Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৯:২১ পূর্বাহ্ণ

আঠারো শতকের বাংলার কৃষি ( ইতিহাস ও বিশ্বসাহিত্য ) ।

‘আঠারো শতকের বাংলার কৃষি’

সুজন রায় ভাণ্ডারী তাঁর ‘খুলাসাৎ-উৎ-তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে অষ্টাদশ শতকের বাংলার বিশাল সমতল-ভূমির কথা বলেছিলেন। (খুলাসাৎ-উৎ-তাওয়ারিখ, সুজন রায় ভাণ্ডারী, স্যার যদুনাথ সরকার কৃত অনুবাদ, দি ইণ্ডিয়া অফ ঔরঙ্গজেব, পৃ- ৫৪) তাঁর বর্ণনা অনুসারে বাংলার সমতলভূমি তখন চট্টগ্রাম থেকে রাজমহলের তেলিয়াগাড়ি পর্যন্ত চারশো ক্রোশ লম্বা; এবং উত্তরের পর্বতপুঞ্জ থেকে হুগলী জেলার মান্দারণ পর্যন্ত দু’শো ক্রোশ চওড়া ছিল। সমসাময়িক রায় ছত্রমন তাঁর ‘চাহার গুলশান’ গ্রন্থে তৎকালীন বাংলার জরীপ করা জমির পরিমাণ ৩,৩৪,৭৭৫ বিঘা বলেছিলেন। (চাহার গুলশান, রায় ছত্রমন, স্যার যদুনাথ সরকার কৃত অনুবাদ, দি ইণ্ডিয়া অফ ঔরঙ্গজেব, পৃ- ৫৪) ১৭৫৮ খৃষ্টাব্দে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত ‘এ্যানুয়াল রেজিস্টার’-এ বাংলাকে উর্বর ও শস্যশালী বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। প্রায় সমসাময়িক রবার্ট ওরমে এবং আলেকজাণ্ডার ডাও (Alexander Dow) তাঁদের লেখায় বাংলার কৃষি, কৃষিজমি এবং উৎপন্ন ফসলের কিছু কিছু বর্ণনা রেখে গিয়েছিলেন। (এ হিস্ট্রি অব দি মিলিটারি ট্রানসাকসন অব দি বৃটিশ নেশন ইন হিন্দুস্তান, দ্বিতীয় খণ্ড, রবার্ট ওরমে, পৃ: ৩-৪; হিস্ট্রি অফ হিন্দুস্তান, প্রথম খণ্ড, আলেকজাণ্ডার ডাও, পৃ- ১৩৬) ওরমে বলেছিলেন, “পলিমাটি দিয়ে গড়া বাংলার সমতলভূমি উর্বর ও ঐশ্বর্যশালী। এই সমতলভূমি গঙ্গা ও তার শাখা-প্রশাখা এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা অসংখ্য নদীর জলধারাপুষ্ট। মে থেকে আগস্ট - এই তিনমাসের প্রবল বর্ষণে বাংলার মাটি উর্বর হয়, এবং এদেশের মানুষ অল্প আয়াসে শস্য পান। এত অল্প আয়াসে পৃথিবীর আর কোনো অঞ্চলে শস্য ফলে না। বাংলার সবচেয়ে বড় ফসল ধান। নিম্নবঙ্গে ধান এত প্রচুর পরিমাণে জন্মে যে ফসল ওঠানোর সময় ক্ষেতে মাত্র এক ফারদিঙে দু’ পাউণ্ড ধান পাওয়া যায়। আরো অনেক প্রকারের শস্য, অনেক ফল ও সবজি, খাদ্যের প্রয়োজনীয় অনেক মশলা বাঙালীরা অল্পায়াসে উৎপন্ন করেন। আখ চাষের জন্য কিঞ্চিৎ বেশি পরিশ্রম ও যত্নের প্রয়োজন হয়। বাংলার সর্বত্র আখের চাষ হয়। তাঁদের গরু মোষ একটু নিম্ন মানের, এবং কম দুধ দেয়। কিন্তু সেগুলির সংখ্যা এত বেশি যে গুণগত মানের ঘাটতি পুষিয়ে দেয়। বাংলার নদী ও পুকুরগুলিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। যাঁরা মাছ খান তাঁরা সহজেই সেটা যোগাড় করতে পারেন। সমুদ্রোপকূলের দ্বীপগুলিতে প্রচুর লবণ তৈরি হয়। সুতরাং সৈরাচারী সরকার থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চল জনবহুল। চাষাবাদ থেকে অবসর সময়ে কৃষকেরা তাঁত বোনেন, এবং সিল্ক ও সূতীবস্ত্র উৎপাদন করেন। বাংলায় বিভিন্ন ধরণের এত বস্ত্র উৎপন্ন হয় যে, এর চেয়ে আয়তনে তিনগুণ বড় অন্য কোনো ভারতীয় অঞ্চলে তা হয় না। এই বস্ত্র ও কাঁচা রেশমের একটা বড় অংশ ইউরোপে চালান যায়। এছাড়া ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে, এবং ভারতের বাইরে অন্যান্য দেশে এগুলি রপ্তানি করা হয়। বস্ত্র ও কাঁচা রেশমের সঙ্গে থাকে চাল, চিনি, সুপারি, আদা, লম্বা লঙ্কা, হলুদ, অন্যান্য ভেষজ সামগ্রী এবং কৃষিজাত পণ্য।” কৃষি যে কোন দেশের একটি জাতীয় সম্পদ। আঠারো শতকের বাংলার ক্ষেত্রে এই কথাটি আরো বেশি করে সত্যি ছিল। গঙ্গা ও পদ্মার পলিমাটি দিয়ে গড়া বাংলার বিশাল সমতল ভূমিতে তখন কৃষিকাজের অতি উপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল। সেটার সঙ্গে ছিল মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত নিয়মিত বর্ষা। আঠারো শতকের বাংলার কৃষি প্রসঙ্গে আলেকজাণ্ডার ডাও লিখেছিলেন, “প্রকৃতি যেন বাংলাকে নিজহাতে কৃষি ও কৃষিকাজের জন্য প্রস্তুত করেছেন। কৃষির উপযোগী সবকিছুই বাংলায় রয়েছে।” (হিস্ট্রি অফ হিন্দুস্তান, প্রথম খণ্ড, আলেকজাণ্ডার ডাও, পৃ- ১৩৬) এখনকার মতোই সেকালের বাংলার কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে ধান প্রধান ছিল। ‘খুলাসাৎ’ রচয়িতা সুজন রায় ভাণ্ডারী তখনকার বাংলার ধান চাষ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন, সেটা এখানে বিশেষ প্রাণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছিলেন যে, বাংলায় তখন বহু জাতের ধান উৎপন্ন হত। সেই প্রতিটি জাতের একটি করে শস্যকণাও যদি একটি ভাণ্ডে রাখা হত, তাহলে ভাণ্ডটি পূর্ণ হয়ে যেত! অর্থাৎ, সেযুগের বঙ্গদেশে বহুপ্রকারের ধানের চাষ করা হত। ধান চাষের ক্ষেত্রে সেরকম বৈচিত্র্য ভারতের অন্য কোথাও দেখা যেত না বলেই গ্রন্থকার ওই তথ্যটি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এছাড়া আলোচ্য সময়ের বাংলার কৃষি সম্বন্ধে তিনি আরো একটি অজানা তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাংলার কোন কোন অঞ্চলে চাষযোগ্য জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন হত। সেই সময়কার বাংলায় ভালরকমের গমের চাষ হত বলেও জানা যায়। কারণ, সমকালীন ওলন্দাজ নাবিক স্ট্যাভোরিনাস জানিয়েছিলেন যে, বাংলায় তখন ধান ছাড়া ভাল গমের চাষও হত। এর আগে (অর্থাৎ, স্ট্যাভোরিনাসের আগে বা অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে) বঙ্গদেশে উৎপন্ন সেই গম ওলন্দাজদের উপনিবেশ বাটাভিয়াতে (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) চালান করা হত। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর প্রথম সার্ভেয়ার জেমস রেনেলের ‘জার্নাল’-এও আলোচ্য সময়কার বাংলার কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যায়। রেনেলের জার্নালে তৎকালীন বঙ্গদেশের বিভিন্ন জেলার চাষবাসের সংবাদও পাওয়া যায়। রেনেল জানিয়েছিলেন যে, তখন রঙ্গপুর জেলায় ভাল চাষ হত। সেখানে উৎপন্ন কৃষিজ-পণ্যের মধ্যে গম, আখ ও তামাক প্রধান ছিল। (জার্নালস, জেমস রেনেল, পৃ: ১৩, ১৫, ১৯, ৪৮, ৫৪, ৬৩, ৬৮ ও ৭৩) রেনেল সাহেব ময়মনসিংহ জেলার বাগানবাড়ি ও চিলমারির মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরের সমতলভূমির সর্বত্রই ধানের ক্ষেত দেখতে পেয়েছিলেন। তখন বাগানবাড়ি থেকে মোরাগঞ্জ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের দুই তীরে সারি সারি ধান ক্ষেত, এবং সেগুলোর মাঝে মাঝে পান ও সুপারি গাছের ঝোপ দেখতে পাওয়া যেত। উত্তর-বঙ্গের বাহারবন্দ সরকারের সর্বত্রই তখন ভাল চাষ হত। সেখানেও কৃষি জমির মাঝে মাঝে সুপারি গাছের বাগান ছিল। পূর্ববঙ্গে তখন অনাবাদী জমি একেবারেই দেখা যেত না। ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত অলিয়াপুর থেকে কালিগঞ্জ পর্যন্ত তখন ঐ একই দৃশ্য, অর্থাৎ সর্বত্র ধান ক্ষেত ও সুপারি বাগান দেখতে পাওয়া যেত। ‘রিয়াজ-উস-সালাতীন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, সেই যুগে মাহমুদাবাদ সরকারে (উত্তর-পূর্ব নদীয়া, উত্তর-পূর্ব যশোহর, ও পশ্চিম ফরিদপুর) প্রচুর পরিমাণে লঙ্কার চাষ করা হত। (রিয়াজ-উস-সালাতীন, গোলাম হোসেন সলিম, পৃ- ৪৩) রেনেল সাহেব রঙ্গপুর ও বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে গম ও আফিমের চাষ দেখতে পেয়েছিলেন। বারাসাত থেকে যশোহর পর্যন্ত উন্মুক্ত প্রান্তরে তখন ডালের চাষ করা হত। ওই অঞ্চলের উৎপন্ন ফসলের মধ্যে ধান, মুগ, মুসুর, মটর প্রভৃতি প্রধান ছিল। আলোচ্য সময়ে কলকাতা থেকে যশোহরের হাজিগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তাটি ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ছিল, সেই রাস্তার দু’পাশে ধান ক্ষেতের সারি দেখতে পাওয়া যেত। জলঙ্গীর পাঁচ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মহেশপুন্দা নালার আশেপাশে তখন প্রচুর পরিমাণে ধান ও তুলার চাষ করা হত। আঠারো শতকের নদীয়া জেলার গ্রামগুলিতে নানা কৃষিকাজ ও ধানচাষ করা হত।

তখন গঙ্গা ও পদ্মার উভয় তীরেই ভাল কৃষি কাজ হত বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। পদ্মার ধারে পাবনা জেলাতে প্রচুর পান ও সুপারির ফলন হত। সেই জেলার সোনাপাড়া, বাণদোশী ও গোপালপুর অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে সুপারির চাষ করা হত। আলোচ্য সময়ে আত্রেয়ী নদীর উভয় তীরে যে চাষ হত, সেটা থেকে প্রচুর পরিমাণে ধান ও তুলো পাওয়া যেত। ভাল তুলো চাষের জন্য কালো উর্বর মাটি প্রয়োজন হয়। বাংলায় সেরকম কালোমাটি তখন ঢাকা, রাজশাহী ও উত্তর-বঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলে ছিল। টেলর সাহেবের সাক্ষ্য অনুযায়ী বলা যেতে পারে যে, ওই অঞ্চলে তখন ভাল জাতের তুলো জন্মাত। তাঁর মতে, সমগ্র বঙ্গদেশের মধ্যে ঢাকার তুলো তখন গুণগত মানের দিক দিয়ে সেরা ছিল। ঢাকা ও জাফরগঞ্জের মধ্যবর্তী জায়গাগুলিতেও তখন তুলোর চাষ করা হত। সেই চাষ থেকে যে তুলো পাওয়া যেত, তাতে স্থানীয় প্রয়োজন মিটে যেত। (জার্নালস, জেমস রেনেল, পৃ: ২৭-২৮ ও ৮২) সমগ্র ঢাকা জেলায় সেকালে প্রচুর পরিমাণে ধান ও তুলো উৎপন্ন হত। রেনেল সাহেব আঠারো শতকের ফরিদপুর জেলার চাষের যে বিবরণ রেখে গিয়েছেন, সেটা থেকে দেখা যায় যে, তখন ওই জেলায় আখ, তামাক, সুপারি ও পানের চাষই প্রধান ছিল। এমনকি সেখানকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিতেও ভাল পানের চাষ হত। এছাড়া ঢাকার আশপাশের জেলাগুলিতেও ভাল পানের চাষ ছিল। বীরভূমের কিছু অঞ্চলে তখন তুলো উৎপন্ন হত। সিউড়ীর চারপাশে ধান চাষ করা হত। সেই সময়ে বাঁকুড়া ও বর্ধমানে যে পরিমাণ তুলো জন্মাত, সেটা দিয়ে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন মিটে যেত। (ইন্টারেস্টিং হিস্টোরিক্যাল ইভেন্টস, প্রথম খণ্ড, জে. জেড. হলওয়েল, পৃ: ১৯৬-২০০) রিয়াজের লেখক গোলাম হোসেন সলিম জানিয়েছিলেন যে, আলোচ্য সময়ে মালদা জেলার কোন কোন অঞ্চলে নীলের চাষ করা হত। (রিয়াজ-উস-সালাতীন, গোলাম হোসেন সলিম, পৃ- ৪৬) ফার্মিংগারের ‘ফিফথ রিপোর্ট’ থেকে আঠারো শতকের বর্ধমানের চাষের খবর পাওয়া যায়। সেখানে তখন নানা ধরণের রবিশস্য (মুগ, কলাই, ছোলা মটর ইত্যাদি), তুলো, রেশম ও আখের চাষ করা হত। (ফিফথ রিপোর্ট, ফার্মিংগার, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ: ১৭৭ এবং ১৯৪-২০৪) শুধুমাত্র রাজশাহী জেলাতেই তখন সারা বাংলার উৎপন্ন রেশমের পাঁচ ভাগের চার ভাগ পাওয়৷ যেত। কাশিমবাজারের বিপরীত দিকে (গঙ্গার পূর্ব তীরে) লস্করপুরে কাঁচা রেশম সংগ্রহের একটি বড় কেন্দ্র ছিল।

সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে সেযুগের রবিশস্যের মধ্যে মাসকলাই, মুগ, ছোলা, অড়হর, মুসুরি, বরবটী, মটর, মাড়ুয়া, ভুরা, যব ও খেসারির উল্লেখ পাওয়া যায়। গঙ্গারাম লিখিত ‘মহারাষ্ট্রপুরাণ’ (পৃ- ১৮), এবং ভারতচন্দ্র লিখিত ‘অন্নদামঙ্গল’ গ্রন্থে সেযুগের খাদ্যশস্য ও রবিশস্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়। ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল গ্রন্থে ‘দিল্লীতে উৎপাত’ বর্ণনাকালে সেই যুগের বাংলার সমস্ত রকমের উৎপন্ন শস্যের পরিচয় দিয়েছিলেন -

“ধান চাল মাষ মুগ ছোলা অরহর।

মসুরাদি বরবটী বাটুলা মটর॥

দে ধান মাড়য়া কোদা চিনা ভুরা খর।

জনার প্রভৃতি গম আদি আর সব॥”

(অন্নদামঙ্গল, ভারতচন্দ্র, মানসিংহ, পৃ- ১১)

গঙ্গারাম তাঁর কাব্যে তখনকার ‘চাউল কলাই মটর মষুরি খেসারি’র কথা জানিয়েছিলেন। সমকালীন সাহিত্যে চাষের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির বর্ণনাও পাওয়া যায়। রামেশ্বরের ‘শিবায়ণ’ কাব্যে সেকালের বাংলার মাঠের চাষ, শস্য লালন ও ঝাড়াইয়ের নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায়। (শিবায়ণ, রামেশ্বর, বসুমতি সংস্করণ, পৃ: ৪৪-৪৫) রামেশ্বর ভট্টাচাৰ্য্য তাঁর লেখায় তৎকালে ব্যবহৃত চাষবাসের যন্ত্রগুলির বর্ণনা রেখে গিয়েছেন। তিনি সেগুলিকে ‘চাষাস্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। বর্তমান সময়ের চাষাস্ত্রের সঙ্গে সেগুলির বিশেষ কোন পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায় না। তখন চাষের জন্য চাষীরা সাধারণতঃ কোদালী, কাস্তে, লাঙ্গল, জোয়াল ফাল, জমির আগাছা দূর করবার জন্য বিড়ে, এবং জমি সমান করবার জন্য মই ব্যবহার করতেন। বলদ ও মহিষ - দুটোই তখন চাষের জন্য ব্যবহার করা হত। গোবর জমির সারের প্রয়োজন মেটাত।

আঠারো শতকের বঙ্গদেশে কৃষিকাজের জন্য কৃত্রিম জলসেচের খুব বেশি প্রয়োজন হত না। সমগ্র বাংলার অসংখ্য নদ-নদী তখন প্রাকৃতিক জলসেচ প্রণালীর কাজ করত। তবে সেযুগে জলসেচের একেবারেই যে কোনো ব্যবস্থা ছিল না - তা কিন্তু নয়। তখন বর্ষাকালে জমিতে বাঁধ দিয়ে বর্ষার জল ধরে রাখবার ব্যবস্থা ছিল। বীরভূমের মল্লরাজারা বড় বড় বাঁধ দিয়ে জল ধরে রাখবার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেগুলো দিয়ে দু’রকমের কাজ করা হত - (১) মল্লভূমের বড় বড় বাঁধগুলি ওই সীমান্ত জেলায় পরিখার কাজ করত ও দেশকে বহিঃশত্রুর আক্রমণের হাত থেকে রাখা করত, এবং (২) অনাবৃষ্টির সময়ে সেগুলো থেকে চাষীদের চাষের জল সরবরাহ করা হত। (হিস্ট্রি অফ বিষ্ণুপুররাজ, এ. পি. মল্লিক, পৃ- ৯৭) পার্কার সাহেব তাঁর ‘দি ওয়ার ইন ইণ্ডিয়া’ গ্রন্থে আঠারো শতকের বঙ্গদেশে বাঁধ দিয়ে জল ধরে রেখে রিজার্ভার তৈরির কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই রিজার্ভার থেকে চাষীরা চাষের জন্য জল পেতেন; বিনিময়ে তাঁরা রাষ্ট্রকে কর দিতেন। (দি ওয়ার ইন ইন্ডিয়া, পার্কার, পৃ: ৫-৬) এছাড়া গ্রাম বাংলার অসংখ্য পুকুরে বর্ষাকালে জল ধরে রেখে সেই জলের সাহায্যে শীতকালে শস্যের চাষ করা হত। সেই ব্যবস্থা আলোচ্য সময়ের বঙ্গদেশের প্রায় সর্বত্রই দেখতে পাওয়া যেত। (ভয়েজেস, স্ট্যাভোরিনাস, প্রথম খণ্ড, পৃ- ৩৯৬)

সেযুগের বাংলায় বনজ সম্পদও পরিমাণে কম কিছু ছিল না। গোলাম হোসেন সলিম জানিয়েছিলেন যে, বাজুহা সরকারে (রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া ও ময়মনসিংহ) তখন বিশাল একটা অরণ্য ছিল। (রিয়াজ-উস-সালাতীন, গোলাম হোসেন সলিম, পৃ- ৪৩) সেই অরণ্য থেকে প্রচুর পরিমাণে কাঠ পাওয়া যেত। সেগুলির বেশিরভাগই বাড়ি ও নৌকা নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা হত। বীরভূম ও বাঁকুড়া জেলাতেও তখন অরণ্য ছিল। সেখান থেকে কাঠ, মধু, লাক্ষা ও মোম পাওয়া যেত। শ্রীহট্টের বন থেকে নানা রকমের ফল, কমলালেবু ও ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করবার মত নানারকম চীনা মূল সংগ্রহ করা হত। সেই অরণ্যে প্রচুর পরিমাণে অলি কাঠ (aloe) পাওয়া যেত। জলপাইগুড়ি জেলার অরণ্য থেকেও তখন প্রচুর কাঠ পাওয়া যেত। (জার্নালস, জেমস রেনেল, পৃ- ৬৮) আলোচ্য সময়ে সুন্দরবন অঞ্চলের প্রধান ফসল ছিল কাঠ ও আম। তখন বাংলার সর্বত্রই আমের ফলন হত। ‘খুলাসাৎ’ রচয়িতা বরবকাবাদ (মালদা, রাজশাহী ও বগুড়া) ও শ্রীহট্টে প্রচুর পরিমাণে কমলালেবু উৎপন্ন হত বলে জানিয়েছিলেন। এছাড়া নিজের লেখায় তিনি ওই অঞ্চলের আরো একটি অদ্ভুত ফলের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি সেটার নাম দিয়েছিলেন ‘সাংতাড়া’। তাঁর প্রদত্ত ফলটির বর্ণনা থেকে গবেষকরা মনে করেন যে, সেটা সম্ভবতঃ বাতাবিলেবু ছিল।

আলোচ্য সময়ের ইতিহাস থেকে বাংলার কৃষি উৎপাদনের পদ্ধতি ও পরিমাণে বড় রকমের কোনো পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায় না। তখন ভূমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রেও কোনো বড় রকমের পরিবর্তন ঘটেনি। নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলার পতিত ও অনাবাদী জমিগুলিকে চাষের আওতায় আনবার জন্য চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি ছোট ছোট কৃষকদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য তাঁর রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। কৃষকদের হালের গরু ও মহিষ কেনবার জন্য তিনি সরকারী ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। দুর্ভিক্ষের সময়ে বা অনাবৃষ্টির ফলে শস্যের ক্ষতি হলে তিনি কৃষকদের খাজনা মকুব করে দিতেন। এছাড়া কৃষিজমিতে যাতে ভালভাবে চাষ করা হয়, সেটার জন্য তিনি কৃষকদের কৃষিঋণ (তাকাবি) দেওয়ার নীতিও অনুসরণ করেছিলেন। মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলার জমিদারদের ওপরে কড়া নজর রাখতেন। তাঁর সময়ে কৃষক বা রায়তের উপরে অত্যাচার করলে কোন জমিদারই সহজে নিস্তার পেতেন না। সেই কারণে তাঁর সময়ে জমিদারেরা সব সময়ে সন্ত্রস্ত থাকতেন। জমিদারের ভকিলরা মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারের আশেপাশে নিজেদের অঞ্চলের বিক্ষুব্ধ রায়তের সন্ধান করতেন; এবং সেরকম কোনো বিক্ষুব্ধ রায়তের সন্ধান পেলেই, নবাবের দরবারে সে নিজের অভিযোগ পেশ করবার আগেই ভকিল তাঁকে খুশী করে দিয়ে তাঁর ও জমিদারের মধ্যেকার বিরোধ মিটিয়ে দিতেন। নবাব সুজাউদ্দিন ও আলিবর্দীও বাংলার কৃষকদের রক্ষা করবার নীতি অনুসরণ করেছিলেন। তাঁরা কৃষকদের ওপরে নজর রাখতেন। বাংলায় মারাঠা আক্রমণের অবসান ঘটবার পরে আলিবর্দ্দী বঙ্গদেশের কৃষির পুনর্গঠনে মন দিয়েছিলেন। সমসাময়িক ব্যক্তিদের লেখা থেকে জানা যায় যে, মারাঠা আক্রমণে বাংলার বিধ্বস্ত গ্রাম ও কৃষিকে গড়ে তোলাই তাঁর জীবনের শেষ কাজ। কৃষি তখন বাংলার জাতীয় সম্পদ ছিল। তাই কৃষি ও কৃষককে রক্ষা করাকে বাংলার নবাবেরা তাঁদের কর্তব্য বলে মনে করতেন। সেটাই ওই যুগের রাষ্ট্রনীতি ছিল। সেযুগে জমিদারদের সঙ্গে রায়তের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটেনি। জমিদারেরা রায়তদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ছিলেন। তখন রায়তদের সঙ্গে জমিদারদের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ হলেও, নবাব সরকারের সঙ্গে ক্ষীণ ও অপ্রত্যক্ষ ছিল। আঠারো শতকের বাংলায় খাদ্যশস্যের বড় রকমের কোন ঘাটতি দেখা দেয়নি। তবে ১৭১১ খৃষ্টাব্দের বঙ্গদেশে একবার খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল। তখন কয়েক হাজার মানুষ সেই দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে কোম্পানীর কাগজপত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। (ডায়েরি এণ্ড কন্সালটেশন বুক, ৯ই জুলাই, ১৭১১ সাল)  সেই সময়ে মুর্শিদকুলী খাঁ খাদ্যশস্যের রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে, এবং গুদামজাত শস্য উদ্ধার করে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ওই সমস্যার মোকাবিলা করেছিলেন। এরপরে ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দে বঙ্গদেশে ঝড়ের পরে, এবং একই শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে (১৭৫২, ১৭৫৪) বন্যার ফলে খুব অল্পকালের জন্য খাদ্য সরবরাহে টান পড়েছিল। তবে সেই সাময়িক ঘাটতি কখনো গুরুতর রূপ পরিগ্রহ করেনি।

আলোচ্য সময়ে বাংলার সমস্ত কৃষিজাত পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করা হত না। সেটার পিছনে দুটি কারণ ছিল। কৃষি-পণ্য আকারে বড় হওয়ার জন্য জাহাজে বেশি জায়গা দখল করত; সেই কারণে কৃষিপণ্যের জাহাজ পরিবহন ভাড়া তখন বেশি ছিল। যেহেতু কৃষিপণ্য সহজে নষ্ট হয়ে যেত, সেজন্য তখন বাংলা থেকে সুদূর ইউরোপে কৃষিপণ্য নিয়ে যাওয়া মোটেও সহজসাধ্য ছিল না। ইউরোপের শিল্পে চাল বা তৈলবীজের ব্যবহার তখনো পর্যন্ত শুরু হয়নি। আলোচ্য সময়ে বাংলার কৃষিজ পণ্য নীল ও পাট ইউরোপে রপ্তানি করা হত না। সেগুলো যেটুকু উৎপন্ন হত, ততটা অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনে লেগে যেত। তবে তখন বাংলা থেকে নানা ধরণের কৃষিপণ্য - চাল, চিনি, ডাল, তৈলবীজ, আফিম, নীল, লঙ্কা প্রভৃতি ভারতের অন্যান্য প্রদেশে এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে নিয়মিতভাবে রপ্তানি করা হত।

তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:

১- দি ইণ্ডিয়া অফ ঔরঙ্গজেব, স্যার যদুনাথ সরকার।

২- খুলাসাৎ-উৎ-তাওয়ারিখ, সুজন রায় ভাণ্ডারী, অনুবাদক: স্যার যদুনাথ সরকার।

৩- চাহার গুলশান, রায় ছত্রমন, অনুবাদক: স্যার যদুনাথ সরকার।

৪- এ হিস্ট্রি অব দি মিলিটারি ট্রানসাকসন অব দি বৃটিশ নেশন ইন হিন্দুস্তান, দ্বিতীয় খণ্ড, রবার্ট ওরমে।

৫- হিস্ট্রি অফ হিন্দুস্তান, প্রথম খণ্ড, আলেকজাণ্ডার ডাও।

৬- জার্নালস, জেমস রেনেল।

৭- রিয়াজ-উস-সালাতীন, গোলাম হোসেন সলিম।

৮- ইন্টারেস্টিং হিস্টোরিক্যাল ইভেন্টস, প্রথম খণ্ড, জে. জেড. হলওয়েল।

৯- ফিফথ রিপোর্ট, ফার্মিংগার, দ্বিতীয় খণ্ড।

১০- অন্নদামঙ্গল, ভারতচন্দ্র।

১১- মহারাষ্ট্রপুরাণ, গঙ্গারাম।

১২- শিবায়ণ, রামেশ্বর, বসুমতি সংস্করণ।

১৩- হিস্ট্রি অফ বিষ্ণুপুররাজ, এ. পি. মল্লিক।

১৪- দি ওয়ার ইন ইন্ডিয়া, পার্কার।

১৫- ভয়েজেস, স্ট্যাভোরিনাস, প্রথম খণ্ড।

১৬- ডায়েরি এণ্ড কন্সালটেশন বুক, ৯ই জুলাই, ১৭১১ সাল।

মন্তব্য করুন

ব্লগ