন্দ্রকিশোর এবং খুল্লতাত কুলদারঞ্জন - সেই ব্যাপারে আজও বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁরা দু’জনেই ভারতীয় পাশ্চাত্য পুরাণ, ইতিহাস লোককথার বিশাল বর্ণাঢ্য জগতের সঙ্গে সন্দেশ-এর পাঠক-পাঠিকাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। রামায়ণ, মহাভারত, কথাসরিৎসাগর থেকে শুরু করে ইলিয়াড, ওডিসি আবার মধ্যযুগীয় ইংল্যাণ্ডের মহৎ দস্যু রবিন হুডের নিত্য নতুন অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী পর্যন্ত তাঁদের ক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল। সুকুমার তাঁদের দু’জনের কাছেই ঋণী ছিলেন। বিশেষতঃ উপেন্দ্রকিশোরের প্রভাব তাঁর অনেক গল্পেরই ভাব এবং ভাষায় অনুভব করা যায়। যেমন তাঁর ‘পাজি পিটার’ গল্পটি উপেন্দ্রকিশোরের ‘ঝানু চোর চানু’র কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সুকুমার সেই জাতীয় গল্পে যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেননি, সেক্ষেত্রে তাঁর দুই পূর্বসূবীই অনেক বেশি সার্থকতা পেয়েছিলেন। সুকুমারের বেশিরভাগ অনুবাদ গল্প সম্পর্কেই একথা প্রযোজ্য। কেবলমাত্র দু’-একটি রচনায় পাঠক-পাঠিকার আরো বেশি প্রাপ্তিলাভ হয়। যদিও সেই গল্পগুলির কতটা অংশ মূল রচনার আক্ষরিক অনুবাদ, আর কতটাই বা সুকুমারের নিজস্ব সংযোজন - সেটা নিশ্চিতভাবে নিরূপণের এখন আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু তবুও যেরূপে সেগুলোকে এখন দেখতে পাওয়া যায়, তাতে সেগুলো যে রসোত্তীর্ণ - সেই বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না। সুকুমারের - ‘খৃষ্টবাহন’ এবং ‘ভাঙাতারা’ - সেরকম দুটি অপেক্ষাকৃত স্বল্পপরিচিত গল্প। ‘খৃষ্টবাহন’ হল রোমান ক্যাথলিক ধর্মের কাহিনী, সেটি সেইন্ট ক্রিস্টোফারের জীবনকথা। একটি ধর্মীয় কাহিনীকে ভক্তমণ্ডলীর বাইরে, সাধারণ পাঠক-পাঠিকা গোষ্ঠীর জন্য লেখা খুব একটা সহজ কাজ নয়। অনেক সময়ে ভক্তদের কাছে যেটা ঈশ্বরের লীলা, সেটা সাধারণ পাঠক-পাঠিকার মনে সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়। সুকুমারের সমস্যা আরো গুরুতর ছিল। তিনি অ-খৃষ্টান পাঠক-পাঠিকাদের জন্য গল্পটি লিখেছিলেন। একজন রোমান ক্যাথলিক পাঠকের মনে ঐতিহ্যসূত্রে পাওয়া সেই কাহিনী - যদি তিনি ভক্ত নাও হন, তবুও যে আবেদন নিয়ে আসবে, অল্পবয়সী অ-খৃষ্টান বাঙালি পাঠক-পাঠিকার পক্ষে সেটার অর্থ বোঝা হয়ত ততটা সম্ভব হবে না। কিন্তু তবুও, সেসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সুকুমার একটি হৃদয়হারিনী কাহিনী লিখতে পেরেছিলেন। সেকাজ করতে গিয়ে মূল কাহিনীটির ধর্মীয় অনুষঙ্গকে তিনি বর্জন করেননি। সেই গল্পে সকলের ত্রাণকর্তা যীশুর কথা অবশ্যই রয়েছে। কাহিনীর নায়ক অফেরো ক্রুশের মানুষ যীশুকেই খুঁজেছিলেন। তাঁকে পাবেন বলেই তিনি স্বর্গ আর মর্তের মধ্যবর্তী অন্ধকার নদীর কাণ্ডারির কাজ নিয়ে কত মানুষকে - কত অক্ষম বৃদ্ধ, কত অসহায় শিশু, আর শয়তানের কত পাপের বোঝাকে পার করেছিলেন। অবশেষে একদিন আলোর মুকুট পরা এক মহাপুরুষ তাঁকে ত্রাণ করেছিলেন; তিনিই তাঁর নাম সেইন্ট ক্রিষ্টোফার দিয়েছিলেন, এবং তাঁকে অক্ষয় স্বর্গের অধিকার দিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ পাঠক-পাঠিকারা গল্পটিতে ধর্মীয় সেই রূপকের অন্তরালে শাশ্বত আদর্শের অপার মহিমাকে দেখতে পান। তাতে তাঁরা সেই মহান আদর্শের প্রতি মহৎ একজন মানুষের চিরকালীন আনুগত্যের কথা খুঁজে পান। পাহাড়ের মত শরীর, সিংহের মত বল আর আগুনের মত তেজসম্পন্ন অফেরো এমন একজন রাজাকে খুঁজেছিলেন, যে রাজার মনে কোন ভয় ছিল না। যে রাজা - প্রজার ভয়, শত্রুর ভয়, যুদ্ধের ভয়, বিদ্রোহেব ভয় এমনকি মৃত্যুকেও ভয় পেতেন না। এই ‘মাভৈঃ’-এর বাণী, এটা কোনো বিশেষ সম্প্রদায় বা ধর্মের কথা নয়, এটাকে সবদেশের সবকালের মানুষই জীবনের শ্রেষ্ঠ আচরণীয় ধর্ম বলে মনে করেছেন। চিরকালীন ও মহত্তম আদর্শের সেই কাহিনী সুকুমার নিতান্ত অনাড়ম্বর ভাবে বলেছিলেন। কোনো নীতিকে তিনি পাঠক-পাঠিকার ওপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। অল্পবয়সী পাঠক-পাঠিকাদের সামনে অতি সহজে তিনি শুধু অনুকরণীয় এক জীবনাদর্শকে তুলে ধরেছিলেন। একই বিষয়ে সুকুমারের দ্বিতীয় গল্পটির নাম ‘ভাঙাতারা’। আকাশে সপ্তর্ষি মণ্ডলের জন্মকথা নিয়ে মাওরি দেশের কাল্পনিক একটি কাহিনীকে তিনি সেখানে অবলম্বন করেছিলেন। সেই গল্পের স্বাদ এবং প্রকৃতি - দুই-ই প্রথমটি থেকে ভিন্ন। কাহিনীটি এরকম। সব আকাশের পরীর মত মাতরিকিরও একটি তারা ছিল। সবচেয়ে ঝকঝকে, সবচেয়ে সুন্দর সেই তারাটি দেখে অন্যান্য আকাশ-পরীদের খুব হিংসা হত। কিন্তু গাছের দেবতা তানের মনে শুধু হিংসা নয়, প্রতিহিংসা জেগে উঠেছিল। মাতরিকির তারাটি নষ্ট করতে তিনি বদ্ধ পরিকর হয়েছিলেন। মাতরিকির দুই বন্ধু দখিন হাওয়া আর জলের রাজার ছোট্ট মেয়ে তানের মতলব জানতে পেরেছিল। আকাশের দেশে গিয়ে তাঁরা মাতরিকিকে সাবধান করে আসতে চেয়েছিল। তখন ভোর হয়েছিল। “সূর্য তখন স্নানটি সেরে সিঁদুর মেখে সোনার সাজে পুবের দিকে দেখা দিচ্ছেন। রাজার মেয়ে তাঁর কাছে আবদার করল, ‘আমি আকাশের দেশে বেড়াতে যাব।’ সূর্য তাঁর একখানি সোনালি কিরণ ছড়িয়ে দিলেন। সেই কিরণ বেয়ে বেয়ে রাজার মেয়ে উঠতে লাগলেন। সকাল বেলার কুয়াশা দিয়ে দক্ষিণ হাওয়া তাঁকে ঘিরে ঘিবে চারদিকেতে ঢেকে রাখল। এমনি করে রাজার মেয়ে মাতরিকির বাড়িতে গিয়ে তাঁকে সব খবর বলে, ঝাপসা মেঘের আড়াল দিয়ে বৃষ্টি বেয়ে নেমে আসলেন।” তারপরে পূর্ণিমার রাতে তানে এবং দুষ্টু আকাশ পরীরা মাতরিকির তারাটি ধরতে বেরোল। মাতরিকি দু’হাত দিয়ে তারাটিকে ধরে ছুটতে লাগল - “ছুট ছুট ছুট। আকাশের আলোর নীচে, ছায়াপথের ছায়ায় ছায়ায় নিঃশব্দে ছুটাছুটি আর লুকোচুরি। দখিন হাওয়া স্তব্ধ হয়ে দেখতে লাগল রাজার মেয়ে রাত্রি জেগে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।” শেষকালে তানে মস্ত একটা তাবা ছুঁড়ে মাতরিকির সাধের তারাটি সাতটুকরো করে দিল। সেই ভাঙ্গাতারার সাতটি টুকরো আজও আকাশের গায়ে একই জায়গায় ঝিকমিক করে। “ঘুমের আগে রাজার মেয়ে এখনও তার ছায়ার সঙ্গে খেলা করে। আর জোছনা রাতে দখিন হাওয়ায় মাতরিকির দীর্ঘনিশ্বাস শোনা যায়।” রূপময় গদ্যের এই দীর্ঘ উদ্ধৃতিগুলি থেকে ‘ভাঙা তারা’র রচনাবৈশিষ্ট্য কিছুটা বোঝা সম্ভব। অনেকেই হয়ত জানেন যে, ছোটদের জন্য লেখা গল্প এবং কবিতায় শব্দের ধ্বনিগুণকে নানাভাবে ব্যবহার করা হয়, বর্ণনাও সেখানে চিত্রময় হয়। কারণ ছোটদের কল্পনার জগৎ মূলতঃ দৃষ্টি এবং শ্রুতিগ্রাহ্য। ধ্বনি এবং চিত্রের সাহায্যে সুকুমারও অল্পবিস্তর সব লেখাতেই তাঁর বর্ণনাকে মূর্ত করে তুলেছিলেন। কিন্তু সেগুলির মধ্যেও ‘ভাঙাতারা’র স্বাতন্ত্র্য খুবই স্পষ্ট। সেখানে ছবিই সর্বময় হয়ে উঠেছে বলে দেখা যায়। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ছবির ওপরে ভর দিয়েই কাহিনী এগিয়ে চলে। সেই সঙ্গে - “এমন সময়ে দখিন হাওয়া গুনগুনিয়ে জলের ধারে এসে পড়ল।” - এরকম দু’-একটি বাক্যে সুকুমার যেন ইন্দ্রিয়বেদ্য গদ্যের জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে কবিতাব অতীন্দ্রিয় জগৎকে স্পর্শ করে গিয়েছিলেন। এথেকে বুঝতে পারা যায় যে, কেন কোন কোন সমালোচকের সুকুমারকে ‘অপ্রতিরোধ্য কবি’ বলে মনে হয়।

কিন্তু তাও নিরপেক্ষ বিচারে, গল্পকার সুকুমার রায়ের কৃতিত্বের পরিমাণ খুব বেশি বলা যায়না। অনেকসময়েই তাঁর গল্প যেন নেপথ্যলোকের প্রস্তুতিতেই ফুরিয়ে যায়, পাঠক-পাঠিকার মনে প্রত্যাশা জাগিয়ে তুললেও, তিনি সেটাকে পূর্ণ করতে পারেন নি। সন্দেশ-পত্রিকার জন্যই তাঁর সব গল্পগুলি লেখা হয়েছিল। অনেকসময়েই হয়ত ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা, পত্রিকার পৃষ্ঠা পূরণের তাগিদে তাঁকে একাধিক রচনা লিখতে হয়েছিল। তাঁর গল্পগুলির অসম্পূর্ণতার সেটাও একটা কারণ। কিন্তু সেসবের চেয়েও বড়ো কারণ হল, নিতান্ত অসময়ে তাঁর চলে যাওয়া। রোগশয্যায় শুয়েও সুকুমার আবোল তাবোল-এর কবিতাগুলি বারংবার সংশোধন করে দিয়েছিলেন, সেগুলিকে গ্রন্থাকারে প্রকাশযোগ্য করে তুলেছিলেন। মনে হয় মৃত্যুর কাছে জীবনের জন্য আরেকটু সময় পেলে তিনি হয়ত তাঁর গল্পগুলিকেও মার্জনা করতেন, সেগুলিকে সুসংগত কলেবর দিতেন। তাঁর অপূর্ণ সেই সম্ভাবনা পাঠক-পাঠিকাকে আজও বিষন্ন করে বটে, কিন্তু সমালোচকের কাজ তো সাহিত্যিকের রচনার যেরূপ তাঁর সম্মুখে বর্তমান সেগুলি নিয়েই। সেই অনুসারে বিচার করলে সুকুমারের অনেক গল্পই বেদনাকরভাবে খণ্ডিত বলে মনে হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও, সেগুলির মধ্যে আছে এক আশ্চর্য সম্মোহনী শক্তি রয়েছে, একথা জানবার জন্য কোনো সমালোচকের দ্বারস্থ হতে হয় না। প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সুকুমারের গল্পগুলি যে শিক্ষিত বাঙালির সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে, এই তথ্যই সেটার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

তথ্যসহায়ক রচনাবলী:

১- সুকুমার রায়: শিল্প ও সাহিত্য, বিষ্ণু বসু।

২- সুকুমার রায়: জীবনকথা, হেমন্ত কুমার আঢ্য।

৩- সুকুমার বিচিত্রা, সুজিতকুমার নাগ সম্পাদিত।

মন্তব্য করুন